যুগ যুগ ধরে সুবিধা বঞ্চিত আট লক্ষ বেদে জনগণের প্রতি সুদৃষ্টির জন্য কি আরো সময় প্রয়োজন?


নদীর পাড়ে ছোট তাঁবু টাঙ্গিয়ে অথবা নৌকার টাবরের নিচে কোন মত মাথা গুজে থাকা একটি যাযাবর গষ্টির সাথে আমরা সবাই বেস পরিচিত, এদেরকে বেদে/বৈদ্য/বাইদ্যা/­ব্যারাইজ্জ্যা/বাদিয়া ইত্যাদি নামে ডাকা হয়,তবে বেদে নামটাই বেসি ব্যাবহার করা হয়। এদের নিয়ে লিখতে বসলাম এক ছোট ভাইয়ের আগ্রহ থেকে,তার ইচ্ছা দলিত এই গষ্টিটির শিশু গুলোকে উপ-আনুষ্ঠানিক ভাবে অক্ষরজ্ঞান দেয়া ও বাঙালী সমাজের মুল স্রোতধারার সাথে সংযুক্ত হতে উৎসাহ দেয়া।

শোনার পরে কন্সেপ্টটা আমার বেস ভাল লেগে যায়, আর ওর কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়েও যাই।

যাইহোক বেদেরা হল ভ্রমণশীল বা ভবঘুরে একটি সম্প্রদায়।বেদেরা মুলত নদীনির্ভর বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রান্তে নৌকায় সংসার পাতে ও নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে।

ঢাকার সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মিরসরাই, তিনটুরী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এসব বেদের আবাস।শুধু সুনামগঞ্জের সোনাপুরেই বাস করে বেদে সমাজের বৃহত্তর একটি অংশের।

১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সাথে এরা ঢাকায় আসে। পরবর্তীকালে তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নেয়। এরা প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে এবং পরে সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও তারা ছড়িয়ে পড়ে। বেদের আদি নাম মনতং। বেদে নামটি অবজ্ঞাসূচক বাইদ্যা (হাতুড়ে ডাক্তার), পরিমার্জিত ‘বৈদ্য’ (চিকিৎসক) থেকে উদ্ভূত। অধিকাংশ বেদেই চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনতংরা কালক্রমে বেদে নামে অভিহিত হয়। বেদেরা আরাকান রাজ্যের মনতং আদিবাসী (Mon-tong) গোত্রের দেশত্যাগী অংশ। তাই এরা নিজেদের মনতং বলে পরিচয় দিতে বেশি আগ্রহী। যুদ্ধ ও শিকারে অতিশয় দক্ষ বেদেরা কষ্টসহিষ্ণু ও সাহসী। এদের গাত্রবর্ণ ও আকৃতি বাঙালিদের মতোই।

বেদেনী/বাইদানী সম্প্রদায়ের নারীরা যথেষ্ট শ্রম দেয়। বাইদানী নারীরা যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। বেদে পুরুষরা সাধারণত অলস হওয়ায় উপার্জন, বিয়ে ও সন্তান প্রতিপালনে নারীরা মোটমোটি মুখ্য ভূমিকাই পালন করে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ৭.৮০ লক্ষ বেদে জনগোষ্ঠীর লোক রয়েছে ।

দেশের মোট জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ হল এই বেদে সম্প্রদায়। তবে দুঃখের ব্যাপার হল সুবিধা বঞ্চিত এই মানুষগুলোকে পাস কাটিয়েই উন্নয়নের সব পরিকল্পনা চলছে। ২.৫ লাখ চাকমা সমেত ৬ লাখ অভিবাসী উপজাতির জন্য দেশে সকল সরকারী চাকুরী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য ৫% কোটা নির্ধারিত করা হয়েছে।

কিন্তু এই প্রায় আট লক্ষ বেদের জন্য সরকারের কোন পরিকল্পনাই লক্ষ করা যায় না।
বেদে জনসংখ্যার প্রায় ৯৮% লোকেই অশিক্ষিত। তাদের শিক্ষা গ্রহণে প্রধান বাধা হল তারা যাযাবর, আর এর পরেই আর একটি বড় বাধা হল সামাজিক ভাবে হেয় করে দেখার প্রবণতা।
বেদে শিশুদের স্কুলের সহ পাঠিরা সাধারণত ঘৃণার চোখে দেখে। পাশে বসতে দেয় না। এমনকি বেদেরা ইসলাম ধর্মের অনুসারী হলেও তাদের জুম্মা বা ঈদের নামাজে সবার পিছনের কাতারে দাড় করানো হয়।

বেদে সম্প্রদায়ের বহর গুলো বিভিন্ন স্থানে গেলে বেদেনী নারীদের কে স্থানীয় প্রভাবশালীর দ্বারা ধর্ষনের স্বীকার হয়ে থাকেতে হয় বলে প্রচার আছে । তবে তাদের ভিতি ও সামাজিক মর্যাদা হীনতার কারনে কোন অভিযোগ করার উপায় পায় না।
এছাড়াও গ্রামে সাপ খেলা দেখাতে গেলেও বেদেনীদের অহরহ ইফটিজিং বার এর চেয়ে বড় যৌন হয়রানীর স্বীকার হতে হয়।

আমাদের মোট জনসংখ্যার এই বিশাল একটি অংশকে উন্নয়ন বঞ্চিত রেখে কোন ভাবেই টেঁকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় হেতু, আমাদের উচিৎ এই সম্প্রদায়টির প্রতি সুদৃষ্টি প্রদান ও সামাজিক ভাবে মানুষ হিসেব জ্ঞান করা।

এবং এই ব্যাপারে সরকার জনসচেতনতা চালাতে পারে যে দেশে কোন নাগরিক ছোট বা বড় নয় সবাই সমান তাই সবার ক্ষেত্রে নুন্যতম সম্মানের সাথে জীবন জাপনের অধিকার রয়েছে মর্মে প্রচার করা।
এছাড়াও
পিছিয়ে পড়া এই জনগষ্টিটিকে মুল স্রতধারার সাথে সমপৃক্ত করতে পার্বত্য অঞ্চলে পতিত থাকা পাহাড় ও সরকারী জমিতে পুনর্বাসন করতে হবে।
এবং সরকারী কোটার মাধ্যমে সাধারণ ও উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

২ thoughts on “যুগ যুগ ধরে সুবিধা বঞ্চিত আট লক্ষ বেদে জনগণের প্রতি সুদৃষ্টির জন্য কি আরো সময় প্রয়োজন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *