বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা শিখার প্রাণ, ডঃ আহমদ শরীফ।

প্রতিভার ঔদ্ধত্যই আমার বেশি গ্রহণীয় মনে হয়। কারণ উদ্ধত মানুষ সহজে চরিত্রহীন হ’তে পারে না। আত্নপ্রত্যয়ী আত্নমর্যাদাসম্পন্ন না হ’লে কেউ উদ্ধত হতে পারে না। কৃত্রিম বিনয়ে অনেকেই বিনীত। বিনীত মানুষেরা সুবিধাবাদী হয়।

প্রতিভার ঔদ্ধত্যই আমার বেশি গ্রহণীয় মনে হয়। কারণ উদ্ধত মানুষ সহজে চরিত্রহীন হ’তে পারে না। আত্নপ্রত্যয়ী আত্নমর্যাদাসম্পন্ন না হ’লে কেউ উদ্ধত হতে পারে না। কৃত্রিম বিনয়ে অনেকেই বিনীত। বিনীত মানুষেরা সুবিধাবাদী হয়।

প্রতিভার ঔদ্ধত্যই আমার বেশি গ্রহণীয় মনে হয়। কারণ উদ্ধত মানুষ সহজে চরিত্রহীন হ’তে পারে না। আত্নপ্রত্যয়ী আত্নমর্যাদাসম্পন্ন না হ’লে কেউ উদ্ধত হতে পারে না। কৃত্রিম বিনয়ে অনেকেই বিনীত। বিনীত মানুষেরা সুবিধাবাদী হয়।

ডঃ আহমদ শরীফের জন্মদিন আজ, তিনি জন্মেছিলেন ঊনিশশো একুশ-এর তেরই ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামে। আর মৃত্যুবরণ করেন ঊনিশশো নিরানব্বইয়ের চব্বিশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায়।

আহমদ শরীফ বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্যিক জীবন্ত কোষগ্রন্থতুল্য প্রতিভা ছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন, মানুষের মানবিক অগ্রাদিকার, অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরেপক্ষ আদর্শের সমাজ গঠন, বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন এবং প্রগতিশীল জীবনাচরণে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করার জন্য লিখেছেন। তার লেখায় ভাষাগত নিজস্বতা এবং উচ্চচিন্তার পরিচয়; বৈষম্য ও শোষনমুক্ত সমাজ গঠনের তীব্র আবেদন রয়েছে। তিনি স্বদেশের ঐতিহ্যসন্ধানী, ইতিহাস অন্বেষু, গনমুক্তির আকাঙ্ক্ষী। তার মানবপ্রত্যয় ছিল বৈশ্বিক পরিসরে উন্নীত। তিনি মুলত চিন্তা-চেতনায় প্রাগ্রসর ও মুক্তবুদ্ধির সাধক। প্রথাগত বুদ্ধিজীবীদের মতো কোন নগদ সুবিধার লোভে নিজেকে বিকিয়ে দেননি রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হিসেবে।

আহমদ শরীফ বড় হয়ে উঠেছিলেন আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদের দুর্লভ অমূল্য পুঁথির ভাণ্ডার ও সাময়িক পত্রপত্রিকার সম্ভারের মধ্যে। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি ব্যয় করেছেন মধ্যযুগের সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাস রচনার জন্য। যা ইতিহাসের এক অন্যতম দলিল। বিশ্লেষণাত্মক তথ্য, তত্ত্ব ও যুক্তিসমৃদ্ধ দীর্ঘ ভূমিকার মাধ্যমে তিনি মধ্যযুগের সমাজে ও সংস্কৃতির ইতিহাস বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে দিয়ে গেছেন যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অমর গাঁথা হয়ে থাকবে।

আহমদ শরীফ আমাদের শিখিয়েছেন কিভাবে অপ্রিয় সত্য সহজে বলতে হয়, আমাদের বুঝিয়ে গেছেন সীমাবদ্ধতার দেয়াল যদি আমরা না ভাঙ্গি তাহলে এই দেয়াল আরও শক্ত হবে আরও বড় হবে। তাই আমাদের দায়িত্ব আমাদেরই পালন করতে হবে। যেটাকে আমরা সীমাবদ্ধতা বলে চুপ করে থাকি সেটাকে আহমদ শরীফ আরও অনেক আগেই ভাঙার কাজ শুরু করে গেছেন।

জ্ঞানের গভীরতায়,মৌলিক চিন্তায়, মুক্তবুদ্ধির চর্চায় এবং সর্বোপরি মানবতাবাদ প্রচারে নিষ্ঠাবান শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড.আহমদ শরীফ বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল জোতিষ্ক দ্রোহ ও প্রথাবিরোধিতা যার মানসের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য । সমাজের সকল রকম অসঙ্গতি, অন্যায়-অনাচার-বৈষম্য, ধর্মান্ধতা-মতান্ধতা-সাম্প্রদায়িকতা, শোষন-পীড়ন-দুঃশাসন এবং বিদেশী খবরদারী ও লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রতিবাদ ও দ্রোহের প্রতীক । তাঁর শত্রু-মিত্র সকলের ঐকমত হল , তিনি সাহসী মানুষ ছিলেন । তাঁর এই দ্রোহ আর সাহসের উৎস কি ? তাঁরই ভাষায় …আমার সাহসের উৎস হচেছ হঠকারিতা,অবিমৃশ্যকারিতা ,সংস্কৃত শব্দ। আমি ভেবে চিনতে কোনো কাজ করতে পারিনা। আমি যেটা মনে করি উচিৎ, সেটা উচিৎ।

আহমদ শরীফ তার জীবনের কর্মকান্ডের জন্য তাকে কেউ কেউ ‘সক্রেটিস’ আখ্যায়িত করেছেন তেমনি আমাদের দেশের ধর্মান্ধ-মৌলবাদের কাছ থেকে পেয়েছেন আক্রমণ। ২১ অক্টোবর ১৯৯২ তারিখে স্বদেশ চিন্তা সংঘের সেমিনারে ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে মত প্রকাশের জন্য তিনি প্রতিক্রিয়াশীল মোল্লাদের দ্বারা ‘মুরতাদ’ আখ্যায়িত হন , (ইনকিলাব ২৪ অক্টোবর ১৯৯২)। শুধু ‘মুরতাদ’ বলেই থেমে থাকেন নি ঐ ধর্মান্ধরা তার বাসভবনে বোমা নিক্ষেপও করে ।

আহমদ শরীফের দেশ ও মাটির জন্য প্রেম কতটা গভীর ছিল তা তার বাঙলা ও বাঙালি প্রবন্ধে ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন…

মা জন্ম দেয়, মাটি লালন করে । তাই দেশের মাটিকে মায়ের মতোই ভালবাসতে হয়। একসময় মায়ের প্রয়োজন ফুরায়। কিন্তু মাটির প্রয়োজন মৃত্যুর পরেও থেকে যায়। মানুষের জীবন একাকীত্বে সম্ভব নয়, তাই পরিজন-প্রতিবেশী নিয়েই যাপন করতে হয় তার জীবন। এদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ও মিলনে সহযোগিতায় ও বিরোধেই তার জীবনের বিকাশ ও বিস্তার সম্ভব। অতএব চেতনার গভীরে দেশের মাটি ও মানুষের গুরুত্ব উপলব্ধি করাই স্বজাত্য ও স্বাদেশিকতা।

আমাদের দেশে নাস্তিকতা হচ্ছে একটি ভয়ঙ্কর বিষয়, কেউ নিজে নিজেকে নাস্তিক দাবী করতে পারে না, যদি করে তাহলে তার অবস্থা কি পাঠক তা ভালো করেই জানেন। নাস্তিক সম্পর্কে আহমদ শরীফ স্পষ্ট ভাবে বলেছেন. . .

নাস্তিক্য কোন নতুন তত্ত্ব নয়,-সুপ্রাচীন, সবাই বলে সব কিছুরই স্রষ্টা আছে, গাড়ি-বাড়ির, জামা-কাপড়ের, বই-পত্রের যেমন নির্মাতা আছে, তেমনি জগতেরও স্রষ্টা থাকার কথা। এ কথাগুলো যুক্তিগর্ভ। কিন্তু তারা স্রষ্টাকে স্বয়ম্ভূ বলে। বিজ্ঞান বলে- সবকিছু একাধিক উপাদানে গঠিত। তাই যদি হয়, স্বয়ম্ভূ স্রষ্টায় সম্ভবত একাধিক উপাদানের সমষ্টি। তা হলে তার আগেও কিছু উপাদান ছিল, তা ছাড়া খালি-খোলা স্থান ও কাল পরিসরও ছিল, নইলে স্রষ্টার স্ব হওয়ার ঠাঁই মিলত কোথায়! স্রষ্টার অস্তিত্ব লাভের আগেই যদি স্বয়ম্ভূ হবার প্রতিবেশ স্বয়ং তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে অন্য কিছুরও স্বয়ম্ভূ হবার পথে বাধা কি! কাজেই স্রষ্টা তত্ত্ব টেকে না।

আহমদ শরীফ ইতিহাস-দর্শন-সাহিত্য এমন কি মার্ক্স বাদ সম্পর্কেও তিনিও লিখেছেন, তাই তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন. . .

আমি যখন লিখতে শুরু করি তখন দেখি যে সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ বা কম্যুনিজমের কথা বললেই চারদিকের মানুষ চটে ওঠে, অথচ এ-যুগে বন্টনে বাঁচা ছাড়া কোন উপায় নেই। বন্টনে বাঁচতে হলে রীতিনীতি-আইন-কানুন-শাস্ত্র সম্পর্কে নতুন ধারণা করতে হবে, পুরোনো দিয়ে হবে না। সেজন্য দরকার সমাজতন্ত্র। মানুষের সর্বশেষ আবিষ্ক্রিয়া হচ্ছে সমাজতন্ত্র, সর্বশেষ বলেই বোধহয় সর্বশ্রেষ্ঠ। পৃথিবীর গরীব দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রই সর্বোৎকৃষ্ট। সেজন্যই আমি সমাজতন্ত্রের পক্ষপাতী। কিন্তু সমাজতন্ত্র বললেই মানুষ ক্ষেপে যায়, তার কারণ হলো শাস্ত্র। মানুষ বিশ্বাস-সংস্কার অনুসারে চলে। তাদের ভূতে ও ভগবানে বিশ্বাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ওই বিশ্বাসই তাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে, তারা নিয়তিবাদী হয়, অদৃষ্টবাদী হয়। নতুন ব্যবস্থার জন্য তাই আঘাত করা দরকার বিশ্বাসের দুর্গে। প্রথম লেখা থেকে আজ পর্যন্ত আমি মানুষের পুরোনো বিশ্বাস-সংস্কার-নিয়ম-শাস্ত্র-প্রচলিত আইন-কানুন সব কিছুকেই আঘাত করেছি।

আহমদ শরীফ সমাজে বিখ্যাত হওয়া এবং কিংবা কৃপা করুণাকে ঘৃনা করেছেন, তিনি বলেছেন. . .

আমি সারাজীবন মোসাহেবি করে তোয়াজ-তোষামোদ-খোসামোদ করে, তদবির করে অপরের কৃপায় করুণায় তকদির তৈরির বা বদলানোর পন্থা মাত্রকেই ঘৃণা করেছি। বরং ক্ষতি স্বীকারের শক্তি অর্জনে ও রক্ষণে ছিলাম সদা সচেতন। তাই কোথাও কোন কৃপা-প্রসূন পদ-পদবি ছাড়াই আজো নিশ্চিত নিদ্রার, নিশ্চিত মনের অভীক চিত্তের অধিকারী হয়ে টিকে রয়েছি। তৃপ্ত-তুষ্ট-হৃষ্ট ও পুষ্ট হয়ে নিজের নীতি-আদর্শের মতে পথে সিদ্ধান্তে স্বাতন্ত্র্য রেখেও শরীরের অসুস্থতা নিয়েও সুখানন্দে আমার দিন কাটছে । পড়া-লেখা-আড্ডা আমার নিত্যদিনের কাজ। নাস্তিক বলে মৃত্যুভয়ও নেই।

তিনি নিজের সম্পর্কে বলেছেন. . .

আমি মেজাজি। আমি তর্ক করতে ভালোবাসি। বুদ্ধিমান লোক হ’লে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করতে পারি। ইডিয়সি আমি সহ্য করতে পারি না।…ঘৃণা করি, নিন্দা করি…আবেগ আছে, আমি বিচলিত হই। বিপদে আপদে অসুখে দুর্ঘটনায় আমি বিচলিত হই।…গল্প-উপন্যাস-কবিতা-নাটক ছাড়া যে-কোনো ধরনের বই এখনো আমি পড়ি।…(লেখালেখি আমার কাছে) অত্যন্ত আনন্দদায়ক। একটা লেখা যখন ধরি সেটা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মনের মধ্যে দাহ থাকে। যখন শেষ হয় তখন একটা সৃষ্টির আনন্দ অনুভব করি। পরিশ্রম মনে হয় না। এটা আনন্দিত পরিশ্রম।

ধার্মিকতা আর অসাম্প্রদায়িকতার সহাবস্থান আহমদ শরীফের কাছে গ্রহনযোগ্য ছিল না। কিন্ত তাঁর মানে এই নয়, তিনি নিজে, ধর্ম পালনকারী সাধারণ মানুষের প্রতি অবজ্ঞা বা ঘৃণা পোষন করতেন।

এ প্রসঙ্গে অজয় রায় লিখেছেন,

আহমদ শরীফ সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসে কোনদিন আঘাত দেন নি, হয়তো তাঁদের প্রতি এক ধরনের অনুকম্পা থাকতে পারে; তিনি সোচ্চারে নিন্দা করেছেন যাঁরা ঐ ধর্মবিশ্বাসকে ব্যবহার করতে চায় ইহজাগতিক কাজে, তা রাজনৈতিক অঙ্গনেই হোক, আর সাংস্কৃতিক-সামাজিক ক্ষেত্রেই হোক। এজন্য তিনি শুধু তথাকথিত কট্টর মৌলবাদীদের সমালোচনা করেছেন তা নয়, সমভাবে তীক্ষ্ণ কশাঘাত করেছেন অনেক প্রগতিপন্থী রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবীদেরও। ধর্মকর্ম করে বলে সাধারণ মানুষকে তিনি ধিক্কার দেন নি, ধিক্কার দিয়েছেন সেই সব রাজনীতিবিদকে যাঁরা ‘ধর্মকর্ম সমাজতন্ত্র’ বলে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিতে চেয়েছেন।

ডঃ হুমায়ুন আজাদ একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ডঃ আহমদ শরীফের। তার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি. .

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ কারা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য হন? লেখাপড়ার সাথে যোগ নেই যাদের, যারা দুর্বল মেরুদন্ডের?
ডঃ আহমদ শরীফঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মধ্যে ভালো পরীক্ষা পরিক্ষা পাশ উপাচার্য ছিলেন অনেকে। প্রায় অধিকাংশই। কিন্তু পরবর্তীকালে লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন তেমন লো দেখা যায় না। রমেশচন্দ্র মজুমদার আমাদের আগের। মাহমুদ হাসান থেকে বলি, তিনি ডিগ্রী নেওয়ার পর সই করা ছাড়া আর কিছু করেন নি। শুনেছি স্যার এফ রহমান ও সই ছাড়া আর কিছু করেন নি। মাঝখানে শুধুরমেশ চন্দ্র মজুমদার লেখা পড়া করেছেন, সারাজীবন করেছেন। মোয়াজ্জেম হোসেন সাহেব ও ডিগ্রি নেয়ার পর কখনো লেখাপড়া করেন নি। মাহমুদুল হাসান করেন নি, ওসমান গনি করেন নি। আবু সাইদ চৌধুরী ওতো এ লাইনেরই না। এ ছাড়া লেখা পড়া খুব কম শিক্ষকই করেন। এক ডক্টরেট ডিগ্রি দেখিয়েই অধিকাংশ সব কিছু হন।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ কোন দার্শনিক ধারাটিকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

ডঃ আহমদ শরীফঃ নাস্তিক্যধারা। জগৎ-জীবন-স্রষ্টার রহস্য জানার আগ্রহ থেকে দর্শন শাস্ত্রের শুরু। কুলকিনারা না পেয়ে দুর্বলেরা আস্তিক্য দর্শনগুলো গ’ড়ে তোলেন, পরবর্তীকালে সেগুলো ধর্ম নির্ভর দর্শনে পরিণত হয়। অবশ্য কেউ কেউ সংশয়বাদী হয়েছেন,নাস্তিক্যবাদী হয়েছেন । ভারতবর্ষে বৈশেষিক দর্শন বা সাংখ্য দর্শন এক সময় নাস্তিক্য দর্শন ছিলো। লোকায়েতিকেরা নাস্তিক্যবাদী। এগুলো আমার খুব পছন্দ, কারণ আমি আস্তিক্যে বিশ্বাস করি না। শাস্ত্রকে আমি মনে করি ম্যান মেইড।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্ককে আপনি কী দৃষ্টিতে দেখেন?
ডঃ আহমদ শরীফঃ এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। সামাজিক কারণেই বিয়ে দরকার, মারামারি ঠেকিয়ে রাখার জন্যে। বিয়ে হচ্ছে সমাজ স্বীকৃত যৌনসম্ভোগের অধিকার। এখন ইউরোপের অনুকরণে আমাদের দেশে পারমিসিভ সোসাইটি শুরু হয়ে গেছে। এর জন্যে শিক্ষার দরকার।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ আপনি একবার বলেছিলেন যে চলচ্চিত্রে চুমোর অধিকার দিলে অনেক উপকার হবে।
ডঃ আহমদ শরীফঃ এখনো বলি। এখানে সিনেমায় অশিক্ষিত লোকের, তরুণ তরুণীর রিরংসাপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যে আদিরসের ভিয়েন দেয়া হয়- এটা গান, নদীর ধারে গাছের তলে ছোটাছুটি, নাচ, এটা কুৎসিত। কুরুচির ব্যাপার। দুজনের প্রেমই যদি দেখানো হয়, তবে আবেগ বশত চুমো খাওয়া দোষের হ’তে পারে না।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ মদ্যপান সম্পর্কে আপনার কি মত?
ডঃ আহমদ শরীফঃ মদ্যপান তো খারাপ জিনিশ নয়। আমাদের এখানে নিম্নবিত্তের লোকেরা চিরকালই মদ খেয়েছে। মাওলানা কেরামত উল্লাহর প্রচারে মুসল মানদের মধ্য থেকে মদ্যপান উঠে গেছে। বড়োলোকেরা সারা পৃথিবীতে চিরকাল মদ খেয়েছে। মাঝারি লোকেরা শাস্ত্র মানে ব’লে খায় না। ইসলামে ও প্রথমদিকে মদ্যপান নিষিদ্ধ ছিলো না। হযরত আলি একবার মাতাল অবস্থায় মসজিদে গিয়েছিলেন, তখন অহি নাজেল হয় যে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মসজিদে যাবে না। যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েম হয় তখন মদ্যপান নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু রাজা বাদশারা, ধনীরা চিরকাল মদ খেয়েছে, এখনো খায়।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ একটা পশ্চিমা পপ নাচ ও একটা খাঁটি বাঙালী জেলে নৃত্যের মধ্যে কোনটা আপনার ভালো লাগে?
ডঃ আহমদ শরীফঃ পপ নাচে আমার চোখ অভ্যস্ত নয় ব’লে ভালো লাগে না; আর জেলে নৃত্য অক্ষমতার দান, আমার কাছে কখনো আকর্ষণীয় ছিলো না। তবে পশ্চিমা নাচগান প্রবেশ করছে, কেননা তা অনিবার্য। এতে বাঙালিত্ব চ’লে গেলো বলে চিৎকার করেন যাঁরা, তাঁরা কুপমণ্ডুক। বাঙালি সংস্কৃতির কোনো চিরস্থায়ী রূপ নেই।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ প্রতিভার বিনয় আর প্রতিভার ঔদ্ধত্যের মধ্যে কোনটা আপনার পছন্দ?
ডঃ আহমদ শরীফঃ প্রতিভার ঔদ্ধত্যই আমার বেশি গ্রহণীয় মনে হয়। কারণ উদ্ধত মানুষ সহজে চরিত্রহীন হ’তে পারে না। আত্নপ্রত্যয়ী আত্নমর্যাদাসম্পন্ন না হ’লে কেউ উদ্ধত হতে পারে না।কৃত্রিম বিনয়ে অনেকেই বিনীত। বিনীত মানুষেরা সুবিধাবাদী হয়।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ আপনি কি গান শোনেন?
ডঃ আহমদ শরীফঃ হ্যাঁ। রবীন্দ্র সঙ্গীত, কীর্তন।

ডঃ হুমায়ুন আজাদঃ আপনার কি মৃত্যু র কথা মনে হয়?
ডঃ আহমদ শরীফঃ আমার মৃত্যু ভয় নেই। যন্ত্রণার ভয় নেই। আর পরলোকে যেহেতু আমি বিশ্বাস করি না, তাই আমার কোনো ভয় নেই। তবে আমার এমনিতে মৃত্যু চিন্তা আছে, অনেক দায়িত্ব পালন করা হয় নি।

আহমদ শরীফ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদ বলেছেন. . .

ডঃ আহমদ শরীফ ছিলেন বোশেখের দুপুরের রোদের মতো সুস্পষ্ট মানুষ, তিনি নিজের চারপাশে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি সৃষ্টি করে তৈরি করতে চান নি নিজের রহস্যময় ভাবমূর্তি, মাথার চারপাশে তৈরি করেন নি কোনো জ্যোতিশ্চক্র। তিনি মেজাজে ছিলেন প্রচন্ড, নিজেকে প্রকাশ করতেন তীব্রভাবে, চেতনায় তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, ছিলেন অতীত, প্রথা ও ধর্মবিমুখ।


১৯৯৫ সালে এক অসিয়তনামার মাধ্যমে তার মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদান করার কথা লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। সে অসিয়তনামায় লেখা ছিল. . .

চক্ষু শ্রেষ্ঠ প্রত্যঙ্গ, আর রক্ত হচ্ছে প্রাণ প্রতীক, কাজেই গোটা অঙ্গ কবরের কীটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাইতো বাঞ্ছনীয়


ডঃ আহমদ শরীফের ‘অছিয়তনামা’ আর ‘মরদেহ হস্তান্তরের দলিল’ বাংলা আর বাঙালির ইতিহাসে অনন্য দলিল হয়ে থাকবে চিরদিন।


আহমদ শরীফ যেই দর্শন কে ধারন করেছেন তার প্রতিফলন মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত আমরা দেখেছি, তার ‘মরদেহ হস্তান্তরের দলিল’-এ তিনি লিখেছেন, “আমার জানাজার প্রয়োজন নেই”।

আহমদ শরীফ শারীরিকভাবে আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত নেই কিন্তু তার রচিত ও প্রকাশিত সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাস ও দর্শন সম্পর্কে প্রায় ১০০টি গ্রন্থ আছে। শুধু তার গ্রন্থ নেই আমাদের কাছে, আছে তার আদর্শ। যা যুগ যুগ ধরে আলো দিয়ে যাবে। এই আলো কোন দিন নিভে যাবে না। নিভতে দেয়া যাবে না। এই আলো মুক্তচিন্তার, এই আলো সাহসের, এই আলো আদর্শের। এই আলোকে আমরাই জ্বালিয়ে রাখবো।

কবি গুরুর কবিতা দিয়ে শেষ করি,

তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারম্বার ।
তাই চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।

শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি আহমদ শরীফ স্যারকে।

২৪ thoughts on “বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা শিখার প্রাণ, ডঃ আহমদ শরীফ।

  1. মা জন্ম দেয়, মাটি লালন করে ।

    মা জন্ম দেয়, মাটি লালন করে । তাই দেশের মাটিকে মায়ের মতোই ভালবাসতে হয়। একসময় মায়ের প্রয়োজন ফুরায়। কিন্তু মাটির প্রয়োজন মৃত্যুর পরেও থেকে যায়। মানুষের জীবন একাকীত্বে সম্ভব নয়, তাই পরিজন-প্রতিবেশী নিয়েই যাপন করতে হয় তার জীবন। এদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ও মিলনে সহযোগিতায় ও বিরোধেই তার জীবনের বিকাশ ও বিস্তার সম্ভব। অতএব চেতনার গভীরে দেশের মাটি ও মানুষের গুরুত্ব উপলব্ধি করাই স্বজাত্য ও স্বাদেশিকতা।

    চমৎকার তথ্যপূর্ণ একটি পোস্ট… আর স্যারকে… :bow: :bow: :bow: :salute: :salute: :salute:

    1. সম্ভব হলে স্যারের দু’একটি বই
      সম্ভব হলে স্যারের দু’একটি বই পড়ে নিয়েন, তাহলে বুঝবেন স্যারের চিন্তা চেতনা কেমন। আমার প্রিয় মানুষ। আহমদ শরীফ স্যার,

      1. জী অবশ্যই পড়ব। আমি আসলে মাঝে
        জী অবশ্যই পড়ব। আমি আসলে মাঝে কয়েকবার খুজেও ছিলাম স্যারের বই… স্যারের কয়েকটা বইয়ের নাম যদি বলতেন খুবই উপকৃত হতাম। ধন্যবাদ। :ধইন্যাপাতা:

  2. এক কথায় অসাধারণ… চমৎকার!
    এক কথায় অসাধারণ… চমৎকার! অসিয়তনামার ফুটেজগুলো দুর্দান্ত কালেকশন।
    সরাসরি প্রিয়তে! :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল: :বুখেআয়বাবুল:

    “ডঃ আহমদ শরীফ ছিলেন বোশেখের দুপুরের রোদের মতো সুস্পষ্ট মানুষ, তিনি নিজের চারপাশে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি সৃষ্টি করে তৈরি করতে চান নি নিজের রহস্যময় ভাবমূর্তি, মাথার চারপাশে তৈরি করেন নি কোনো জ্যোতিশ্চক্র। তিনি মেজাজে ছিলেন প্রচন্ড, নিজেকে প্রকাশ করতেন তীব্রভাবে, চেতনায় তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, ছিলেন অতীত, প্রথা ও ধর্মবিমুখ।”— স্যালুট স্যারকে :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

  3. ইস্টিশন মাস্টারকে অসংখ্য
    ইস্টিশন মাস্টারকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্টিকি করে সবার দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য, :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা: :ধইন্যাপাতা:
    আমার নাম সবাই দেখুক এইটা আমি চাই না, আমি চাই আহমদ শরীফ স্যার কে নতুন প্রজন্ম জানুক, তার বই পড়ুক। ভাববাদকে খণ্ডন করতে শিখুক।তার সুযোগ করে দিয়েছেন মাস্টার।

    সত্যি, আমি আজ মাস্টারের প্রতি কৃতজ্ঞ।

  4. চমৎকার পোস্ট।
    ডঃ আহমদ শরীফ

    চমৎকার পোস্ট।

    ডঃ আহমদ শরীফ ছিলেন বোশেখের দুপুরের রোদের মতো সুস্পষ্ট মানুষ, তিনি নিজের চারপাশে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি সৃষ্টি করে তৈরি করতে চান নি নিজের রহস্যময় ভাবমূর্তি, মাথার চারপাশে তৈরি করেন নি কোনো জ্যোতিশ্চক্র। তিনি মেজাজে ছিলেন প্রচন্ড, নিজেকে প্রকাশ করতেন তীব্রভাবে, চেতনায় তিনি ছিলেন প্রগতিশীল, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী, ছিলেন অতীত, প্রথা ও ধর্মবিমুখ।

    :salute: :salute: :salute: :salute: :salute:

  5. ইস্টিশন মাস্টারকে অসংখ্য
    ইস্টিশন মাস্টারকে অসংখ্য ধন্যবাদ এই অসাধারন পোস্টটি স্টিকি করার জন্য। এই কয়েকদিনে ইস্টিশনে অসাধারন কিছু পোস্ট হচ্ছে। ড.আহমদ শরীফ, হুমায়ূন আজাদ এবং ড.আব্দুর রাজ্জাক আমার জীবনের সেরা তিনজন ব্যক্তিত্ব। ড.আহমদ শরীফের উপর এই পোস্টটি খুব ভাল্লাগছে। প্রিয়তে নিলাম। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *