ভিখারীর ভেক ধরে আমিও গালিব , জগতের দয়ার তামাশা দেখি

পলিটেকনিকের শেষ বছর। ঢাকার বিটাকে ট্রেনিং পড়ল আমাদের। থাকতাম নাখালপাড়া । আমি, প্রিয় গোপাল দা , চিশ্তি ভাই, দূর্জয় আর রফিক। রমজান মাস। খাবারের দোকানে পর্দা দেয়া । ভেতরে কাস্টমার অঢেল। আশে পাশেই তখন একটা হবু গার্মেন্টস এর মৃত্যুফাঁদ দিনে দিনে কোনওমতে দাঁড়াচ্ছে।অজস্র আবর্জনা, এরমাঝে আটকে যাওয়া বর্ষার জলে ময়লা নোংরা গুলে নর্দমার অ অধম হয়ে আছে।তাতে নেমেছে আরো অধম দুই মেথর। একটি নারী আরেকটি পুরুষ।

পলিটেকনিকের শেষ বছর। ঢাকার বিটাকে ট্রেনিং পড়ল আমাদের। থাকতাম নাখালপাড়া । আমি, প্রিয় গোপাল দা , চিশ্তি ভাই, দূর্জয় আর রফিক। রমজান মাস। খাবারের দোকানে পর্দা দেয়া । ভেতরে কাস্টমার অঢেল। আশে পাশেই তখন একটা হবু গার্মেন্টস এর মৃত্যুফাঁদ দিনে দিনে কোনওমতে দাঁড়াচ্ছে।অজস্র আবর্জনা, এরমাঝে আটকে যাওয়া বর্ষার জলে ময়লা নোংরা গুলে নর্দমার অ অধম হয়ে আছে।তাতে নেমেছে আরো অধম দুই মেথর। একটি নারী আরেকটি পুরুষ।
এদের দোকানে ঢুকতে দেয়া যায় না।এই হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করে না খেলে চলে না । তারা টাকা দিচ্ছে বাইরে থেকে, দোকানদার কোনমতে কুকুরকে খাবার ছুড়ে দেয়া মতো করে, বান কি কেক এগুলো ছুড়ে দিচ্ছে।তবু আরো সতর্ক থাকা জরুরী ছিল , সেই বর্ষায় ঢাকার কুকুরগুলোকে দেখতাম একটু ঝড় ঝাপ্টা হলে নোংরা বাঁচিয়ে তারা একটা আরামের পরিষ্কার যায়গা ঠিক বার করে নিতো। অতো নোংরা তারা ছিল না।আমি সেই নোংরা ভেঙ্গে বহুকষ্টে মেসে আসছিলাম, গোপাল দা রয়ে গিয়েছিল বিটাকেই।তাছাড়া দুজনের তখন বিবাদ চছলছিল কি নিয়ে আজ এতদিন পর আর মনে করতে পারছি না। সে যাকগে, আমার মতোই সেই নোংরা মাড়িয়ে যাওয়া আরেক পথচারী একটা চায়ের দোকানের বারান্দা পেয়ে খানিক দাঁড়ালেন।অল্প বৃষ্টিও হচ্ছিল অবশ্য।মেথর দুটা ময়লা তুলে একটা ভ্যানে জড়ো করে এবার একটু জিরোবে বলে এসে দাঁড়াল। জলে হাতের কবজি আর মুখ ধুয়ে নিল কি নিল না কে জানে , ধুয়েছে বলেই মনে হল। এবার পলিথিনের ব্যাগ থেকে দুজনে দুটা বাটার বান বের করে জল সহযোগে গোগ্রাসে গিলতে থাকল।এহেন বে শরীয়তি কাজ দেখে সেই পথিকের খুব খারাপ লাগল। তিনি রাম ধমক দিয়ে বললেন, ওই তোদের মাথা ঠিক আছে, কি মাস চলে হ্যা ? কি মাস ?…
মেথর দুটা হাসে, হাসে আর আবার খাওয়াতে মনযোগ দেয়। কিছুই বলে না। পাত্তা না পেয়ে পথিক আরো ক্ষেপে গালাগালি শুরু করলেন। মিনিট দুয়েক যাবার পর, দেক্তে জল্লাদমার্কা এক ভদ্রলোক চায়ের দকান থেকে বের হলেন।পথিকের একেবারে মুখের সামনে এসে বললেন, ‘অই মিয়া, আপনে পরিষ্কার করবেন এই গুলান, বালের প্যাঁচাল পাইরেন না। চুপচাপ খাড়ায়া থাকেন, নাইলে যানগা।’
সে সময় গালিবের শের মাথায় ঢুকেছিল । বহু কষ্টে দুটা একটা পরতে পারতাম। উর্দু তখনো শিখিনি। সাথে সাথে একটা মনেও পড়ল ;
“বানা কর ফকিরোওঁ কা বেস হাম ভি গালিব /
তামাশায়ে আহলে করম দেখতে হ্যায়।”
“ভিখারীর ভেক ধরে আমিও গালিব/
জগতের দয়ার তামাশা দেখি।”
ক্ষুধার্ত মানুষের খাবারের অনিশ্চয়তা আর রমজানে মধ্য ও উচ্চবিত্তের সারাদিন স্বেচ্ছায় না খেয়ে থাকার বেদনা এক নই। এটা বরং আনন্দেরই নামান্তর। রোজাদার অভুক্ত জানে বেলাশেষে তার পেটপুরে সুস্বাদু খাবার জুটবে।বাস্তবের অভুক্ত কেবল খাবার নয় পুরো অনিশ্চিৎ জীবন নিয়ে মৃত্যু জরা তুচ্ছতার মাঝে কেচো কেন্নোর মতো বেঁচে থাকে। তাই রোজা আসলে সব বলুন , বলুন রোযাদারের নেকির প্রতিদান আল্লাহ স্বয়ং দেবেন। বলুন রোযাদারের মুখের দূর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশক আম্বরের সুবাসের চেয়ে প্রিয়। আপত্তি নেই। যার যা মনে লয়। কিন্তু একথা ভুলেও বলবেন না যে রোযাদার অভুক্তের কষ্ট বুঝতে পায়। এ কথা মিথ্যা কথা । আপনার অনুষ্ঠান আপনি নিজের মতো পালন করুন , মহত্বের তকমা লাগাতে গিয়ে হাস্যকর মিথ্যা বলে কোন লাভ হবে না । আয়োজনের উপবাস আর অপারগতার উপবাসে ফারাক অনেক।

৪ thoughts on “ভিখারীর ভেক ধরে আমিও গালিব , জগতের দয়ার তামাশা দেখি

    1. গালিব প্রিয় কবিদের একজন । তার
      গালিব প্রিয় কবিদের একজন । তার কিছু কবিতা প্রবাদ হয়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরছে । একটা হল ‘দিলে নাদা তুঝে হুয়া কিয়া হ্যায় / আখির ইস দর্দ কা দাওয়া কিয়া হ্যায় ।” ( নির্বোধ হৃদয় তোমার হইয়েছে কি ? / আসলে এই অসুখের ঔষধি কি ? “

  1. একশ্রেণীর ভণ্ড মনে করে থাকে
    একশ্রেণীর ভণ্ড মনে করে থাকে রোজা বুঝি সবাইকে রাখতে হবে। আসলে, শ্রমিকদের জন্য এটা সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু ভণ্ডরা বোঝে না। তাই, জোর করে মেথরকেও মুসলমান বানাতে চায়!
    আপনাকে ধন্যবাদ।

    1. মতামতের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ
      মতামতের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ সাইয়িদ রফিকুল হক । আপনি তাহলে সুফিবাদী । সুফিদের ব্যাপারে আমারও মুগ্ধতা আছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *