নারী দিবসের শুকনো শুভেচ্ছা

নারী দিবস উপলক্ষ্যে গত কয়েকদিন ‘রেসপেক্টের বন্যায়’ স্যোসাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিলো। এই স্রোতের ভীড়ে দাড়িয়ে বিরুদ্ধচারণ করার সাহস এই অধমের হয়নি বলে এই অসময়ে এ নিয়ে দু’চারটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে।


নারী দিবস উপলক্ষ্যে গত কয়েকদিন ‘রেসপেক্টের বন্যায়’ স্যোসাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিলো। এই স্রোতের ভীড়ে দাড়িয়ে বিরুদ্ধচারণ করার সাহস এই অধমের হয়নি বলে এই অসময়ে এ নিয়ে দু’চারটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

আমি বা আমার মতো যারা CSE ব্যাকগ্রাউন্ড ছেলে-পেলে আছে এদের মনে হয় নারী দিবসে সম-অধিকারের শুনলে একটু থতমত খেতে হয়। কেন থতমত খেতে হয়, এখন বলি। কোন প্রজেক্ট বা অ্যাসাইনম্যান যখন গ্রুপে করতে হয় তখন বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নারী সদস্য থাকলে সেই গ্রুপে তার ভূমিকা হবে এমন যে ‘তোমরা যা করার করো, আমি কিছু করতে পারবো না..’। প্রথমত কোন চেষ্টাই থাকবে না করার। দ্বিতীয়ত যখন খুঁটিনাটি কাজে (যেমন ডাটা কালেক্ট করা বা কোন ইকুইপমেন্ট/ফিল্ড ওয়ার্কে) ইনভল্বড হতে বললে যে উত্তর আসে তা হলো, ‘আমি মেয়ে মানুষ.. আমি পারবো না এসব করতে।’ আর যেসব মেয়েরা (সংখ্যায় খুবই নগন্য) গ্রুপে কাজ করে বা করার চেষ্টা করে তাদের ব্যাপারে অন্য (অকর্মা) মেয়েদের অফ দ্যা রেকর্ডে মন্তব্য হলো, ওসব মেয়েরা গ্রুপমেটদের সাথে প্রেম করে বেড়ায় অথবা ওসব মেয়েরা স্লাট। অতএব কোনভাবে কারো মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খেয়ে ভালো গ্রেড তুলতে পারাটাই অনেকের শিক্ষাজীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আর যদি কোন গ্রুপমেট কাজে অংশ নিতে বলে তখন সে হয়ে যায় পৃথিবীর জঘন্যতম খারাপ ছেলেমানুষ। ভাবটা এমন, ভাল পুরুষ মানুষরা নারী গ্রুপমেটদের কাজ করতে বলে না। অতএব, কোনভাবে কাঁঠাল ভাঙ্গা শেষ হলে ভবিষ্যতে অন্য কোন ‘ভাল পুরুষ মানুষদের’ গ্রুপে যোগদান করাটা মহান নারীর লক্ষণ। এ নিয়ে বেশী করা না বলি, তাহলে আমি আমার বান্ধবী সমাজের তোপের মুখে পড়তে হবে। (বিনিময়ে বন্ধু সমাজের হাততালি পাবো কিনা জানিনা! :p )

গ্রুপওয়ার্কের এটা একটা মাত্র উদাহরণ। মূলত যতই বলুক নারীদের সমধিকার দিতে হবে, তারা নিজেরাও সেটা বিশ্বাস করে কি না আমার সন্দেহ আছে। আপনি আপনার কর্মক্ষেত্রে আপনার যতটুকু ভূমিকা রাখা দরকার তা রাখাটা হচ্ছে মানুষ হিসেবে আপনার কর্তব্য, সেটা না করে আপনি নারী হয়েছেন বলে বাড়তি সুবিধা নেবেন -এমনটা তো হওয়া উচিত নয়। আর আপনি নারী বলে আপনার অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণ করলে কাউকে খারাপ মানুষের সার্টিফিকেট দিয়ে ফেলাটা অবশ্যই আপনার কোন দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।

একবার এক আড্ডায় ওপেন এয়ার কনসার্টে যাওয়া প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিলো, তখন এক মেয়ে বন্ধু আরেক মেয়ে বন্ধুকে বলছে, ‘তুই ওসব কনসার্টে যাস?’ অন্যজন বলে ‘না যাই না।’ প্রথম জন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে, ‘ভাল মেয়েরা ওসব কনসার্টে যায় নাকি? গান শুনলে বাসায় বসেও শোনা যায়।’
আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে এসব প্রোগামে নিরাপত্তা একটা বড় ইস্যু, তবে যেসব মেয়েরা ওপেন এয়ার কনসার্টে যায় তারা সবাই ফালতু-খারাপ এমন ধারণা পোষণ করাটা সত্যিকারেই কি যৌক্তিক? অন্য সবার মতো একটা মেয়ের ওপেন এয়ার কনসার্ট বা অন্য যে কোন প্রোগ্রামে যাওয়া ইচ্ছে থাকতেই পারে আর সেখানে গেলে মান্ধাতার আমলের মানসিকতার পুরুষ মানুষদের মতো সমাজে ভাল মেয়ের সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য উদগ্রীব মেয়েরাও তাকে ‘খারাপ-ফালতু মেয়ের’ ক্যাটেগরীতে ফেলে দেয়। ওপেন এয়ার কনসার্ট ইস্যু নয়, অন্যান্য যে কোন ইস্যুতে সমাজের অযৌক্তিক চোখ রাঙ্গানীকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর সাহস যেসব মেয়ের নাই তারা বরং নিজের দুর্বলতা ঢাকতে অন্য সাহসী মেয়েদের কাঠগড়ায় না তুলেই অপবাদসমৃদ্ধ রায় দিয়ে দেয়।

আমি নিজেকে খুব অপটিমিস্ট মনে করি, তবুও এই ছোট্ট জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেগেটিভলি বলছি যে খুব শীঘ্রই আমাদের এই সমাজে নারীদের অবস্থানের পরিবর্তন হবে না। তারা যেমন পুতুল ছিলো, পুতুলই থাকবে। যারা নিজেদেরই নিজেরা সম্মান দিতে পারে না, তারা আবার অন্যের কাছে কিভাবে সম্মান আশা করে?!

উচ্চবিত্তে যাদের (যে সব নারীদের) জন্ম হয় মানে যাদের ‘লাইফ ইজ আ বেড অব রোজেজ’ তাদের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে চিন্তা না করলেও হয়। মানে মানি টকস্! অন্যরা তাদের প্রাপ্য অধিকার পেলো কি না পেলো তাতে কিছু যায় অাসে না। মধ্যবিত্তের নারীদের টার্গেট উচ্চ আয়ের স্বামী, জীবনের সব শখ-আল্লাদ পূরণ করে দেবে। এদেশে যদি প্রোপার সমঅধিকার বলে থাকেন, তবে তা নিম্নবিত্ত পরিবারের নারীদের পাওয়া উচিত। নারী-পুরুষ সবাই কাজ করে পরিবারে কন্ট্রিবিউট করে। এদেশের গার্মেন্টস্ সেক্টর দাড়িয়ে আছে ওসব নিম্নবিত্তের নারীদের পায়ের উপর। আর ‘মধ্যবিত্ত মানসিকতা সম্পন্ন’ উচ্চ আর মধ্যবিত্ত নারীরা কর্মজীবি নারীদের কাজে কর্মে নাক সিঁটকানোতেই বেশি ব্যাস্ত থাকে। বোরকা আর হিজাব স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়, তাও কথা প্রসঙ্গে বলছি। আমাদের দেশে উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তের নারীদের মধ্যে গত কয়েকবছর ধরে আরবীয়দের মতো হিজাব ব্যবহার একটা ট্রেন্ড হয়ে গেছে। হিজাব ট্রেন্ডটা আসলে শালীনতার জন্য বা ধর্মভীরুতার জন্য যতটা না আমাদের দেশের নারীরা ব্যবহার করছে তার চেয়ে বেশি সমাজের কাছে ‘ভাল মেয়ে’ বা ‘ভাল মহিলা’ সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য ব্যবহার করে। আরে ভাই আপনি তো আর বাকী সবার মতো রাস্তায় বের হচ্ছেন, পুরুষের সাথে মিশছেন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে দু-চারটা মিথ্যা কথাও বলছেন.. তাহলে আপনি আসলেই কতটুকু ইসলামিক?! ধর্ম পালন যখন করবেন তখন ধর্মের পুরোটাই পালন করুন, আধা-আধি ধর্ম ব্যাবহার (নাকি ধর্মকে ব্যাবহার?) করে ধর্ম সম্পর্কে মানুষের কাছে ভুল ম্যাসেজ দিচ্ছেন কেন?

সম-অধিকার একটা কর্পোরেট মূলা। তবে সম-মর্যাদা বা প্রাপ্য মর্যাদা নারীরা পেতে পাওয়া অবশ্যই উচিত, তবে তা নারীরা নিজেদের মর্যাদা দিলেই বোধহয় সম্ভব হবে। আর একদিন দিবস পালনে আমার সমস্যা নেই, তবে সেটা হবে অনেক বছর পরে যখন নারীরা বলবে যে পৃথিবীতে কোন এক সময় পুরুষরা নারীদের সম্মান করতো না, সেই অসম্মানিত কোটি কোটি নারীদের সম্মানে এই নারী দিবস পালন করা হচ্ছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *