চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৬ (স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর ভুমিকা, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়)

চেকপয়েন্ট – পর্ব – ১ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ২ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৩ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৪ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৫
৩রা ডিসেম্বর, ১৯৭১
নয়াদিল্লী, ভারত


চেকপয়েন্ট – পর্ব – ১ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ২ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৩ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৪ চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৫
৩রা ডিসেম্বর, ১৯৭১
নয়াদিল্লী, ভারত

অন্ধকার হয়ে আসছিলো ভারতের রাজধানী শহরে, এর মধ্যেই হুট করে এয়ার রেইড সাইরেন বেজে উঠলো। ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশর ব্যুরোর কনফারেন্সরুমে বেশ অনেকজন দেশী বিদেশী সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছিলেন সন্ধ্যা ৬ টার ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে পুর্ব পাকিস্তান বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তির জন্য। চতুর্দিক অন্ধকার হয়ে এলো সাইরেন বাজার কিছুক্ষন পরেই, সকল বাতি নিভে গেলো। সবাই ধারনা করছিলো যে এটা বিমান হামলার মোকাবিলায় সতর্কতামুলক মহড়ার জন্যই করা হচ্ছে।

ঠিক ছয়টায় যখন ভারতীয় সরকারের মুখপাত্র তার ব্রিফিং টিম সহ এসে হাজির হলেন, তখন উপস্থিত সাংবাদিকরা অভিযোগ করলেন যে আলোর অভাবে তারা কিছু দেখতে পাচ্ছেন না যে প্রেস রিলিজের বক্তব্য লিখে রাখবেন। সাংবাদিকেরা তাকে বাতি জালিয়ে দেবার ব্যবস্থ্যা করতে অনুরোধ করলেন।

তবে জবাবে ব্রিফিং প্রদানকারী অফিসারদের প্রধান বললেন,

– “জেন্টলমেন, আমি আপনাদের নিশ্চিত করছি এটা কোন মহড়া নয়। পাকিস্তান বিমান বাহিনী ভারতের নানা স্থানে একযোগে হামলা শুরু করেছে। আমরা সম্ভবত পুর্ন সমরের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছি।“

সন্ধ্যার পরপরই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া বেতার ভাষনে ঘোষনা করলেন,

– “এই বিমান আক্রমনের মাধ্যমে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুচনা করেছে এবং ভারত তার সমুচিত জবাব দেবে।“

প্রকৃতপক্ষেই পাকিস্তান বিমান বাহিনী একযোগে ভারতের পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত প্রায় এগারটি ভারতীয় বিমান ঘাটিতে আক্রমন করে বসেছিলো সন্ধ্যে ৫ টা ৪০ মিনিটে। এই বিমান হামলার পরপরই পাকিস্তান সেনাবাহিনী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ন চাম্ব সেক্টরে বড়মাত্রার আক্রমন শুরু করে। ভারতীয় সেনাবাহিনী পশ্চিম সীমান্তে কোন ধরনের আক্রমনের জবাব না দিয়ে প্রতিরক্ষামুলক অবস্থান গ্রহন করলো। তবে পুর্ব পাকিস্তানে তাদের সেনাবাহিনী এর পরপরই পুর্নমাত্রায় সামরিক অভিযান শুরু করবে। আর ইতিহাসে প্রথমবারের মত ভারত পাকিস্তান একসাথে দুইটি ফ্রন্টে যুদ্ধে লিপ্ত হবে। এই পুর্ব পরিকল্পিত আক্রমনের কোডনেম ছিলো ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’। এই আক্রমনে ১৯৬৭ সালের ইসরায়েলী বিমান বাহিনীর ‘অপারেশান ফোকাসের’ মত অকর্স্মাৎ আক্রমন চালিয়ে সেই সময়ের আরব বিমান বাহিনীর মত ভারতীয় বিমান বাহিনিকেও ভুমিতেই ধ্বংস করে দেবার কৌশল নেয়া হয়। তবে তাতে মাত্র ৫০ টির মত বিমান অংশগ্রহন করলো, পুর্ন শক্তি নিয়ে আক্রমন করলো না। পাকিস্তান তাদের শেষ চালটিও ভুল দিলো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের সময় কেবল এগিয়েই আসবে।

সেদিন গভীর রাত থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের অভ্যন্তরের নানা সামরিক স্থাপনায় বিমান আক্রমন শুরু করা হলো। ভারতীয়রা পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এমন কিছুর আশংকা করছিলো এবং জবাব দিতে প্রস্তুত হয়েই ছিলো। পরদিন সকাল থেকে এই বিমান আক্রমন প্রচন্ডতর হবে। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সুচনা হলো। প্রধানমন্রী ইন্দিরা গান্ধী তাতক্ষনিকভাবে সেনাবাহিনীকে পুর্ব পাকিস্তানে পুর্ন মাত্রার সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলেন। ভারতীয় সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনী সমন্বিতভাবে আক্রমন শুরু করলো পুর্ব পাকিস্তানে। পুর্বের ফ্রন্টে ভারতের প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো ঢাকাকে যথাশীঘ্রই দখলমুক্ত করা এবং পশ্চিম ফ্রন্টে পাকিস্তানী সেনাদের থমকে রাখা। পশ্চিম সীমান্তে ভারতীয়রা বড় ধরনের কোন আক্রমনে যায়নি।

পশ্চিমে সামরিক আক্রমনের সুচনা করে পাকিস্তানীরাই। সেখানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আর্মার্ড এবং আর্টিলারীর শক্তিতে ভারতের সমপর্যায়ের ছিলো, যদিও পদাতিক সেনা শক্তিতে পাকিস্তান পিছিয়ে ছিলো। পাকিস্তানীরা চাম্ব সেক্টরে কিছুটা সাফল্য লাভ করলো প্রাথমিক আক্রমনে। সেখানে ২৩তম আর্মার্ড ডিভিশন দুটি পদাতিক ব্রিগেড এবং অতিরিক্ত একটি করে আর্মার্ড এবং আর্টীলারী ব্রিগেডের সহযোগিতায় ভারতীয় বাহিনীর দশম ডিভিশনকে হটিয়ে চাম্ব গ্রামের দখল নিতে সক্ষম হয় এবং জম্মু কাশ্মিরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী জম্মুর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। প্রায় সপ্তাহখানেক এখানে তুমুল যুদ্ধ চললো। ভারতীয় সেনাদের পালটা আক্রমনের মুখে পাকিস্তানী সেনারা প্রাথমিক সাফল্যের পরেও পিছু হটতে বাধ্য হয়। এর পেছনে একটি কারন ছিলো ২৩তম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেঃ ইফতিখার খান ১০ ডিসেম্বর হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান এবং আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখা সামরিক পরিকল্পনায় ছেদ পরে।

পাকিস্তানী আক্রমনের মুল লক্ষ্য ছিলো পশ্চিমের ফ্রন্টে যতটা সম্ভব ভারতীয় ভুখন্ড দখল করা। এ সময় পুঞ্জ সেক্টরেও বড় মাত্রার আক্রমন করা হয়, তবে ভারতীয়রা তা সম্পুর্নরুপে প্রতিহত করে। পাঞ্জাব সীমান্তের ফাজিলকা এবং হুসেইনিওয়ালায়ও আক্রমন করা হয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় পাকিস্তানীরা। এর বাইরে সবচেয়ে বড় মাত্রায় আর্মার্ড আক্রমন করা হয় রাজস্তানের মরুভুমি দিয়ে। লঙ্গেওয়ালার বিখ্যাত ট্যাঙ্ক যুদ্ধের মাধ্যমে এখানেও এসে থমকে যায় পাকিস্তানী প্রচেস্টা। সবকিছু দেখে এমন মনে হচ্ছিলো যে পাকিস্তানীরা দ্বিধায় ভুগছিলো যে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চেষ্টা করবে নাকি শক্তি জমিয়ে রাখবে শেষ পর্যন্ত। এসব কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবশ্য একটু বেশি দেরী হয়ে যাবে।

ভারতীয় সেনাপ্রধান জেঃ শ্যাম মানেকশর এ ব্যাপারে সমস্ত পরিকল্পনা করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে এ ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই আলোচনা করে কৌশল নির্ধারন করেন। উনি এর আগে বর্ষাকাল পেরিয়ে যাবার অপেক্ষায় ছিলেন, কারন, পুর্ব পাকিস্তানে বর্ষাকালে সামরিক ভারী যান এবং অস্ত্র নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা খুবই দুরুহ কাজ হতো। এ সময় পার হবার পর পাকিস্তানীরা আক্রমন করে তাকে চমৎকার একটি সুযোগ এনে দিলো। মুক্তিবাহিনী এ সময়ের মধ্যে প্রায় পুরোপুরি সক্ষম একটি শক্তিতে পরিনত হয় এবং ভারতীয় বাহিনীও বেশ অনেকদিন ধরেই এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। তবে উনি চীনা সেনাবাহিনীর থেকেও আক্রমনের ভয় করছিলেন যাদের হাতে মাত্র নয় বছর আগে ভারতীয়রা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। চীন ছিলো পাকিস্তানের মিত্র দেশ এবং পুর্ব পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতে নানা হুমকী ধামকি দিয়ে যাচ্ছিলো সময়ে সময়ে। তাই অন্যান্য সামরিক কমান্ডাররা অসন্তুষ্ট হলেও পশ্চিম সীমান্তে কোন ধরনের পালটা আক্রমনে যাওয়া থেকে বিরত থাকলেন। চীনের সাথে দীর্ঘ্য এবং ঝুকিপূর্ন সীমান্তে তার হাতে থাকা সামরিক শক্তির একটা অংশ মোতায়েন করে রাখলেন তিনি। উনার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে পুর্ব পাকিস্তানের বড় একটা অংশের উপর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে পুর্ব পাকিস্তানের বড় একটা অংশে যুদ্ধ বিরতির আগেই নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠা করা যেতো কোন ধরনের আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আগেই। তিনি এ লক্ষ্যে সামরিক বাহিনীর তিনটি কোরকে (সর্বমোট ১২টি ডিভিশন) পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরা থেকে ত্রিমুখী আক্রমনের নির্দেশ দিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শক্তি ছিলো প্রায় ৪৫ হাজার সেনার তিনটি খর্বশক্তির ডিভিশন এবং অন্যান্য প্যারা মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যরা যাদের পশ্চিম পাকিস্তান থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছিলো। এর বাইরে রাজাকার বাহিনীর প্রায় পঞ্চাশ হাজার সশস্ত্র বাঙ্গালী দোসর তাদের সাহায্যকারী হিসেবে মজুদ ছিলো। তাদের বলা হয় সকল বাঁধা যথাসম্ভব এড়িয়ে গিয়ে যতটা সম্ভব ভুখন্ড দখলে নিতে। মাত্র ১২ দিনের যুদ্ধে পুর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় বাহিনীর আনুমানিক পাঁচ হাজার সেনা নিহত হন। প্রথমদিকে ভারতীয় বাহিনী কিংবা মিত্র বাহিনীর কেউই ধারনা করতে পারেনি যে এতো দ্রুত তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করে ফেলবে, তবে খুব দ্রুতই মিত্র বাহিনী চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে।

৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ফয়সাল এয়ারবেস, পশ্চিম পাকিস্তান

সকল বাঙ্গালী বিমানসেনা এবং অফিসার মার্চের শেষ থেকেই সকল ধরনের অপারেশনাল দায়িত্বের বাইরে সাধারন কর্তব্য পালন করছেন। গতকাল থেকে যুদ্ধ পুরোমাত্রায় শুরু হয়েছে। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম আজকাল অনেক বিষন্ন থাকেন। কেন থাকেন সেটা সবাই জানে। যদিও তাকে, স্কোয়াড্রন লীডার মাহমুদকে এবং এমন আরো কিছু অফিসারকে পাকিস্তানীরা এখনো সম্মানের সাথেই দেখে। তবে সাইফুল আজমের ভেতর ভেতর অনেক খারাপ লাগতো কারন পূর্ব পাকিস্তানে কি হচ্ছে সেই সম্পর্কে তাদের ধারনা ছিলো রেডিওএ প্রচারিত নানা আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমের ভাষ্য শুনে। তবে টিভি আর রেডিওর সরকারী প্রোপাগান্ডা শুনে মনে হয় যে পূর্বে সামান্য বিদ্রোহের মত হয়েছিলো আর সব বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করে দিয়েছে দেশপ্রেমিক সামরিক বাহিনী। তাঁরও কোন ইচ্ছেই ছিলনা আর পশ্চিমে থাকবার। কিন্তু পালাবার পথ কঠিন। বেশ কয়জন সেনা আর বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা পালিয়েছেন আবার পালাতে গিয়ে ধরাও পড়েছেন অনেকে। তাদের আর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা। ইতিমধ্যেই কিছু বিমান ধ্বংসের পরিকল্পনা করে জঙ্গী বিমান নিয়ে ভারতে পালিয়ে যাবার পরিকল্পনাও করেছিলেন তিনি। সে সম্পর্কে আঁচ করতে পেরে তাকে আটক করে কোর্ট মার্শালের ব্যবস্থ্যা করা হয়। ২১ দিন তিনি কাটিয়ে এসেছেন গোপন সামরিক বন্দীশালার কালো কুঠুরীতে। তবে এর আগে বিমান বাহিনীতে তার বীরত্বপূর্ন অবদানের কারনে তাকে শাস্তি না দিয়ে নজরবন্দী রাখা হয়েছে। তবে গতকাল থেকে যুদ্ধ শুরু হবার পর তিনি বুঝতে পারছেন তিনি কতটা অসহায়। নিজেকে ভীষনভাবে ছোট মনে হচ্ছে। ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন যে এই দেশের জন্যই তিনি তাঁর জীবন বিপন্ন করেছেন বহুবার। তিনি এতদিনে ভালোভাবেই বুঝে গেছেন, তিনি বাঙ্গালী, পাকিস্তানী কখনোই নন, হতে পারেননি এত আত্মত্যাগের পরেও।

(কাল্পনিক কথোপোকথন)
ফ্লাঃ লেঃ সাইফুলের সাথে আবার সদ্য পদোন্নতি প্রাপ্ত উইং কমান্ডার মাহমুদের দেখা হল। অফিসার্স মেসে বসে আলাপ করছিলেন তাঁরা। উইং কমান্ডার মাহমুদকে সাইফুল জিজ্ঞেস করলেন,

– “স্যার, আমাদের সবাইকে গ্রাউন্ডেড করে দৃশ্যত আটকে রাখা হয়েছে, এমনকি আপনাকেও। আমরা এই পাকিস্তানের জন্যই এতো কিছু করেছি। মতিউর ঠিকই করেছিলো, নিজের মানুষের জন্য, নিজের দেশের জন্য জীবন দিয়েছে।“

উইং কমান্ডার আলম জবাব দিলেন,

– “এতো অধৈর্য্য হচ্ছ কেন? পূর্বে পরিস্থিতি কিছুটা খারাপ। ভালো হয়ে যাবে খুব জলদি। সময় আর দরকার পড়লেই তোমাকে ডাকা হবে, তুমি দেশের সেরা পাইলটদের একজন। চরম বিপদের মুহূর্ত ছাড়া তোমাকে মিশনে পাঠাবার কথা কেউ ভাবছেনা। আর আমি তো এখন সেই সময় পার করে এসেছি। ডেপুটি ডিরেক্টর এয়ার অপারেশন্স হিসেবে আমার দায়িত্বই এমন যে আমার মিশনে যাবার অবসর নেই। তবে তোমার সময় অবশ্যই পাল্টাবে“

সাইফুল বুঝে গেলেন, পাকিস্তান অন্য যে কাজে সফল হোক আর নাই হোক, অন্তত এই মানুষটাকে পুরোপুরি পাকিস্তানী হিসেবে বদলে দিতে পেরেছে। অথবা এমনও হতে পারে, মাহমুদ আলম এখন নিজেকে বাহিনীর বাইরে গিয়ে ভাবতেই পারেননা। নিজের মানুষদের থেকে দেশ আর বাহিনী তার কাছে বড় হয়ে গেছে।

সময় পাল্টেছিলো, ১৯৭২ এর সিমলা চুক্তির পর পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে পাকিস্তানে আটক বাঙ্গালী সামরিক কর্মকর্তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবার ব্যাপারে সম্মত হয় পাকিস্তান সরকার। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানে আটক অথবা কর্মরত বাঙ্গালী সামরিক কর্মকর্তাদের দেশে ফিরবার প্রস্তাব দেয়া হয়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে তখন পর্যন্ত অনেক বাঙ্গালী কর্মকর্তা বন্দী হিসেবে নয়, বরং পূর্ন মর্যাদায় চাকুরীরত ছিলেন। পাকিস্তান সরকার তাদের পাকিস্তানে থেকে যাবার অথবা বাংলাদেশে ফিরে যাবার ব্যাপারে তাদের ইচ্ছা জানতে চায়। এরমধ্যে প্রায় সব বাঙ্গালী কর্মকর্তাই দেশে ফেরত আসেন। সাইফুল আজমও তাদের মধ্যে একজন। কিন্তু অল্প কিছু বাঙ্গালী কর্মকর্তা পাকিস্তানে থেকে যাওয়াকেই ভালো মনে করেছিলেন। এর মধ্যে মাহমুদ আলমও ছিলেন।

মাহমুদ আলম বাঙ্গালী ছিলেন, ৬৫ সালে উনার বীরত্ব আর সাহসিকতার গল্প পড়ে বাঙ্গালী হিসেবে আমার ভীষন গর্ব হয়। আমার এতা ভেবেও ভালো লাগে যে উনার মাতৃভাষা বাংলা আর উনি বাঙ্গালী হলেও উনার জন্ম বাংলাদেশের সীমানায় হয়নি। উনি জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায়। অনেকে আবার বলেন কুচবিহারে। তবে যাইহোক, উনি বাংলাদেশের কোন স্থানে জন্ম নেননি। এদেশের মাটিতে জন্ম নেয়া কেউ এতো রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পরেও পাকিস্তানে থেকে গেলে জাতি আর জন্মভূমির প্রতি তারচেয়ে বড় অপমান, অবজ্ঞা আর কি হতে পারতো??

৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১
ভারতীয় পার্লামেন্ট, দিল্লী

আজকে ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনে এক অন্যরকম আমেজ দেখা যাচ্ছে। পার্লামেন্টের সকল সদস্য, সকল মন্ত্রী উপস্থিত। আজকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী একটা বিশেষ ঘোষনা দেবেন আর এ ব্যাপারে সকল দলকে অবগত করা হয়েছে ইতিমধ্যে এবং সকল দলের সম্মতিও পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সংসদে ঘোষনা করলেন,

“I am glad to inform the House that in the light of the existing situation and in response to the repeated requests of the Government of Bangladesh, the Government of India have after the most careful consideration, decided to grant recognition to the people’s republic of Bangladesh…

…I’m confident that in future the government and the people of India and Bangladesh, who share common ideals and sacrifices, will forge a relationship based on the principles of mutual respect for each other’s sovereignty and territorial integrity, non-interference in internal affairs, equality and mutual benefit. Thus working together for freedom and democracy we shall set an example of good neighbourliness which alone can ensure peace, stability and progress in this region. Our good wishes to Bangladesh.”

১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১
তেজগাও বিমানবন্দর, ঢাকা
সকাল ১১ টা
টাইগার নিয়াজী প্রেস কনফারেন্সে মুখেই তুড়ি ফুটাচ্ছেন। ঢাকাও পতনের মুখে রয়েছে নাকি এমন এক প্রশ্নের জবাবে উনি সাংবাদিকদের উনার বুকের দিকে ইশারা করলেন এবং বললেন,

– “এজন্য তাদের আগে এর উপর দিয়ে ট্যাঙ্ক চালিয়ে যেতে হবে।“

উনি আরো প্রতিজ্ঞা করলেন যে শেষপর্যন্ত উনি লড়ে যাবেন। আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন,

– “কতক্ষন?”

জোর গলায় উনি উচ্চারন করলেন,

– “last man, last round”.

হয়তো উনার চখে ভেসে উঠেছিলো সপ্তম নৌবহর এগিয়ে আসার কাল্পনিক এবং আশাবাদী দৃশ্য। তাই তিনি এভাবে বলার সাহস পেলেন। আরো বললেন,

– “Dhaka will fall only over my dead body.”

আত্মসমর্পএর দলিল সাক্ষরের মাত্র ৪ দিন আগে!!

১২ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
কিছুক্ষন আগে প্রেস কনফারেন্স শেষ হয়েছে জেনারেল নিয়াজীর। এসে শুনলেন মেজর জেনারেল রহিম চাদপুর থেকে জীবন হাতে নিয়ে পালিয়ে এসেছেন। আসবার পথে কিছুটা আহতও হয়েছেন। উনি বর্তমানে জেঃ ফরমানের বাসভবনের একটি অংশে অবস্থান করছেন প্রাথমিক চিকিৎসার পর। আজ পুরদস্তুর যুদ্ধের নবম দিন চলছে। তাদের মনে এখন এই ভাবনাই কাজ করছে যে ঢাকা আসলেই সুরক্ষিত কিনা। জেঃ ফরমান এবং জেঃ রহিমের মধ্যে কথাবার্তা চলছিলো। জেঃ রহিম বললেন যে যুদ্ধবিরতিই একমাত্র পথ। জেঃ ফরমান এই কথা শুনে একটূ অবাক হলেন। উনি সবসময় ভারতের বিরুদ্ধে লম্বা এবং ফলপ্রসু যুদ্ধের কথা বলতেন। জেঃ ফরমান একটু কঠিন গলায়ই বললেন,

– “ব্যাস দানে মক গায়ে- ইতনি জালদি! (Have you lost your nerve – so soon!)”

জেনারেল রহিম জবাব দিলেন,

– “একটু বেশিই দেরী হয়ে গেছে।“

এই আলোচনার মধ্যে জেঃ নিয়াজী এবং জেঃ জামশেদ চলে আসলেন আহত জেঃ রহিমকে দেখতে। জেঃ রহিম তাদেরও একই কথা বললেন। কিন্তু জেঃ নিয়াজী কোন প্রতিক্রিয়া দেখালেননা। ততদিনে বিদেশী সাহায্য লাভের সকল আশাও দূর হয়ে গেছে। এই বিষয় এড়িয়ে গিয়ে জেঃ ফরমান পাশের কক্ষে চলে গেলেন।

কিছু সময় জেনারেল রহিমের সাথে কাটানোর পর জেঃ নিয়াজী পাশের কক্ষে জেঃ ফরমানকে গিয়ে বললেন,

– “তবে রাওয়ালপিন্ডিতে বার্তা পাঠাও!”।

মনে হচ্ছিলো জেঃ নিয়াজী জেঃ রহিমের পরামর্শ মেনে নিয়েছেন, যা স্বাভাবিক সময়েও উনি মেনে চলতেন। জেঃ নিয়াজী চাইছিলেন গভর্নর হাউজ থেকে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাঠানো হোক প্রেসিডেন্টের সম্মতির জন্য। কিন্তু জেঃ ফরমান মতো দিলেন যে এটা ইস্টার্ন কমান্ড হেডকোয়ার্টার থেকেই যাওয়া উচিত। জেঃ নিয়াজী বললেন,

– “কি আসে যায় কোথা থেকে পাঠানো হচ্ছে। আমার অন্য জায়গায় জরূরী কাজ আছে। তুমি এখান থেকেই পাঠাও। “

জেঃ ফরমান আবার আপত্তি জানাবার সুযোগ পাবার আগেই প্রধান সচিব মুজাফফর হুসেন কক্ষে প্রবেশ করলেন এবং কথাবার্তা শুনে বললেন যে এখান থেকেই তা পাঠানো যেতে পারে। বিতর্কের অবসান হলো এভাবেই।

জেনারেল ফরমান যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিপক্ষে ছিলেননা, কিন্তু কোথা থেকে পাঠানো হবে এ ব্যাপারে ভিন্নমত দিয়েছিলেন। বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে উনার আগের পাঠানো একই প্রস্তাব রাওয়ালপিন্ডি প্রত্যাখ্যান করেছিলো। একবার ধরা খেয়ে দ্বিতীয়বার আবার লজ্জিত হতে চাননি। জেঃ নিয়াজী তার তথাকথিত জরুরী কাজে চলে গেলেন এবং এরপর মুজাফফর হুসেন সেই ঐতিহাসিক নোটটির খসড়া তৈরী করেন। এটি জেঃ ফরমান আবার দেখেন এবং গভর্নরের কাছে প্রেরন করেন, যা ওইদিন সন্ধ্যাতেই প্রেসিডেন্টের কাছে পৌছাবে।

এই নোট কিংবা সংক্ষিপ্ত বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পুর্ব পাকিস্তানের “নিস্পাপ জীবন” রক্ষায় যা কিছু সম্ভব করবার অনুরোধ করা হলো!

১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১
গভর্নরস অফিস, পুর্ব পাকিস্তান
এদিন সকলে রাওয়ালপিন্ডির নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্টকে কোন সিদ্ধান্ত দেবার ফুরসত করার জন্য খুব বেশিরকম ব্যস্ত মনে হচ্ছে। এদিন জেঃ ফরমানকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আজকে উনাকে পাকিস্তানপ্রেমী ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নিবেদিতপ্রান সামরিক শাখার নেতাদের সাথে ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে। আলবদর, আল শামস উনার নিজের মস্তিস্কপ্রসুত বাহিনী। বাঙ্গালীকে শেষ শিক্ষা দিতে এদের কাজে লাগাবার শেষ সুযোগ এবং শেষ কিছু মুহুর্ত এখন আর হেলাফেলা করে নস্ট করবার সময় নেই। আগে উনি বলেছিলেন বাঙ্গালীকে এমন শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে আগামী ২৫ বছর তারা মাথা উচু করে কথা বলতে পারবেনা। আর এবার এমন কিছু করে যাবেন যাতে আরো ৫০ বছর কোমর সোজা করে দাড়াতে না পারে। দু-একদিনের মধ্যেই যা করবার করে ফেলতে হবে!

হাতে সময় নেই, একেবারেই নেই!

১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১
গভর্নরস হাউস, ঢাকা
সকাল ১১ টা ১৫ মিনিট
উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি সভা আহবান করা হয়েছে। কিন্তু তিনটি ভারতীয় মিগ গভর্নরস হাউস আক্রমন করে বসলো। গোয়েন্দাসুত্রে কিভাবে যেন ভারতীয়রা এ বৈঠকের কথা জেনে গিয়েছিলো, তাই মানসিকভাবে আরো ভেঙ্গে দিতে এই হামলা করা হলো। গভর্নর ডঃ মালেক সাহেব এয়ার রেইড শেল্টারে গিয়ে আশ্রয় নিলেন এবং তার ইস্তফাপত্র লিখে ফেললেন। প্রায় সব জীবিত প্রানীই সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন, যদিও কিছু দুর্ভাগা একুরিয়াম ফিস সৌখিন কাঁচের পাত্র ভেঙ্গে মেঝেতে পরে দমবন্ধ হয়ে হাসফাঁস করতে করতে মারা গিয়েছিলো।

( এই ডঃ মালেক ছিলেন শান্তি নিকেতনের ছাত্র। নিপাট ভদ্রলোক, রবীন্দ্রপ্রেমী এবং সংস্কৃতিমনা বলেই পরিচিত চিলেন বলে জানা যায়। এভাবে মুখোশ ধরে থেকে একজন মানুষ কিভাবে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর অধীনে থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যায় সাহায্য করেছিলো এ এক অবাক ব্যাপার! মানুষ সব করতে পারে, একমাত্র মানুষই পারে!)

পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সব কর্মকর্তা পরিবার সহ ঐদিনই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয় নিয়েছিলেন। হোটেলটি আন্তর্জাতিক রেডক্রস কর্তৃক নিরপেক্ষ অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত হয়েছিলো। বেশ অনেকজন পশ্চিম পাকিস্তানী ভিআইপি যাদের মধ্যে মুখ্য সচিব, পুলিশের আইজি, কমিশনার ঢাকা ডিভিশন, প্রাদেশিক সচিবেরা সহ অনেকেই ছিলেন তারা পাকিস্তান সরকারের পদ থেকে লিখিত ইস্তফা দিয়ে এসেছিলেন যাতে এই নিরপেক্ষ অঞ্চলে ঢুকতে পারেন। কারন, প্রাদেশিক সরকারের কোন কর্মকর্তা রেডক্রসের নিরাপত্তা পাবার যোগ্য ছিলেননা।

১৪ ডিসেম্বরই হয়ে থাকলো পূর্ব পাকিস্তান সরকারের শেষ দিন। সরকারের যা কিছু উচ্ছিষ্ট ছিলো এবং গভর্নর হাউস ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। পাকিস্তানের শত্রুদের এখন কেবলমাত্র টাইগার নিয়াজী এবং তার দিশেহারা বাহিনীকে কাবু করলেই চলবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পন্ন করবার জন্য। এরমধ্যে জেঃ নিয়াজী তার সকল উদ্দ্যম হারিয়ে ফেলেছেন। উনার সুরক্ষিত বাঙ্কার থেকে কদাচিতই তিনি বের হচ্ছেন এবং সিদ্ধান্ত যা দেবার সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দিচ্ছেন, যার উপর উনার এখন আর কোন নিয়ন্ত্রন নেই।

বাস্তবতা বুঝেই জেঃ নিয়াজী প্রেসিডেন্টোকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু জবাব না পেয়ে তিনি ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে চীফ অফ স্টাফ জেঃ হামিদকে ফোন করে তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “Sir, I have sent certain proposals to the President. Could you kindly see that some action is taken on them soon.”

এবার ব্যস্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার সময় বের করতে পারলেন জবাব দেবার জন্য। তিনি গভর্নর ও জেঃ নিয়াজীকে নির্দেশ দিলেন লড়াই বন্ধে এবং জীবন রক্ষায় সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবার। উনি আন ক্লাসিফাইড বার্তাপত্রে জানালেন,

“Governor’s flash message to me refers. You have fought a heroic battle against overwhelming odds. The nation is proud of you and the world full of admiration. I have done all that is humanly possible to find an acceptable solution to the problem. You have now reached a stage where further resistance is no longer humanly possible nor will it serve any useful purpose. It will only lead to further loss of lives and destruction. You should now take all necessary measures to stop the fighting and preserve the lives to armed forces personnel, all those from West Pakistan and all loyal elements. Meanwhile I have moved UN to urge India to stop hostilities in East Pakistan forthwith and to guarantee the safety of armed forces and all other people who may be the likely target of miscreants.”

বার্তাপত্রটি দুপুর ১ টা ৩০ মিনিটে রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রেরন করা হয় এবং বিকেল ৩ টা ৩০ মিনিটে পুর্ব পাকিস্তান সময়ানুসারে গ্রহন করা হয়।

১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ইউএস এমব্যাসী, ঢাকা
জেঃ নিয়াজী যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিকেলেই ইউএস কনসাল জেনারেল মিঃ স্পাইভ্যাকের কাছে ছুটলেন জেঃ ফরমান সহ। এর আগে তিনি সৌভিয়েত এবং চাইনিজ কুটনৈতিকদের কথা ভেবেছিলেন কিন্তু আমেরিকাকেই শেষ ভরসা ধরে নিলেন। যখন উনারা মিঃ স্পাইভ্যাকের অফিসে পৌছালেন, জেঃ ফরমানকে এন্টিরুমে অপেক্ষায় রেখে জেঃ নিয়াজী ভেতরে ঢুকলেন। সেখান থেকেই জেঃ নিয়াজীকে আবেগী কন্ঠে কথা বলতে শুনলেন কনসাল জেনারেলের সমবেদনা আদায়ে। যখন বুঝলে যে কিছু নরম করা গেছে তখন তিনি মিঃ স্পাইভ্যাককে যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভারতীয়দের সাথে তার পক্ষ হয়ে আলোচনার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু সকল আবেগ নিমেশে ভুলে গিয়ে মিঃ স্পাইভ্যাক বললেন,

– “আমি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করতে পারবোনা ভারতীয়দের সাথে, তবে যদি চান, আপনার হয়ে একটি বার্তা পাঠাতে পারি।“’

এরপরই জেঃ ফরমানকে ডেকে এনে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেঃ শ্যাম মানেকশর প্রতি যুদ্ধবিরতি বার্তার খসড়া করতে বলা হলো। জেঃ ফরমান পুরো এক পাতার একটি নোট প্রস্তুত করলেন অনতিবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহবান জানিয়ে যাতে লেখা ছিলো যুদ্ধবিরতির সময় পাকিস্তানী সেনা এবং আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য সহ পাকিস্তানের প্রতি অনুগত বেসামরিক জনগনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে মুক্তিবাহিনী থেকে। সেই সাথে আহতদের চিকিতসার জন্য সহযোগিতা করতে হবে।

খসড়া প্রস্তুত হবার সাথে সাথে মিঃ স্পাইভ্যাক বললেন,

– “২০ মিনিটের মধ্যে বার্তা প্রেরন করা হবে!”

জেঃ নিয়াজী এবং জেঃ ফরমান ফিরে গেলেন জেঃ নিয়াজীর এডিসি ক্যাপ্টেন নিয়াজীকে সেখানে রেখে বার্তার প্রতিউত্তরের আশায়। ক্যাপ্টেন নিয়াজী সেখানে রাত ১০ টা পর্যন্ত বসে রইলেন, কিন্তু কোন উত্তর তখনো আসেনি। জেঃ নিয়াজী ঘুমাতে যাবার আগে তাকে ফোনে আবার জিজ্ঞেস করলেন প্রতিউত্তর এসেছে নাকি খবর নিতে।

কোন উত্তর আসেনি সে রাতে!!

(আসলে মিঃ স্পাইভ্যাক বার্তাটি জে; মানেকশর কাছে পাঠাননি। তিনি সেটা ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। সেখান থেকে আমেরিকান সরকার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সাথে যোগাযোগের চেস্টা করে কোন পদক্ষেপ নেবার আগে, কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। উনি খুব সম্ভবত তার ভারী মন অন্য কোথাও হালকা করবার জন্য ব্যস্ত ছিলেন। পরে জানা যায় যে, ডিসেম্বরের ৩ তারিখের পর থেকেই উনি যুদ্ধে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন ও পরিনতি বুঝে যান এবং অফিসেও আর আসেননি।)

১৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১
দিল্লী, ভারত
জেঃ মানেকশ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা বলে এইমাত্র ফিরেছেন। তিনি হাতে হাতে বার্তা লিখে তার স্টাফ অফিসারকে দিলেন। বার্তাটি ছিলো পাকিস্তানীদের যুদ্ধবিরতির আহবানের জবাব যেটা অনেক ঘুরে আমেরিকান এম্বেসীর মাধ্যমে ভারতীয়দের কাছে এসে পৌছেছে।

জেঃ মানেকশ যুদ্ধবিরতির আহবানের জবাবে জানালেন, যুদ্ধবিরতি গ্রহন করা হবে এবং বার্তায় উল্ল্যেখ করা ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনী “আমার অগ্রবর্তী সেনাদের কাছে” আত্মসমর্পন করে। উনি বার্তায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সী উল্ল্যেখ করে দিলেন যাতে করে কলকাতায় পুর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের যোগাযোগ করে সবকিছু ঠিক করা যায়।

জেঃ মানেকশর বার্তা রাওয়ালপিন্ডি পাঠানো হলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধানের কাছ থেকেও সন্ধ্যার পরপরই জবাব এবং নির্দেশনা পৌছে গিয়েছিলো পুর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কাছে,

– “Suggest you accept the cease-fire on these terms as they meet your requirements….. However, it will be a local arrangement between two commanders. If it conflicts with the solution being sought at the United Nations, it will be held null and void.”

বিকেল ৫ টা থেকে পরদিন সকাল ৯ টা পর্যন্ত সাময়িক যুদ্ধবিরতির জন্য সম্মতি জানানো হলো। পরে যা দুপুর ৩ টা পর্যন্ত বর্ধিত করা হবে যুদ্ধবিরতির পদক্ষেপ নেবার জন্য। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেঃ হামিদ “উপদেশ” দিলেন জেঃ নিয়াজীকে যুদ্দবিরতির শর্তাবলী মেনে নিতে। জেঃ নিয়াজী এটাকেই আত্মসমর্পনের অনুমতি বলে ধরে নিলেন এবং তার স্টাফ অফিসার ব্রিগেডিয়ার বাকারকে নির্দেশ দিলেন এ সম্পর্কিত নির্দেশনা সকল ফর্মেশনে পৌছে দিতে। পুরো একপৃষ্ঠার একটি নোটে সেনাদের “বীরোচিত লড়াইয়ের” প্রশংসা করা হয় এবং স্থানীয় কমান্ডারদের তাদের ভারতীয় প্রতিপক্ষের সাথে যুদ্ধবিরতির জন্য যোগাযোগ করতে বলা হয়।

এই নোটের কোথাও “আত্মসমর্পন” কথাটির উল্ল্যেখ ছিলোনা কেবলমাত্র একটী বাক্য ছাড়া, যেখানে লেখা ছিলো,“’Unfortunately, it also involves the laying down of arms’.” যার মানে কেবলমাত্র আত্মসমর্পনই বোঝায়।

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১
টঙ্গী, পূর্ব পাকিস্তান
নিয়তির অমোঘ বিধানের মত চূড়ান্ত পরিনতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো ঘটনাপ্রবাহ। ভারতীয় সেনাদের একটি অংশ মুক্তিবাহিনীর সহযোগিতায় টঙ্গীর কাছাকাছি পৌছে গেছে। পাকিস্তানীরা তাদের ট্যাঙ্কের গোলাবর্ষনের মাধ্যমে স্বাগত জানায়। যদিও নামকাওয়াস্তে দু চারটি ট্যাঙ্ক আর কিছু সৈনিক ছাড়া সেখানে তেমন কোন প্রতিরক্ষা ছিলনা। তবে এরফলে ভারতীয় বাহিনী মনে করলো যে ঢাকা-টঙ্গী সড়ক সুরক্ষিত রয়েছে, যার ফলে ভারতীয়রা ঘুরো পথে মানিকগঞ্জ হয়ে ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। ভাগ্যক্রমে কর্নেল হামিদের অধীন পাকিস্তানী সেনারা কেবলই সে পথ থেকে সরে গিয়েছিলো ৬ তারিখ খুলনা থেকে পালিয়ে আসবার পর। কর্নেল হামিদের সেনাদের অনুপস্থিতি ভারতীয় সেনা এবং মুক্তিবাহিনীকে মুক্তভাবে দক্ষিন পশ্চিম থেমে ঢাকা অভিমুখে অগ্রযাত্রার সুযোগ করে দেয়। নাহলে বিজয়ের আগে ঢাকার খুব কাছে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ের সমুহ সম্ভাবনা ছিলো উভয় পক্ষেরই।

ব্রিগেডিয়ার বশীর এই মুহুর্তে ক্যান্টনমেন্ট বাদে বাদবাকী প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার সুরক্ষার দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত, যদিও এ জন্য তার হাতে পর্যাপ্ত সৈন্য কিংবা গোলাবারুদের মজুদ কিছুই নেই। আজ দুপুরের দিকে তিনি জানতে পেরেছেন মানিকগঞ্জ-ঢাকা সড়ক পুরোপুরি অরক্ষিত। উনি রাতের প্রথম অর্ধেক পার করলেন ইপিসিএফের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইউনিট সমুহকে জড়ো করতে, এভাবে তিনি এক কোম্পানীর মত শক্তি সম্পন্ন একটা সেনাদল প্রস্তুত করলেন এবং মেজর সালামতের অধীনে মিরপুর ব্রীজের কাছে মোতায়েন করলেন। ভারতীয় বাহিনীর প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের একটি দল ১৬ ডিসেম্বর শেষরাতের দিকে এদিক দিয়ে ঢাকায় অগ্রসর হতে চাইলেন, মুক্তিবাহিনীর মাধ্যমে তাদের কাছে খবর ছিল যে এই পথটি অরক্ষিতই রয়েছে।। কিন্তু ততক্ষনে মেজর সালামতের দল সেখানে প্রস্তুত ছিলো এবং ভারতীয়দের দিকে অন্ধের মত গোলাবর্ষন শুরু করে। এতে বেশ কিছু ভারতীয় সেনা মারা যায় এবং দুটি ভারতীয় জীপ পাকিস্তানিদের হস্তগত হয়। হস্তগত হয় একটি দিনের অর্ধেকেরও কম সময়ের জন্য!!

এটিই খুব সম্ভবত ঢাকার আসেপাশের কোন এলাকায় সর্বশেষ মুখোমুখি সংঘর্ষ ছিলো। এরপর আত্মসমর্পনের আগে ও পরে ঢাকা ও আসেপাশের নানা এলাকায় বিক্ষিপ্ত গোলাগুলি চলে যাতে যৌথবাহিনী এবং পাকিস্তানীদের বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটে।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা
ঘড়ির কাটা ১২ টা পার করেছে, শুরু হয়েছে নতুন দিনের। যা দুই দেশের ইতিহাসে দুভাবে লেখা থাকবে। প্রায় সবজায়গায় বার্তাটি পৌছে গেছে ইতিমধ্যেই। এরপরেই অফিসার কমান্ডিং ৪ নং এভিয়েশন স্কোয়াড্রন লেঃ কর্নেল লিয়াকত বোখারীকে তার শেষ ব্রিফিঙের জন্য তলব করা হয়েছে। তাকে বলা হলো ৮ জন পশ্চিম পাকিস্তানী নার্স এবং ২৮ পরিবারের সদস্যকে সে রাতেই বার্মার আকিয়াবে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার উপর দিয়ে।

দুটি হেলিকপ্টার রাতেই বার্মার দিকে উড়ে গেলো এবং তৃতীয়টি সকালের আলো ফোটার পর রওনা দিলো। সেখানে জেঃ রহিম সহ আরো বেশ কয়জন ছিলেন, কিন্তু নার্সদের নেয়া যায়নি তাদের সময়মত জড়ো করতে না পারার কারনে। .হেলিকপ্টার গুলো বার্মায় পৌছেছিলো এবং এর আরোহীরা পরে নিরাপদেই করাচী পৌছায়। পাকিস্তানীরা ততক্ষনে তাদের নিয়তির ব্যাপারে জেনে গিয়েছে। আরো কিছুদিন লড়াইয়ের ইচ্ছা থাকলে তারা হেলিকপ্টারগুলো তখনই পাঠিয়ে দিতনা, যেহেতু নানা বিচ্ছিন্ন ফর্মেশনে রসদ পৌছানোর একমাত্র অবলম্বনই ছিলো এই হেলিকপ্টারগুলো।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা, পূর্ব পাকিস্তান
সুর্যোদয় হচ্ছে, ঠিক একই রকম সুর্য্য যা গতকালও উঠেছিলো। আজও ঠিক সেভাবেই উঠছে। কিন্তু আজকে এই সুর্য্য অন্য এক ইতিহাসের সাক্ষী হবে!

জেনারেল নাগরার সেনারা ঢাকার পশ্চিম উপকন্ঠে এসে পৌছেছেন যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক ১২ দিন পরেই। ইতিমধ্যে দেশের নানা স্থানে পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পন করতে শুরু করেছিলো এবং টাইগার নিয়াজী বুঝতে পারছিলেন খেলা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে।

(জেনারেল নাগরা আর জেনারেল নিয়াজী একে অপরের পরিচিত ছিলেন, বন্ধুও বলা চলে। তারা দুজনেই রাজকীয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং এর আগে দেহরাদুন মিলিটারী একাডেমীতে ক্যাডেট হিসেবে কোর্সমেট ছিলেন। তাদের চেনাজানা আর বাড়ে যখন জেঃ নাগড়া করাচীতে ভারতীয় হাইকমিশনের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন এবং জেনারেল নিয়াজী সিন্ধুর একটি ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন।)

একসময়ের বন্ধু, ক্লাসমেট এবং কোর্সমেট এই দুই জেনারেল আজ প্রতিপক্ষ হিসেবে যুদ্ধে লিপ্ত, নিজ নিজ দেশের হয়ে। যদি জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পনের জন্য রাজী হন তবে জেনারেল নাগরা চাইছিলেন পুরোনো এক বন্ধুর কাছেই সেই আত্মসমর্পনের সুযোগ দিতে।

ভোর থেকেই জেঃ নিয়াজী বেতারে অস্ত্রবিরতির আহবান জানিয়ে বার্তা প্রচারের নির্দেশ দেন যা যৌথ বাহিনীর সেনারা ইন্টারসেপ্ট করেন। ভোরের দিকে জেনারেল নাগরা সাভারের কাছে পৌছালে ৯৫ নং মাউন্টেন ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার ক্লের তাঁকে এই বার্তা সম্পর্কে অবগত করলেন।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
মিরপুর ব্রিজ, আমিনবাজার, ঢাকা
সকাল ৮ টা
জেনারেল নাগরা এবং তার সেনারা মিরপুর ব্রিজের অদুরে পৌছেছেন। মুক্তিবাহিনীর নানা দল আগেই এসে সেখানে অবস্থান নিয়েছিলো। জেনারেল নাগরা সেখানে পৌছে একটি কলম এবং ছোট রাইটিং প্যাড থেকে ছিড়ে একটুকরো কাগজ বের করলেন পকেট থেকে। প্যাডের পেপারটি জীপের হুডের উপর রাখলেন এবং তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত চিটটি (সংক্ষিপ্ত অফিসিয়াল নোট) লিখবেন লেঃ জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর উদ্দেশ্যে, যা পরবর্তীতে দেশ বিদেশের নানা সংবাদ মাধ্যমে হুবহু প্রতিলিপি হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে।

উনি লিখেছিলেন,

“My dear Abdullah, I am here. The game is up. I suggest you give yourself up to me and I’ll look after you.”

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
সদর দপ্তর, ১৪ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
সকাল ৯ টা
জেনারেল নাগরার লেখা সরল ব্যক্তিগত মেসেজ, যা জেনারেল নিয়াজীকে মানসিকভাবে আরো ভেঙ্গে দেয়ার জন্যই হয়তো লেখা হয়েছিলো, তা জেনারেল নাগরার এডিসি (এইড ডি ক্যাম্প) ক্যাপ্টেন মেহতা এবং ২ নং প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের এডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন নির্ভয় কুমার একটি খোলা জীপে করে সাদা পতাকা উড়িয়ে ১৪ নং ডিভিশনের সদর দপ্তরে এসে পৌছে দিয়েছেন। রাস্তায় তাদের দেখে অনেক বাঙ্গালী ‘জয় বাংলা” স্লোগান তুলছিলো আনন্দের আতিশয্যে, পাকিস্তানী সেনা এবং তাদের সমর্থকদের পরোয়া না করেই।

মেজর জেনারেল জামশেদ, মেজর জেনারেল ফরমান এবং রিয়ার এডমিরাল শরীফ জেনারেল নিয়াজীর সাথেই ছিলেন যখন আনুমানিক ৯ টার সময় এই নোটটি পৌছে দেয়া হয় তার হাতে। জেনারেল ফরমান, যিনি তখনো “যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার” বার্তার অপেক্ষায় ছিলেন, জেনারেল নিয়াজীকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “Is he (Nagra) the negotiating team?”

জেনারেল নিয়াজী কিছু বললেননা।

তখন তাদের মনে একটাই চিন্তা কাজ করছিলো যে জেনারেল নাগরাকে আলোচনার জন্য নিয়ে আসা হবে নাকি প্রতিরোধ করা হবে, যিনি ইতিমধ্যে শহরের উপকন্ঠে পৌছে গেছেন।

কিছুক্ষন পর সব জেনে জেনারেল ফরমান জেনারেল নিয়াজীকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “’Have you any reserves?”

জেনারেল নিয়াজী এবারও কিছু বললেননা। রিয়ার এডমিরাল শরীফ এবার উর্দুতে পাঞ্জাবী উচ্চারনে বললেন,

– “কুজ পাল্লে হ্যায়? (Have you anything in the kitty?)”

জেনারেল নিয়াজী এবার ঢাকার ডিফেন্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেনারেল জামশেদের দিকে তাকালেন, যিনি মাথা নাড়লেন, যার একমাত্র অর্থ করা যায়, “কিছুই নেই!“

জেনারেল ফরমান এবং এডমিরাল শরীফ প্রায় একসাথেই বললেন,

– “যদি তাই হয়, তবে সে (জেঃ নাগরা) যা চায় তাই করুন। (If that is the case, then go and do what he (Nagra) asks!)”

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পুর্বাঞ্চলের মাথারা মেনে নিলেন যে যুদ্ধ তারা হেরে গেছেন!!

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
মিরপুর ব্রিজ, ঢাকা
সকাল ১০ টা
আরো কিছুক্ষন আলোচনার পর বর্তমান পরিস্থিতি এবং তাদের অবশিষ্ট শক্তি বিবেচনায় এনে জেনারেল নিয়াজী ঠিক করলেন যে জেনারেল জামশেদকে পাঠাবেন জেনারেল নাগরাকে ‘অভ্যর্থনা’ জানাতে।

জিওসি ১৪ ডিভিশন, মেজর জেনারেল জামশেদ মেজর জেনারেল নাগরার কাছে মিরপুর ব্রিজের কাছে দৃশ্যত আত্মসমর্পনই করলেন, যদিও তখনো তার কাছে ঢাকা রক্ষা করবার জন্য ২৪,০০০ সেনা মজুদ ছিলো। তিনি নিশ্চিত করে বললেন ঢাকায় ঢুকবার পথে কোন বাধার সম্মুক্ষীন হতে হবেনা। পাকিস্তানী সেনাদের উনি জেনারেল নাগরাকে শান্তিপূর্নভাবে নিয়ে যেতে বললেন এবং যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে বললেন। যদিও সবাই বুঝে গিয়েছে ইতিমধ্যে যে যুদ্ধবিরতি নয়, আত্মসমর্পনই ঘটতে যাচ্ছে।

সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে প্রথমে ২ নং প্যারা ব্যাটালিয়ানের সেনারা কাদেরিয়া বাহিনীর কাদের সিদ্দিকী এবং তার অনুগত বাহিনী সহ ঢাকায় প্রবেশ করেন। এর কিছু পরেই ব্রিগেডিয়ার হারদেব সিং এর অধীন ৯৫ নং মাউন্টেন ব্রিগেডের ইউনিটগুলোও ঢাকায় প্রবেশ করে কোন বাধা ছাড়াই।

এর মাধ্যমেই দৃশ্যত ঢাকার পতন ঘটলো, যদিও তখনো আত্মসমর্পনের দলিল সাক্ষরিত হয়নি। হৃদরোগীর মতো নীরবে পতন ঘটলো ঢাকার, কোন অঙ্গহানী নেই, কোন মারামারি কাটাকাটি নেই। অনেকটা নীরবেই এই শহরটি একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীতে পরিবর্তিত হয়ে গেলো। সিঙ্গাপুর, প্যারিস কিংবা বার্লিনের পতনের গল্পের মতো কোনকিছুর নতুন দৃশ্যায়ন ঘটলো না…

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
সকাল ১১ টা
জেনারেল নাগরা তার বার্তা পাঠিয়েছিলে দু ঘন্টাও হয়নি সম্ভবত। এখন তিনি জেনারেল নিয়াজীর অফিসে পৌঁছেছেন। জেনারেল নিয়াজী জানতেন যে উনি যুদ্ধে হেরে গেছেন, সময়ের ব্যাপার রয়ে গেছে এখন। আরো দেরী করা মানে দুইপক্ষেই আরো হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকা।

যখন জেঃ নাগরা জেঃ নিয়াজীর অফিসে হেটে প্রবেশ করছিলেন, তখন সবার মুখ দেখে ঠিকঠাক বুঝে গিয়েছিলেন পাকিস্তানীরা কি ভাবছে। জেঃ নিয়াজীর গালে কিছু মাংস লেগেছে, একটু ঝুলে গেছে হয়তো কিন্তু জেঃ নাগরা ঠিকঠিক চিনে নিলেন তাকে।

জেনারেল নাগরা জিজ্ঞেস করলেন,

– “Hello Abdullah, how are you?”

জেঃ নিয়াজী ভেঙ্গে পরলেন, হয়তো পুরা জীবনে এই প্রথমবার। ধরে আসা গলায় বললেন,

– “পিন্ডি মে ব্যায়ঠে হুয়ে লোগোনে মারওয়া দিয়া! (The people sitting in Pindi doomed us.) “

জেনারেল নাগরা তাকে কিছুটা হালকা হতে দিলেন। এরপর পুর্ব থেকেই পরিচিত জেনারেল নিয়াজী এবং নাগরা হাসি তামাশা, প্রকাশ অযোগ্য ঘননীল কৌতুক বিনিময়ে মেতে উঠলেন। এবং চা পানের পালাও শেষ হলো। এরপর বাকীটূকুও ইতিহাস হয়েই রইবে।

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
দুপুর ১২ টা
একটূ আগে জেঃ নিয়াজী খবর পেয়েছেন মাগুরায় জিওসি ৯ নং পদাতিক ডিভিশন, মেজর জেনারেল আনসারী আত্মসমর্পন করেছেন তার সকল সেনা সহ। উনি বুঝতে পারলেন উনার হাতের সব তাসই দমকা হাওয়ায় উড়ে গেছে…

জেনারেল নাগরা তেজগাও বিমানবন্দরে চলে গেছেন চীফ অফ ইস্টার্ন কমান্ড মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকবকে অভ্যর্থনা জানাতে, উনি আগরতলা থেকে হেলিকপ্টারে উড়ে এসেছেন। কেবলমাত্র একটা কাজই বাকী আছে, আর তা হচ্ছে আত্মসমর্পনের দলিলের খসড়া তৈরী করা।.

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, ঢাকা
দুপুর ১ টা
জেনারেল জ্যাকব ঢাকার বিধ্বস্ত এয়ারফিল্ডে হেলিকপ্টার থেকে অবতন করেছেন। উনার স্টাফ অফিসার কর্নেল খারা সহ উনি সরাসরি নিরস্ত্র অবস্থাতেই ঢাকা ক্যান্টোনমেন্টে জেঃ নিয়াজীর অফিসে চলে গেলেন। সেখানে উনি জেঃ নিয়াজীকে অস্ত্রবিরতির চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিয়ে আত্মসমর্পনের জন্য রাজী করাতে চেস্টা করলেন। জেঃ নিয়াজী তখনো আশা করছিলেন ভারতীয়রা হয়তো যুদ্ধবিরতিতে রাজী হবে এবং পরে আমিরিকা এবং চায়নার চাপে কোন না কোনভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে।

কর্নেল খারা আত্মসমর্পনের খসড়া দলিল পাঠ করে শেষ করবার সাথে সাথেই জেনারেল ফরমান, যিনি অপারেশন সার্চলাইটের মুল পরিকল্পনাকারী ছিলেন, আপত্তি জানালেন। ঘন্টাখানেক আলাপ আলোচনার পরেও পাকিস্তানীরা রাজী না হতে চাইলে জেনারেল জ্যাকব তার শেষ চাল চাললেন। উনি বললেন, হয় আত্মসমর্পন, নাহলে কিছুই নয়। তখন ব্যাপারটা মুক্তি বাহিনীর উপর ছেড়ে দেয়া হবে। এরপর সবকিছু ভেবে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জেঃ নিয়াজীকে ৩০ মিনিট সময় দেয়া হল।

সময় শেষ হবার ১০ মিনিট আগেই জেঃ নিয়াজী আত্মসমর্পনের সর্তাবলী লেখা কাগজ জেনারেল জ্যাকবের দিকে ঠেলে দিলেন।

জেঃ জ্যাকব জেঃ নিয়াজীকে জিজ্ঞেস করলেন,

– “’General do you accept this document?”

জেঃ নিয়াজী চুপ করে রইলেন, এরপর আরো তিনবার একই কথা জিজ্ঞেস করবার পরেও কোন জবাব এলোনা। জেনারেল জ্যাকব পেপারগুলো তুলে নিলেন এবং বললেন,

– “I’d take it as accepted!”

জেনারেল জ্যাকব জেঃ নিয়াজীর নিরবতাকেই সম্মতি হিসেবে ধরে নিলেন। ঠিক ওই মুহুর্তে পিনপতন নিরবতা বজায় করছিলো সেই কক্ষে, উপস্থিত সকলে লক্ষ্য করছিলো জেঃ নিয়াজীর গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কে জানে, এটাও হয়তো জীবনের প্রথম…

জেঃ নিয়াজী বললেন,

– “আমি অন্য কোথাও সারেন্ডার করবোনা। আমি ঢাকা অফিসেই সারেন্ডার করবো!! (‘I won’t surrender anywhere else. I’ll surrender in the Dhaka office.’ )”

জেনারেল জ্যাকব বললেন,

– “না, আপনি রেসকোর্সে ঢাকার মানুষের সামনেই আত্মসমর্পন করবেন!”

জেঃ নিয়াজী বিড়বিড় করে বললেন,

– “আপনি মনে হয় গার্ড অব অনারও প্রদান করবেন!”

জেনারেল জ্যাকব পরে তার আত্মজীবনীতে এ ব্যাপারে লিখবেন,

“It was he (NiyazI) who had said Dhaka would fall over ‘my dead body’. That’s why I made it a point to make him surrender in front of the people of Dhaka.”

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
তেজগাঁও বিমানবন্দর, ঢাকা
বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিট
ইউএস নেভীর “টাস্ক গ্রুপ সেভেন্টি ফোর” এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার “ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ” সহ ভারত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে যাত্রা করেছে। হাতে সময় ছিলো খুব কম। আত্মসমর্পনে রাজী হবার খবর মুহুর্তেই দিল্লীর উপরমহলে পৌছে গিয়েছিলো। আবার কোন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়বার আগেই সব আয়োজন সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেয়া হলো।১০টি হেলিকপ্টারের একটী ফ্লিট ঠিক সাড়ে চারটায় তেজগাঁও বিমানবন্ধরে অবতরন করলো। একটি থেকে লেঃ জেঃ অরোরা সস্ত্রীক নেমে এলেন। কলকাতা থেকে উনারা ঢাকায় উড়ে এসেছেন।

তাড়াহুড়া এবং পরিস্থিতিগত কারনে আত্মসমর্পনের সাধারন নিয়মকানুনে ভজঘট লেগে গিয়েছিলো। সাধারনত বিজিত সেনাপতি বিজয়ী সেনাপতির সদর দফতরে এসে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দেন, কিন্তু এখানে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব নেয়ার জন্য বিজয়ী সেনাপতি বিজিতের কাছে গেলেন। জেঃ অরোরাও জে নিয়াজীর সাথে একসাথে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত ছিলেন। যদিও তিনি জেঃ নাগরা এবং জেঃ নিয়াজীর চেয়ে এক কোর্স সিনিয়র ছিলেন।

লেঃ জেঃ অরোরা এবং তার স্ত্রী ছাড়াও আরও ছিলেন এয়ার মার্শাল এইচসি দেওয়ান (এয়ার অফিসার কমান্ডিং ইন চীফ ইস্টার্ন কমান্ড), ভাইস এডমিরাল কৃষনান (ফ্লাগ অফিসার কমান্ডিং ইন চীফ, ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড), লেঃ জেঃ সাগাত সিং (চতুর্থ কোরের কমান্ডার) এবং মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে গ্রুপ ক্যাপ্টেন একে খন্দকার (ডেপুটি চীফ অফ স্টাফ অফ বাংলাদেশ ফোর্সেস)। জেঃ নিয়াজী এবং জেঃ অরোরা তাদের অভ্যর্থনা জানালেন। ভারতীয় পররাস্ট্র মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব একে রায় ভারতীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনেক বাঙ্গালী বাধভাঙ্গা স্রোতের মতো ভারতীয় জেনারেল এবং তার স্ত্রীর দিকে ছুটে এলেন। জেঃ নিয়াজী তাকে স্যালুট করলেন এবং হ্যান্ডশেক করলেন। প্রায় সিকি শতাব্দী পর আবার তাদের দেখা হলো, ইতিহাসের অংশ হতে। ল্যান্ড করবার পরপরই জেঃ অরোরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দিকে একটি কালো লিমুজিনে করে রওনা দিলেন, তার সাথে গেলেন বাংলাদেশ সরকারের মুখ্য সচিব রুহুল কুদ্দুস এবং অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ।

জনতার উল্লাসের বিজয় ধ্বনির শোরগোল আর অকৃত্তিম স্বাগতমের মধ্যে দিয়ে তারা চলছিলেন রমনা রেসকোর্স ময়দানের (এখনকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দিকে যেখানে আত্মসমর্পনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। রমনা ময়দানই সেই জায়গা যেখানে শেখ মুজিবর রহমান তাঁর বিখ্যাত স্বাধীনতার ভাষন প্রদান করেছিলেন এবং ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টোর দম্ভের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। আবার কাকতালীয়ভাবে এটাই সে জায়গা, যেখানে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিলো।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
রমনা রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
বিকাল ৫ ঘটিকা
কোন অজানা কারনে অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের তেমন কেউ এখানে উপস্থিত নেই। গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে মেজর হায়দার, ফ্লাঃ লেঃ ইউসুফ এবং কাদেরিয়া বাহিনির প্রধান কাদের সিদ্দিকী উপস্থিত আছেন। মেজর কে এম শফিউল্লাহও উপস্থিত আছেন, তবে সাইনিং টেবিলের সামনে দাড়াবার কারনে কোনো ছবিতেই তাকে দেখা যাবেনা।

৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। এর দশদিন পর যখন পশ্চিম পাকিস্তানীরা আত্মসমর্পন করে তার অনেক আগে থেকেই অস্থায়ী সরকারের কার্যক্রম বেশ ভালোভাবেই চালু ছিলো। তবে ২২ শে ডিসেম্বরের আগে তাদের বেশিরভাগই দেশে প্রত্যাবর্তন করেননি। এবং তার পেছনেও ছিলো ভারতীয় বাহিনীর অনুরোধ। কারন ১৬ ডিসেম্বরের পর পর দেশের নানা স্থানে প্রতিশোধমুলক এবং সংঘাতপ্রয়াসী নানা ঘটনা ঘটতে থাকে, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রনে আনতে অস্থ্যায়ী সরকারের ভুমিকা নেয়া জরুরী ছিলো। কারন ভীনদেশে মানুষ ভীনদেশী মিত্রের চেয়ে নিজের সরকারের কথাই বেশি শোনে, এখানেও ব্যাপারটা তেমন ছিলো। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি এবং মুক্তিবাহিনীর অনুপস্থিতি এই আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের একটা দুর্বল দিক ছিলো যা ওই মুহুর্তে মেনে নেয়া ছাড়া কারোই কিছু করবার ছিলনা। অনেক বাংগালীর মতে এই অনুষ্ঠানটা বাংলাদেশীদের জন্য কিছু মাত্রায় অপমানজনক ছিলো এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে খারাপ সম্পর্কের সুচনা করে।

এ ব্যাপারে আমার মতামত হচ্ছে, এ ঘটনা এড়াবার উপায় ছিলনা। তাই হয়েছে যা হবার ছিল এবং যেভাবে হবার ছিলো। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রায় সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তাদের কিংবা দিল্লীর দিক নির্দেশনায়। সেইরুপ ঘটনা ঘটেছে এই আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। ভারতীয়রা চেয়েছিলো কোনরকম আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কিংবা মার্কিন পরাশক্তির আগমনের আগেই যুদ্ধের একটা ফয়সালা হয়ে যাক। আর তা করতে গিয়ে বাঙ্গালীদের এই আনুষ্ঠানিকতার সময় ঢাকায় উড়িয়ে আনা সম্ভব ছিলো না, কারন অস্থায়ী সরকারের সবাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যার যার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর আত্মসমর্পনের ঘটনাটা ঘটে খুব দ্রুত, যা হয়তো ভারতীয়রাও আশা করেনি। তবে আত্মসমর্পনের দলিলে ভারত এবং বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর কথাই বলা আছে। আর যেহেতু সিনিয়রিটির দিক দিয়ে জেঃ অরোরা বাকী সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন, তারই মিত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে সাক্ষর করবার কথা এবং সেটাই যৌক্তিক। আত্মসমর্পন হয় একটা কনভেনশনাল সেনাবাহিনীর আরেকটা কনভনশনাল কিংবা প্রথাগত সেনাবাহিনীর হাতে। মুক্তিবাহিনী কোন কনভেনশনাল ফোর্স ছিলো না, যেটা ছিল ভারতীয় বাহিনী। আর পাকিস্তানীরাও চাইছিলো ভারত যেহেতু জেনেভা কনভেনশনের সাক্ষরকারী দেশ, তাই তাদের কাছেই আত্মসমর্পন করতে। মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করলে তারা প্রতিশোধমূলক ঘটনা ঘটবার আশংকা করছিলো এবং সেটা ঘটাই খুব স্বাভাবিক ছিলো।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
রমনা রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
বিকেল ৫ টা ১ মিনিট
শীতের আগমনের কারনে কিছুটা বাদামী হয়ে আসা ঘাস আবৃত মাঠে ভারতীয় বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সাবেক সিং এবং আরো সাত্জন ভারতীয় অফিসার আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানের স্টেজ তৈরী করলেন। একটা সাধারন কাঠের টেবিল পাতা হলো শীতের স্বচ্ছ নীল আকাশের নীচে।
জনসম্মুখে আত্মসমর্পন অনুষ্ঠান এবং যৌথ গার্ড অফ অনার দেয়া নিয়ে কিছু সমালোচনা হয় অনুষ্ঠান শুরুর আগেই। যদিও সময়টা এসব তুচ্ছ ব্যাপারে মাথা ঘামানোর মত সুস্থির ছিলনা। এ ব্যাপারে জেনারেল জ্যাকব তার গ্রন্থে উল্ল্যেখ করেন,

“There has been some criticism of the public surrender and the combined guard of honor as well as the simple table set up. As I had no instructions or guidance and had to negotiate the terms in what amounted to obtaining an immediate and unconditional surrender without any time or resources for protocol or ceremonial frills, I acted on my own initiative, and in retrospect I do not regret the modalities adopted…”

উচ্চপদস্থ্য সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জেঃ অরোরা এবং জেঃ নিয়াজী পাশাপাশি বসলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন একজন এয়ার মার্শাল, একজন ভাইস এডমিরাল এবং এছাড়াও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যান্য কোরের কমান্ডারেরা সারিবদ্ধভাবে পেছনে দাঁড়ান। পেছনে জনতা একে অপরের কাঁধের উপর দিয়ে দেখবার চেস্টায় আছেন যে জেঃ নিয়াজী ঠিকমত সাক্ষর করছেন নাকি কিংবা করতে পারছেন নাকি। জনতা এই দাম্ভিক পাকিস্তানী জেনারেলের জনসম্মুখে অপমানজনক পরিনতি স্বচক্ষে দেখতে উদগ্রীব, যার অধীন সেনারা লাখো মানুষের জীবন নিয়েছে মার্চের সেই কালো রাতের পর থেকে।

আত্মসমর্পনকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে আর কেউ বলতে কেবল মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী উপস্থিত আছেন ভঙ্গ হৃদয় আর মলীন চেহারার জেঃ নিয়াজীর পাশে। শৌর্য্য বীর্য্যের গর্ব করে বেড়ানো দাম্ভিক পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জেনারেলদের জন্য এরচেয়ে বড় অপমান আর কিছু হতে পারতোনা এই সময়ে।

মলিন চেহারায় ছলছল চোখে জেঃ নিয়াজী একটী কলম ধার করলেন জেঃ অরোরার থেকে। জেঃ নিয়াজী তার নিজের কলম খুব সম্ভবত আত্মসমর্পনের খসড়া সাক্ষরের সময় ভুলে ফেলে এসেছিলেন। এমন কিছু আপাত গুরুত্বহীন দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষে লেঃ জেঃ এ এ কে নিয়াজী এবং যৌথ বাহিনীর পক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেঃ জেঃ জগজিত সিং অরোরা দলিলে সাক্ষর করলেন। এ দুজনের কেউই এসময় একটা শব্দ পর্যন্ত উচ্চারন করলেননা!!

এই আত্মসমর্পনের দলিলই আজপর্যন্ত প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্ভবত একমাত্র জনসম্মুখে আত্মসমর্পন। এর বাইরেও যদি প্রথাগত যুদ্ধের কথা বলা হয়, তবে এই আত্মসমর্পন আধুনিক সমর ইতিহাসেরই দ্রুততম সময়ে আত্মসমর্পনের অন্যতম নজির!!

দ্যা ওয়ার অফ দ্যা টুইন্স (১৯৯৭) বইতে কৃষ্ণ চন্দ্র সাগর এ দৃশ্যের বর্ননায় লিখেছেন,

“ A grim faced Niazi had to borrow a pen from Gen Aurora as he had lost his own at the moment of signing the surrender deed. Amid such scenes, Gen Niazi of Pakistan and Gen Aurora of India signed the Instrument. Neither of the two uttered a single word. ”

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
রমনা রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা
বিকেল ৫ টা ৫ মিনিট

আত্মসমর্পনের দলিলে সাক্ষর সম্পন্ন হবার পরপরই আত্মসমর্পনের সামরিক প্রথা মেনে লেঃ জেনারেল এ এ কে নিয়াজী, (সিতারা ই জুরাত) অথবা ‘টাইগার’ নিয়াজী আত্মসমর্পনের জন্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছেন, যিনি পরবর্তীতে একটি আত্মজীবনী লিখবেন “Betreyal of East Pakistan” শিরোনামে, যেখানে তিনি দাবী করবেন, উনি লড়াই করতে চেয়েছিলেন, জেনারেল হেডকোয়ার্টারে লেখা তার সব বার্তার শেষেই নাকি তিনি লিখতেন, “Last man, last round”।

“প্রথমে তিনি তার মুক্তা অলংকৃত পিস্তল কোমরের বেল্ট থেকে খুলে এনে সমর্পন করলেন, এরপর তার সোর্ড, এরপর ডানকাঁধ থেকে র‍্যাঙ্ক ব্যাজ অপসারন করে নিজেকে সেই পদবী থেকে নিজেকে অপসারন করলেন নিজেই, এরপর তিনি সেগুলো খুলে লেঃ জেঃ অরোরার হাতে দিলেন। এরপর তার মাথা হালকা অবনত করলেন আত্মসমর্পন করছেন এটা বোঝাতে। তিনি নিজেকে সমর্পন করলেন এবং সেইসাথে সমর্পন করলেন তৎকালীন পাকিস্তান নামক রাস্ট্রের অর্ধেক, যাকে পুর্ব পাকিস্তান বলা হতো। উদয় হলো একটা রাস্ট্রের, একটা পতাকার, আমাদের সোনার বাংলাদেশের।“

(পাকিস্তানীরা কাদের কাছে সারেন্ডার করেছিলো এই ব্যাপারে এই ছবিটা একটা দলিল। “BANGLA DESH” নামটা চোখে না পড়বার কিছু নেই। এই যুদ্ধ আমরা একসাথে লড়েছিলাম, আমরাও একা নয়, ভারতও একা একাই নয়।)

টাইগার নিয়াজীর তার দেশের এবং ৯৩,০০০ যুদ্ধাপরাধী সেনার পক্ষ থেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পনের সাথে সাথে পাকিস্তানের চূড়ান্ত পরাজয় মেনে নিলেন এবং “তাদের” পূর্ব পাকিস্তানকে হস্তান্তর করলেন বাঙ্গালীদের হাতে। সাথে সাথেই সমাপ্তি ঘটলো দীর্ঘ সাড়ে নয়মাসের গনহত্যা, ধর্ষন, লুট, অগ্নিসংযোগ এবং ভারতের সাথে ১৩ দিনের স্বপ্লমেয়াদী যুদ্ধের। পূর্ব পাকিস্তান পরিনত হল গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে এবং পৃথিবীর মধ্যে অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশে।

যেই মুহুর্তে জেঃ অরোরা জেঃ নিয়াজীর মিলিটারী ব্যাজ খুলে নিলেন এবং রিভলবারটি গ্রহন করলেন, হার হাজার জনতা বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে, মুক্তির অকৃত্তিম আনন্দে চিৎকার করে উঠলো, “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু!!”

১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১
ঢাকা, স্বাধীন বাংলাদেশ
বিকেল সাড়ে ৫ টা
জেনারেল নিয়াজী, ওরফে টাইগার নিয়াজী, যিনি দৃঢ় কন্ঠে উচ্চারন করেছিলেন শেষ পর্যন্ত লড়ে যাবেন, তাকে বিমর্ষ এবং অশ্রু বিজরিত চেহারায় দেখা যাচ্ছে আত্মসমর্পনের দলিলে সাক্ষর করবার পর। এসময়ে জেঃ অরোরা তাকে জেনারেলের সম্মান প্রদর্শন করেন এবং স্বান্তনা দিতে দেখা যায় যদিও তার যোগ্য তিনি ছিলেননা।

১০০ পাকিস্তানী সেনা কর্মকর্তা এবং ১০০ সৈনিক তাদের র‍্যাঙ্ক ব্যাজ খুলে ফেলে এবুং অস্ত্র সমর্পন করে লেঃ জেঃ নিয়াজীকে অনুসরন করলেন প্রতীকী রুপে। পুরো আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো খুব অল্প সময়ে। নিরাপত্তাজনিত কারনে বাদবাকী পাকিস্তানী সেনাদের ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হলো যুদ্ধবন্ধী হিসেবে।

আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে না হতেই জনতা ছুটে আসে মঞ্চের দিকে। কোনভাবেই আর তাঁদের আটকে রাখা সম্ভব হয়না। জেঃ অরোরাকে দেখা যাচ্ছে জনতার কাঁধের উপর, এমন অবস্থা যৌথবাহিনীর কর্তাব্যক্তি এবং সেনা সবারই। তাঁরা আজ সূর্য্য ছিনিয়ে এনেছে, তারাদের আলোয় আজ চাঁদের রুপের কথা বলা হবে পৃথিবীর এই কোণে, এই সূর্য্য সন্তানেরা চাঁদকেও মনে হয় অধিকারে নিয়ে এ ভূমিতে রেখে দিয়েছে আজ।!!

পাকিস্তানী নিপীড়ন থেকে মুক্তির আনন্দ আজ সকল কিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিলো। তাঁদের আবেগের উপর আজ আর কারো নিয়ন্ত্রন নেই। তারা সকলেই আজ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক!!

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১
ভারতীয় লোকসভা, দিল্লী
ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটা
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এইমাত্র ভারতীয় লোকসভায় ঘোষনা করলেন,

“ঢাকা এখন স্বাধীন একটি দেশের মুক্ত রাজধানী!”

লোকসভার সকল সদস্য এই ঘোষনার সাথে সাথে উল্লাসে ফেটে পড়লো। টেবিল চাপড়ে, ফাইলের কাগজ উড়িয়ে তারা আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁদের কন্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিলো,

“জয় বাংলা, জয় ইন্দিরা গান্ধী!!”

তিনি আরও বললেন,

“এই অধিবেশন এবং পুরো জাতি এই ঐতিহাসিক ঘটনা চিরদিন স্মরনে রাখবে। আমরা বাংলাদেশের জনতাকে সম্ভাষন জানাই তাদের এই বিজয়লগ্নে। আমরা মাথানত করি সেইসকল তরুন যুবকদের প্রতি এবং মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের প্রতি তাঁদের বীরত্ব এবং দৃঢ় সংকল্পের জন্য।“

এর বাইরে তিনি দৃপ্ত কন্ঠে আরও ঘোষনা করলেন,

“ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক মুহুর্তও বেশি সময় অবস্থান করবেনা!“

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১
ঢাকা, বাংলাদেশ
বিকেল, সন্ধ্যা, রাত, গভীর রাত এবং তারপর তারপর…
সন্ধ্যা থেকে শুরু করে পুরো রাত জুড়ে ঢাকার প্রতি কোনে কোনে জনতা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করছে আজ। শহরের কোন মিস্টির দোকানেই আর কোন মিস্টি নেই, সবই বিতরন করা হয়ে গেছে। শহরের এখানে সেখানে মাইকে বাজছে শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষন এবং দেশাত্মবোধক গান। কে জানে এতোদিন মানুষজন এসব কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলো?!

এমন দৃশ্য দেশবাসী আর কখন দেখবেনা। এমন বিজয়ের মুহুর্ত একটা দেশের ইতিহাসে একবারই আসে। আর কোন কিছুর সাথে এর তুলনা হয়না। হয়তো এদের প্রায় সবাই প্রিয়জন হারানোর বেদনা বুকে নিয়েও উল্লাসে মেতেছে আজ, বিজয়ের উল্লাসে!!

“জয় বাংলা! জয় বাংলা!!” শ্লোগানে মুখরিত আজ শুধু এই ঢাকাই নয়, পদ্মাপাড়, বক্ষপুত্রপারের মানুষ, সোনালী ধানক্ষেত, সর্ষে রঙের পাহাড়ঘেরা অঞ্চল সবই আজ এই শ্লোগানে মুখরিত। তাঁদের কেউ কেউ চলন্ত বাসের উপর লাফিয়ে নাচতে ব্যস্ত, কেউ শহরের অলিতে গলিতে দৌড়ে দৌড়ে গাইছে, “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি!”। তারা লুকোনো কোনো জায়গা থেকে আজ নির্ভয়ে বের করে আনছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এখানে সেখানে আজ এই পতাকা সদর্পে পতপত করে উড়ছে!

১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১
দিল্লী, ভারত
ভারতীয় লোকসভা অধিবেশনে আবার ভাষন দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তিনি যৌথবাহিনীর এ বিজয় সম্পর্কে বললেন,

“এটা বিজয়, কিন্তু কেবল অস্ত্রের বিজয় নয়, বিজয় একটি আদর্শের। মুক্তিবাহিনী এতটা নির্ভয়ে লড়াই করতে পারতোনা যদিনা তাঁদের স্বাধীনতার জন্য এমন অদম্য স্পৃহা এবং আত্মপরিচয়ের জন্য স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কামনা না থাকতো। আমাদের নিজেদের সেনারাও এমন নির্ভয় এবং নিমগ্ন হতে পারতোনা তাঁদের লক্ষ্য অর্জনে যদিনা তারা এর কারন সম্পর্কে আবগত না থাকতো। “

এর মাধ্যমে ভারতীয়দের মনের ভাবনার কি প্রকাশ পাওয়া যায় সেটা বলা সম্ভব না হলেও বোঝা যায় যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অন্তত এই বিজয়কে কেবল ভারতের বিজয় মনে করছেননা। তিনি এই বিজয়ের কৃতিত্ব দিলেন বাংলাদেশের সংগ্রামী জনতাকে। এ বিজয় ছিলো সেই অস্থির সময়ে আমাদের জনতার, যাদের সব ধরনের সাহায্য করেছিলো ভারতীয়রা দুঃসময়ের মিত্র হয়ে। এ বিজয় বাঙ্গালীর, এ বিজয় মিত্র বাহিনীর। এ যুদ্ধ আমরা একসাথে লড়েছিলাম!

ডিসেম্বর মাসের কোন এক সময়, ১৯৭১
টর্চার সেল, নবীনগর থানা
ব্রাক্ষনবাড়িয়া, বাংলাদেশ
দেশ স্বাধীন হয়েছে। দেশের এখানে সেখানে এখন মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ বিচরন। স্থানীয়ভাবে পাকিস্তানীদের দোসরদের ধরে ধরে এনে বিচারও করা হচ্ছে। ফটিক রাজাকারকেও ধরে আনা হয়েছে থানায়, সে এখন থানার টর্চার সেলে। থানার পূর্ন নিয়ন্ত্রন এখন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই। সে অবশ্য পালাতে চায়নি, ভেবেছিলো এলাকার চেনাজানা মুক্তিবাহিনীর লোকেরা তার এই রাজাকারে যোগ দেয়াটাও মাফ করে দেবে একটূ কান্নাকাটি করলে। কিন্তু সে জানতোনা, এতদিন পাকিস্তানী সেনারা আর তাদের দোসরেরা যে রুপ দেখিয়েছে, সেটা ফেরত পাবার সময় এসেছে।

ফটিক রাজাকারকে ধরে এনে বেধে পিটিয়ে ক্ষত বিক্ষত করা হলো, নখ চোখ উপড়ে কাটা স্থানে দেয়া লবন দেয়া হল। তিলে তিলে যন্ত্রনা দিয়ে মারা হলো তাকে, একজন রাজাকারের ঠিক যেভাবে মৃত্যু হওয়া উচিত সেভাবেই। মারা যাবার সময় কি সে একবারও জাহাঙ্গীরের কথা ভেবেছিলো? তাকে দেখলে কি সে চিতকার করে সাহায্য চেয়ে বলতো আমাকে ছেড়ে দাও, আমি তোমার পরিবারকে হত্যার থেকে রক্ষা করেছি? জাহাঙ্গীর তখন কি করতো?

মুক্তিবাহিনীর ছেলেরাও গল্প করতে করতেই সব দেখছিলো। কারো মনেই ফটিক রাজাকারের জন্য কোন মায়া নেই। একটা রাজাকারের জন্য আবার কিসের মায়া?

১৭ই ডিসেম্বর ১৯৭১ – ফেব্রুয়ারী ১৯৭২
স্বাধীন বাংলাদেশের তখন পর্যন্ত পরাধীন বিভিন্ন অঞ্চল
সামরিক বাহিনীর প্রথা অনুসারে প্রতিটি পাকিস্তানী পদাতিক ডিভিশন, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী এবং অন্যান্য আধা সামরিক বাহিনী আলাদা আলাদা ভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মসমর্পন করে ১৬ই ডিসেম্বরের আগে এবং পরে। জীবন রক্ষার তাগিদে অনেক পাকিস্তানী ইউনিট (ডিভিশন থেকে কোম্পানী পর্যন্ত) ব্যাজ খুলে এবং অস্ত্র সমর্পন করে আত্মসমর্পনের দলিলে সাক্ষর করে। তখনো পর্যন্ত দেশের নানা স্থানে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলছিলো কারন হাই কমান্ডের আত্মসমর্পনের পরেও বেশ কিছু পাকিস্তানী ইউনিট আত্মসমর্পনের নির্দেশনা না মেনে অথবা যোগাযোগহীনতার কারনে নির্দেশনা না পেয়ে লড়াই চালিয়ে যায়। কিন্তু এসব সংঘর্ষ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ১০৭ নং ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার মালিক হায়াত খান ৪০০০ হাজারের বেশি সেনা সহ খুলনায় জনসম্মুখে আত্মসমর্পন করেন ১৭ই ডিসেম্বর। ১৮ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামের পাকিস্তানী সেনারা আমসমর্পন করে এবং চট্টগ্রাম মুক্ত হয়। চার হাজার পাকিস্তানী সেনা ২০শে ডিসেম্বর নওগাঁয় আত্মসমর্পন করে। বেশ অনেকগুলো বিহারী প্যারামিলিটারী বাহিনীর এবং সসস্ত্র পাকিস্তান সমর্থকদের ছোট ছোট দল দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্থানের নিয়ন্ত্রনে ছিলো। বিশেষ করে ঢাকার মোহাম্মদপুর, উত্তরবঙ্গ এবং পার্বত চট্টগ্রামে এমন অনেক ছোট ছোট পকেট ছিলো। ঢাকার মিরপুর মুক্ত হয় ৩১ শে জানুয়ারী। এই অভিযানের সময়ই নিখোজ কিংবা শহীদ হন জহীর রায়হান। তবে ফেব্রুয়ারীর মধ্যেই দেশের সকল অঞ্চল আলোচনা এবং সীমিত মাত্রার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে মুক্ত হয়।

১০ জানুয়ারী, ১৯৭২
দিল্লী, ভারত
বাংলাদেশের জন্মের পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছেন ৮ জানুয়ারী। সেখান থেকে তিনি লন্ডনে উড়ে যান। এরপর সেখান থেকে রাজকীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে দিল্লীতে এসে পৌছেছেন আজ। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সহ পুরো মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সকল সাংসদ বিমানবন্দরে উপস্থিত। সেখান থেকে তারা সরাসরি চলে এলেন সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষন দিতে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বললেনঃ

“আমরা ভারতের জনতার কাছে তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। প্রথমত, যারা ভারতে শরনার্থী হয়ে এসেছিলো তারা বাংলাদেশে আবার ফেরত যাবে। দ্বিতীয়ত, আমরা মুক্তিবাহিনী এবং বাংলাদেশের মানুষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো । এবং তৃতীয়ত, আমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে জেল থেকে মুক্ত করবো। আমরা আজ আমাদের তিনটি প্রতিশ্রুতিই পূরন করেছি।“

দুঃখের বিষয় হচ্ছে এটাই, যে আমরা এই মহীয়সী নারী এবং নেত্রীকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যথাযথ সম্মান দেইনি কখনোই। দেশ স্বাধীন হবার পর ভারত বিদ্ধেষ চরমে ওঠে, এবং নানা রাজনীতির মারপ্যাচে আমরা এসব অবদান কিংবা সাহায্যের কথা ভুলে যাই। আমরা কেবল সে ঘটনাগুলোর কথাই মনে রেখেছি যেসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ভারতীয় বাহিনীর দ্বারা হয়েছিলো, এটা ভেবে দেখিনা যে ভারতীয় বাহিনীর সেই সময়ে আসলে কি করবার সক্ষমতা ছিলো। স্বাধীনতার পর আমাদের চল্লিশ বছর লেগেছে রাস্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা জানাতে এই মহীয়সী নারীকে। চল্লিশটা বছর একটু দীর্ঘ্য সময়ই বটে!

শেখ মুজিবুর রহমান আবেগাপ্লুত কন্ঠে ইন্দিরা গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“আপনার সরকার, সেনাবাহিনী এবং জনগন যে মততা দেখিয়েছে এবং যে সহযোগিতা করেছে বাংলাদেশের জনগন তা কখন ভুলবেনা। শ্রীমতী গান্ধী সারা বিশ্ব ঘুরে তাঁর সাধ্যমত করেছেন এটা নিশ্চিত করতে যে আমি নিরাপদে আছি। আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার সাড়ে সাত কোটি জনতা তাঁর এবং তাঁর সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ!”

ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক দক্ষতা এবং দুরদর্শিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের দৈর্ঘ্যকে সংক্ষিপ্ত করে। ইন্দিরা গান্ধী এ সময় সাহসী এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহন করেন সকল প্রতিকুলতা আর আন্তর্জাতিক চাপ সামলে। পাকিস্তানের প্রতি আমেরিকান এবং চীনা সমর্থনের পালটা পদক্ষেপ হিসেবে তিনি দক্ষ কূটনোইতিক ডীপি ধরকে মৈত্রী চুক্তির জন্য সৌভিয়েত ইউনিয়ন প্রেরন করেন যা তাঁকে নির্ভয়ে এবং মুক্তভাবে নানা পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। উনি তাঁর দেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিজয় অর্জনে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন যা ভারতকে তাঁর ৬২ ও ৬৫ তে হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে এবং একটী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে। উনি দৃঢ়চিত্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং জাতিসংঘের নানা চাপ সামাল দেন প্রায় একাই।

১৭ মার্চ, ১৯৭২
ঢাকা, বাংলাদেশ
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রনে ঢাকায় এসেছেন। এসেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রথম যে ঘোষনাটি দিলেন, তা হচ্ছেঃ

“ভারতীয় সেনাদের প্রয়োজন বাংলাদেশে ফুরিয়েছে। তারা এবার নিজের দেশে প্রত্যাবর্তন করবে।“

১৬ ডিসেম্বর দেয়া কথা তিনি রাখলেন। স্বাধীনতা অথবা বিজয় লাভের কেবল ৩ মাসের মধ্যে বিজয়ী কোন বাহিনীর সহযোগী মিত্রবাহিনীর প্রত্যাহারের ব্যাপারে পৃথিবীর ইতিহাসেই একটা দৃস্টান্ত হয়ে রইবে।

স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিপূর্ন আত্মপ্রকাশের সাথে সাথেই আমাদের উপর অর্পিত হয় অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশ হিসেবে মাথা উচু করে দাড়াবার দ্বায়িত্ব; শ্রদ্ধ্যা, সম্মান এবং অহংকার নিয়ে…

(ছবিগুলো যোগ করা হয়নি পোস্টে)

চলবে…

৪ thoughts on “চেকপয়েন্ট – পর্ব – ৬ (স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর ভুমিকা, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়)

  1. আরেকটি কথা বলতে চাইছি যে
    আরেকটি কথা বলতে চাইছি যে আপনার এইসব পর্বগুলির প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বটি খুবই ভাল লেগেছে। একেবারে গোড়া থেকে আরম্ব করায় একটু অন্য ধরণের লেগেছে।
    এককথায় অসাধারণ।

    1. ছয় বছর ধরে লিখেছি। অনেক
      ছয় বছর ধরে লিখেছি। অনেক ক্রসচেকও করেছি। শতভাগ নিরপেক্ষতা সম্ভব নয়, তারপরেও নিজের কাছে সৎ থাকতে চেয়েছি। এর পরের ইতিহাসই বিতর্কিত ইতিহাস, সেটাও নিজ বুদ্ধিতে যা সঠিক মনে হয়েছে তাই লিখেছি। কোন দল কিংবা আদর্শের বাইরে থেকে স্বাভাবিক লজিকে যা ঠিক মনে হয়েছে তাই বলতে চেয়েছি পরেই। সাথে থাকবার জন্য ধন্যবাদ আবারো 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *