প্রাচীন রঙ্গপুরের ইতিহাস।


প্রাচীনকালে ‘বঙ্গভূমি’ অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র, বরেন্দ্র, সুহ্ম, রাঢ়, সমতট, হরিকেল, গৌড়, তাম্রলিপ্তি প্রভৃতি নামে ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে, ‘অঙ্গ’ রাজ্যের অবস্থান ছিল হিমালয়ের ভাগলপুরে। প্রায় সাড়ে তিনহাজার বছর আগে ‘কর্ণ’ এর রাজা ছিলেন বলে মহাভারতে বর্ণিত হয়েছে। ‘বঙ্গ’ রাজ্য গঠিত ছিল বৃহত্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে। আর্যদের ভারতবর্ষে আগমনের পূর্বে এ রাজ্যে ‘বঙ্গ’ জাতির বাস ছিল। ঋগে¦দের শাখা ‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থে এই ‘বঙ্গ’ শব্দটির উল্লে-খ রয়েছে। উড়িষ্যার নাম ছিল ‘কলিঙ্গ’ রাজ্য।‘পুণ্ড্র’ বা পুণ্ড্রবর্ধণ রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল বগুড়ার মহাস্থানগড়। পাশ্ববর্তী বৃহত্তর রংপুরের অধিকাংশ এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।‘সুহ্ম’ বলতে পশ্চিম বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চল বুঝাতো। ‘তাম্রলিপ্তি’ মেদিনিপুর জেলার তমলুক, ঘাটাল এবং হলুদিয়া মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত ছিল। ‘হরিকেল’ বৃহত্তর সিলেট জেলা ও কুমিল্লার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। ‘বরেন্দ্র’ সমগ্র বৃহত্তর রাজশাহী এবং বৃহত্তর পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল। ‘গৌড়’-এর প্রাণকেন্দ্র ছিল মালদহ। পার্শ্ববর্তী মুর্শিদাবাদ ও আরো কিছু এলাকা এর অন্তর্ভূক্ত ছিল। ‘সমতট’ ছিল বৃহত্তর নোয়াখালি, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লর অর্ধাংশ এবং ২৪ পরগণার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত একটি বিরাট রাজ্য।

সপ্তম শতাব্দীতে সমগ্র বঙ্গদেশ ৫টি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলোর নাম ছিল ‘পুণ্ড্র’, ‘কামরূপ’, ‘সমতট’, ‘কর্ণসুবর্ণ’ ও ‘তাম্রলিপ্তি’। এই পর্যায়ে রঙ্গপুর ‘কামরূপ’ বা ‘প্রাগজ্যোতিষ’ রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়। রামায়ণ, মহাভারত ও কালিকা পুরাণের উদ্ধৃতি থেকে ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলে ‘প্রাগজ্যোতিষ’ বা ‘কামরূপ’ রাজ্যের নাম পাওয়া যায়।৭ এসব গ্রন্থের বিবরণ মতে- করতোয়া রাজ্যের পশ্চিম সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ভূখণ্ড ছিল প্রাচীন কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষ রাজ্যের সীমানা। কামরূপের চারটি পীঠ বা ভাগ ছিল- কামপীঠ, রত্নপীঠ, মহিপীঠ ও যোনীপিঠ। বৃহত্তর রঙ্গপুর ছিল রত্নপীঠের অন্তর্ভূক্ত।

তবে রঙ্গপুর তথা রংপুর অত্যন্ত প্রাচীন জনপদ হলেও এর আদি ইতিহাস অনেকটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। রামায়ণ, মহাভারত, কালিকাপুরাণ ইত্যাদি হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থের কিছু কিছু বর্ণনার আলোকে এই ইতিহাস অনুসন্ধানের একটা প্রয়াস চলেছে। সেই সূত্রে জানা যায়, সুদূর অতীতে রঙ্গপুর উত্তর ভারতের প্রাচীন ‘কামরূপ’ বা ‘প্রাগজ্যোতিষ’ রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল। মহাভারতে বর্ণিত ‘নরক’ ছিলেন এর রাজা। দেবতাদের অভিশাপে তিনি অসুর চরিত্র লাভ করায় শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিহত হন। পরে তার পূত্র ‘ভগদত্ত’ রাজা হন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে দুর্যোধনের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি অর্জুনের হাতে নিহত হন। তার উত্তরসূরীরা ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ পযন্ত কামরূপ শাসন করেন বলে জানা যায়। খ্রিষ্টীয় ৪র্থ শতাদ্দীর মাঝামাঝি সময়ে কামরূপ উত্তর ভারতের খ্যাতনামা শাসক চন্দ্রগুপ্তের অধীনে আসে তা প্রয়াগে (উত্তর প্রদেশ) অবস্থিত অশোক স্তম্ভের শিলালিপিতে জানা যায়।৮ দশম শতাব্দীর শেষে পাল বংশীয় রাজা ব্রহ্মপাল কামরূপের সিংহাসনে বসেন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে পরবর্তী দুশো বছরের বেশী সময়ের ইতিহাসও অতি গোলযোগ পূর্ণ। পঞ্চদশ শতাব্দীতে খেন বংশীয় শাসক ‘নীলধ্বজ’ (১৪৪০-৬০খ্রি.), তার পূত্র ‘চক্রধ্বজ’(১৪৬০-৮০খ্রি.) এবং ‘নীলাম্বর’(১৪৮০-৯৮খ্রি.) কামরূপ শাসন করেন। গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৮খ্রি.) রাজা নীলাম্বরকে পরাজিত করে কামরূপ দখল করেন। আলাউদ্দিন হোসেন শাহের মৃত্যু পর্যন্ত (১৫১৯ খ্রি.) রংপুরসহ কামরূপ গৌড়ের অধীন ছিল। আলাউদ্দিন হোসেন শাহের মৃত্যুর পর তার পূত্র নসরত শাহের সময় আসামের পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন উপজাতিসমুহ কোচ নেতা বিশুর (বিশ্বসিংহ) নেতৃত্বে মুসলমানদের বিতাড়িত করে ঘোড়াঘাট পর্যন্ত সমগ্র কামরূপ দখল করে নেয়। বিশু কামরূপের রাজা হয়ে কোচ উপজাতীয় নাম পরিত্যাগ করে ‘বিশ্বসিংহ’ নাম ধারণপূর্বক নিজেদের বংশকে রাজবংশী বলে অভিতি করেন। বিশ্বসিংহ কামরূপ (কামতাপুর) থেকে কোচবিহারে রাজ্য স্থানান্তর করেন। এই রাজ্যই ‘কোচবিহার রাজ্য’ নামে পরিচিত এবং ১৯৫২ খ্রিঃ পর্যন্ত তার উত্তরসূরীরা কোচবিহারের রাজা ছিলেন। বিশ্বসিংহের সময় থেকে মোগল আমলের পূর্ব পর্যন্ত রংপুর কোচ বিহার রাজ্যের অংশ ছিল এবং মোগল কতৃক সমপূর্ণরূপে দখল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তা কোচবিহার রাজ্যের অংশ হিসেবে বিদ্যমান থাকে।৯ বিশ্বসিংহের মৃত্যুর পর (১৫৩২ মতান্তরে ১৫৪০ খ্রি.) প্রায় দেড় শতাব্দীকাল অর্ধাৎ ১৬৮৭ খ্রি. পর্যন্ত কোচবিহার রাজ্য নানা টানাপোরেনের শিকার হয়।
মহামতি আকবরের সভাসদ তোডরমলের আইন-ই-আকবরীর বিবরণে জানা যায়, মোগল আমলে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ভিত্তিতে রংপুর তিনটি প্রশাসনিক ইউনিটে (সরকার) বিভক্ত ছিল। প্রথমত. ঘোড়াঘাট সরকারের কিছু অংশ যা পরগণা পাতিলাদহ, কুণ্ডি (পরবর্তীতে সরকার বাজুহার অংশবিশেষ), স্বরূপপুর ও রোকনপুর। দ্বিতীয়ত, সরকার বাঙ্গালভূম বা বাহারবন্দ ও ভিতরবন্দ (বর্তমানে গাইবান্ধা জেলা, কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি ও রাজারহাট থানা বাদে) পরগণা নিয়ে গঠিত ছিল। তৃতীয়ত, রংপুর সদর বা মূল রংপুর যা সরকার কোচবিহার বা ‘কাছওয়ারা’ নামে অভিহিত ছিল এবং গঠিত ছিল ৬টি পরগণা নিয়ে, তাহলো কার্যিরহাট (বর্তমান নীলফামারী জেলা), কাকিনা (পাটগ্রাম থানা বাদে বর্তমান লালমনিরহাট জেলার অধিকাংশ), ফতেহপুর (কাউনিয়া, পীরগাছা, বামনডাঙ্গা, নলডাঙ্গা এলাকা), পাটগ্রম (পাটগ্রাম থানা), বোদা (বর্তমান পঞ্চগড় জেলাধীন থানা) এবং পুর্বভাগ ( কুড়িগ্রাম জেলাধীন ফুলবাড়ি থানা)।

১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত এই তিন ধরণের প্রশাসনিক এরাকা মোগলদের দখলে আসে শুধুমাত্র পাটগ্রাম, পূর্বভাগ ও বোদা পরগণা ব্যতীত। ১৬৮৭-১৭১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৪ বছর এই তিনটি পরগণা দখল করতে মোগল শক্তিকে কোচবিহার রাজ্যের সাথে অনবরত যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়। তবে শেষ পর্য পর্যন্ত মোগলরা এ তিনটি পরগণা দখল করতে সমর্থ হলেও তা করদানের স্বীকৃতিতে কোচশাসনের অধীনেই থাকে এবং কোচবিহার শাসনাধীন সামন্তপ্রভু, জমিদার, ফৌজদাররা মোগলদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে নিজেদের পদ ও পদবীকে সুদৃঢ় করেন। ফলে ১৭১১ থেকে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশের দেওয়ানী লাভের পূর্ব রংপুরে মোগল শাসনের নতুন কোন পরিবর্তনের ইতিহাস পাওয়া যায়না। এ অঞ্চলে কোচ রাজাদের আমলে যে প্রশাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল মোগল আমলেও তা বহাল ছিল ।১০

বৃটিশ আমলে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে রংপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে রংপুর জেলাকে ২১ টি থানায় এবং ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে থানাগুলোকে ৪টি মহকুমায় বিন্যস্ত করা হয়। মহকুমা ৪টি হলো- রংপুর সদর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম এবং নীলফামারী।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে এই উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। রংপুর পাকিস্তানের ‘পূর্ববঙ্গ’ (পূর্ব পাকিস্তান) প্রদেশের অন্তর্ভূক্ত হয় । কিন্ত স্বাধীনতা ছিল পরাধীনতার নামান্তর মাত্র। পাকিস্তানের শাসন ক্ষতায় অধিষ্ঠিত হয় পশ্চিম পাকিস্তানী স্বৈরশাসক গোষ্ঠী। ১৯৪৭-১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে পশ্চিম পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের সীমাহীন শোষণ-বঞ্চনা, অত্যাচার-নির্যাতনের চির অবসানের লক্ষ্যে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেদিয়ে জন্ম নেয় ‘বাংলাদেশ’ নামে এক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পরবর্তী প্রায় এক দশক পর্যন্ত রংপুরে পূর্ববর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা বহাল থাকে ।

১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে কুড়িগ্রাম মহকুমাকে ভেঙ্গে লালমনিরহাট নামে আরও একটি মহকুমা গঠিত হয়। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের প্রতিটি মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হলে রংপুর সদর মহকুমা একটি পৃথক জেলা ‘রংপুর জেলা’ হিসেবে রূপলাভ করে। বর্তমান রংপুর জেলা ৮টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছে-রংপুর সদর, কাউনিয়া, পীরগাছা, গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে বর্তমান অবধি সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় প্রাচীন ‘রঙ্গপুর’ কখনও ছিল মহাভারত খ্যাত নরক-ভগদত্তের ‘কামরূপ-প্রাগজ্যোতিষ’ সাম্রাজ্যের অংশ, মধ্যযুগের অধিকাংশ কেটেছে কামরূপের হিন্দু শাসক আর মুসলিম অভিযানকারীদের রণ-দামামার শব্দে। পরবর্তীতে মোগল, ইংরেজ, পাকিস্তানী শাসনামল পাড়ি দিয়ে ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেদিয়ে বাংলাদেশ স্ব-শাসিত স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রে রূপলাভ করে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ফলে বৃহত্তর রংপুর ৫টি জেলায় বিভক্ত হয়। বর্তমান রংপুর জেলা অতীতের বৃহত্তর ‘রঙ্গপুর-এর একটি খণ্ডিত অংশমাত্র। তবে রংপুর অঞ্চলের লোকসংস্কৃতিকে এই প্রশাসনিক সীমারেখা দ্বারা আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। বর্তমান রংপুর জেলায় প্রচলিত লোকসংস্কৃতির অনেক উপাদানই এই সীমারেখার গণ্ডিপেরিয়ে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল জুড়ে পরিব্যাপ্ত রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *