কয়েক শতাব্দীর সবচেয়ে সাহসীপুরুষ শেখ মুজিব। ৭ই মার্চে বিশ্বে তা-ই প্রমাণিত হয়েছে।

কয়েক শতাব্দীর সবচেয়ে সাহসীপুরুষ শেখ মুজিব। ৭ই মার্চে বিশ্বে তা-ই প্রমাণিত হয়েছে।
সাইয়িদ রফিকুল হক

পাকিস্তানীজালিমগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য-শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একজন মানুষ দৃঢ়চিত্তে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একমাত্র তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭১ সালে বীর-বাঙালি-জাতি ‘আমেরিকা-ইংল্যান্ড আর চীনে’র মদদপুষ্ট পাকিস্তানীহানাদারবাহিনীকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। তিনি বাঙালি-জাতির কাছে চিরদিন সাহসের এক মূর্তপ্রতীক। তাঁকে ঘিরেই ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালি-জাতি যে-স্বপ্ন দেখেছিলো তা একসময়ে বাস্তবে পরিণত হয়।

কয়েক শতাব্দীর সবচেয়ে সাহসীপুরুষ শেখ মুজিব। ৭ই মার্চে বিশ্বে তা-ই প্রমাণিত হয়েছে।
সাইয়িদ রফিকুল হক

পাকিস্তানীজালিমগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য-শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একজন মানুষ দৃঢ়চিত্তে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একমাত্র তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭১ সালে বীর-বাঙালি-জাতি ‘আমেরিকা-ইংল্যান্ড আর চীনে’র মদদপুষ্ট পাকিস্তানীহানাদারবাহিনীকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। তিনি বাঙালি-জাতির কাছে চিরদিন সাহসের এক মূর্তপ্রতীক। তাঁকে ঘিরেই ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত বাঙালি-জাতি যে-স্বপ্ন দেখেছিলো তা একসময়ে বাস্তবে পরিণত হয়।

এই বিশ্বের সর্বকালের কুখ্যাত জালিমগোষ্ঠী পশ্চিমপাকিস্তানীদের হাত থেকে পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে মুক্ত করার ও রক্তপাতহীন স্বাধীনতার জন্য ১৯৬৬ সালে লাহোরে বঙ্গবন্ধু তাঁর ঐতিহাসিক ‘৬-দফা’ পেশ করেন। এরপর থেকেই বঙ্গবন্ধু পশ্চিমপাকিস্তানীহায়েনাগোষ্ঠীর চক্ষুশূল আর সমগ্র বাঙালি-জাতির নয়নমণিতে পরিণত হন। আর তখন থেকেই বাংলাদেশের সম্পূর্ণ নেতৃত্ব চলে আসে বঙ্গবন্ধুর হাতে। এরপর তিনি ধাপে-ধাপে বাঙালি-জাতিকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত করতে থাকেন। তাঁর আন্তরিক দীক্ষায় বারুদের মতো জ্বলে ওঠে বীর-বাঙালি-জাতি।

ঐতিহাসিক সাতই মার্চ বাঙালির জীবনে একটি উজ্জ্বলতম দিন। এটি বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এইদিন বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রত্যক্ষ-ভাষণে সুকৌশলে পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাঘোষণা করেন। আর সেদিন আয়োজন ছিল আনুষ্ঠানিক। আর ছিল বিশ লক্ষাধিক মানুষের গণসমাবেশ। তবুও বিশ্বের অন্যতম সাহসীপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেন আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় সাতই মার্চ প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতাঘোষণা করলেন না, তা-ই আজ আমাদের জানতে হবে।

আমাদের বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন আপাদমস্তক নেতা। বিশ্বের প্রথম সারির হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন নেতার একজন আমাদের বঙ্গবন্ধু। আর বিশ্বের নিপীড়িতমানুষের নেতা হিসাবে মহান লেনিনের পরই তাঁর নাম উচ্চারণ করতে হবে। তাই, শোষিত-বঞ্চিত-মানুষের নেতা হিসাবে মার্টিন লুথার কিং কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার আগেই আমাদের বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হয়। তাইতো আমরা দেখতে পাই, বিশ্বে আজও শোষিত-বঞ্চিত-মানুষের মতবাদ: মাকর্সবাদ, লেনিনবাদ আর মুজিববাদ। শোষণমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন এঁরা।

বঙ্গবন্ধু সবসময় মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন বলেই সমগ্র জাতি তাঁরই নেতৃত্বে এই অমৃতের স্বাদগ্রহণ করতে পেরেছে।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু কেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতাঘোষণা করেননি, তা-ই নিয়ে সেকালের ও একালের অনেক মূর্খ এখনও তর্কে লিপ্ত হয়। আর মূর্খদের কথা হচ্ছে: “শেখ মুজিব যদি সাতই মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাঘোষণা করতো, তাহলে, আমরা আরও আগে ও এতো রক্তক্ষয় ব্যতিরেকে স্বাধীনতালাভ করতে পারতাম!” এরা রাজনীতিমূর্খ। এদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার বড়ই অভাব। এরা সমাজের আত্মস্বীকৃত-আঁতেল। এদের মুরুব্বি চীন। আর এরা এদের সীমাবদ্ধ ধারণার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ বিজ্ঞ-সুধীজনকে ঘায়েল করতে চায়। এবার দেখা যাক, আমাদের বঙ্গবন্ধু সকল আয়োজনসত্ত্বেও কেন ১৯৭১ সালের সাতই মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি:

পাকিস্তানীসামরিকজান্তারা ছিল ‘আমেরিকা-ইংল্যান্ড-চীনে’র মদদপুষ্ট। তাই, এরা কোনো আইনকানুনের তোয়াক্কা করতো না। এরা, যার যা খুশি তা-ই করতো। সেই সময় পাকিস্তান নামক শয়তানরাষ্ট্রটি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আমেরিকাকে ‘বাপ’ ডেকে বাঙালি-জাতির বিরুদ্ধে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা নির্মম ও যারপরনাই দমননীতি চালাচ্ছিলো। তারা রাজনৈতিকভাবে আমাদের ‘বঙ্গবন্ধু’র সঙ্গে কোনোভাবেই পেরে উঠতে না পেরে নানারকম ‘শয়তানী ও সন্ত্রাসে’র আশ্রয়গ্রহণ করছিলো। তারা আমাদের স্বপ্নের ‘৬-দফা’কে মানেনি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আমরা জয়লাভ করার পরও আমাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করেনি। তারা আমাদের কূটকৌশলে চিরদিনের জন্য সামরিক-কায়দায় দমন করে রাখতে চেয়েছিলো। আর প্রয়োজনে তারা শয়তানরাষ্ট্র আমেরিকার ‘ভিয়েতনাম-যুদ্ধে’র মতো আমাদের বিরুদ্ধে আক্রোশ ও আগ্রাসন চালাতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমাদের প্রজ্ঞাবান-নেতা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানীপপিষ্ঠদের সেই সুযোগ দেননি। সাতই মার্চ বঙ্গবন্ধু ইচ্ছাকৃতভাবে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন না। কারণ, ওইদিন বাঙালি ‘স্বাধীনতাঘোষণা’ করলে পাকিস্তানীশয়তানগোষ্ঠী বিশ্বের বুকে আমাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসাবে চিহ্নিত করার একটা অপচেষ্টা চালাতো। আর তাদের এই শয়তানী-কাজে সর্বপ্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করতো তাদের আজন্ম-আমৃত্যু-বাপ: আমেরিকা, ইংল্যান্ড ও চীন। বঙ্গবন্ধু দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়ে একজন ‘প্রজ্ঞাবান-নেতা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সেদিন সমগ্র জাতিকে পাকিস্তানীশয়তানগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও বিশ্বের বুকে আমাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসাবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা থেকে রক্ষা করেছেন। এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। তিনি গণমানুষের একমাত্র নেতা। তিনিই জানেন, কখন-কোন কাজটি করলে তাঁর জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। আর তাই, কৌশলগত-কারণে তিনি সেদিন পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাঘোষণা করে জাতিকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে দীক্ষিত করার পাশাপাশি তাদের লড়াইসংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাকে অর্জন করার এক ঐতিহাসিক দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই সাতই মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপটেই বাঙালি-জাতি ১৯৭১ সালে ‘গেরিলাযুদ্ধে’র প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

আমাদের বঙ্গবন্ধু বিশ্বের সবচেয়ে সাহসীপুরুষ:
সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধু যেন ভালোভাবে ভাষণ দিতে না পারেন, তজ্জন্য পাকিস্তানীহানাদারবাহিনী আমাদের বঙ্গবন্ধুর ভাষণদানকালে তাঁর মাথার উপরে অনবরত কয়েকটি সামরিক হেলিকপ্টার দিয়ে টহল প্রদান করছিলো। ওরা মনে করেছিলো: এতে আমাদের বঙ্গবন্ধু ঘাবড়ে যাবে। কিন্তু আমাদের বঙ্গবন্ধু একসেকেন্ডের জন্যও সামান্য ভয় পাননি। বরং তিনি একজন সত্যিকারের সিংহপুরুষ হয়ে গর্জে ওঠেন পাগলা-কুকুরদের বিরুদ্ধে। আর তাই, আমাদের বঙ্গবন্ধু অকুতোভয়চিত্তে ঘোষণা করেন:

“আমি প্রধানমন্ত্রীত্বও চাই না। দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এ বাংলাদেশে কোর্ট-কাছারি, আদালত, ফৌজদারি-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেজন্য যে সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে, সে-গুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিক্সা, গোরুর গাড়ি, রেল চলবে। শুধু সেক্রেটারিয়েট ও সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জর্জকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দফতর, ওয়াপদা কোনোকিছুই চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেওয়া না হয়, এরপর যদি একটি গুলিও চলে, এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয়—তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে-ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা-কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা-যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো। আমরা পানিতে মারবো।”

বাঙালির মনের কথা এভাবেই প্রকাশ করলেন আমাদের বঙ্গবন্ধু।

তারপর তিনি সিংহনাদে-জলদগম্ভীরস্বরে বলে দিলেন:
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি-জাতি এক অসম্ভবকে সম্ভব করার দুরন্তসংগ্রামে লিপ্ত হয়। এরফলে জাতির জীবনে যুক্ত হয় সাহসের নতুন মাত্রা। পিতার নির্দেশে দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। তারা যার যা-কিছু আছে তা-ই নিয়ে পাকিস্তানীহায়েনাবধে নেমে পড়ে। বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই ভাষণটি বাঙালি-জাতির জীবনে চিরদিন শক্তি ও সাহসের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বিশ্বইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো: আমাদের বঙ্গবন্ধুর চেয়ে সাহসী কোনো পুরুষ নাই। একটি জাতির মুক্তির জন্য জীবনবাজি রেখে তিনি যারপরনাই সাহসীসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আর কিছুসংখ্যক রাজাকার ব্যতিরেকে তিনি সমগ্র জাতিকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে দাঁড় করেছিলেন। বাঙালি-জাতি ও বাংলাদেশরাষ্ট্রের জন্য জীবনবিসর্জন দিতে তিনি ছিলেন সদাপ্রস্তুত। তাইতো তিনি সাহসীকণ্ঠে বলেছিলেন:

“ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো: আমি বাঙ্গালী, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। জয় বাংলা।”

সাতই মার্চ বাঙালির অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের কাঙ্ক্ষিত-বিজয় অর্জিত হয়।
আজকের এই দিনে আমাদের জনকের প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *