চেকপয়েন্ট – পর্ব – ২ (প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্যা, আউয়ুব খানের উত্থান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং জেঃ ইসফাকুল মজীদ)

চেকপয়েন্ট – পর্ব – ১
৬ এপ্রিল, ১৯৪৮
লাহোর, পাকিস্তান


চেকপয়েন্ট – পর্ব – ১
৬ এপ্রিল, ১৯৪৮
লাহোর, পাকিস্তান

আজ চৌধুরী রহমত আলী তাঁর স্বপ্নের পাকিস্তানে এসেছেন। তার মস্তিস্ক প্রসুত পাকিস্তান নামেই এই মুসলমানদের এই রাস্ট্রের নাম হয়েছে এজন্য যদিও উনার গর্বে বুক ফুলে উঠবার কথা, কিন্তু উনি ভীষন বিষন্ন হয়ে আছেন। তিনি এই ক্ষুদ্র পাকিস্তান চাননি। তিনি চেয়েছিলেন দ্বীনিয়া নামের ভারতীয় উপমহাদেশ আর মুসলমানদের জন্য শক্তিশালী এক পাকিস্তান। কিন্তু নেতাদের দূর্বলতার জন্য আর হয়নি। লাখ লোক শহীদ হয়েও যদি তার স্বপ্নের সেই পাকিস্তান হত তবে খুশী হওয়া যেত। পাঞ্জাবকে ভাগ করা হয়েছে, তবে তাঁর নিজের গ্রামটাও পড়েছে ভারতের মধ্যে। তিনি সব ছেড়ে লাহোর চলে এসেছেন। নিজের গ্রামটা আর আসেপাশের মানুষগুলোর জন্য কেন যেন তাঁর ভীষন খারাপ লাগছে। এমনকি সন্ধ্যায় শাঁখ বাজনোর আওয়াজ না শুনে হয়তো উনার মনে হচ্ছিলো কি যেন হারিয়ে গেছে তাঁর জীবন থেকে।

তাঁর মন খারাপ হয়ে আছে, ভীষন খারাপ!!

১০ অক্টোবর, ১৯৪৮
করাচী, পাকিস্তান

চৌধুরী রহমত আলীর আজ লিয়াকত আলী খানের সাথে প্রচন্ড কথাকাটাকাটি হয়েছে। ভীরুতার জন্য রহমত আলী লিয়াকত আলী খানকে গালাগালি করেছেন। বলেছেন যে দরকার হলে তিনি পাকিস্তানের মানুষকে সাথে নিয়ে যুদ্ধে নামবেন। লাখ লাখ মুসলমান দরকার হলে শহীদ হবে, তবু পাকিস্তান হতে হবে পাকিস্তানের মত। কোন মুসলমান ভাই যেন ভারতে অরক্ষিত না থাকে। ভারতের ভেতর দক্ষিনাঞ্চলের মুসলমানদের জন্য উস্মানিয়া আর আরও এমন নামের আরো রাস্ট্র গড়তেই হবে। উনি লিয়াকত আলী খানকে হুমকী দিয়ে আসলেন উনারা কিছু না করলে উনি একাই আবার লড়াই শুরু করবেন।

১৮ অক্টোবর, ১৯৪৮
করাচী, পাকিস্তান

রহমত আলীর সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাঁকে দেশ ছাড়বার আদেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী। দুই দিন পর তাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, যে দেশের নামটা পর্যন্ত তাঁর দেয়া!

১৭ জানুয়ারী, ১৯৫১
রাওয়ালপিন্ডি, পশ্চিম পাকিস্তান

লেঃ জেনারেল আইয়ুব খান আজ সেনাপ্রধানের দ্বায়িত্বভার গ্রহন করেছেন। অল্পকিছুদিন আগেই বেশ কয়েকজনকে টপকে উনার নিয়োগে সম্মতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান। এর পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন সামরিক সচিব ইস্কান্দার মির্জা।

যদিও আইয়ুব খানের সিনিয়র আরো চারজন ছিলেন। তারা হলেন মেজর জেনারেল ইফিতিখার খান, মেজর জেনারেল ইসফাকুল মজিদ , মেজর জেনারেল আকবর খান এবং মেজর জেনারেল এনএএম রাজা। মেজর জেনারেল ইফতিখার ছিলেন সিনিয়রমোস্ট সেনা কর্মকর্তা এবং উনাকেই লেঃ জেঃ পদে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান পদে মনোনীত করা হয়েছিলো। এরপর কোন এক অজানা কারনে যুক্তরাজ্য যাবার পথে তার বিমানটি দুর্ঘটনায় পতিত হলে তিনি মারা যান। কেন জানি এরপরে আরো অনেকবার আইয়ুব খানের অনেক প্রতিপক্ষই অজানা কারনে মারা যাবেন। প্রতিপক্ষের অকস্মাৎ মৃত্যুর ক্ষেত্রে আইয়ুব খান খুবই ভাগ্যবান ছিলেন।

বাকী তিনজনের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র হচ্ছেন জিওসি (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং নবম পদাতিক ডিভিশন) মেজর জেনারেল ইসফাকুল মজিদ, উনি আইয়ুব খানের চেয়ে দুই বছরের সিনিয়র। জেঃ মজিদ একজন বাঙ্গালী। তবে তাকে পাশ কাটাতে আইয়ুব খানকে সাহায্য করেছেন ডিফেন্স সেক্রেটারী জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা, উনিও আরেক বাঙ্গালী। প্রধানমন্ত্রীর সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শের সময় তিনি লিয়াকত আলী খানকে বলেছিলেন ইসফাকুল মজিদের প্রধান অযোগ্যতা হচ্ছে সে একজন বাঙ্গালী। ভারতের প্রতি উনার সহমর্মিতা থাকতে পারে। ভারতের বিপক্ষে যেকোন কঠিন সিদ্ধান্তে নিশ্চিতভাবেই বাঁধা হয়ে দাড়াবেন উনি তার বাঙ্গালী মানসিকতার কারনে। ইস্কান্দার মির্জা নিজেও যে একজন বাঙ্গালী ছিলেন সেটা উনি দীর্ঘ্যদিনের ব্রিটিশ তাবেদারীর কারনে ভুলেই গিয়েছিলেন হয়তো।

পরবর্তীতে জেঃ ইসফাকুল মজিদকে রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলার আসামী করা হয়। জেঃ মজিদ সহ আরো অনেক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করা এই মামলায় আইনজীবি হিসেবে লড়বেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। পরে জেঃ মজিদ নির্দোষ প্রমানিত হলে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে যাবেন এবং পুর্ব পাকিস্তানে চলে আসবেন।

পাকিস্তানের প্রথম সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল স্যার ফ্যাঙ্ক ওয়াল্টার মিসার্ভী। উনি ১৫ আগস্ট থেকে ১০ই ফেব্রুয়ারী ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত দ্বায়িত্বে ছিলেন। অবসরের আগে উনাকে সম্মানসুচক জেনারেলের পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। উনি পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর অনেক নির্দেশ সরাসরি অগ্রাহ্য করেন। যেমন, কাশ্মীর যুদ্ধের সময় কাশ্মীরে সেনা পাঠাতে তিনি অস্বীকার করেন। এমন কিছু কারনে জিন্নাহ তাকে বরখাস্ত করেন।

এরপর দ্বায়িত্ব নেন জেনারেল স্যার ডগলাস ডেভিড গ্রেসী। উনিও ব্রিটিশ ছিলেন এবং যথারীতি কাশ্মীরে সেনা প্রেরনের ব্যাপারে জিন্নাহর আদেশ অমান্য করে। অবাধ্যতার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি জিন্নাহকে সাফ জানিয়ে দেন যে গভর্নর হিসেবে জিন্নাহও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা, এর বাইরে কিছু নয়। তিনি কেবল নিজের সিদ্ধান্ত তখনই বদলাবেন যখন সাম্রাজ্যের প্রধানের নিকট থেকে আদেশ পাবেন, জিন্নাহর নয়। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জিন্নাহর নির্দেশে তাকেও সরিয়ে প্রথম স্থানীয় সেনাপ্রধান হিসেবে আইয়ুব খানকে নিয়োগ দেন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী, যদিও এই পদের সবচেয়ে যোগ্য দাবীদার ছিলেন বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা জেঃ ইসফাকুল মজিদ।

২০ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫১
ক্যাম্ব্রিজ, যুক্তরাজ্য

একটা লাশ পরে আছে সারাদিন ধরে। কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা দাফন করবার জন্য, পুলিশ পরেছে ঝামেলায়। মুসলমানের লাশ, তাদের ধর্মমতে দাফন করতে হবে। সেজন্য খবর পাঠানো হয়েছে একজনের কাছে, উনি কেবল এসে পৌছেছেন। তিনিও খৃস্টান, তবে চেনা কিছু মুসলমান লোক ডেকে সব ব্যাবস্থা করে নিলেন তিনি। চৌধুরী রহমত আলীকে দাফন করা হল ইংল্যান্ডে। তাঁর জন্মস্তান বালাচুর গ্রাম অথবা তাঁর স্বপ্নের ভূমি পাকিস্তানের মাটি তাঁর শরীর আর কখনো স্পর্শ করতে পারবেনা।

উনি মারা যাবার আগেও বুঝতে পারেননি একটা দেশের নাম সৃস্টি করা আর একটা সফল রাস্টের জন্ম দেয়া দু’টা ভিন্ন ব্যাপার।

জুলাই মাস, ১৯৫১ সাল
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বৈঠক চলছে। গত বছরই অনারারী একটিভ ডিউটি মেজর জেনারেলের পদে নিয়োগ দিয়ে মিলিটারী পুলিশের জিওসি হিসেবে দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

জেঃ মির্জা প্রধানমন্ত্রীকে পুর্ব বঙ্গে মিলিটারী পুলিশ নিয়োজিত করবার পরামর্শ দিলেন। উনার অভিমত হচ্ছে ভাষার জন্য আন্দোলন ভারতের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই এর সঠিক সমাধান সম্ভব। বংশানুক্রিমকভাবেই উনি ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসী।

কিছুদিনের মধ্যেই বেসামরিক প্রশাসনের থেকে শৃংখলা রক্ষায় দ্বায়িত্ব গ্রহন করলো মিলিটারী পুলিশের ইউনিটগুলো। এরপরের কাহিনী নতুন করে বলার কিছু নেই। ৫২ পরবর্তী ইতিহাস আমরা সবাই কমবেশী জানি। তবে জেঃ মির্জা নিজেকে একজন প্রকৃত পাকিস্তানপ্রেমী হিসেবে প্রমান দিতে পারলেন।

২২ শে মে, ১৯৫৪
ঢাকা, পুর্ব পাকিস্তান

কিছুক্ষন আগেই পুর্ব পাকিস্তানের নতুন গভর্নর জেঃ ইস্কান্দার মির্জা বিমানবন্দরে অবতরন করেছেন। বিমান থেকে নেমেই উপস্থিত সাংবাদিক এবং জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি পরিস্কার বাংলায় বললেন,

– “পাকিস্তান বিরোধী কোন রকমের কাজ কঠোর হাতে দমনে আমি একবিন্দু সময় নেবনা। এই প্রদেশের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যদি শক্তি প্রয়োগের দরকার হয়, তবে কোন ধরনের দ্বিধা ছাড়াই আমি তা করবো।“

এরপর দিনই তার প্রথম কর্মদিবসে তিনি প্রায় চারশত নেতাকর্মীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন, যার মধ্যে একজন হচ্ছেন শেখ মুজিবর রহমান। পশ্চিম থেকে ঢাকায় আসবার আগেই মিলিটারী পুলিশের সুত্রে তিনি এদের নামের তালিকা তৈরী করে রেখেছিলেন।

আগস্ট, ১৯৫৪ সাল
কাকুল মিলিটারী একাডেমী
এবোটাবাদ, পশ্চিম পাকিস্তান

কিছুদিন আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে পুর্ব পাকিস্তানে। যুক্তফ্রন্টের কাছে ভরাডুবি ঘটেছে পরাক্রমশালী মুসলীম লীগের। এ খবএ জেনে আনন্দিত পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীর বাঙ্গালী জেন্টলমেন্ট ক্যাডেটরাও (জিসি)। এদের মধ্যেই একজন সেকেন্ড টার্মের জিসি জিয়াউর রহমান। একাডেমী ক্যান্টিনে আনন্দ করছিলেন বাঙ্গালী ক্যাডেটরা। এ উৎসব সহ্য হলোনা কিছু পশ্চিমা ক্যাডেটের। তারা বাঙ্গালীদের যা ইচ্ছা বলে গালিগালাজ শুরু করলো। বললো যে বাঙ্গালীমাত্রই কাপুরুষ, বিশ্বাসঘাতক।

কথাকাটাকাটিতে এই ঝামেলার সমাধান হলোনা। বাঙ্গালীদের কাপুরুষ বলার কারনে জিসি জিয়া বললেন,

– “ঠিক আছে, কারা বীর আর কারা কাপুরুষ সেটা লড়াইয়ের মাধ্যমেই জানা যাবে। কারো সাহস থাকলে আমার সাথে বক্সিং রিং এ লড়তে পারো।“

এই কথা শুনে এগিয়ে এলো এক পাকিস্তানী ক্যাডেট জিসি লতিফ। বাঙ্গালী জিসি জিয়াকে একহাত দেখে নেবার এই সুযোগ সে আনন্দের সাথে লুফে নিলো। সে তেজ দেখিয়ে বললো,

– “এসো, তোমাকে এবার এমন শিক্ষা দেব যে সারা জীবন পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে আর কিছু বলার সাহস পাবেনা।“

এই মুষ্টিযুদ্ধ দেখতে জমা হলো অনেক দর্শক, তুমুল করতালির মাঝে শুরু হলো মুষ্টিযুদ্ধ। পুর্ব পাকিস্তান অথবা বাংলার সাথে পাকিস্তানের। অনেক হম্বিতম্বি আর গালাগালি করা হলো মুষ্টিযুদ্ধ শুরু হবার আগে। কিন্তু আসল লড়াই স্থায়ী হলোনা ত্রিশ সেকেন্ডও। বাঙ্গালী হাতের পাঞ্চে পাকিস্তানপন্থী লতিফ ধুলায় লুটিয়ে পড়লো, আর উঠে দাড়াবার শক্তি কিংবা সাহস হলোনা তার। নীচ থেকেই সে আবেদন জানালো,

– “সব বিতর্কের মিমাংসা আলোচনার মাধ্যমেও হতে পারে!”

তবে জিসি জিয়া হয়তো সেদিনই বুঝে গেলেন শক্তির জবাব শক্তি দিয়েও দিতে জানতে হয়।

৭ই আগস্ট, ১৯৫৫
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

আজ থেকে অস্থায়ী গভর্নর হিসেবে শপথ নিয়েছেন জেঃ ইস্কান্দার মির্জা। অসুস্থ্যতার কারনে গভর্নর জেনারেল গুলাম মুহাম্মাদ আলি যুক্তরাজ্যে মাসখানেকের ছুটিতে গেছেন গতকাল। দ্বায়িত্বভার নেবার পরপরই তিনি তিনি রাস্ট্রীয় বেতার ঘোষনা করলেন রাজনৈতিক অস্থিরতা তিনি শক্তি দিয়ে হলেও দমন করবেন। সেদিনই তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য করলেন প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মাদ আলী বোগড়াকে।

কোন এক অজানা কারনে বাঙ্গালীদের উচ্চপদে দেখতে পারেননা তিনি!

মুহাম্মাদ আলী বোগড়া এর আগেও জিন্নাহর বিরাগভাগন হয়েছিলেন উর্দুকে রাস্ট্রভাষা করবার ব্যাপারে তাকে বারন করবার কারনে। তিনি এ ব্যাপারে খাজা নাজিমুদ্দিনকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। জিন্নাহ এ ব্যাপারে জানতে পেরে তাকে সরিয়ে দেবার জন্য কুটনৈতিক হিসেবে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাকে আবার দেশে ফিরিয়ে এনে প্রধানমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব দেয়া হয়। এর আগে তিনি ছিলেন পাকিস্তান গনপরিষদের নির্বাচিত সদস্য। এমন হাজারো সরিয়ে দেবার ঘটনা পাকিস্তানের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।

২৩ মার্চ, ১৯৫৬
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

নয় বছরের প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে পাকিস্তানের নতুন সংবিধান কার্যকর হয়েছে আজ থেকে। আজ থেকে পাকিস্তান আর ডোমিনিয়ন অফ পাকিস্তান বা পাকিস্তান অধিরাজ্য নয়। আজ থেকে ‘ডোমিনিয়ন অফ পাকিস্তান’ হলো ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান’ বা ‘পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র’।

এই সংবিধান গৃহিত হয়েছিলো ২৯ শে ফেব্রুয়ারী, আজ থেকে তা কার্যকর হলো। এই সংবিধানের মাধ্যমে ‘পুর্ব বাংলার’ নতুন নাম হলো ‘পুর্ব পাকিস্তান’। সেই সাথে গভর্নর জেনারেলের পদকে প্রেসিডেন্টের পদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হলো। আর একই মাধ্যমে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জেঃ ইস্কান্দার মির্জা হয়ে গেলেন পাকিস্তানের প্রথম অনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা উনার প্রভাবের কারনেই তাকে পছন্দ করতে বাধ্য হলো। অনেকটা আগের পদাধিকার বলেই উনি পেয়ে গেলেন এই ক্ষমতা।

১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

আজ পাকিস্তানের ইতিহাসের একটা অন্যরকম দিন। পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট বাঙ্গালী নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আজকে শপথ নিচ্ছেন পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। প্রেসিডেন্ট গতকাল তাঁকে এ ব্যাপারে সম্মতিপত্র পাঠিয়েছিলেন। পাকিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথম দুইজন বাঙ্গালী প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। যদিও সোহরাওয়ার্দীকে ইস্কান্দার মির্জার পছন্দ নয়, কারন বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী হিসেবে উনার বেশ ভালো সুনাম আছে। তবুও এছাড়া আপাতত তার কোন উপায় নেই। সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে, এবং তার ফলস্বরুপ সোহরাওয়ার্দীকে প্রধানমন্ত্রী করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা তার পাকিস্তানী পরিচয়েই বিশেষভাবে গর্বিত। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর থাকাকালীন সময়ে তিনি তার পাকিস্তান প্রীতির প্রমান দিয়েই আজকে এ পর্য্যায়ে আসতে পেরেছেন। খুব চমৎকার উর্দু বলেন তিনি, যদিও তার মাতৃভাষা বাংলা। আর উর্দুকে একমাত্র রাস্ট্রভাষা করবার প্রতিবাদে যে আন্দোলন চলছিলো তার গভর্নর হবার পর সে আন্দোলন এবং অসন্তোষকে তিনি বেশ ভালোভাবেই চাপা দিয়ে রেখেছিলেন আরো কিছুদিন। গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রাদেশিক পরিষদের অনেক সদস্য সহ প্রায় হাজারখানেক নেতাকে। তার আরেকটা পরিচয় আছে যেটা এতক্ষন পর্যন্ত বলা হয়নি। উনি বাংলার বিশিষ্ট বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের সরাসরি বংশধর। তার বাবার দাদা ছিলেন মীর জাফর আলী খান বাহাদুর, বাংলার প্রথম ইংরেজ আজ্ঞাবহ পরাধীন নবাব!

১০ অক্টোবর, ১৯৫৭
প্রেসিডেন্টের কার্য্যালয়
পশ্চিম পাকিস্তান

আজ পাকিস্তানের ইতিহাসের আরেকটা সন্ধিক্ষন। প্রেসিডেন্টের অফিসে ডেকে পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। উপস্থিত আছেন সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানও, যাকে সহ নৌ এবং বিমান বাহিনীর প্রধানদের চাকুরীর মেয়াদ তিনি বিশেষ ক্ষমতাবলে আরো চার বছর বৃদ্ধি করেছেন। এর ফলে আইয়ুব খানের চাকুরীর মেয়াদ ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, নাহলে তিনি ১৯৫৭ সালেই অবসরে চলে যেতেন। কিছুদিন আগে করাচীর ব্যবসায়ী নেতারা এসে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে অনুরোধ করে গেছেন প্রধানমন্ত্রীকে অপসারনের জন্য। সারা দেশের এক ইউনিট নীতি, নানা ক্ষেত্রের জাতীয়করন এবং সর্বশেষে শিপিং লাইনও জাতীয়করনের পদক্ষেপ নেবার পর তাদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়েছিলো। জনগনের উপকার হলেও ব্যবসায়ীদের এতে ভীষন অসুবিধা হচ্ছিলো। সেনাপ্রধান আইয়ুব খানের উপস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট মির্জা তাঁকে বললেন,

– “দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা এবং আমলারা চাইছেন আপনি পদত্যাগ করুন, আপনার সরকারের নেয়া নানা পদক্ষেপ দেশের জন্য আত্মঘাতী হচ্ছে।“

সোহরাওয়ার্দী জবাব দিলেন,

– “আমি পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমাকে সরাবার দরকার হলে পার্লামেন্টের সভা ডাকুন। সেখানে অনাস্থা ভোটে আমি পরাজিত হলে আমি পদত্যাগ করবো। এভাবে পদত্যাগ করতে বলবার অধিকার আপনার নেই।“

প্রেসিডেন্ট জবাব দিলেন,

– “আমাকে গনতন্ত্র শেখাবেন না। এ দেশের বেশিরভাগ মানুষই অশিক্ষিত। এরা না বুঝেই ভোট দেয়। এদের জন্য গনতন্ত্রের দরকার নেই। আমি চাই আপনি পদত্যাগ করুন, নাহলে আপনাকে বরখাস্ত করা হবে। সেই ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার আছে।“

সোহরাওয়ার্দীর আর কিছুই করবার ছিলনা। উনি বললেন,

– “আমি পদত্যাগ করবো। তবে আপনি যে ধারার সুচনা করলেন, সেটার ফল একদিন না একদিন আপনিও ভোগ করবেন।“

এভাবেই অবসান ঘটলো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সরকারের। পাকিস্তানের ইতিহাসের নানা প্রশাসনিক সংস্কার, সামরিক বাহিনীকে ঢেলে সাজানো, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে পারদর্শিতা, পরমানু বিদ্যুৎ উতপাদনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহন সহ নানা যুগান্তকারী কার্যক্রমের সুচনা শুরু হয়েছিলো যার সময়ে এবং দিক নির্দেশনায়। উনি পরবর্তীতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে নিজ কক্ষে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরন করেন। বলা হয় যে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিলো বলেও অনেকে বলে থাকেন।

৭ অক্টোবর, ১৯৫৮
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা রেডিওতে ভাষন দিচ্ছেন আজ। উনি জাতিকে জানালেন নতুন সংবিধানের কথা, যে সংবিধান পাকিস্তানের ভবিষ্যত এবং প্রতিভাবানদের জন্য আরো উপযোগী হবে বলে তিনি জাতিকে জানাচ্ছেন। উনি বিশ্বাস করেন গনতন্ত্র পাকিস্তানের জন্য যুতসই কিছু নয়, যেহেতু পাকিস্তানের শিক্ষিত জনসংখ্যার হার শতকরা ১৫ ভাগও নয়। হয়তো এখান থেকেই আইয়ুব খান তার সীমিত পর্যায়ের লোক দেখানো মৌলিক গনতন্ত্রের ধারনা পাবেন। অথবা কে জানে হয়তো আইয়ুব খান আগেই তা ভেবে রেখেছিলেন আর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা তার কথা মতই সেটা বলছেন। তিনি ঘোষনা করলেন,

“Three weeks ago, I imposed martial law in Pakistan and appointed General Ayub Khan as Supreme Commander of the Armed Forces and also as Chief Martial Law Administrator…. By the grace o fGod… This measure which I had adopted in the interest of our beloved country has been extremely well received by our people and by our friends and well wishers abroad…

I have done best to administer in the difficult task of arresting further deterioration and bringing order out of chaos… In our efforts to evolve an effective structure for future administration of this country…

Pakistan Zindabad, Pakistan Zindabad! ”

আর এভাবেই পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মত সামরিক শাসন জারী করা হলো। জারী করলেন একজন বাঙ্গালী, পাকিস্তানের প্রথম বাঙ্গালী প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জা খান বাহাদুর। এই সামরিক শাসন ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হওয়া পর্যন্ত জারী থাকবে এবং এরপরেও এই সামরিক শাসনের ঘেরাটোপ থেকে পাকিস্তান নামক রাস্ট্রটি আর বের হতে পারবেনা।

প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাও এই সামরিক শাসনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভোগ করা শুরু করবেন আর অল্প কিছুদিন পর, আর মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই!

২৭ অক্টোবর, ১৯৫৮
করাচী, পশ্চিম পাকিস্তান

করাচী বিমানবন্দরে আজ একটু বেশিই নিরাপত্তা তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে। এর কারনটা এখনও সবাই জানেন না। পিআইএ’র লন্ডনগামী ফ্লাইটে আজ সম্ভবত বিশেষ কেউ ভ্রমন করতে যাচ্ছেন। কিছুক্ষনের মধ্যে যাত্রীদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেলো। বিমানের ভেতর উঠে এসেছেন স্বয়ং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, স্বস্ত্রীক!!

প্রেসিডেন্ট মির্জা চাইতেন সবকিছু নিজের নাগালের মধ্যে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে। তিনি তার ক্ষমতার কোন রদবদল চাননি। তবে তিনি ইতিমধ্যে একটা ভুল করে ফেলেছেন, বিশাল ভুল! তিনি আইয়ুব খানকে চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর নিয়োগ দিয়েছিলেন যার ফলে আইয়ুব খান বুঝে যান তিনি কতটা ক্ষমতাধর এবং নিজের অবস্থান আরো সুসংহত করতে চান। সকল রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা যে সামরিক বাহিনীর হাতেই তিনি তা ঠিক ঠিক বুঝে গেলেন। এর মধ্যে কিছুদিন আগেই প্রেসিডেন্ট মির্জা পাকিস্তান পাকিস্তানের ডন পত্রিকাকে বলেছিলেন,

“I didn’t mean to do it…. This (martial law) would be for the shortest possible period until the new elections!”

এক বনে যেমন দুই বাঘ থাকতে পারেনা এমন অবস্থার তৈরী হলো। এর মধ্যে আবারো ভুল করে বসলেন তিনি। আইয়ুব খানকে বেআইনীভাবে প্রধানমন্ত্রী পদে বসালেন। মন্ত্রী সভায় নিয়ে আসলেন অরাজনৈতিক এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকদের। এদেরই আরেকজন ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো নামের একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের তখন পর্যন্ত অখ্যাত ব্যারিষ্টার। আইয়ুব খানের এদেরকেও পছন্দ হলনা। শুরু হলো ঝামেলার।

এই সমস্যার সমাধানে আইয়ুব খানকে তিনি অল্প কিছুদিন পরেই সরাতে উঠে পরে লাগলেন। সামরিক বাহিনীতে আইয়ুব বিরোধী নানা জেনারেলদের সমর্থন লাভের আশায় তাদের সাথে তিনি যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু এটা তার শেষ ভুল ছিলো। সেই জেনারেলরাই আইয়ুব খানকে বলে দেয় প্রেসিডেন্টের অভিপ্রায়ের কথা। সিনিয়র জেনারেলদের সম্মতিক্রমে তিনি প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগে বাধ্য করেন এবং অনতিবিলম্বে তাঁকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠান। দেশে থাকলেই আবার শক্তি সঞ্চয় করে অন্য কিছুর আশংকা করছিলেন আইয়ুব খান। তার ফলাফলই আজকের এই সাধারন ফ্লাইটে পরাক্রমশালী প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার নির্বাসন গমন, যিনি তার দুই বছরের শাসনামলে চারজন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন।

এভাবেই আইয়ুব খান সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলেন। ইস্কান্দার মির্জা তার চাকরীর মেয়াদ বৃদ্ধি না করলে আইউব খান ১৯৫৭ সালেই অবসরে চলে যেতেন আর পাকিস্তানের ইতিহাসে আইয়ুব খানের আমল বলে কিছু লেখা থাকতো না। হয়তো লেখা হত না দীর্ঘ্যদিনের সামরিক শাসনের ইতিহাসও, কে বলতে পারে সে কথা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *