ধর্মের ব্যাবহার এবং ১৯৭১ঃ পাকি মন

-হাম কুত্তা নেহি হ্যায়, হাম মুসলমান হ্যায়।
– তোম যো মুসলমান হ্যায় উ তো ভোল গিয়া।

(রাইফেল রোটি আওরাত)

-হাম কুত্তা নেহি হ্যায়, হাম মুসলমান হ্যায়।
– তোম যো মুসলমান হ্যায় উ তো ভোল গিয়া।

(রাইফেল রোটি আওরাত)

গনহত্যা যেহেতু একটা Systemic Killing, তাই এটা কিছু ধাপে ধাপে সংঘটিত হয়ে থাকে। গবেষকরা এমন অনেকগুলো ধাপকে চিহ্নিত করেছেন, যেমনঃ 1.Classification, 2.Symbolization, 3. Dehumanization, 4. Organisation, 5.Polarization, 6.Preparation, 7. Extermination, 8.Denial। এই ধাপগুলোকে বিশ্লেষণ করে গত বছর গণহত্যাকে অস্বীকারঃ গণহত্যারই একটা অংশ শিরোনামে ব্লগে লিখেছিলাম।

এখানে Preparation কিংবা প্রস্ততিরই একটা অংশ হচ্ছে ‘Identification’। “Identification greatly speeds the slaughter”। ভিকটিমদের তালিকা তৈরী করা হয়, বাড়ি ঘর চিহ্নিত করা হয়, ম্যাপ তৈরী করা হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। রুয়ান্ডায় সবার পরিচয় পত্রের ব্যবস্থা করে হয়েছিল যেন সহজেই তুতসীদের চেনা যায়। এই আইডি কার্ড ছুড়ে ফেলে দিলেও কাজ হত না, ‘হুতু’ হিসবে নিজের পরিচয় প্রমান করতে না পারলে ‘তুতসী’ বলেই ধরে নেয়া হত। এই পরিচয়ের ক্ষেত্রে ২য় ধাপ (Symbolization) এর ভূমিকা ব্যাপক। পাকিস্তানিরা ছিল হিন্দু বিদ্বেষী, হিন্দুদের উপর তাই প্রকোপও পড়েছিল বেশী। তাই হিন্দু নারীরা তখন মাথার সিঁদুর মুছে ফেলত, পুরুষরা মাথায় টুপি পরত, ধুতির বদলে লুঙ্গি পরতো। পাকিরা “চার কলেমা”র মাধ্যমে হিন্দু মুসলিম যাচাই করতো; কেউ বলতে না পারলেই গুলি করে হত্যা করা হত। কখনো কখনো লুঙ্গি খুলে পরীক্ষা করতো হিন্দু না মুসলমান!

একাত্তরের পাকিস্তানিদের এই কাজকর্মের মর্মার্থ ভালো করে বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু নজর দিতে হবে পাকিস্তানিদের সে সময়কার মনমানসিকতার দিকে। পাকিস্তানি জেনারেলরা আর কিছু পারেন আর নাই পারেন উনারা এই দেশের মানুষের রক্তে দুই হাত রঞ্জিত করে নিজ দেশে গিয়ে অতঃপর হাতে কলম তুলে নিয়েছেন। সবাই বই লিখে নিজের সাফাই গাওয়া শুরু করেন। তাদের এসকল সাফাইগাথার মধ্যেও ফুটে উঠছিল তাদের মন মানসিকতার ধরন। গবেষক মুনতাসির মামুন পাকি জেনারেলদের বইগুলো পর্যালোচনা করে ‘পাকি জেনারেলদের মন’ এবং পাকিস্তানি বিভিন্ন পেশার মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে ‘পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর’ নামক দুটো গবেষণাধর্মী বই লিখেন। আমাদের এই পর্ব মূলত মুনতাসির মামুনের এই দুই বইয়ের ভিত্তি করেই লেখা।

পাকিস্তানিরা একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার যে সকল কারণ তাদের বইতে বলেছেন মোটাদাগে সেগুলো নিম্নরূপঃ

  • হিন্দু শিক্ষরা বাঙ্গালীদের মনোজগতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো।
  • ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে প্ররোচিত করেছে বিদ্রোহে এবং লড়াইটি ছিল ভারত ও পাকিস্তানের।
  • ১৯৭১ এর যুদ্ধটা ছিল গৃহযুদ্ধ। ভারতের অনুগত একটি দল আ’লীগের কারণেই হয়েছে।
  • পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্যে মূলত ভুট্টো মুজিব দায়ী, বিশেষ করে মুজিবের একঘেয়েমি।

প্রথম কারণটার দিকে নজর দিলে বোঝা যাবে পাকিস্তানিদের মনোজগতে আসলে কি কাজ করত। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, পাকিদের কাছে সমীকরণটা খুবই পরিষ্কার ছিল, পাকিস্তান = মুসলমান, ভারত = হিন্দু।

রাও ফরমান আলী ১৯৯২ সালে ‘How Pakistan got divided’ নামক বইটা লিখেন। এই বইটাতে তিনি শুধু ‘হিন্দুত্ব তত্ত্ব’ এনে হাজিরই করেন নি, বরং তাজউদ্দীনকে পর্যন্ত হিন্দুর ছেলে বানিয়ে দিয়েছেন। তার বই এর একজায়গায় তাজউদ্দীন সম্পর্কে বলেন,

Tajuddin , the diehard Pro – Indian Awami leaguer, came in and sat down. He hated West Pakistan and perhaps Pakistan itself. He was reputed to have a Hindu up to the age of 8. I do not think this story was correct but it revealed his mental make – up

“তাজউদ্দীন, গোঁড়া ভারতপন্থী আওয়ামী লীগার, ভেতরে এলেন এবং বসলেন। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানকে এবং সম্ভবত পাকিস্তানকেও ঘৃণা করতেন। তিনি আট বছর বয়স পর্যন্ত হিন্দু ছিলেন বলে একটা প্রচারণা ছিল। আমি গল্পটিকে সত্য মনে করি না। কিন্তু তাঁর মানসিক গঠনে এর যথেষ্ট প্রকাশ ঘটত”।

পাকিস্তানিরা বিশ্বাস করত, তাজউদ্দীন আহমদ কোন মুসলমান নয়, তিনি একজন ভারতীয় হিন্দু, আসল নাম তেজারাম। পাকিস্তানকে ভাঙ্গার জন্যেই তিনি পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন। এমনকি ১৯৭১ এ একজন পাকিস্তানি অফিসার তাজউদ্দীন আহমদের শশুরকে জিজ্ঞেস করেছিল, “ সৈয়দ সাহেব, আপনি ছিলেন আরবি প্রফেসর এবং ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধেও আপনার অগাধ জ্ঞান রয়েছে। অথচ আপনার মেয়ের কি না বিয়ে দিলেন এক হিন্দুর সঙ্গে”।

যুদ্ধ পরিবর্তী অবস্থাতেও পাকিস্তানিদের এই মনোভাবের পরিবর্তন ঘটে নি। যুদ্ধের আটাশ বছর পরে মুনতাসির মামুন ও মহিউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানে গিয়ে সাক্ষাৎগ্রহণ করেছিলেন রাও ফরমানের। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে রাও বলেছিলেন,
“ … আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝি ও বিশ্বাস করি যে, হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তানের মন মানসিকতাকে প্রভাবিত করেছে”

এবার দেখি আরেক পাকিস্তানির বই। ব্রিগেডিয়ার সাদুল্লা খানের ‘East Pakistan to Bangladesh’ নামের এই বইটা প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। তার মতে, এ দিককার শিক্ষাব্যাবস্থা ছিল হিন্দুদের নিয়ন্ত্রনে এবং তারাই পাকিস্তান বিরোধী প্রচারনা চালায়। তার বইয়ে তিনি একটা ঘটনার উল্লেখ করেন যা থেকে পরিষ্কার হয়ে যায় বাঙালী মুসলমান সম্পর্কে তাঁর মন মানসিকতা। ঘটনাটা এরকমঃ

“স্থানীয় হাই স্কুল পেরোবার সময় আমরা দেখলাম একটি শহীদ মিনার। ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকায় ২/৩ জন ছাত্র মারা যায়, ইতোমধ্যে সারা দেশের প্রতিটি স্কুলে ‘শহীদ মিনার’ গজিয়ে উঠেছে। মিনারের পাদদেশে আছে একটি কবর। সকালে মিনার প্রদক্ষিণ একটা রিচুয়াল। খালি পায়ে, হাতে ফুল নিয়ে প্রভাত ফেরীতে অংশ নিতে হয়। হিন্দুয়ানী না হলেও হিন্দু সংস্কৃতি তো বটেই”।

খেয়াল করুন, একদিকে যেমন মিথ্যের ফুলঝুরি [কবর] আছে অন্যদিকে এখানেও আছে সেই হিন্দুত্বের সন্ধান পাওয়ার গল্প।

জেনারেল গুলাম উমর ১৯৭১ এ ইয়াহিয়ার বেশ ঘনিষ্ট ছিলেন এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটির সচিব ছিলেন। মুনতাসির মামুনের সাথে সাক্ষাৎকারে তিনিও ঐ একই ধরণের কথা বলেছিলেন, হিন্দুরা দেশ ভাগের সময় খুব একটা যায়নি এবং তারাই প্রভাবিত করেছিল পূর্ব পাকিস্তানিদের।

এমন না যে, শুধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকদের মতামতই এরকম ছিল, বরং তাদের রাজনীতিবিদদের চিন্তাধারাও একই দিকে প্রবাহিত ছিল। এবার পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের একজন প্রাক্তন সদস্যের কথা শুনব; গফুর আহমদ, ১৯৭০ সালে তিনি জাতীয় পরিষদে নির্বাচিতও হয়েছিলেন।

“আমি যখন পূর্ব পাকিস্তানে যাই তখন আমাকে বলা হয় যে, ওখানকার গোটা জনসমষ্টির একটা বড় অংশ পাকিস্তান সৃষ্টির পর ভারতে চলে গেছে। তবে স্কুলের শিক্ষকরা যায় নি। ওরা এখনো রয়ে গেছে। আমাকে ঐ সময় আরো জানানো হয় যে, ঐসব হিন্দু শিক্ষক দেশের অখন্ডতার ধারণার বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রী ছেলেমেয়েদের মন বিষিয়ে তুলেছে। … … তারা এক পরিকল্পনার অংশ হিসাবে কাজ করছে একেবারে গোঁড়া থেকেই। তাদের বিশ্বাস ছিল পাকিস্তান টিকবে না। এটা অল্পদিনের মধ্যেই খতম হয়ে যাবে আর দেশটি আবার ভারতের অঙ্গ হবে”।

একটা প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন এই হিন্দুবিদ্বষী মনোভাব চতুর্দিকে প্রচারিত করা হল? কেনইবা পাকিস্তানি জেনারেলরা বারে বারে শুধু এই প্রসঙ্গটাই এনেছেন? এই প্রশ্নের সুন্দর একটা কারণ বর্ণনা করেছেন তাদেরই একজন, এয়ার মার্শাল (অবঃ) আসগর খান। তিনি রাজনীতিতেও বেশ সক্রিয় ছিলেন।

পূর্ব পাকিস্তানে অনেক হিন্দু ছিল এ কথা সত্যি। তাই সেখানে হিন্দু – মুসলিম পাশাপাশি বাস করবে – এও স্বাভাবিক। তবে আপনি এই যে প্রচারণার কথা বললেন, ওরা পূর্ব পাকিস্তানে যা করেছে তাঁর যৌক্তিকতা খাড়া করার জন্যই এটা করা হয়েছে। আমাদের এখানকার সমাজে হিন্দুর তেমন অস্তিত্ব নেই। কাজেই এ ধরনের প্রচারণা এখানে পাত্তা পেতে সক্ষম হয়। যে ব্যাবস্থা ওখানে নিয়া হচ্ছিল তাকে যৌক্তিতা দেবার জন্যই এ প্রচারণার অবতারণা।

পাকিস্তানিদের মনে এই হিন্দু বিদ্বেষী ভাবটা এত গভীরে চলে গিয়েছিল যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার অনেক পরেও তারা এই চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে পারে নি। আমি আগেই রাও ফরমানের সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করেছি।

পাকিস্তানি আরেক জেনারেল কামাল মতিনউদ্দিন ১৯৯২ সালে একবার ঢাকায় এসেছিলেন, তখন শবেবরাতের রাত ছিল। তিনি দেখলেন টিভিতে শবেবরাতের ফজিলত বর্ণনা করে হচ্ছে এবং পরে আজানও প্রচার করা হচ্ছে। এত বেশ অবাক হয়ে তিনি পরিচারককে জিজ্ঞেস করেন, প্রতিদিন কি নামাজের সময় এখানে আজান প্রচারিত হয়? সে পরিচারিকা তখন বেশ ক্ষুদ্ধ হয়েই উত্তর দিলেন, ‘ আব আপকো মালুম হুয়া কী হামভী মুসলমান হ্যায়, হামকো হিন্দু সমাজ কার মার দিয়া’। এই ঘটনার কথা তিনি নিজেই তাঁর বইয়ে উল্লেখ করে লিখেছিলেন,
“This remark coming spontaneously from a semi literate, lower middle class Bengali youth, twenty one years after the breakup, shook me”

পাকিদের উপরোক্ত কথা শুনে কিংব লেখা পড়ে মনে হওয়াটা স্বাভাবিক যে, পাকিস্তানি জেনারেলরা খুবই ইমানদার মানুষ ছিলেন। তারা সর্বদাই হিন্দুদের আগ্রাসন নিয়ে ভীত থাকতেন, ‘ইসলাম বিপন্ন’ বলে কাঁদতেন, হিন্দু শিক্ষকদেরকে অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা এবং এ কারণে বাংলার মুসলমানদের অধঃপতন দেখে তারা খুবই কষ্ট পেতেন। অবশ্য তাদের বইগুলো পড়লে আবার অন্যজিনিস চোখে পড়বে, তারা যখনই দু তিনজন মিলিত হচ্ছেন, একসাথে বসে মদ্যপান করছেন যদিও ইহা ইসলামে পুরোপুরি হারাম। সে যাই হোক, এবার একটু দেখি এই ইমানদার জেনারেলরা, যারা লেখার প্রতিটা লাইনে লাইনে ধর্মকে তুলে এনেছেন, ৭১ এ এই বাংলায় আসলে তারা কি করেছিলেন? আসুন কয়টা কেস স্টাডি দেখি …

“… চার সৈনিক হামলা করেছে এক বাসায়। বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কন্যাটি অল্প বয়সী, সে হাতজোড় করে তাদের জানাল যে, সে মুসলমান, তাকে যেন তারা বোনের মত দেখে। তারপরও যখন তারা এগিয়ে আসছে তখন সে বলল, আমিওতো পাকিস্তানি। তোমাদের কারও হয়ত আমার মত মেয়ে আছে। তাও তারা মানছে না।
তখন সে বিছানার পাশে কোরান শরীফ রেখে বলল। আমার যদি কিছু করতে চাও তাহলে এই কোরান ডিঙ্গিয়ে করতে হবে।
তারা কোরান ডিঙ্গিয়ে ছিল…”

উক্ত ঘটনাটা যিনি বলেছেন তিনি একজন পাকিস্তানি, সৈয়দ আলমদার রাজা। ১৯৭১ এর মে মাসে ঢাকার কমিশনার পদ লাভ করেন। খেয়াল করে দেখুন, পবিত্র কোরআন শরীফ ও কিন্তু তাদেরকে রুখতে পারে নি।

“One of the most horrible revelations concerns 563 young Bengali women, some of 18, who have been held captive inside Dacca’s dingy military cantonment since the first five days of the fighting, Seized from University and Private Homes and forced into military brooch, the girls are all three to five months pregnant.” – নিউইয়র্ক টাইম, ২৫ অক্টোবর ১৯৭১।

“আগুনে পোড়া গ্রামকে পেছনে ফেলে দুই কিশোরী মেয়ে নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালাচ্ছিলেন চন্দ্র মণ্ডল। কাদামাটির ভেতর দিয়ে। একটু পর সৈন্যদের হাতে ধরা পড়লেন। অসহায় চোখে তাকে দেখতে হলো তাঁর মেয়েদের ধর্ষনের দৃশ্য। বারবার, বারবার, বারবার”। – নিউজউইক, ২ আগস্ট, ১৯৭১।

“পাকিস্তান সেনাবাহিনি সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্রোহীদের খুজতে আসার ভান করে ডেমরা গ্রাম ঘেরাও করে। তারপর ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সী সকল নারীকে ধর্ষন করে এবং ১২ বছরের বেশি সকল পুরুষ্ কে হত্যা করে”। – নিউজ উইক, ১৫ নভেম্বর, ১৯৭১।

“ঘরে ঢুকে দেখি, এ ই দৃশ্য! ও আল্লাহ, এমন দৃশ্য দেখার আগে কেন আমার দুটি চোখ অন্ধ করলো না আল্লাহ। মেয়ের সামনে মাকে ধর্ষণ! কয়েকটি পাগলা কুত্তা আমার মাকে ও বড় বোনটিকে খাচ্ছে কামড়ে কামড়ে। … রাত ভোর হয় হয় – এমন সময় তারা চলে গেছে, মা ততক্ষনে মৃত। যাবার সময় সঙ্গে নিয়ে গেল আমার অর্ধমৃত রক্তাক্ত বোনটিকে”। – ৭১ এ সবাইকে হারানো কিশোর শফিকুরের আর্তি।

“Rape in Bangladesh had hardly been restricted to beauty. Girls of eight and grandmothers of seventy five had been sexually assaulted … … Some women may have been raped as many as eighty times in a night.”– সুসান ব্রাউনমিলার।

“যুদ্ধশেষে ক্যাম্পের একটি কক্ষ থেকে কয়েকটি কাঁচের জার উদ্ধার করা হয়; যার মধ্যে ফরমালিনে সংরক্ষিত ছিলো মেয়েদের শরীরের বিভিন্ন অংশ। অংশগুলি কাটা হয়েছিলো খুব নিখুঁতভাবে”। -খুলনার ডা. বিকাশ চক্রবর্তী।

সারাদিন ধর্মের গান শোনানো পাকিস্তানিরা আসলে যা করেছিল তা সংক্ষেপে নিম্নরূপঃ
ক)৩০ লক্ষ বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়েছিল।
খ)চার – ছয় লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল।
গ)ঢাকায় পুনর্বাসন কেন্দ্রের একজন ডাক্তার জানান যে, ১৯৭২ সালের প্রথম তিন মাসের মধ্যে ১লক্ষ ৭০ হাজার গর্ভবতী নারীকে এবরশন করানো হয় এবং ৩০ হাজার যুদ্ধ শিশু জন্ম গ্রহন করেছিল।
ঘ)এককোটি লোক চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল শরণার্থী শিবিরে।

এমনকি, সাতক্ষীরায় মসজিদের ভিতরেও বেশ কিছু নারী দেহ উদ্ধার করা হয়।

উপরের ঘটনাগুলো আপনার কাছে খারাপ কাজ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা এবং শাসকেরা কিন্তু এটাকে মোটেও খারাপ কাজ বলে মনে করেন নি। তাদের এ কাজের পিছনে আবারো তারা হাজির করেন ধর্মকে, তাদের সেই “ইসলামী – পাকিস্তানি” আদর্শ তত্ত্বকে। তারা এ কাজটা করেছিলেন শুধুমাত্র হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত বাঙ্গালীদেরকে মানুষ করার জন্যে, তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাচ্চা মুসলমান ও সাচ্চা পাকিস্তানি বানানোর জন্যে।

অস্ট্রেলিয়ার এক মেডিক্যাল গ্র্যাজুয়েট, ড জেফ্রি ডেভিস ১৯৭২ সালের মার্চ থেকে প্রায় ছয় মাস বাংলাদেশে কাজ করেছেন। বিনা ডি কস্তা যুদ্ধের ৩২ বছর পর তার সাক্ষাৎকার গ্রহন করেছিলেন। ডেভিসের সে সাক্ষাৎকারে ফুটে উঠেছিল সে সময়ের নারী –নির্যাতনের যাবতীয় দিকগুলো; তিনি নারীদের এবরশন, যুদ্ধ শিশু, নারীদের তখনকার অবস্থা – সবকিছু নিয়েই কথা বলেন। সেখান থেকে প্রাসঙ্গিক দুটো লাইন তুলে দিলাম।

B: How did they justify raping the women?
GD: They had orders of a kind or instruction from Tikka Khan to the effect that a good Muslim will fight anybody except his father. So what they had to do was to impregnate as many Bengali women as they could. That was the theory behind it.

B: Why did they have to impregnate the women? Did they tell you?
GD: Yes, so there would be a whole generation of children in East Pakistan that would be born with the blood from the West. That’s what they said.

তার মানে তাদের ওপর সরাসরি আদেশ ছিল বাংলার নারীদেরকে ধর্ষন এবং গর্ভবতী করা যেন তারা সাঁচ্চা মুসলমান ও পাকিস্তানি বাচ্চা জন্ম দিতে পারে।

২৫ শে মার্চ অপারেশন সার্চ লাইট কার্যকর কারী মেজর জেনারেল খাদিম হুসাইন রাজা ২০১২ সালে “A stranger in my own country” নামে এক গ্রন্থে সে সময়ের দুটো ঘটনা উল্লেখ করেছেনঃ
১০ এপ্রিল এক সভায় জেনারেল নিয়াজি বাঙ্গালীদের নিয়ে বলতে গিয়ে বলেনঃ ‘ম্যায় ইস হারামজাদি কওম কী নাসাল বদল দুন গা। ইয়ে মুঝে কীয়া সামঝতি হ্যায়’।

পরের দিন খাদিম ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে যখন ব্রিফ করতে যান নিয়াজির কাছে তখন নিয়াজি বলেনঃ “দোস্ত, যুদ্ধ নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না…এখন বরং তোমার বাঙ্গালী বান্ধবীদের ফোন নাম্বার গুলি আমাকে দাও”। খাদিম নিজেই অবাক হয়ে লিখেনঃ “For a person of my disposition, these remarks were a thunderbolt. I could not imagine that any same Pakistani could think in such terms in the midst of civil war inflicted on the nations by its recent rulers”

অবশ্য এ ব্যাপারে তার সম্মতি যে ছিল সেটা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন।

You can not expect a man to live, fight and die in the east Pakistan and go to Jhelum for sex, would you?

(সৈন্যরা পুর্ব পাকিস্তানে থাকছে, লড়াই করছে এবং মারা যাচ্ছে আর সেক্স্বের জন্যে কি তারা ঝিলাম যাবে?)

এক পাকিস্তানি মেজর তার বন্ধুকে লেখা এক চিঠিতে লিখেছে –
“We must tame the Bengali tigress and change the next generation, Change to better Muslims and Pakistanis.”

এ বিষয়ে বিখ্যাত ভারতীয় ঔপন্যাসিক মুলক রাজ আনন্দ ১৯৭২ সালে বলেন, “Rapes were so systematic and pervasive that they had to be conscious Army policy. Planned by west Pakistanis in a deliberate effort to create a new race or to dilute Bengali nationalism.”

এমন না যে তারা শুধু ধর্ষনটাকেই জায়েজীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, বরং, আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে তারা বারেবারে ‘হিন্দু – মুসলিম’ যুদ্ধের প্রলেপ দেয়ার চেষ্টাও চালাচ্ছিলেন। যে কোন জনসভায় কিংবা বিদেশী নেতৃবৃন্দের, বিশেষ করে মুসলিম দেশসমূহের কাছে গণহত্যাটাকে ‘জিহাদ’ বলে প্রচার করা হচ্ছিল। ডিসেম্বরের ১ তারিখে ‘মুসলমানরা কখনো পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করেনিঃ নিয়াজী’ শিরোনামের “দৈনিক পূর্বদেশ” এর খবরটা দেখুন,

“জেনারেল নিয়াজী বলেন যে, আমরা টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ করছি কাজেই আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন। পক্ষান্তরে ভারত সম্প্রসারণের বাসনা পূরণের জন্যই যুদ্ধ করছে।
ইতিহাসের দৃষ্টান্তের কথা উলেখ করে তিনি বলেন যে, মুসলমানদের সংখ্যা সব সময়ই কম কিন্তু তবুও তারা কখনো পরাজয়ের গ্লানি ভোগ করেনি। অতীতে আমরা হিন্দুদের বহুবার পরীক্ষা করেছি – প্র্যতেকবার তারা পরাজিত হয়েছে। এবারও আমাদের জয় হবে ইনশাল্লাহ”।

আগস্ট মাসে নিয়াজী বগুড়া সফরে যান, সেখানে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা জাতির জন্য এক অমূল্য সেবা করছেন। ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানের সেবা করার অর্থ হলো ইসলামের সেবা করা এবং আল্লাহ তাদের এ মহান কাজের জন্য অবশ্যই পুরষ্কৃত করবেন’ [দৈনিক পাকিস্তান]

এই নিয়াজী কিন্তু প্রতিরাতেই বিভিন্ন নারীদের কাছে যেত এবং চরম অশ্লীল লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাও ফরমানের বইয়ে তার এমন কাজকর্মের কথা উল্লেখ আছে।

‘দৈনিক পূর্বদেশ’ এর অন্য একটা সংবাদ দেখেন; শিরোনামঃ “বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্র সমূহের প্রতি মালেকের আহ্বান”। সে আহ্বানে তারা কতটুকু সাড়া দিয়েছে আমরা সকলেই জানি। ‘হিন্দু দেশের মদদে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশকে ভাঙ্গার’ কারণে সৌদি আমাদেরকে স্বীকৃতি দেয় নি প্রথম চার বছরেও। এমনকি বাংলার মানুষকে দু বছর হজ্জ পালন করতেও দেয়া হয় নি ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ দেশ বলে। সৌদি আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরেই।

তখনকার পূর্ব পা্কিস্তানের গভর্ণর ডাঃ মালেক অক্টোবরের দিকে লাহোরের এক উর্দু মাসিক পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তার সে সাক্ষাৎকারে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ‘ইসলামের’ বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলেই আখ্যায়িত করেছিলেন। সাক্ষাৎকারের আমাদের প্রয়োজনীয় অংশটুকু নিম্নরূপঃ

“প্রশ্নঃ বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদকে পাকিস্তানের আদর্শের পরিপন্থী বলে আপনি মনে করেন কি?
উত্তরঃ যেভাবে তাঁর অভ্যুদয় দেখেছি তাতে তা নিশ্চিতভাবেই পাকিস্তনী আদর্শে পরিপন্থী।

প্রশ্নঃ সামরিক বাহিনীর তৎপরতার পর সারা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সফর করে আমার এরুপ ধারণা হয়ছে যে আ’লীগ পাকিস্তান থেকে ইসলামী জীবন ব্যাবস্থাকে মুছে ফেলতে চেয়েছে। এরুপ মনোভাবের অধিকারী লোকের সাথে এখন কি একত্রে কাজ করা সম্ভব?
উত্তরঃ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমার মনোভাব নিয়ে এবং যারা ইসলামে বিশ্বাসী তারা যদি ইসলামের শিক্ষাকে কাজে প্রয়োগ করেন, মহানব (দ) ও তাঁর সাহাবারা যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা এক সাথে থাকতে পারি।”

মে মাসে মীলাদুন্নবী উপলক্ষে ইয়াহিয়া খান বেতারে দেয়া এক বাণীতে বলেন, ‘পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে অবিনশ্বর। পাকিস্তান আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক এবং আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের দূর্ভেদ্য প্রাচীর’। তার বাণী শুনে এক পত্রিকা মন্তব্য করে, ‘তাঁর এই আবেদনের মধ্যে ‘ইসলাম বিপন্ন’ সুর ফুটে উঠেছে।

“দৈনিক পূর্বদেশ” ১১ ডিসেম্বর ‘তথ্যমন্ত্রীর বেতার ভাষণঃ সমগ্র জাতি জেহাদের জন্য প্রস্তুত’ শিরোনামের খবরে বলে,

… আল্লাহর নাম উৎসর্গীকৃত জনতার পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি সশস্ত্র বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে ভারত কোনদিন সাফল্য অর্জন করতে পারবে না। তিনি আরও বলেন যে, জেহাদের আদর্শে উদ্দীপ্ত মুসলমান জাতি সবসময়ই শত্রুকে পর্যদুস্ত ও নস্যাৎ করে দিয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে তিনি আশা করেন।

তথ্যমন্ত্রী ভাষনের দুটো জিনিস খেয়াল করেন, তাহলে বুঝ নেয়া যাবে ধর্মটাকে কিভাবে ব্যাবহার করা হচ্ছে।
এক, সেনাবাহিনী তাহলে “আল্লাহর নাম উৎসর্গীকৃত জনতার পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি সশস্ত্র বাহিনী” ছিল যারা একাধারে যেমন মানুষ মেরেছে তেমনি নারীও ধর্ষনও করেছে। এই কর্মকান্ড কিভাবে ইসলামের মধ্যে পড়ে?

দুই, “জেহাদের আদর্শে উদ্দীপ্ত মুসলমান” – এটা কেন জেহাদ তা কি বোঝা যাচ্ছে? যেহেতু আগেই আলোচনা করেছি পাকিস্তানিদের ধারণা ছিল এই দিকের সবাই হিন্দু হয়ে গিয়েছে, নাহলে হিন্দু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে গিয়েছে, মানে ‘কাফের’ হয়ে গিয়েছে, অতএব তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাট ‘জেহাদ’ই বটে।

যতই পাকিস্তানিরা দাবি করুক ‘এক দেশ’, আসলে তখনকার অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা সামাজিক বৈষম্যতে এটা প্রতিয়মান হয় যে, পাকিস্তানিরা শুরু থেকেই বাঙ্গালীদের কলোনি করেই রাখতে চাচ্ছিল এবং এর প্রয়োজনেই দরকার ছিল এক মোক্ষম অস্ত্রের। ‘ইসলাম ও ধর্ম’ কে তারা বানিয়ে ফেলে সেই মহামারী অস্ত্র যার প্রকোপ চলছিল পুরো পাকিস্তান আমল জুড়েই। পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে বাঙালী ছিল সর্বদা নিচু জাত, কমজোর মুসলমান এবং হিন্দু দ্বারা প্রভাবিত সংকর মুসলমান। এই থিওরি তারা প্রচার এবং প্রসার করেছে সর্বদা। তারা শুধু তখনই যে বিশ্বাস করত এমন কিন্তু না, পাকিস্তানের নতুন প্রজন্ম এখনো বিশ্বাস করে ১৯৭১ ছিল হিন্দুদের করাল গ্রাস থেকে ইসলামিক পাকিস্তান রক্ষার আন্দোলন। বহুদিনের পরিকল্পনায় সংঘটিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর পরবর্তী কার্যকলাপ তাদের সে ধ্যান ধারণারই ফসল। মানুষ হত্যা করেছে, নারী ধর্ষণ করেছে, আবার এর জায়েজীকরণের জন্যে আশ্রয় খুজেছে ধর্মের তলে। মানুষের মধ্যে তারা ছড়িয়েছে ধর্মীয় বিষবাস্প – যাদের দেখানো পথে এখনো বাংলাদেশ জুড়ে চলছে এমনই বিষের হাওয়া। আজ যারাই খেলার সময় ‘পাকিস্তান, পাকিস্তান’ বলে গলা ফাটায়, তারাও এই উদ্দীপনার পিছনে ‘ধর্মীয়’ কারণ দেখায়।

হুমায়ুন আজাদ স্যারের মতোই আমিও তাই বলি, পাকিস্তানিদের আমি অবিশ্বাস করি, যখন তারা গোলাপ নিয়ে আসে, তখনও।

তথ্যসুত্রঃ
১) পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে একাত্তর – মুনতাসির মামুন
২) The Rape of Bangladesh – অ্যান্থনী মাসকারেনহাস
৩) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র
৪) অবরুদ্ধ বাংলাদেশে সামরিকজান্তা ও তার দোসরদের অপতৎপরতা – সুকুমার বিশ্বাস
৫) মুক্তিযুদ্ধ ও তারপরঃ একটি নির্দলীয় ইতিহাস – গোলাম মুরশিদ
৬) মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ – মুনতাসির মামুন
৭) গনমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ – মুনতাসির মামুন ও হাসিনা আহমদ
৮) 8 stages of genocide – Dr. Gregory H. Stanton
৯) ঘাতকের দিনলিপি – রমেন বিশ্বাস
১০) তাজউদ্দিন আহমদঃ নেতা ও পিতা – শারমীন আহমদ
১১) ত্রিশ লক্ষ শহীদঃ বাহুল্য নাকি বাস্তবতা – আরিফ রহমান
১২) বীরাঙ্গনা ১৯৭১ – মুনতাসির মামুন
১৩) How Pakistan Got Divided – রাও ফরমান আলী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *