খেলা


সালেক আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে। আজ তার বিশেষ একটা
সাক্ষাতকার গ্রহণের কথা। সাক্ষাতকারদাতা তাকে দুপুর তিনটায় সময় দিয়েছেন।
যদিও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। তার ঘুম
ভেঙ্গেছে আসলে ছোট ভাইয়ের ফোনে। ছোটভাই জানাল তারা আগামী ২৬ মার্চ
তারা একটা নাটক করছে। নাটকটিতে তুলে ধরা হবে ভাষা আন্দোলন থেকে
মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙ্গালীর সকল সংগ্রামের কাহিনী। ছোট ভাইকে ধন্যবাদ দিয়ে
সালেক বলল -টাকা লাগবে তোদের নাটকের জন্য? পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার


সালেক আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে। আজ তার বিশেষ একটা
সাক্ষাতকার গ্রহণের কথা। সাক্ষাতকারদাতা তাকে দুপুর তিনটায় সময় দিয়েছেন।
যদিও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। তার ঘুম
ভেঙ্গেছে আসলে ছোট ভাইয়ের ফোনে। ছোটভাই জানাল তারা আগামী ২৬ মার্চ
তারা একটা নাটক করছে। নাটকটিতে তুলে ধরা হবে ভাষা আন্দোলন থেকে
মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙ্গালীর সকল সংগ্রামের কাহিনী। ছোট ভাইকে ধন্যবাদ দিয়ে
সালেক বলল -টাকা লাগবে তোদের নাটকের জন্য? পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার
অফিসের কাজ না থাকলে অবশ্যই যাব তোদের নাটক দেখতে। ছোটভাই খুশি
হয়ে ফোন রেখে দিল। সালেকের এসব খুব ভাল লাগে। সে নিজে পারেনা
জীবনের প্রয়োজনে কিš‧ অন্যকে অফুরন্ত উৎসাহ দেয়। সালেকের চাকরি এখনও
¯ ায়ী হয়নি। শিক্ষানবীস অব¯ ায় চাকুরিতে যোগদানের পর এই প্রম তাকে
এইরকম একটা এ্যসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছে। ভাল একটা নিউজ করতে পারলে
চাকরিটা ¯ ায়ী হবে এবং চাকরিতে তার কদরও বাড়বে। হাতে যথেষ্ট সময় থাকা
সত্তেও সালেকের টেনশন হচ্ছে। সে ব্যস্ত হয়ে প্রমে ক্যামেরায় ব্যাটারি ভরে
চেক করতে লাগল। কিš‧ ক্যামেরার মেমরি কাজ করছে না। সালেকের মাথা
খারাপ হয়ে গেল। আজ শুμবার দোকানপাট সব বন্ধ। বহু চেষ্ঠা করেও ঠিক
হলোনা মেমরি। মাথায় হাত দিয়ে বসে সিগাারেট ফুঁকল কিছুক্ষণ। তারপর ফোন
দিল মিতুকে।
-হ্যালো মিতু।
-জ্বি বলুন সাংবাদিক সাহেব।
-একটা বিপদে পড়েছি গো।
-সে তো বুঝতেই পারছি। তা না হলে এত সকাল সকাল আমায় মনে পড়বে
কেন?
-শোন না, আজ একজনের সাক্ষাতকার নিতে হবে। আমার ক্যামেরার মেমরিটা
নষ্ট হয়ে গেছে। তোমারটা একটু ধার দেবে সোনা?
-ওলে…ওলে সোনা আমার তুমি কার ইন্টারভিউ নিবে গো?
-ভেংচাইও না। যার সাক্ষাতকার নিতে যাব উনি একাত্তরের একজন বীরাঙ্গনা।
-এই সত্যি? আমিও যাব।
-ঠিক আছে। মেমরিটা নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসো আমার বাসায়। বিকাল
তিনটায় সময় দিয়েছেন তিনি। একটায় বের হতে হবে। যা জ্যাম শহরে।
-ই…তোমার বাসায় আমি যাব না। শয়তানি করবে।
-না গো সোনা…বিয়ের আগে ওসব নয়।
মিতু হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিল। সালেক টিভি ছেড়ে সাউন্ড বাড়িয়ে
বাথরুমে ঢুকল। এটা তার সবচেয়ে অদ্ভুত একটা অভ্যাস। ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে
এসে নাস্তা করতে করতেই প্রশড়ব ঠিক করতে লাগল সাক্ষাতকারের জন্য।
পৃথিবীকে জানাতে হবে এই মহান বীরাঙ্গনার কথা। সালেক শুনেছে তিনি হুইল
চেয়ার ছাড়া চলতে পারেন না। টিভির ¯ৃলবার দেখে সালেকের মনে পড়ল
বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের ফাইনাল খেলা আছে আজ। পাকিস্তান নামটা
শুনলেই সালেকের শরীর রি রি করে উঠে ঘৃণায়। ক্ষোভ হয়, প্রচন্ড ক্ষোভ।
সালেক একাত্তর দেখেনি। ওর বাবা বলেন – তোরা তো ইতিহাস শুনে এতটা
ক্ষুব্ধ, আর আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি। নিজ চোখে দেখেছি ওদের নির্মমতা।
তাহলে ভেবে দেখ কতটা ক্ষোভ জমে আছে আমাদের মনে। সালেক খাওয়া শেষ
করে একটা সিগারেট ধরায়। তারপর ব্যলকনিতে গিয়ে তাকিয়ে থাকে বাইরে।
সকালের রোদ ঢলে পড়েছে প্রকৃতিতে। এই তার দেশ। দুঃখীনি দেশ। টিভিতে
তখন রবীন্দ্রসংগীত চলছে। অনেকদিন পর সকালটাকে সালেকের নিকট
অসাধারন লাগছে। মিতু আসছে কিছুক্ষণ পরে। ওকে কি করে একটা সারপ্রাইজ
দেয়া যায় সেটা সালেকের মাথায় জেঁকে বসল। দরজা খুলেই প্রথম কাজ মিতুকে
জড়িয়ে ধরা। মিতু ভীষণ লজ্জা পায় এতে। সম্পর্কের এতদিন পরও মিতুর
আড়ষ্টতা কাটেনি। খিচুড়ি-মাংস ওর খুব প্রিয় খাবার। সালেক চঞ্চল হয়ে উঠে।
দিস ইজ দ্যা প্লান ! সময় খুব কম। সালেক দ্রুত কিচেনে ঢুকল। আপাতত তার
মাথা থেকে সাক্ষাতকারের বিষয়টা উধাও।
রঞ্জনা মিত্রের কোমড়ের ব্যাথাটা আজ বেড়েছে। নাতনীটা সকাল থেকে উধাও।
আজকাল বড্ড টো টো করে ঘোরার স্বভাব হয়েছে ওর। টেপরেকর্ডারটা ঘরঘর
আওয়াজ করছে। সকালে তো ঠিকই চলছিল। রঞ্জনা মিত্র প্রতিদিনের অভ্যাসমত
সকালে ঘুম থেকে উঠে চা-মুড়ি খেতে খেতে টেপরেকর্ডারে রবীন্দ্রসঙ্গীত
শোনেন। ছেলে সে․মেন অনেকবার বলেছে মা তোমাকে একটা ডিভিডি প্লেয়ার
কিনে দেই। রঞ্জনা মিত্র হেসে বলেছেন -থাক বাবা, আমি পুরাতন যুগের মানুষ।
টেপরেকর্ডারটাই বুঝি। সে․মেন গলা জড়িয়ে ধরে বলেছে -মাগো, তুমিই না
বলেছ সময়ের সাথে তাল মেলাতে হয়। তিনি হেসে বলেছেন -আমি বুড়ো মানুষ
বাবা। তোরা এগিয়ে যা সময়ের সাথে। রঞ্জনা মিত্র বুঝতে পারলেন
টেপরেকর্ডারটারও শেষ সময় চলে এসেছে। এবার নতুন একটা কিনতে হবেই।
মা মা ডাকতে ডাকতে সে․মেন এসে ঢুকল।
-মা আমি একটু বাইরে যাব।
-কোথায় যাবি রে বাবা?
– পর্টির মিটিং আছে মা।
-ও আচ্ছা সাবধানে যাস বাবা। আমাকে একদিন নিয়ে যাবি পার্টি অফিসে?
অনেকদিন যাইনা।
-আজই চলো না।
-না বাবা । আজ একটি ছেলে আসার কথা আমার নাকি সাক্ষাতকার নিবে।
-তবে ঠিক আছে মা। সামনের শুμবার নিয়ে যাব। বলেই মায়ের গালে একটা
চুমু দিয়ে বেড়িয়ে যায় সে․মেন। রঞ্জনা মিত্র তাকিয়ে থাকে ছেলের চলে যাওয়া
পথের দিকে। ছাত্রজীবন থেকেই তারই উৎসাহে সে․মেন বামরাজনীতিতে প্রবেশ
করে। এখন সে পার্টির একজন দায়িত্বশীল নেতা। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আর
বিয়ে করেনি সে․মেন। ভালবেসে বিয়ে করেছিল। যেদিন রঞ্জনা মিত্রকে এসে
মেয়েটির কথা বলল তিনি আপত্তি করেননি। হাসিমুখে বিয়ে দিয়েছেন দুজনের।
কিš‧ সে সুখ কপালে সইল না। ছেলের দিকে তাকিয়ে মাঝে মধ্যে খুব কষ্ট হয়
রঞ্জনা মিত্রের। কিš‧ তবু তাকে কখনও দ্বিতীয় বিয়ের কথা বলেননি। তাতে ছেলে
আরও বেশি কষ্ট পাবে। রঞ্জনা মিত্র বই নিয়ে বসলেন। তার সবচেয়ে অদ্ভূত
বিষয়টি হল এত বছর বয়সেও চশমা ছাড়া বই, পত্রিকা সব পড়তে পারেন। মাঝে
মাঝে বিরক্ত হয়ে বলেন, “এ যুগের ছেলে-মেয়েদের যে কি হয়েছে, জন্ম নেয়ার
পর থেকেই চোখে চশমা লাগাতে হয়।” একটার দিকে কাজের মেয়েটির সাহায্যে
¯ড়বান সেরে খেতে বসেন। দুপুরে ঘুমানোর অভ্যাস তার কোনকালেই ছিল না।
সেই সময়টা তিনি টিভি দেখেন কিংবা বাগানে বসে থাকেন। আজ নিজেই হুইল
চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে তিনি বাইরে চলে আসলেন। বাড়িটির সামনে সাজানো
বাগান। অনেক ফুলের মহাসমারোহে আনন্দে নেচে নেচে বেড়াচ্ছে প্রজাপতি আর
পাখির দল। রঞ্জনা মিত্রের ফুলের খুব শখ। তিনি নিজ হাতে অনেক ফুলগাছ
লাগিয়েছেন। এখন আর পারেন না। গোলাপ গাছটির সামনে এসে তিনি ছুঁয়ে
দেখতে লাগলেন ফুলগুলিকে। অজিতের খুব প্রিয় ছিল লালগোলাপ। মাঝে
মাঝেই গোপনে রঞ্জনার খোঁপায় সে গেঁথে দিত লাল গোলাপ। রঞ্জনা মিত্র এখন
আর খোঁপা বাঁধেন না। ফুলের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যেতে
থাকেন তিনি। মার্চ মাসের গরমেও শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে ঝিরঝির হাওয়া। ক্সচত্রের
রুক্ষ প্রকৃতি যেন কাল‣বশাখীর অপেক্ষায়। কাল‣বশাখী ঝড়ের সময় রঞ্জনা
মিত্রের মনে হয় সবকিছু কেন ধ্বংস হয়না। খুব ভুল হয়েছিল দেশ স্বাধীন করে।
বাঙ্গালী খুব সহজেই স্বাধীনতা পেয়ে গেছে।
-নম¯‥ার।
রঞ্জনা মিত্র দেখতে পান তার সামনে দাঁড়িয়ে দুটি তরুণ-তরুণী। তরুণটি বলল
আমি সাংবাদিক সালেক আহম্মেদ। ও আমার বন্ধু মিতু। ফোকলা হেসে রঞ্জনা
মিত্র বলেন -ও আচ্ছা আচ্ছা, বস তোমরা। বাগানের একপাশে সুন্দর ছাউনি
দেয়া সুন্দর বসার ব্যাব¯ া আছে। সেখানে বসে সালেক তার রেকর্ডার আর প্রশেড়বর
নোটগুলি বের করে। তার সামনে হুইল চেয়ারে বসে একাত্তরের বীরাঙ্গনা রঞ্জনা
মিত্র। যিনি এতদিন ছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। মিতুই প্রম প্রশড়ব করল।
-কে কে আছে আপনার মাসীমা?
রঞ্জনা মিত্র ফোকলা দাঁতে হেসে বললেন – আমার ছেলে আর একমাত্র নাতনী।
স্বামী মারা গেল মুক্তিযুদ্ধে। বউমা মারা যায় লাবণ্যর জন্মের সময়। এই অভাগা
নাতনীটা আমার কাছেই মানুষ। দেখতে দেখতে কত বড় হয়ে গেল। আর আমি
এখন চলৎশক্তিহীন। হা…হা…
-কিভাবে মারা গেলেন আপনার স্বামী- সেই ঘটনাটি কি একটু বলবেন?
রঞ্জনা মিত্রের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সালেক ও মিতু বসে আছে জবাবের
অপেক্ষায়। রঞ্জনা মিত্র দেখছেন মার্চ মাসের রোদে পোড়া ধরনী। নীল
আকাশজুড়ে ভাসছে সাদা মেঘের দল। তিনি চলে গেলেন চার দশক পূর্বের এক
মে মাসের মেঘে ঢাকা আকাশে। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। মাঝে মধ্যে গুলির শব্দ আর
আর্তচিৎকার ভেসে আসছে। বৃদ্ধা শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে কেঁপে কেঁপে উঠছে
সদ্যবিবাহিতা তরুনী রঞ্জনা। শহরে কারফিউ চলছে। আলো জ্বালানো নিষেধ।
হঠাৎ মেঘ ডেকে উঠল ভীষণ আর্তনাদে। মেঘের আওয়াজ ভেদ করে রঞ্জনা যেন
শুনতে পেল দরজায় টোকার শব্দ। সে “মাগো” বলে চাপা আওয়াজ করল।
শ্বাশুড়ী বললেন চুপ কর থাক। দরজা খুলবে না। এবার দরজায় টোকার সাথে
সাথে ভেসে এল একটি চাপা কন্ঠ “মিনু, আমি…আমি…দরজা খোল”! রঞ্জনা
আনন্দে চিৎকার করে বলল – মা, আপনার ছেলে এসেছে। আমি বলেছিলাম না
ও আসবে!” শাশুড়ি মৃদু ধমক দিয়ে বলল -“চিৎকার করো না। দরজা খোল”।
রঞ্জনা ঝড়ের বেগে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। কাঁধে স্টেনগান নিয়ে দ্রুত প্রবেশ
করে তার মুক্তিযোদ্ধা স্বামী। রঞ্জনার যেন উন্মাদ হয়ে গেল। শাশুড়ির সামনে
জড়িয়ে ধরে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিল তাকে। শাশুড়ি মাথা নিচু করল। আজিত
হাসতে হাসতে চাপা স্বরে বলল – “ওরে পাগলী ছাড়, মা দেখছেন।” রঞ্জনার হুঁশ
হল। লজ্জায় স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে শাশুড়ির দিকে পেছন দিয়েই দাঁড়িয়ে থাকল।
অজিত আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল মায়ের কাছে। মা ফোঁপাচ্ছে। অজিত কাছে
গিয়ে জড়িয়ে ধরতেই মায়ের অশ্রুর বাধ ভেঙ্গে গেল। হাউমাউ করে কাঁদতে
লাগলেন ছেলেকে জড়িয়ে। অজিত বলল -মাগো, আমি খুব কম সময়ের জন্য
এসেছি। তুমি কি কেবলই কাঁদবে মা?
মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন -ত্ইু আবার চলে যাবি বাবা?
-হ্যাঁ মা। দেশের এই বিপদে কি করে ঘরে থাকি বল? এই দেশটা যে আমার
মায়ের মত। তোমার বিপদে আমি কি পারতাম ঘরে বসে থাকতে?
মা সব বুঝেন। কিš‧ মায়ের মন বুঝবে কিভাবে মরণপাগল ছেলে। মা চোখের
জল মোছেন। বলেন বে․মা, ওকে হাত-পা ধোয়ার জল দাও। রঞ্জনা দে․ড় দেয়।
অজিত তার পিছু পিছু গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ
করা অজিত ভালবেসেছিল সবে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা রঞ্জনাকে। দুই
পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে হয় ওদের। খুব ধুমধাম হয়েছিল। মাত্র দুমাস আগের
কথা। অথচ, মনে হয় কতদিন না হয়ে গেল। কি এক বিরাট পরিবর্তন ঘটে গেল
দেশে। পাগল ছেলেরা ঘর ছাড়ল। পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা আর সদ্যবিবাহিত বউ ছেড়ে
অজিত যোগ দিল মুক্তিযুদ্ধে। আসলে সময় এক বড় μীড়ানক। সবকিছু উল্টে
দেয়।
-এই ছাড় ছাড়।
– ওরে পাপিষ্ঠা, স্বামীকে তুই করে বলছিস…নির্ঘাত নরকে যাবি।
-নরকে গেলে তোকে ছাড়া যাব কেন রে? তোকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না।
– তাই গো? অজিতের বাঁধন আরও শক্ত হয়। আকাশে প্রচন্ড গর্জনে মেঘ ডেকে
উঠে। কেঁপে উঠে রঞ্জনা। অজিত বলে
-মেঘকে ভয় করো না, এখন আর ভয়ের সময় নেই। রঞ্জনা মুখ লুকায় স্বামীর
বুকে। শাশুড়ী চেঁচিয়ে বলে – ও বে․মা, অজিতকে ভাত দাও। কিš‧ রঞ্জনা
অজিতকে ছাড়তে চায়না, জড়িয়ে ধরে রাখে শক্ত করে।
Ñঅনেক ভালবাসা ছিল দুজনের মধ্যে তাই না? হাসিমুখে বলে সালেক। মিতু যেন
কোথাও হারিয়ে গেছে। সালেক তাকে কনুই দিয়ে খোঁচা দেয়।
Ñহ্যাঁ গো বাবা। পুরো তিন বছর প্রেম করেছি। ফোকলা দাাঁতে হাসতে থাকেন
রঞ্জনা মিত্র। তার চোখেমুখে ফুটে উঠে কিশোরীর লাজুক হাসি। সালেক ও মিতু
মুগ্ধ হয়ে শোনে একাত্তরের জীবন্ত সাক্ষী একজন বীরাঙ্গনার কথা।
-বিয়ের আগে সেই যে তুই করে বলতাম, বিয়ের পরও সেই অভ্যাস যায়নি।
এজন্য শাশুড়ির কম বকা খাইনি। তবে আমরা খুব সুখী ছিলাম। শাশুড়ি খুব
আদর করতেন আমাকে। কিš‧ সুখ সইল না বুঝলে। রঞ্জনা মিত্রের মুখে আবার
আঁধার ঘনিয়ে আসে। সে আবার যেন ফিরে চলে স্বামীর বুকে। স্পষ্ট শুনতে থাকে
অজিত বলছে -“এই পাগলী ছাড়, মা বকবে।” রঞ্জনা ছেড়ে দেয় বাহুবন্ধন। ওর
সিঁথির সিঁদুর কিছুটা অজিতের জামায় আর বাকীটা রঞ্জনার মুখে লেপ্টে গেছে।
অজিত বলে -যা , মুখ ধুয়ে আয় তাড়াতাড়ি। আর আমাকে একটা শার্ট দে। এটা
পড়ে মার সামনে যাওয়া যাবে না। রঞ্জনা মুচকি হেসে চলে যেতে উদ্যত হয়।
ঠিক তখনই দরজায় দুমদাম শব্দ সাথে অনেক মানুষের কোলাহল। !“নায়ারে
তাকবীর” ধ্বনি! আগš‧কদের পরিচয় সম্পর্কে বোঝার বাকী থাকেনা কারও।
শংকিত হয়ে উঠে সবাই। অজিত ধাক্কা দিয়ে রঞ্জনাকে বাথরুমে ঢুকিয়ে দেয়।
পালানোর রাস্তা খোঁজে। কিš‧ পালানোর কোন পথ নেই। ঘরের দরজা একটাই।
তাই অজিতের পথও একটাই। ওর মা কাঁদতে কাঁদতে ভগবানকে ডাকতে
থাকেন। সবাই বুঝে গেছে কি ঘটতে চলেছে। অজিতের দলটি এই গ্রামেই
অব¯ ান করছে। ওরা যদি খোঁজ পেত তবে হয়ত সাহায্য আসত। এখন যা
করতে হবে একাই। অজিত দৃঢ় হস্তে স্টেনগানটা তুলে নেয়। মায়ের ঘরের দিকে
যেতে থাকে। কিš‧ তার আগেই দরজা ভেঙ্গে ঢুকে পড়ে মৃত্যুদূত। দলটির
অগ্রভাগে এই গ্রামেরই দেলু রাজাকার। ঘরে ঢুকেই অজিতের প্যারালাইজড্ হয়ে
যাওয়া মাকে লাথি দিয়ে দেলু বলে -ঐ বুড়ি তোর পোলা কই? লাথি খেয়ে বিছানা
থেকে মাটিতে পড়ে যায় অজিতের মা। কোঁকাতে থাকেন। অজিত আর ¯ি র
থাকতে পারেনা। তার স্টেনগান গর্জে উঠে। কিš‧ এতগুলো শকুনের আধুনিক
অস্ত্রের সামনে দ্রুতই থেমে যায় তার স্টেনগান। অজিতের বুকের তাজা রক্তের
সাথে মিশে একাকার হয়ে যায় শার্টে লেগে থাকা রঞ্জনার সিঁথির সিঁদুর। রক্তের রং
বুঝি অনেক বেশী লাল। অজিতকে হত্যা করে ঘরে লুটপাট করতে থাকে ওরা।
দেলু রাজাকার বাথরুমের দরজা ভেঙ্গে বের করে আনে রঞ্জনাকে। হায়নাদের
অট্টহাসি আর রঞ্জনার আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠে বাতাস। লুন্ঠিত মালামালের
সাথে ওরা তুলে নিয়ে যায় রক্তাক্ত রঞ্জনাকেও। অজিতের মা আর উঠতে
পারেননি।
মিতুর চোখে জল। সালেক কখনই এত আবেগী নয়। সাংবাদিকদের এত আবেগী
হতে নেই। কিš‧ এই বৃদ্ধার সাথে সাথে আজ তার চোখের কোনেও দেখা দিয়েছে
অশ্রু। আকাশও যেন হঠাৎ দুঃখী হয়ে গেল। তার দেহ ছেয়ে গেল কালো মেঘে।
রঞ্জনা মিত্র চোখের জল মুছে বলে চললেন -তারপর প্রতিদিন নির্যাতন করত
ওদের ক্যাম্পে। ভয়ানক বিকৃত সব নির্যাতন। আমি । ঈশ্বরের কাছে বলতাম
আমার মৃত্যু আসে না কেন? মৃত্যু আসলেই আমার কাছে আসেনা। বিজয়ের
প্রাক্কালে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল অভিযান চালিয়ে অর্ধমৃত আমাকে উদ্ধার
করে। তখন আমি সাত মাসের গর্ভবতী।
সালেক আর মিতু কোন কথা না বলে শুনে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের কথা। একজন
বীরাঙ্গনার যুদ্ধের কথা। কোন প্রশড়ব করার দরকার আছে বলে তার মনে হয়না
সালেকের।
-আমি বাচ্চাটাকে নষ্ট করতে চাইনি। আমি চেয়েছি ও পৃথিবীতে আসুক। ও
জানুক একাত্তরের কথা। ও ঘৃণা করুক ওই জানোয়ারদের। আমার এক মামা
আমাকে আশ্রয় দিল। বাঙ্গালী কত বেঈমান জানো? যাদের স্বর্বস্ব ত্যাগের
বিনিময়ে স্বাধীনতা আসল সেই স্বাধীন দেশের তথাকথিত সমাজে তাদের ঠাঁই
হলো না। কতটুকু বেঈমান এরা? এদের কাছে আমরা ছিলাম নষ্টা! মামা আমাকে
এসব থেকে রক্ষা করেছেন। এই বাড়িটিতেই আমার সন্তান জন্ম নিল। মামা
আমার জন্য চাকুরীর ব্যাব¯ া করে দিলেন। ছোটবেলায় বাবা-মাকে
হারিয়েছিলাম। আমার সবচেয়ে দুঃসময়ে মামা ছিলেন আমার পিতৃসম। রঞ্জনা
মিত্র আকাশের দিকে দুহাত জোড় করে প্রণাম করলেন। সালেক জিজ্ঞেস করল –
আপনার ছেলে ?
-ছেলে বড় হলে তাকে বলি মুক্তিযুদ্ধের কথা। তার বাবার কথা, তার জন্মের
কথা। ও তখন থেকেই ভীষণ গর্ব করে সবাইকে বলে তার বাবা-মা দুজনেই
মুক্তিযোদ্ধা। জানো, যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা আসলে এটুকুই চায়।
সাহায্য চায় না। টাকা চায়না। কিš‧ এটুকু দিতেই সবার বড় আপত্তি।
এমন সময় গেট খুলে ভেতরে ঢুকে একটি উচ্ছল তরুনী। তার মুখটি গম্ভীর হয়ে
আছে। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে আসতে থাকে। রঞ্জনা মিত্র হেসে বলেন -আমার
নাতনী লাবন্য। লাবন্য কাছে আসতেই ঠাকুমা হেসে বললেন -কি গো সতীন,
মুখটি গোমড়া কেন? লাবন্য এতক্ষণে খেয়াল করে সালেক আর মিতুকে। কোন
কথা না বলে ধীরে ধীরে চলে যায় ভেতরে। রঞ্জনা মিত্র বলেন “নিশ্চয় কারো
সাথে ঝগড়া করে এসেছে। একটু পরেই আমার কোলে শুয়ে শুয়ে সব বলে
দেবে। হা…হা…হা…।” সালেক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। মিতু ওকে কনুই দিয়ে
খোঁচা মারে। সালেক ওর দিকে তাকালে মিতু ভ্রু কুচকায়। সালেক হেসে দিয়ে
রঞ্জনা মিত্রকে বলে
-মাসীমা আমরা এই প্রজন্মও চাই মুক্তিযোদ্ধাদের এইটুকু দিতে। আপনাদের ঋণ
পরিশোধযোগ্য নয়। কোন কিছুর বিনিময়ে মাতৃঋণ শোধ করা যায়না।
রঞ্জনা মিত্র মলিন মুখে বলেন – আমি এই প্রজন্মকে বুঝি না, সত্যিই এদের বুঝি
না।
কাজের মহিলাটি এসে বলল -ঠাকুমা তোমার ওষুধ খাবার সময় হল। চল যাই।
অজিত উঠে পড়ল । সে রঞ্জনা মিত্র এবং তার বাড়ির অনেকগুলো ছবি নিল।
বিদায় নেবার আগে দুজনেই রঞ্জনা মিত্রের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। রঞ্জনা মিত্র
বললেন -যাও, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি, এখন এই দেশের ভার
তোমাদের হাতে।
সালেক ও মিতু হাঁটতে লাগল। রঞ্জনা মিত্র তাকিয়ে রইলেন আকাশের দিকে।
আকাশ জুড়ে মেঘ। অসময়ের মেঘ। কিছুতেই যেন কাটছে না।
পরদিন সকালে ঘুমের ভেতরেই ফোন করে খবরটা দিলেন একজন সিনিয়র
রিপোর্টার। সালেক তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ধড়মড় করে উঠে দরজার সামনে থেকে
পত্রিকাটা তুলল। প্রম পাতায় ছাপানো হয়েছে রঞ্জনা মিত্রের ছবিসহ
সাক্ষাতকারটি। নিজের লেখা রিপোর্টটি দেখতে সালেকের ভীষণ ভাল লাগছে।
এমন সময় মিতুর ফোন। “হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে মিতু ব্যাস্ত হয়ে বলল
“খেলার পৃষ্ঠা দেখ।”
-কি আছে খেলার পাতায়? আমার রিপোর্ট দেখেছ?
-আরে বাবা দেখেছি। তুমি খেলার পৃষ্ঠা দেখ!
কানে ফোন রেখেই সালেক পৃষ্ঠা ওলটাতে লাগল। ওপাশ থেকে মিতুর উত্তেজিত
কন্ঠ -পেয়েছ? খেলার পৃষ্ঠার শিরোনাম “সারা দেশকে কাঁদিয়ে রানার্সআপ হল
বাংলাদেশ।” নিচে তিনটি ছবি। একটিতে পাকিস্তানী μিকেটাররা ট্রফি হাতে
উল্লাসরত, পরের ছবিতে কাঁদছে বীরাঙ্গনা রঞ্জনা মিত্রের নাতনী লাবণ্য। তার
কপোলে আঁকা লাল-সবুজ পতাকা। তৃতীয় ছবিটা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল
সালেক! গ্যালারিতে উচ্ছাসিত তরুণীদের মাঝে মধ্যমনি একটি মেয়ের হাতে
প্ল্যাকার্ড। মেয়েটি লাবণ্যর বয়সীই। সে প্ল্যাকার্ডটি উঁচিয়ে চিৎকার করছে। তার
মাথায় পাকিস্তানী পতাকার ব্যন্ড বাঁধা। আর পুরো প্ল্যাকার্ডটা জুড়ে লেখা “মেরি
মি”; নিচে একজন পাকিস্তানী μিকেটারের নাম! ভীষণ বিষ্ময়ে ছবির মেয়েটির
দিকে তাকিয়ে থাকল সালেক। তারপর পত্রিকটি দুমড়ে-মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল
বাইরে।

ব্রাহ্মমুহূর্ত বইটিতে প্রকাশিত

৪ thoughts on “খেলা

  1. কিছুসংখ্যক কুলাঙ্গার-বাঙালির
    কিছুসংখ্যক কুলাঙ্গার-বাঙালির পাকিস্তানপ্রেম দেখলে মনে হয় সাথে-সাথে জুতাপেটা করি।
    লেখককে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *