ভারত বিদ্বেষ এবং পাকিস্তান বিদ্বেষ – পৃথক নাকি অভিন্ন?

আমরা সব সময়ই একটা কথা স্পষ্ট করে বলার চেষ্টা করি- ভারত আর পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপার কোন সুযোগ নেই। পাকিস্তানের বিরূদ্ধে কিছু বলতে গেলে ব্যালেন্স করার জন্য ভারতের বিরূদ্ধেও কিছু বলতে হবে – এই নীতিটি সব সময় সঠিক নয়। ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী দেশ হিসেবে আমাদের যে বিরোধ গুলো আছে সেগুলোর প্রেক্ষাপট এক রকম, আর পাকিস্তানের সাথে শত্রুতার প্রেক্ষাপট আরেক রকম।ভারত বিরোধীতার আমাদের দেশে দুটো দিক আছে-

১। যারা সুনির্দিষ্ট কারণে কিছু সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে ভারতের সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক অপরাধের বিরোধী এবং
২। যার পাকি প্রেমের বশবর্তী হয়ে এবং অনেকটা ধর্মীয় কারণে ভারত বিরোধী।


আমরা সব সময়ই একটা কথা স্পষ্ট করে বলার চেষ্টা করি- ভারত আর পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপার কোন সুযোগ নেই। পাকিস্তানের বিরূদ্ধে কিছু বলতে গেলে ব্যালেন্স করার জন্য ভারতের বিরূদ্ধেও কিছু বলতে হবে – এই নীতিটি সব সময় সঠিক নয়। ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী দেশ হিসেবে আমাদের যে বিরোধ গুলো আছে সেগুলোর প্রেক্ষাপট এক রকম, আর পাকিস্তানের সাথে শত্রুতার প্রেক্ষাপট আরেক রকম।ভারত বিরোধীতার আমাদের দেশে দুটো দিক আছে-

১। যারা সুনির্দিষ্ট কারণে কিছু সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে ভারতের সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক অপরাধের বিরোধী এবং
২। যার পাকি প্রেমের বশবর্তী হয়ে এবং অনেকটা ধর্মীয় কারণে ভারত বিরোধী।

প্রথম শ্রেণীর মানুষ গুলো গঠনমূলক উপায়ে ঐ সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়েই লেখালেখি-আলোচনা-সমালোচনা-প্রতিবাদ করে। এদের সাথে ভারতের একটি সাধারণ মানুষের কোন বিরোধ নেই, গণহারে গালিগালাজও এরা করেনা। দ্বিতীয় শ্রেণীটি মূলত গঠনমূলক কোন প্রতিবাদে না গিয়ে নানাবিধ গালি বর্ষণ করতে, মাথাকাটা ছবি বানাতে আর ধর্মীয় ভাবে হেয় করতেই সিদ্ধহস্ত। ভারতের সব মানুষ এদের কাছে শত্রু। বাংলা সংস্কৃতি এদের কাছে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি! ‘মালাউন’ এদের কাছে খুব প্রিয় গালী।এবং এই গোষ্ঠীটি কখনই পাকিস্তানের প্রতি এই বিদ্বেষ দেখাবেতো না-ই, উল্টো আকারে ইঙ্গিতে ‘মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই’ এই তত্ত্ব প্রতিষ্ঠায় তৎপর থাকে।

পাকিস্তানের জন্য এদের প্রাণ কাঁদে। ক্রিকেটে ভারতের বিরূদ্ধে পাকিস্তানের জয়লাভে এরা যতটা আনন্দিত হয়, বাংলাদেশের জয়ে ততটা আনন্দিত হয়না। বাংলাদেশের তাসকিন যদি একটা উইকেট পায় এরা হাততালি দেয়, কিন্তু আফ্রিদি যদি একটা উইকেট পায় তাহলে নর্তন কুর্দন শুরু করে। ২০১৩ গণজাগরণের পর থেকে এরা কিছুটা গর্তে ঢুকে গেলেও খেলার সময় গুলোতে এরা গর্ত ছেড়ে বেড়িয়ে আসে। কথা খুবই পরিষ্কার। পাকিস্তান আমাদের জন্মশত্রু। এদের পাঠ্যপুস্তকে এখনও বাংলাদেশকে ‘ভারতের চক্রান্তে আলাদা হয়ে যাওয়া পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে দেখানো হয়। সেখানকার প্রতিটা নাগরিক বাংলাদেশের প্রতি এই ধরণের মনোভাবই প্রদর্শন করে যদিও ওদের থেকে সকল ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এখন অনেক গুণে এগিয়ে।একটা ঘটনা বলি।ঘটনাটি ১৯৯৭/৯৮ সালের।

গগন নামের এক তরুণ কে বেলজিয়ামে একদল পাকিস্তানি গুলি করে হত্যা করে। একদল পাকিস্তানি গগনের পরিচয় জানতে পেরে বাংলাদেশকে নিয়ে নোংরামী করছিল,গগন তার প্রতিবাদ করেছিল। ওই পাকিরা গগনকে হত্যা করে।’প্রিয় গগন’ শিরোনামে এক লেখায় জাফর ইকবাল স্যার ঘটনাটির বর্ণনা করেছিলেন,সেই লেখায় আমরা আরও জানতে পারি,যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন সময়ে তিনি পাকিস্তানি তরুনদের বাংলাদেশী নিউজগ্রুপে এই ধরণের চিঠি লিখতে দেখেছেন-

” বাংলাদেশের সবকিছু কুৎসিত, শুধু তাদের রমণীরা আকর্ষনীয়- আমাদের যেসব পাকিস্তানী জওয়ানেরা একাত্তরে তাদের ধর্ষন করেছিল তাদের কাছে শুনেছি।”

বাংলাদেশের প্রতি ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তানের অধিকাংশের মনোভাব ঠিক এমনটাই। কিন্তু আমাদের দেশের একদল মানুষ কোন বিচিত্র কারণে অন্তরে পাকিস্তান প্রীতি লালন করে, লালন করে বলেই এর সাথে ভারত বিদ্বেষকে মিশিয়ে ফেলে। পাকিস্তানের বিরূদ্ধে কথা বলতে গেলে তাই প্রশ্ন খাঁড়া করে ‘ভারত যখন সীমান্তে হত্যা করে তখন আপনে কই ছিলেন?’ কিংবা ‘পাকিস্তান আমাদের পূর্বের শত্রু, ভারত বর্তমান শত্রু।’ ভারতের আমাদের দেশের প্রতি সংগঠিত অপরাধ গুলোর বিরোধীতা করার জন্য পাকিস্তানকে ভালবাসার দরকার পড়বে কেন?

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আপনের কি ভাই ভারত প্রীতি আছে নাকি? এর উত্তর দিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বের কিছু নেই। ভারত নয়, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সাথে ভাষাগত কারণেই আমাদের একটা সম্পর্ক আছে। দু অঞ্চলের এমন বহু মানুষ আছে যাদের দু প্রজন্ম আগের পূর্বপুরুষরা অপর দেশটি থেকে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গে যেমন অনেককে পাওয়া যাবে যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেশ ভাগের সময় ভারতে চলে গেছে,আবার বাংলাদেশেরও এমন অনেককে পাওয়া যাবে যারা ভারত থেকে এদেশে চলে এসেছে। যোগাযোগের মূল মাধ্যম যে ভাষা,সেই ভাষা এক হওয়াতে সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকে দিয়ে দু অঞ্চলের মধ্যে একটা বন্ধন রয়েছে। এদেশে যেমন আমরা হুমায়ূনের পাশাপাশি সুনীল-সমরেশকে যত্ন করি,ওদেশেও তেমনি হুমায়ূন আহমেদ-জাফর ইকবাল স্যারদের বই পড়া হয়। মূলত অতীত সম্পর্ক এবং ভাষাগত মেলবন্ধনই এই সম্প্রীতির প্রধাণ কারণ। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গে ভারতের কথা আলাদা করে আর নাই বলি।শুধু এটুকু বলি,হুমায়ূন আহমেদ তাঁর ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ বই-এর ভূমিকায় লিখেছেন

“বইএর শেষে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ভারতীয় সেনাদের তালিকা দেয়ার ইচ্ছা ছিল আমার কিন্তু তাতে বই এর পৃষ্ঠা সংখ্যা আরও ১০০ বেড়ে যেত,তাই দেয়া হয়নি।”

স্বাভাবিক কারণেই ভারতের ‘সাধারণ মানুষের’ প্রতি আমার বিদ্বেষ নেই যেটা আছে পাকিস্তানের প্রতি।

ভারত আমাদের প্রভু নয়,বন্ধুরাষ্ট্র। কিন্তু পাকিস্তান কখনই বন্ধু নয়, যতদিন অবধি তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা না করছে। ভারতের বিরূদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ হচ্ছে ভারতের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরূদ্ধে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরূদ্ধে, অহেতুক দাদাগিরির বিরূদ্ধে, পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে, সীমান্তে হত্যা বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ। দেশের সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করার প্রতিবাদ যাতে তারা এই বিষয় গুলো সমাধানে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করে। এই প্রতিবাদ সমগ্র ভারতকে গালি দেয়া, ধর্মকে সামনে খাঁড়া করা কিংবা সকলের বিরূদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রতিবাদ নয়। কিন্তু পাকিস্তানের বিরূদ্ধে আমাদের যেটা, সেটা প্রতিবাদ নয়, বিশুদ্ধ ঘৃণা। পিতার হত্যাকারীর প্রতি ঘৃ্ণা, মায়ের ধর্ষকের প্রতি ঘৃণা, ভাইকে যে বেয়োনেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করেছে তার প্রতি ঘৃণা, আমার বোনের দু পা দু গাড়িতে বেধে গাড়ি দুটি বিপরীত দিকে চালিয়ে যারা আমার বোন কে দুভাগ করে ছিড়ে ফেলেছে তাদের প্রতি ঘৃণা- অবর্ণনীয় ক্রোধ। এই কাজের জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্রটি কোনদিন ক্ষমা চায়নি, কোনদিন ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। উল্টো এখন তারা আমাদের দেশের কুটনীতিক এর সাথে অসদাচারণ করে, আমাদের দেশে জঙ্গীবাদে অর্থায়ন করে, আমাদের দূতাবাসের কর্মচারীকে আটকে রাখার ধৃষ্টতা দেখায়। অথচ একদল ছদ্ম-বাংলাদেশী পাকিস্তান নিয়ে কথা বলতে গেলে সরাসরি কিছু বলার সাহস না পেয়ে ভারতকে টেনে এনে ব্যালেন্স করার চেষ্টা করে।

কাজেই যে বা যারা পাকিস্তান প্রীতি প্রদর্শন করে – সেটা খেলা হোক বা অন্য কোন মাধ্যমেই হোক তারা বাংলাদেশের প্রকাশ্য শত্রু, তারা বাংলাদেশের জন্মকেই অস্বীকার করে। ক্রিকেট খেলার সময় এরা বিভিন্ন ভাবে বিদ্বেষ ছড়ায়। তাসকিনের হাতে ধোনির কাটা মাথার ছবি এরাই তৈরি করে (পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কিন্তু এরা এটা করবেনা! ) । পাকিস্তানের জন্য এরা কান্নাকাটি করে। অন্যসব দেশের সাথে আমরা যখন ক্রিকেট খেলি বা অন্য কোন প্রতিযোগীতায় অবতীর্ণ হই তখন সেটা খেলা-বিনোদন-প্রতিযোগীতা। কিন্তু দেশটা যখন পাকিস্তান তখন হিসেবটা একটু ভিন্ন।

[ফুটনোটঃ ফেলানি হত্যাকান্ডের পর একদল ছেলেপেলে ভারত দূতাবাস ঘেরাও করার ডাক দেয়। ফেসবুকে ইভেন্ট খোলা হয়। সেই ইভেন্টে গোয়িং ছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি। প্রোগ্রামের দিন দেখা গেল সেখানে সর্বসাকুল্যে পঞ্চাশ জন উপস্থিত আছে। সেই পঞ্চাশ জনই ভারতীয় দূতাবাসের সামনে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। একটি ছেলে শ্লোগান শুরু করল- ‘কাটাতারে ঝুলছে কে-ফেলানি না বাংলাদেশ?’, ‘অ্যাকশন অ্যাকশন ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘ফেলানি হত্যার বিচার চাই’ ইত্যাদি। শ্লোগান শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ চলে আসলো,কথাকাটাকাটি হল। এরপর লোক সংখ্যা কম হওয়াতে সহজেই ছেলে গুলোকে পুলিশ এলাকা ছাড়া করল। শ্লোগান দেয়ার কারণে এন.এস.আই এক কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করল তাকে। সেদিন যতজন গোয়িং দিয়েছিল তার পাঁচ ভাগের একভাগ লোকও যদি সেখানে উপস্থিত থাকত তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম হতে পারত। সেদিন যে ছেলেটি ফেলানি হত্যার প্রতিবাদে দূতাবাসের সামনে শ্লোগান ধরেছিল,সেই ছেলেটি এই প্রবন্ধটির লেখক।]

২ thoughts on “ভারত বিদ্বেষ এবং পাকিস্তান বিদ্বেষ – পৃথক নাকি অভিন্ন?

  1. পাকিপ্রেমীরা সবসময় কোনোকিছু
    পাকিপ্রেমীরা সবসময় কোনোকিছু না-বুঝে ভারতবিরোধী। এটা ওদের জন্মগত আক্রোশ।
    লেখককে ধন্যবাদ।

  2. দুই বিদ্বেষ একই জিনিস,
    দুই বিদ্বেষ একই জিনিস, মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠি। দুইটাই তাবেদারী মনোভাব থেকে সৃষ্টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *