চেকপয়েন্ট (আদর্শ, দেশপ্রেম, স্বপ্ন আর স্বাধীনতার অল্প গল্প) – পর্ব-১

১০ নভেম্বর, ১৯৩২
৩ হ্যাম্বারস্টোন রোড, ক্যামব্রিজ
যুক্তরাজ্য


১০ নভেম্বর, ১৯৩২
৩ হ্যাম্বারস্টোন রোড, ক্যামব্রিজ
যুক্তরাজ্য

চৌধুরী রহমত আলী সাধারনত বেশী রাত করে ঘুমান না। ১০ টা বাজলেই ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু গত কয়রাত ধরে ঘুমাতে পারছেন না। তাঁর মাথার ভেতর একটা চিন্তা ঘুরঘুর করছে। দিনরাত তিনি ইসলামী ইতিহাস নিয়ে পড়ে থাকেন। খালেদ ইবনে ওয়ালিদ, হযরত আলী, হযরত ওমর, তারিক ইবনে জিয়াদ এদের বীরত্ব আর কারিশমা উনাকে উজ্জীবিত করে। মহানবী (সাঃ) যেভাবে বিচ্ছিন্ন আরব সম্প্রদায়কে একতাবদ্ধ করেছিলেন, তা তাঁকে প্রতিনিয়ত ভাবায় নিজেদের নিয়ে, নিজের মানুষদের নিয়ে। তাঁর কাছে নিজের মানুষ বলতে মুসলমান ভাই বোনেরা। তার মনে পড়ছে নিজের গ্রামের কথা, বালাচুর নাম সেই গ্রামের।

বালাচুর গ্রাম হিন্দু প্রধান, এখানে অনেক কিছুই মুসলমানরা নিজের ইচ্ছেমত করতে পারে না। উচ্চস্বরে আজান দেয়া যাবে না অথবা কুরবানীর সময় কিছু গরু জবাই হবে আল্লাহর নামে, তাও এলাকার হিন্দুরা হতে দেবে না। নিজের দেশেই তাঁর নিজেদের পরাধীন মনে হয়, পরাধীন মনে হয় সকল মুসলমানদেরকেই।

ইদানিং তিনি একটা বিষয় নিয়ে ভাবছেন। মুসলমানদের সকল ভোগান্তি আর অপমানের অবসানের জন্য এর হয়তো কোন বিকল্প নেই। সব কাফিরদের তো আর মুসলমান বানিয়ে ফেলা যাবে না, সেই পুরোনো দিনের মত ঈমানী শক্তি মানুষের মধ্যে আর কোথায়? সবাই তাবেদারী করতে ব্যস্ত। তবে রহমত আলীর বিশ্বাস একদিন এর অবসান হবেই। মুসলমানরা তাদের ভুল বুঝতে পারছে, এজন্যই এখন তারা ভারতীয় কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লীগ গঠন করেছেন। তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে আগের থেকে অনেক বেশি সচেতন। হাজার খানেক মুঘল কিংবা পাঠান যদি পুরো হিন্দুদের এই ভারত কেবল নিজেদের বীরত্বে দখল করে নিতে পারে, তবে এখন কেন তিন কোটি মুসলমানের এই উপমহাদেশে আবার কেন আল্লাহর দ্বীন কায়েম হবে না? হিন্দুস্তান নামটা তাঁর একদম পছন্দ না। উনার দৃঢ় বিশ্বাস একদিন আবার এখানে আবার মুসলমানদের রাজত্ব ফিরে আসবে। দ্বীন কায়েম হবে সবার উপরেই, একদিন না একদিন এই উপমহাদেশের সকল ধর্ম বর্নের মানুষের আবাসভুমির নাম হিন্দুস্তান থেকে পাল্টে হবে দ্বীনিয়া। বাংলার নাম হিসেবে উনি মনে মনে ঠিক করলেন ‘বাঙ্গীস্তান’ শব্দটা, যদিও বাঙ্গী এই অঞ্চলের তেমন কোন জনপ্রিয় ফল না। এই নাম বাঙ্গালীরা ঘৃনাভরে কিংবা হেসেই প্রত্যাখ্যান করতো, তবু প্রস্তাব করতে তো দোষ নেই। শত বছরের শোষনে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, আর দেরী নয়, এখনি অথবা আর কখনোই কিছু করা যাবেনা।

বাঁচতে হলে এখন থেকেই বাঁচার মত বাঁচতে হবে, নাহলে চিরদিনের মত হারিয়ে যাওয়াই সম্মানের হবে।

২৭ জানুয়ারী, ১৯৩৩
বালাচুর গ্রাম, হোশিয়ারপুর জেলা
পাঞ্জাব, অবিভক্ত ভারত

নিজেকে আজ ভারমুক্ত মনে হচ্ছে চৌধুরী রহমত আলীর। এতোদিন ধরে যে চিন্তা তিনি মাথায় নিয়ে ঘুরছিলেন সেটা সাজিয়ে লিখতে পেরেছেন। কয়েকজনের সাথে এ নিয়ে আলোচনাও করেছেন, প্রায় সবার মধ্যেই স্বপ্নের ঝলক দেখতে পেয়েছেন উনি। কেউ কেউ অবশ্য বলেছে অসম্ভব। তাদের নিশ্চয়ই ঈমানী শক্তির অভাব আছে। ঈমানী শক্তি থাকলে কোন অস্ত্রই দরকার হয়না!

উনি পরদিন সকালে স্থানীয় একটা ছাপাখানা থেকে হাজার খানেক প্যামপ্লেট ছাপিয়ে আনলেন। সব মুসলিম নেতাদের পাঠাতে হবে এসব, পৌছাতে হবে ইসলামের জন্য নিবেদিত প্রান কর্মীদের কাছে। জীবন দিয়ে লড়বার সময় এসেছে মুসলমানদের, “পাকিস্তানের” জন্য। এই নামটা উনি নিজে অনেক ভেবে বের করেছেন। মুসলমানদের আবাসভুমি হবে পাক পবিত্র, এরচেয়ে যুতসই নাম আর কিই বা হতে পারে? তিনি তার প্যামপ্লেটের শিরোনাম দিলেন,

“Now or Never; Are We to Live or Perish Forever?”

যা পরবর্তীতে পাকিস্তান ডিক্লারেশন নামে পরিচিত হবে। এই প্যাম্পলেট শুরু হয়েছে একটি আকর্ষনীয় বক্তবের মধ্যে দিয়ে।

“At this solemn hour in the history of India, when British and Indian statesmen are laying the foundations of a Federal Constitution for that land, we address this appeal to you, in the name of our common heritage, on behalf of our thirty million Muslim brethren who live in PAKSTAN – by which we mean the five Northern units of India, Viz: Punjab, North-West Frontier Province (Afghan Province),Kashmir, “I” for Indus, Sindh and Baluchistan.”

“পাকিস্তান, PAKSTAN, যা দিয়ে বোঝানো হয়েছে উত্তরের ৫ টি প্রদেশ পাঞ্জাব (P), নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স বা আফগান প্রভিন্স (A), কাস্মীর (K), সিন্ধ (S) আর বেলুচিস্তান (TAN)। PAKSTAN এর মাঝে একটা ‘I’ টা আসলে যোগ করা হল উচ্চারন সহজ করবার জন্য, Indus ভ্যালি অথবা অনেকের মতে সিন্ধু নদীর নামে, PAKSTAN হল PAKISTAN. হয়ে গেলো একটা দেশের নাম তৈরী করা, দেশটার নাম ‘পাকিস্তান’!!”

এই পাকিস্তানের সাথে উনি বাংলাকে যোগ করেননি। পাকিস্তান নামের সাথে বাংলা কখনোই ছিলনা।

১৯৩৬ সাল, ৭ই মার্চ
রাইনল্যান্ড, জার্মানি

ভোরের সূর্য্য মুখ তুলে চায়নি সেভাবে। জার্মান সেনাবাহিনীর উনিশটি পদাতিক ব্যাটালিয়ান এবং কিছু বিমান খুব নীরবতার সাথে রাইনল্যান্ডে প্রবেশ করেছে। সেনাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো এক স্কোয়ার্ড্রন মেসেরস্মিট জঙ্গী বিমান। বিমানগুলো পর্যবেক্ষনের কাজ করছিলো সামনে থেকে যাতে করে লক্ষ্যে পৌছাবার আগে কোন অঘটন না ঘটে। সকাল ১১ টার মধ্যেই তাঁরা রাইন নদীর তীরে পৌছে যায় এবং তিনটি ব্যাটালিয়ান কোন ধরণের ঝামেলা ছাড়াই রাইন নদীর পশ্চিম তীর অতিক্রম করলো। আর এরই মাধ্যমে জার্মানী ভার্সাই চুক্তির ৪২ ও ৪৩ নম্বর এবং লোকার্নো চুক্তির ১ ও ২ নং অনুচ্ছেদ ভঙ্গ করলো।

ফিরে দেখা যাক আরেকটু অতীতে। সময়টা ১৯১৮ সাল, নভেম্বর মাস। সবেমাত্র “দ্য গ্রেট ওয়ার” শেষ হয়েছে। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে একে ১ম বিশ্বযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে। পুরো জার্মানীতে থমথমে অবস্থা। সমগ্র জার্মানির ভাগ্য ঝুলে আছে মিত্রশক্তির হাতে। তাদের করুণার উপর নির্ভর করছে জার্মানির ভবিষ্যৎ কল্যাণ, উন্নতি ও সেই সাথে হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু মিত্ররা কোনো দয়া প্রদর্শন করল না। তারা জার্মানিকে বাধ্য করল এক নির্দয় ভার্সাই চুক্তিতে সই করতে।

চুক্তি অনুযায়ী, সমগ্র যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ জার্মানিকে একাই দিতে হবে। অথচ জার্মানির কোষাগার প্রায় শূন্য। যুদ্ধে মিত্রবাহিনী তাদের কম ক্ষতিসাধন করেনি। সেই ক্ষতি পোষাবার অর্থই জার্মানদের হাতে নেই, আর তারা দিবে সমগ্র যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ! (জার্মানী এই ক্ষতিপূরণ কিন্তু কিস্তিতে ঠিকই শোধ করেছিলো। ২০১০ সালের ৩রা অক্টোবর, জার্মানী তার ক্ষতিপূরণের শেষ কিস্তি পরিশোধ করে)।

এর বাইরে জার্মানীর নীতিনির্ধারকেরা, তথাপি মিত্রশক্তি, সিদ্ধান্ত নিল যে, জার্মান-ফ্রান্স সীমান্তের একটি অঞ্চল সম্পূর্নরূপে জার্মান সেনাবাহিনীমুক্ত রাখতে হবে। অর্থাৎ, ঐ অঞ্চলের ত্রিসীমানায় সেনাবাহিনীর ছায়াও থাকতে পারবে না। এতে সুবিধা হবে যে, ঐ অঞ্চলে সেনাবাহিনী প্রবেশ করা মাত্রই, ফরাসীরা নিজ মাতৃভূমিকে জার্মান আক্রমণ থেকে রক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যে যথেষ্ট সময় পেয়ে যাবে। এমনকি, সুযোগ পেলে ফ্রান্সে প্রবেশের আগেই জার্মান সেনাবাহিনীকে জার্মানিতেই থামিয়ে দেওয়া যাবে। এছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, জার্মানিকে নজরে রাখার জন্যে সেখানে মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্যে অবস্থান করবে। অবশ্য, মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে অঙ্গীকার করা হয় যে, তারা উক্ত অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিবে (এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ১৯৩০ সালে শেষ ফরাসি সৈন্য রাইনল্যান্ড ত্যাগ করে)। জার্মানির মানুষ এই সিদ্ধান্তটিকে কোনোদিনও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। এটা ছিলো তাদের জন্য খুবই অপমানের। তারা মনে মনে ঠিকই সুযোগ খুঁজে যাচ্ছিলো যথাযোগ্য জবাব দেবার।

ভার্সাই চুক্তির সীমানা সংক্রান্ত বিষয়ের ব্যাপারে জার্মানির সম্মতি আদায়ের লক্ষ্যে ১৯২৫ সালের ১ ডিসেম্বর, সুইটজারল্যান্ডের লোকার্নো শহরে জার্মানী, ফান্স, গ্রেট ব্রিটেন, ইতালি এবং বেলজিয়ামের মধ্যে একটি চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এতে জার্মানী অঙ্গীকার করে যে, অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর যে কোনো ধরণের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের ঘটনা ব্যাতিরেকে, তারা ভার্সাই চুক্তি নির্ধারিত সীমান্ত চুক্তিগুলো যথাযতভাবে মেনে চলবে। জার্মানী নিরুপায় হয়ে এই চুক্তিতে সাক্ষর করে, কারন, ১৯২৫ সালে রাষ্ট্র হিসেবে জার্মানী প্রায় দেউলিয়া হয়ে যেতে বসেছিল। মিত্রপক্ষের সাহায্য ছাড়া তার অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে যেত। যার কারণে, এক প্রকার বাধ্য হয়ে মিত্রপক্ষকে খুশি করবার জন্যে জার্মানী লোকার্নো চুক্তিতে সই করে। তবে এতে জার্মানদের মনের ভেতরের রাগ ক্ষোভ পুঞ্জিভুত হতে শুরু করে। তখন থেকেই রাইনল্যান্ড হয়ে দাঁড়ালো প্রতিশোধ নেবার জন্যে জার্মানদের প্রথম টার্গেট।

রাইন নদীর উপরের সেতু পার হয়ে শহরে প্রবেশের সময় জার্মান সেনারা এক অভুতপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করে। তাদের উপর কড়া নির্দেশ ছিল সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রেখে সম্মুখে অগ্রসর হবার। কিন্তু এমন দৃশ্য দেখে বিমোহিত না হয়ে পারা যায় না। সৈন্যদের চলার পথের দুধারে উৎসুক জনতার ভিড়। আগাম খবর পেয়ে তারা চলে এসেছে সৈন্যদের অভ্যর্থনা জানাতে। অনেকেই ফুল নিয়ে এসেছেন, সৈন্যদের উপহার হিসেবে দেওয়ার জন্যে। হাতের ফুলগুলো তারা পথের উপর বিছিয়ে দিতে লাগলেন। জনগণ বিস্ময়ে ভাবতে লাগল, ‘দিনে দুপুরে কথা নেই বার্তা নেই, রাইনল্যান্ডে হুট করে সেনাবাহিনী ঢুকে পড়েছে! এমন বুকের পাটা তো আর কারও কখনো হয় নি! আর কত খেল দেখতে হবে ফুয়েরারের আমলে!’

ঠিক এই সময়েই ব্যারন ভন নিউর‍্যাথ ইতালিয়ান এম্ব্যাসেডর কাউন্ট বার্নার্ডো, ব্রিটিশ এম্বেসেডর স্যার ফিলিপ্স এবং ফ্রেঞ্চ এম্বেসেডর ফ্র্যাঙ্কোইস পঙ্কেলকে পররাস্ট্র দফতরে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। উদ্বেগটা অবশ্য তিনি ঢেকে রাখতে পারছিলেন না। রাস্ট্রদুতেরা এখনো জানেন না যে নিউরাথ তাদের কেন এত জরুরি তলব করেছেন। নিউরাথ দূতদের সাথে শুরু থেকে একটি কথাও বলেননি। তিনি আসলে একটি টেলিফোন কলের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। যদি ভালো খবর থাকে তাহলে তিনি তার অতিথিদের যাবতীয় ঘটনাবলি খোলাসা করে বলবেন। খারাপ খবর হলে, কিছুক্ষণ অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথা বলে তাদের ভাগিয়ে দেওয়াটাই আপাতত তার পরিকল্পনা। ১০টা বাজার কিছুক্ষণ পরে টেলিফোন কলটি আসে। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিটির কথা শুনে নিউরাথের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। নিউর‍্যাথ রাস্ট্রদুতেদের হাতে পত্র তুলে দিলেন তাদের নিজ নিজ সরকারকে অবগত করবার জন্য যে, ফ্রান্স লোকার্নো চুক্তি ভঙ্গ করেছে ফ্রেঞ্চ-সৌভিয়েত আক্রমণাত্মক চুক্তির মাধ্যমে। আর এই কারণে জার্মানী লোকার্নো চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে রাইনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে রাইনল্যান্ডে প্রবেশ করেছে।

নিউরাথ অবশ্য এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, বিশ্বশান্তির সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। নতুন করে আবার সবকিছু শুরু করা যেতে পারে।

১৯৩৬ সালের ৭ই মার্চ
রাইখস্ট্যাগ, বার্লিন।
দুপুর ১ টা।

বিশাল এক সম্মেলন কক্ষে হিটলার ভাষন দিচ্ছেন। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বললেন যে কেন ভার্সাই চুক্তি একটি অন্যায্য চুক্তি। তিনি এটাও বললেন যে তিনি শান্তিপ্রিয় মানুষ এবং যেকোন ধরনের যুদ্ধের বিপক্ষে। অন্যায় চুক্তি হলেও শান্তির জন্য তিনি ভার্সাই এবং লোকার্নো চুক্তি মেনে চলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এরপরপরই তিনি ঘোষনা করলেন যে রাইনল্যান্ডে জার্মান সেনারা প্রবেশ করেছে। উপস্থিত জনতা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো। কিছুক্ষন পর কেউ সম্বিত ফিরে পেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো,

– “হেইল হিটলার!”

জনতা সমস্বরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো,

– “হেইল হিটলার!”

হিটলার বুঝতে পারলেন তিনি বাজী জিতে গেছেন। দৃপ্ত কন্ঠে তিনি ঘোষনা করলেন,

– “জার্মানি ভার্সাই চুক্তি এবং লোকার্নো চুক্তির শিকল দ্বারা আর আবদ্ধ নয়। নিজ দেশের অঞ্চলে সার্বভৌমত্ব বজায় রাখাটা একজনের রাষ্ট্রীয় অধিকার। এই অধিকার কেউ হরণ করতে পারবে না। আর সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই দেশপ্রেমিক জার্মান সেনারা রাইনল্যান্ডে আজ রাষ্ট্রের পুর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।”

সববেত জনতা ডান হাত উঁচিয়ে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “হাইল, হাইল, হাইল!!!!” এরপর তুমুল আনন্দে ফেটে পরেছে রাইখস্ট্যাগে উপস্থিত জনতা।

কিছুক্ষণ পর হিটলার বললেন,

– “হে জার্মান জনগণ! আজ এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, যখন আমাদের দুর্দমনীয় সেনাবাহিনী জার্মানির পশ্চিম প্রান্তে দুর্বার গতিতে তাদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করছে, আসুন আমরা দুটো পবিত্র শপথে নিজেদের আবদ্ধ করি।

প্রথমত, আমরা শপথ করছি, আমরা আর কোনোদিন কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করব না।

দ্বিতীয়ত, আজ থেকে জার্মানি, ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে, বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে এক শান্তিপূর্ণ ও সমঝোতামূলক সমপর্কে আবদ্ধ হবে। অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করবার কোনো ইচ্ছাই আমাদের নেই। কারণ আমরা এর মর্ম বুঝি। জার্মানি কোনোদিন বিশ্বশান্তি হরণ করবে না।”

এতটুকু বলে হিটলার তার বক্তৃতার ইতি ঘটালেন। তিনি তার জেনারেলদের সঙ্গে নিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন। তার চোখ মুখ ছিল উজ্জ্বল, সপ্রতিভ এবং প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। কিন্তু অন্যদিকে তার পিছনে থাকা জেনারেলদের দিকে তাকিয়ে ঠিকই অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তা টের পাওয়া যাচ্ছিল। বলা তো যায় না, যদি মিত্রপক্ষ আক্রমণ করে?

রাইনল্যান্ড অভিযানের মত সিদ্ধান্ত নেওয়াটা হিটলারের পক্ষে সহজ ছিল না। তবে অপারেশনের জন্যে তিনি যে সময়সীমা নির্ধারণ করেছিলেন, তাতে অপারেশনের সাফল্য ছিল অবধারিত। হিটলার সঠিকভাবেই পালটা আক্রমণের ক্ষেত্রে ফরাসিদের উদাসীনতা এবং ব্রিটিশদের নমনীয়তার বিষয়টি ধরতে পেরেছিলেন। হিটলারের গোয়ার্তুমি স্বভাব আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এই অপারেশনের পেছনে একটা মুল চালক ছিলো। জার্মানীর ধ্বংসের পেছনেও কাজ করবে আর এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর গোয়ার্তুমি। রাশিয়া আক্রমন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্ত হয়ে থাকবে পরবর্তীতে। একসাথে দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ শুরু করে জার্মানীর যুদ্ধ চালিয়ে যাবার শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসবে খুব দ্রুতই।

যদি ফ্রান্স জার্মানিকে আক্রমণ করত অথবা আক্রমণের সামান্য আভাস দেখাতো, তাহলে নিশ্চিতভাবে এদিনই হিটলারের পতন ঘটতো। কেননা এই পরিকল্পনা ছিল সম্পূর্ণরূপে হিটলারের মস্তিস্কপ্রসূত। অপারেশনটি ব্যর্থ হলে তাকেই এর দায়ভার নিতে হত। অপারেশনের আগে, হিটলারের কাছে জেনারেলগণ অপারেশনটি এক বছর পিছিয়ে দেবার জন্যে হেন কোনো অনুরোধ নেই যা করেননি। এমনকি অপারেশন চলাকালেও বেশ অনেকবার পিছ্যে আসবার জন্য অনুরোধ করেছিলেন তারা। কিন্তু হিটলার তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন, তার প্রধান সমর্থক ছিলেন নিউর‍্যাথ।

কিন্তু মিত্রপক্ষ আক্রমণ করল না। ফ্রান্স তার সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হল। ফরাসি সেনাবাহিনীর হর্তাকর্তাগণ, এক রাইনল্যান্ডের জন্যে এত বড় মাপের একটি পালটা আক্রমণ চালাতে নিরুৎসাহিত ছিলেন। তাছাড়া, এত বড় সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করাটা ছিল প্রচুর অর্থের ব্যাপার। রাইনল্যান্ড বিষয়ে তারা তা করতে রাজি ছিল না। অথচ ফরাসিরা খুব ভালো করে জানত, রাইনল্যান্ড জার্মানদের দখলে চলে যাওয়ার অর্থ হল, নিজের সীমান্ত সম্ভাব্য জার্মান আক্রমণের সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়া।

অন্যদিকে দ্বীপরাষ্ট্র ব্রিটেন ছিল কিছুটা সহানুভুতিশীল। তারা বলতে লাগল, জার্মানরা তো অন্য দেশ দখল করে বসেনি। তারা তাদের দেশে যা ইচ্ছা তা করুক, ক্ষতি কি? ওরকম একটা নিষেধাজ্ঞা প্রথমে জারি করে জার্মানিকে রাগিয়ে দেওয়াটাই ছিল একটি ভুল কাজ।

আর এভাবেই ভাগ্যক্রমে হিটলার এবং জার্মানী লাভ করলো এক অভুতপূর্ব সাফল্য। সমগ্র জাতি নতুন চেতনায় উদ্দীপ্ত হলো। আর এর মাধ্যমেই সুচনা হল জার্মান সামরিকীকরনের। হিটলার অসফল হলে সাথে সাথেই তার পতন ঘটতো এবং ইতিহাসে হিটলারের নাম সাধারন একজন চান্সেলর হিসেবেই লেখা হতো। শুরু হতোনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সুচনা না হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দুর্বল হতোনা। অন্ততপক্ষে ভাআরতীয় উপমহাদেশ আরো অনেক বছর শাসন করবার শক্তি তাদের থাকতো। আর সেটা না হলে পাকিস্তানের সৃস্টি হতো আরো পরে, বাংলাদেশের সৃস্টি হয়তো আরো পরেই হতো কিংবা বাংলাদেশ শুরু থেকেই স্বাধীন রাস্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতো। হয়তো এসব প্রশ্ন থেকে যাবে কেবল তাত্ত্বিক বিশ্লেষনের মধ্যেই।

মার্চ ১৯৪২
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ওয়েস্ট মিনিস্টার এব্যেতে নিজ কার্য্যালয়ে আসবার জন্য অনুরোধ করেছেন হাউস অফ কমন্সের নেতা স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপসকে। কিছুদিন আগেই জাপানী বাহিনীর হাতে সিঙ্গাপুরের পতন ঘটেছে, তাঁরা আধিপত্য বিস্তার করেছে মালয় দীপপুঞ্জের উপর।। এরই মাঝে আমেরিকানরাও ভারতীয়দের স্বাধীনতার জন্য প্রকাশ্যে সমর্থন ঘোষনা করেছে। ভারতকে এই মুহুর্তে ভীষন দরকার ব্রিটিশদের। নাহলে এখন পর্যন্ত অক্ষশক্তির কাছে প্রচন্ড মার খাচ্ছে ব্রিটেন এবং মিত্র শক্তি। রাশিয়া এখনও জার্মানীর মিত্র। আমেরিকাও নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে। ক্রমেই দুর্দমনীয় হয়ে উঠছে জার্মানরা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন সকল রাজ্য, কলোনীর সর্বাত্মক সহযোগিতা এই মুহুর্তে ভীষন দরকার, নাহলে ব্রিটেনের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পরবে।

চার্চিল স্যার ক্রিপসকে বোঝাচ্ছেন যে তাঁকে কি কি কাজ করতে হবে। তাঁকে বিশেষ দুত হিসেবে যেতে হবে ভারতে। সেখানে গিয়ে তিনি ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের সমর্থন আদায়ের চেস্টা করবেন এই যুদ্ধে বৃটেনের সমর্থনে, বিনিময়ে ভারতকে যুদ্ধ শেষে দেয়া হবে ডমিনিয়নের মর্যাদা।

(ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস হচ্ছে ব্রিটেনের রাজা কিংবা রানীকে সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নিয়ে স্বাধীন রাস্ট্রের অধিকার কিংবা মর্যাদা। ভারত এবং পাকিস্তান যথাক্রমে ১৯৫২ এবং ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ডমিনিয়ন ছিলো, এরপর প্রজাতন্ত্র পরিনত হয়। সে সময় ডমিনিয়ন অফ ইন্ডিয়া এবং ডোমিনিয়ন অফ পাকিস্তানের সরকার প্রধান ছিলেন বৃটেনের রাজা কিংবা রানী। নামেমাত্র প্রধান থাকতেন, নিজেদের শাসনভার এবং সকল বিষয়ে কর্তৃত্ব ছিল নিজ নিজ সরকারেরই।)

তিনি স্যার ক্রিপসকে বললেন,

– “আমাদের হাতে আর কোন উপায় নেই এই যুদ্ধে টিকে থাকতে হলে। ভারতের স্বাধীনতার বিনিময়ে হলেও আমাদের এই মুহুর্তে তাদের সমর্থন আর সহযোগিতা দরকার। নাহলে জাতি হিসেবেই আমাদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পরে যাবে।“

স্যার ক্রিপস উনাকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে,

– “আপনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন। ওরা নানা দলে আর মতে এতটাই বিভক্ত যে একজন রাজী না হলেও আরেকজন ঠিকই সহায়তা করবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করতে। বড় রকমের শক্তি আমরা ভারত থেকে অবশ্যই পেয়ে যাবো।“

স্যার ক্রিপস ভারতে আসলেন। তিনি কংগ্রেসের সামনে প্রধানমন্ত্রীর আবেদন এবং প্রস্তাবনা তুলে ধরলেন। কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এই প্রস্তাবে সায় দিলেন, যদিও মহাত্মা গান্ধী এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন। তিনি নিঃশর্তে ইংরেজদের ভারত ছাড়বার দাবী জানালেন।

(সে সময়ে ভারতের একমাত্র শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বলতে এই কংগ্রেসই ছিল, যারা পুরো ভারতের সকল দল আর মতের প্রতিনিধিত্ব করতো ১৮৮৫ সালে কিছু আইনজীবির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠার পর। ধীরে ধীরে এই দল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে।)

স্যার ক্রিপস ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দল এবং নানা প্রিন্সলী স্টেট এবং মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ রাজ্যের সমর্থন নিয়ে ফেরত গেলেন লন্ডন। ভারত থেকে যুদ্ধে যোগ দিলো প্রায় এক মিলিয়ন সেনা। অনেক রাজা, নবাব এবং রাজপুত্ররা ইউরোপের বিভিন্ন ফ্রন্ট্রে নিজ নিজ সেনাদল নিয়ে মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করলেন। বার্মা ফ্রন্টে জাপানী বাহিনীর বিরুদ্ধে এই ভারতীয় সেনারাই তাদের ঠেকিয়ে রাখলো অনেকদিন। তাদের অগ্রযাত্রা বার্মা ফ্রন্টে এসেই সম্মুক্ষীন হলো ভারতীয় বাঁধার।

মে মাস, ১৯৪২ সাল
বার্লিন, জার্মানী

রাইখস্ট্যাগে এক সংবাদ সম্মেলনে ভাষন দিচ্ছেন হিটলার। উনি বললেন,

“আমরা যদি ফ্রান্সকে ভয় পেয়ে সেদিন যদি আমার সেনাবাহিনী রাইনল্যান্ড থেকে পিছু হটতে নির্দেশ দিতাম, তবে তা হত এক চরম ভুল এক সিদ্ধান্ত।”

হিটলার রাইনল্যান্ড পুনঃসামরিকীকরনের ব্যাপারে বলবেন,

“রাইনল্যান্ডে প্রবেশের পরবর্তী ৪৮ ঘন্টা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে স্নায়ুক্ষয়ী এবং চাঞ্চল্যকর। সেদিন যদি ফরাসিরা আক্রমণ করত, তবে জার্মান সেনাদের প্রানরক্ষায় পালিয়ে আসা ছাড়া আর কোন গতি ছিলনা, কারন, সেই সময় যে সামরিক রসদ আর অস্ত্রসম্ভার জার্মানীর ভান্ডারে ছিল, তা দিয়ে ফরাসিদের সামান্য আক্রমণ মোকাবেলা করার মত সামর্থ আমাদের ছিল না।“

সেই সময় ফ্রান্সের ছিল প্রায় ১৬০ টি পদাতিক ডিভিশন। জার্মানীর তুলনায় যে সেনাবাহিনী ছিলো প্রায় দশ গুন বড়। ফ্রান্সের সেনারা মার্চ করে গেলেও জার্মানী তলিয়ে যেতে বাধ্য ছিলো সেই সময়।

উনি যে আজ ভুল বলেছেন উনি সেটা নিজেও বুঝতে পারছেন না। আর অল্প কয়বছরের মধ্যেই জার্মানবাসীরা বুঝে যাবেন, তিনি যদি সেদিন ফ্রান্সের সেনা সমাগমে ভয় পেয়ে পিছু হটে আসতেন, তবে পৃথিবীর ইতিহাসের এই বিংশ শতাব্দীর ঘটনাপ্রবাহ লেখা হতে পারতো অন্যভাবে।

আগস্ট মাস, ১৯৪২
দিল্লী, অবিভক্ত ভারত

কংগ্রেসের বেশিরভাগ নেতাই বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটীশদের সহায়তার বিনিময়ে ভারতের ডমিনিয়ন মর্যাদা লাভের সুযোগ গ্রহন করলেও মহাত্মা গান্ধী তা মানতে রাজী নন। তিনি ঘোষনা করলেন “ভারত ছাড়” আন্দোলনের, যার মাধ্যমে তিনি দাবী জানালেন সংবিধানের আমুল পরিবর্তন এবং নিজেদের শাসনের অধিকারের। ব্রিটিশরা এই আন্দোলনকে মারাত্মক হুমকী হিসেবে বিবেচনা করলো তাদের শাসনের জন্য, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর এমন বিপদে আর কখনো পরতে হয়নি তাদের অবিভক্ত ভারতে। বিশ্বযুদ্ধের ফলস্বরুপ তাদের শক্তি সামর্থ্য ক্রমশই কমে আসছিলো, যা ঠেকাতে ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের প্রায় সকল প্রধান নেতাকে কারাবন্দী করে। ১৯৪৫ সালের আগস্টের পর্যন্ত তাঁরা বন্দী থাকবেন, যতদিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফয়সালা হয়ে যাবে। মহাত্মা গান্ধী চেয়েছিলেন অবিভক্ত ভারত, কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি তিনি নিজ হাতেই ভারত বিভক্তির বীজ বপন করতে যাচ্ছেন।

যদিনা সেই সময়ে কংগ্রেস দুর্বল হয়ে যেতো এবং তার ভারত ছাড় সিদ্ধান্তের কারনে কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা কারাগারে নিক্ষিপ্ত না হতো তবে হয়তো মুসলিম লীগ সারা ভারতে এতোটাও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারতোনা। কংগ্রেসের সাথে মুসলমান নেতাদের তীব্র বিরোধ তীব্রতর হয় সেই সময়েই এবং মুসলমান নেতারা মুসলমানদের জন্য আলাদা ভুমির দাবীতে অনঢ় অবস্থান গ্রহন করেন।

ঠিক এ সময়টাতেই শক্তিশালী হয়ে উঠবে মুসলীম লীগ। তিন বছর তাঁরা ফাঁকা ময়দান পাবেন তাদের কার্যক্রম চালাবার জন্য। এর আগ পর্যন্ত মুসলিম লীগ এতোটা সংগঠিত হতে পারেনি যা তাঁরা ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫, এই তিন বছরের মধ্যেই হয়ে উঠবে। মুসলীম লীগের নেতা জিন্নাহ পরবর্তিতে এ ব্যাপারে নিজেই স্বীকার করবেন যে,

“ যে যুদ্ধটা আমরা কেউই চাইনি, সেই যুদ্ধই আমাদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দিয়েছিলো।“

উনি আমাদের বলতে মুসলমানদেরই বুঝিয়েছিলেন।

জুন মাস, ১৯৪৬
দিল্লী, অবিভক্ত ভারত

কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জওহরলাল নেহেরু ও বল্লভ ভাই প্যটেল্‌ এবং মুসলীম লীগের পক্ষ থেকে লিয়াকত আলী খান ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আজ ভারতের বিভক্তিতে সম্মত হয়েছেন। শিখদের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছেন আকালি দলের নেতা মাস্টার তাঁরা সিং। তাঁরা ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত করার ব্যাপারে নিজেদের সম্মতি জানিয়েছেন, যদিও কংগ্রেসের প্রধান নেতা মহাত্মা গান্ধী এর বিরোধী ছিলেন। এর আগে ১৯৪৬ সালেই বৃটেনের লেবার পার্টি সরকার ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে সম্মতি জানায়। হিন্দু এবং শিখ সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে গঠিত হবে ভারত এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে গঠন করা হবে পাকিস্তান।

এর পরপরই শুরু হবে এ অঞ্চলের ভয়াবহতম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার, যার নিষ্ঠুরতার সীমা অতিক্রম দেখতে এই অঞ্চলকে অপেক্ষা করতে হবে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত।

১৪ই আগস্ট ১৯৪৭
করাচী, ডোমিনয়ন অফ পাকিস্তান

আর এই উপমহাদেশের পূর্ব আর পশ্চিম অংশে নতুন একটি পতাকা উড়েছে, চাঁদ তাঁরা খচিত ডোমিনিয়ন অফ পাকিস্তানের (পাকিস্তান অধিরাজ্য) সবুজ পতাকা। যদিও এই দুই অংশের মাঝে এখনো উড়ছে ব্রিটিশ প্রতাকা। কেবলমাত্র ধর্মের নামে পৃথিবীর এই অংশের দুটো বিচ্ছিন্ন অংশকে বেধে ফেলা হলো একত্রে। মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ হলেন এই রাস্ট্রের প্রথম গভর্ণর জেনারেল, যার রাজধানী হলো করাচী।

১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭
দিল্লী, ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া

আজ ভারতও আত্মপ্রকাশ করলো একটি স্বাধীন রাস্ট্র হিসেবে, যদিও তার আকার এখন আগের চেয়ে বেশ অনেকটাই কমে গেছে পাকিস্তান সৃস্টি হবার কারনে। নয়া দিল্লীতে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে দ্বায়িত্বভার গ্রহন করলেন সরকারের প্রধানেরা। জওহরলাল নেহেরু হলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক অবিভক্তি ভারতের ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন সংযুক্ত ভারতের প্রথম গভর্নর হিসেবে পরিবর্তিত পদেই রয়ে গেলেন। মহাত্মা গান্ধী এই আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করে বাংলায় রয়ে গেলেন, সেখানে তিনি উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করতে ব্যস্ত ছিলেন নাকি ভারত বিভক্তির কষ্ট ভুলতে ব্যস্ত ছিলেন সেটা কারোই জানা হবেনা।

এর আগে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি পরিকল্পনা করেন। “৩ জুনের মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা” নামে পরিচিত এই পরিকল্পনা নতুন দুইটি ডোমিনিয়নের মধ্যে ভুমি থেকে শুরু করে সামরিক বেসামরিক সকল সম্পদের ভাগাভাগীর কথা বলা হয়। পরিকল্পনাটি অবিভক্ত ভারতের নেতাদের সামনে ২রা জুন ১৯৪৭ সালেই পেশ করা হয় এবং উনারা এতে সম্মতি জানান। প্রিন্সলি স্টেট এবং অন্যান্য মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ রাজ্যগুলোর এই পরিকল্পনার বাইরে ছিলো। ৩ জুন একটী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই পরিকল্পনার কথা প্রথম প্রকাশ করা হয় যাতে ভারতের স্বাধীনতার সময় নির্দিস্ট করা হয় ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭। প্রিন্সলী স্টেট এবং অন্যান্য রাজ্যগুলোকে তিনি অনুরোধ করেন স্বাধীন না থেকে ভারত অথবা পাকিস্তান, যেকোন একটি ডমিনিয়নে যোগদান করতে। প্রিন্সলী স্টেওগুলোর স্বাধিনভাবে যেকোন একটিতে যগদান করতে পারবার ক্ষমতা পরবর্তীতে নানা সমস্যার তৈরী করে। ভারত পাকিস্তান ভাগ হবার পরপরই মুসলিম প্রধান কাশ্মীরের হিন্দু রাজা ভারতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন এবং এ কারনে দুইদেশ প্রথমবারের মত যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। এবং চিরবৈরীতার সুতপাত ঘটে প্রধানত কাশ্মীর ইস্যুতেই। সেগুলো অন্য এক অধ্যায়। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার প্রধান বিষয়গুলো ছিলোঃ

– পাঞ্জাব এবং বাংলার শিখ ও হিন্দু এবং মুসলমানদের বিভক্তির জন্য নিজ নিজ আসনসমুহের মাধ্যমে ভোট গ্রহন করা হবে। যদি তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিচ্ছিনতা চায়, তবে সেই প্রদেশগুলোকে বিভক্ত করা হবে।
– সিন্ধু এ ব্যাপারে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।
– উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং আসামের সিলেট জেলার ভাগ্য নির্ধারিত হবে ভোটের মাধ্যমে।
– ভারত স্বাধীন হবে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ সালের মধ্যে।
– বাংলাকে আলাদাভাবে স্বাধীনতা দেয়া হবেনা।
– বিভক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে একটি সীমান্ত কমিশন গঠন করা হবে।

এভাবেই খুব দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠা মুসলীম লীগের একটি স্বতন্ত্র আবাসভুমির দাবী মেনে নেয়া হলো। এর প্রধান দুর্বলতা ছিলো এটাই যে ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ করে হাজার মাইল দুরবর্তী দুটি অঞ্চলকে একটি রাস্ট্রের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। এরচেয়ে অবিভক্ত বাংলাই সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ব্যাপার হতো। এ ব্যাপারে বাংলার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভাই সত্যেন বসু প্রমুখ নেতারা দাবী জানিয়েছিলেন কিন্তু কংগ্রেসের তীব্র বিরোধীতায় তা বাতিল হয়ে যায়। কংগ্রেসের দাবীমত ভারতকে যতটা সম্ভব অবিভক্ত রাখবার চেস্টা করা হয় এবং পাকিস্তান নামক রাস্ট্রকে আয়তনে যথাসম্ভব সংক্ষিপ্ত রাখবার চেস্টা করা হয়। এভাবে মাউন্টোব্যাটেন পরিকল্পনার মাধ্যমে মুসলমানদের আলাদা রাস্ট্রের দাবীও মেনে নেয়া হয় এবং ভারতকেও যথাসম্ভব অবিভক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ ব্যাপারে বাউন্ডারী কমিশন গঠন করা হয় ৫ জনের সমন্বয়ে, যাতে কংগ্রেসের মনোনীত দুজন হিন্দু এবং মসলীম লীগের মনোনীত দুজন মুসলিম বিচারপতি ছিলেন পাঞ্জাব এবং বাংলার জন্য গঠিত বাউন্ডারী কমিশনে। উভয় কমিশনের চেয়ারম্যানই ছিলেন স্যার র‍্যাডক্লিফ। বাংলার বিভক্তির জন্য গঠিত বাউন্ডারী কমিশনের বিচারপতিরা ছিলেন সি সি বিশ্বাস, বি কে মুখার্জী, আবু সালেহ মোহাম্মদ আকরাম এবং এস এ রহমান।

পেশায় আইনজীবি স্যার রেডক্লিফ এবং তার কমিশনের সদস্য কারোই এই কাজ করবার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ছিলনা। কারো কাছ থেকে উপদেশ নেবেন এ উপায়ও ছিলনা। এর বাইরে সময়ও ছিলো খুব সংক্ষিপ্ত। যথাযথ জরিপ এবং পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা ছিলো কঠিন কাজ। বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আর্থিক দৈন্যদশার কারনে ব্রিটেনের পক্ষেও জরিপ কাজের জন্য ব্যয় করবার মত পর্যাপ্ত অর্থও ছিলনা। এর বাইরে জাতিসংঘের মত আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুপস্থিতি অতি দ্রুত কাজ সম্পন্ন করে নিজের লোকেদের কাছেই বৃটেনের মুখ রক্ষা করে কোনক্রমে।

এর বাইরেও স্যার রেডক্লিফ কিছু অদ্ভুত সমস্যার মুখে পড়েন। যেমন দুপক্ষের দুজন করে বিচারপতি সদস্য হিসেবে নেয়া হয়েছিলো সিদ্ধান্তগুলোতে ভারসাম্য আনতে। কিন্তু সেটা না হয়ে বরং আরো সমস্যার সৃস্টি করে। প্রতিটি ইস্যুতে সদস্যরা ২-২ ভোটে বিভক্ত সুপারিশ করেন। যার ফলে পুরো ব্যাপারের সিদ্ধান্তগুলো স্যার রেডক্লিফ একার সিদ্ধান্তেই গ্রহন করতে বাধ্য হন। তাদের নিজেদের মধ্যে বিদ্ধেষ চরমে পৌছে। এমনকি পাঞ্জাব বাউন্ডারী কমিশনের একজন শিখ বিচারপতিকে তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানসহ লাহোরে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় স্বাধীনতা লাভের কিছুদিন আগে।

পাঞ্জাবের ব্যাপারে প্রধান সমস্যা এটাই ছিল যে সেখানে আসলেই কোন ধরনের বাউন্ডারী টানা সম্ভব ছিলনা। সকল অঞ্চলেই মুসলমান, শিখ এবং হিন্দুদের আবাস ছিলো কম বেশি। এর বাইরে অনেক শিখই নিজেদের আলাদা রাস্ট্রের দাবী করে। তবে ব্রিটিশরা পাঞ্জাবের প্রতি পক্ষপাত দেখায় কিছুটা এ কারনে যে এই রাজ্য থেকে অনেক সেনা ব্রিটিশদের হয়ে যুদ্ধ করেছে আনুগত্যের নিদর্শন রেখে শত বছর ধরে। অনেক বিতর্কের অবকাশ রেখে পাঞ্জাবকে বিভক্ত করা হয়। এর প্রধানত পশ্চিম অংশ হয় পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ আরে পূর্বের অংশ ভারতীয় পাঞ্জাব রাজ্যে পরিনত হয়। লাহোর আর জয়সলমীর সম্পর্কে কমিশন কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি, জনসংখ্যার অনুপাত প্রায় সমান সমান ছিলো এ দুটি শহরে। এরপর স্যার রেডক্লিফের একক সিদ্ধান্তে লাহোরকে পাকিস্তানের ভাগে আর জয়সলমীরকে ভারতের অংশে দেয়া হয়।

বাংলার বাউন্ডারী কমিশনের প্রধান সমস্যা ছিল কলকাতা কোন দেশের অধীনে যাবে সেটা। হিন্দু মুসলমান আর শিখ বাদে অন্য কোন জাতির কোন প্রতিনিধি ছিলনা কমিশনগুলোতে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধদের যেমন কোন প্রতিনিধি ছিলনা এ কমিশনে। তারা দেশ ভাগের দুদিন পর জানতে পারে তাদের নিয়তি কোথায় নির্দিস্ট হচ্ছে।

তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং সময় স্বল্পতার কারনে সকল জটিল সমস্যার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্যার রেডক্লিফ নিজে প্রহন করেন এবং তাঁকে এই সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাপারে নিঃসন্দেহ মনে হয়। যদিও তিনি এর আগে কখনোই ভারতে আসেননি এবং এই অঞ্চলের ব্যাপারে তার কোন ধরনের ধারনাই ছিলনা। বলা হয় যে তার এই অনভিজ্ঞতা এবং না জানাটাকেই তার যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়, যেহেতু এক্ষেত্রে তিনি নিরপেক্ষ হিসেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কারো কিংবা কোনকিছুতে প্রভাবিত না হয়ে। তিনি তার ফাইলপত্র তার ব্যক্তিগত সহকারীর কাছেও প্রকাশ করতেননা। তিনি এ ব্যাপারে কোন ধরনের আপত্তি কিংবা প্রস্তাব গ্রহন করেননি পরবর্তীতে।

তার ধারনা ছিল যে তিনি যে সিদ্ধান্তই নেননা কেন মানুষ দুর্ভোগে পরবেই। তার এই ধরনের ধারনার পেছনের কারনগুলো আজীবন অজানাই থেকে যাবে, কারন একটি সুত্র মতে ভারত ত্যাগের আগে তিনি এ সংক্রান্ত সকল দলিলপত্র ধ্বংস করে দিয়ে যান। এই ব্যাপারে পরে একটি চলচ্চিত্রও তৈরী হয় “ড্রয়িং দ্যা লাইন” নামে। তার স্ক্রিপ্ট তৈরী করেন হাওয়ার্ড ব্রেন্টন। সাইরিল রেডক্লিফের চরিত্র সম্পর্কে উনি বলেন যে, তিনি বিবেকের দংশনে জর্জরিত হচ্ছিলেন। তিনি স্যার রেডক্লিফ সম্পর্কে লেখেন,

“আমি এমন উপাত্ত পেয়েছি যাতে মনে হয়েছে তিনি তার বাংলোয় মানসিক অস্থিরতায় ছিলেন। উনি তার প্রাপ্য ফি নিতে অস্বীকার করেন এবং সকল দলিল ও খসড়া ম্যাপ একত্রিত করেন। এরপর তিনি সেগুলো লন্ডনে সঙ্গে করে নিয়ে যান এবং পুড়িয়ে ফেলেন। বাদবাকী জীবনে তিনি এ সম্পর্কে আর একটি শব্দও উচ্চারন করেননি, এমনকি তাঁর পরিবারের কাছেও। আমার মস্তিস্ক এসব সত্য ধারনে অক্ষমতা জানায় বিস্ময়ে যখন আমি এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পারি।“

আরও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে যে রেডক্লিফ ভারত স্বাধীন হবার দিন দেশ ছাড়েন, এরপরদিন ভারত এবং পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের কাছে ভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কপি দেয়া হয় পড়ে দেখবার জন্য এবং ১৭ আগস্ট ১৯৪৭ সালে এটা প্রকাশ করা হয়, দেশ ভাগের দুইদিন পর! তারমানে সত্যিই কোন উপায় ছিলনা এই সিদ্ধান্ত কিংবা ফয়সালা পাল্টাবার। এতো গুরুত্বপূর্ন এবং সংবেদনশীল কোন ব্যাপারে এতো অনড় কোন সিদ্ধান্ত ইতিহাসেই খুজে পাওয়া দুস্কর।

পাঞ্জাবের বিভক্তি নিয়ে অনেক গুটি চালাচালি হয়, ঘটতে থাকে অনেক সহিংসতাও। তবে বাংলায় সবচেয়ে বড় ইস্যুগুলোর মধ্যে ছিলো পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল কার অধীনে যাবে এটা এবং মালদা, মুর্শিদাবাদ, খুলনা এবং আসামের সিলেট জেলার করিমগঞ্জ সাব-ডিভিশন কোথায় যাবে সেটা নিয়ে কিছুটা সংশয়। প্রধানত পশ্চিমবঙ্গ চলে যায় ভারতের অধীনে আর পূর্ববঙ্গ চলে যায় পাকিস্তানের অধীনে। ১৯৫৫ সালে সংবিধান সংশোধনের সময় ‘ইস্ট বেঙ্গল’ বা ‘পূর্ব বাংলার’ নাম পরিবর্তন করে ‘ইস্ট পাকিস্তান’ বা ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯৭ ভাগ লোক ছিলো অমুসলিম (বেশিরভাগই বৌদ্ধ), কিন্তু এই অঞ্চলকে দেয়া হলো পাকিস্তানের ভাগে। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনতা সংঘের মাধ্যমে আপত্তিপত্র দেয়া হলেও সেটা আমলেই নেয়া হয়নি। ভারতীয়রা মনে করেছিলো যে অমুসলিম অঞ্চল হিসেবে এটা ভারতের অংশই হবে। তবে এর পেছনে কাজ করে বেশ কিছু কারন। প্রথমত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের সাথে থাকলে সেটা ভারতের পক্ষে যোগাযোগের জন্য দুর্গম হতো এবং উন্নতি বাধাগ্রস্থ হতো। পাকিস্তানের সাথে থাকলেই বরং সুবিধা বেশি পাবে সেই হিসেবে এটাকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৫ তারিখেও কেউ জানতেননা এটা কার অধীনে গেছে, ১৭ তারিখ অনেকটা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েই এটা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর পর পার্বত্য চট্টগ্রাম জনতা সংঘ সেই সিধান্ত না মেনে ভারতের পতাকা উড়িয়ে দেয়, তবে পাকিস্তান সরকার সেনাবাহিনী প্রেরন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে।

কলকাতা পড়লো ভারতের ভাগে। আরো সমস্যা ছিলো খুলনা, মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং সিলেটের ভাগাভাগি নিয়ে। খুলনায় কিছুটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫২% এর কিছু বেশি) থাকলেও তা পাকিস্তানের অধীনে দেয়া হলো। আবার মুর্শিদাবাদ এবং মালদা জেলা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভারতের অংশে দেয়া হলো। এর পেছনে কারন ছিলো খুলনাকে পাকিসানে দেয়ার বিনিময় করবার মত। খুলনাকে ভারতের ভাগে দিলে সেটা চারদিক দিয়ে পাকিস্তানে আবদ্ধ থাকতো যেটা সে জেলার মানুষকে বন্দী করে ফেলে আরেক সমস্যার তৈরী করতো। তবে এর পুরস্কার হিসেবেই অনেকটা মুর্শিদাবাদ আর মালদাকে ভারতের ভাগে দেয়া হলো, তবে মালদার অংশ কিংবা উপজেলা নবাবগঞ্জ কে পাকিস্তানের ভাগে দেয়া হয় যা চাপাইনবাবগঞ্জ নামে এখন পরিচিত। আবার কলকাতাকে ভারতের অংশ করবার বিনিময়ে পুরস্কার হিসেবেই পার্ব্যত্য চট্টগ্রামকে জোরপুর্বক পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দেয়া হয়। আরেকটা সমস্যা ছিলো সিলেটের ভাগাভাগি। সিলেট কার ভাগে যাবে এটা ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ৬০-৪০ অনুপাতের ব্যবধানে সিলেট ভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সমতা রক্ষার জন্য সিলেটের একটা অংশ কিংবা সাব-ডিভিশন করিমগঞ্জকে ভারতের অংশ করা হয়। করিমগঞ্জ এখনো একটি মুসলিম প্রধান জেলা এবপুং ভারতের আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে, প্রিন্সলী স্টেট কিংবা স্থানীয় রাস্ট্র্ অথবা ভারতীয় রাস্ট্র্গুলো ছিলো ব্রিটিশ রাজত্বের সময়ে অনেকটাই স্বার্বভৌম যেগুলো সরাসরি ব্রিটিশদের দিয়ে শাসিত ছিল না, এগুলো স্থানীয় শাসক দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরোক্ষ শাসনের অনুগত এবং জোটবদ্ধ হয়ে।

অফিসিয়ালী ভারতে ৫৬৫ টি ছোট বড় প্রিন্সলী স্টেট ছিলো স্বাধীনতা লাভের সময়ে। নানা জমিদারী এবং জায়গীরদাররা এসবের বাইরে ছিলেন। ১৯৫০ সালের মধ্যে এসব রাজ্যের বেশিরভাগই ভারত অথবা পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়। ভারত এবং পাকিস্তানের সাথে এই রাজ্যগুলোর আত্মীকরন অনেকটাই শান্তিপূর্ন ছিলো। নয়টি রাজ্য বাদে বাকী সবগুলো ভারতের অংগীভুত হয়ে যায়। এরমধ্যে দুইশতের মত রাজ্য ছিলো খুবই ছোট, আয়তনে ২০-২৫ বর্গকিলোমিটারের। জম্মু-কাশ্মীর এবং হায়দ্রাবাদ নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃস্টি হয়। পাকিস্তানপন্থী উপজাতির লোকেরা যখন জানতে পারেন কাশ্মীরের হিন্দু রাজা ভারতে যোগ দিতে ইচ্ছুক, তারা আক্রমন করে বেশকিছু অংশ দখন করে নেয়, যা এখন আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। কাশ্মীরের হিন্দু রাজা এ ব্যাপারে লিখিতভাবে ভারতের সাহায্য চাইলে ভারত সমর্থনে সেনা পাঠায়। এ নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় যা পরবর্তীতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধিবিরতির মাধ্যমে স্থগিত হয়। সেই থেকে জম্মু কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ পাকিস্তানের অধীনে এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভারতের অধীনে রয়েছে। যদিও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাব ধরলে জম্মু-কাশ্মীর স্বাধীন অথবা পাকিস্তানের অংশ হবার কথা ছিলো। হায়দ্রাবাদের নিজাম ছিলেন ইংরেজদের খুবই অনুগত। তিনি তাঁর বিরাট রাজ্য নিয়ে স্বাধীন থাকতে চাইলেও ভারত তাঁকে অঙ্গীভুত হতে চাপ দেয়, এবং পরবর্তীতে অবরোধ আরোপ করে এবং সেনা পাঠায়। এভাবেই হায়দ্রাবাদ ভারতের অঙ্গীভুত হয়। গোয়া, দমন দিউ, দাদরা ও নগর হাভেলী এসব ছিলী ইউনিয়ন টেরিটোরী। এগুলোকে পর্তুগীজ ইন্ডিয়াও বলা হতো। ১৯৬১ সালে ভারত পর্তুগালের বিপক্ষে একটা স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে দখলে নেয়। এ কারনে পর্তুগালের সাথে দীর্ঘ্যদিন ভারতের সম্পর্ক ছিলনা। বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে জন্ম নেয়া লোকেদের পর্তুগাল জন্মসুত্রে নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতো। এমন আরেকটা স্বাধীন রাজ্য ছিলো সিকিম, যেটাও প্রথমে ভারতের প্রটেক্টরেট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আশির দশকের প্রথমেই ভারতের অঙ্গীভুত হতে বাধ্য হয় ভৌগলিক বাধ্যবাধকতার কারনে। শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান কিংবা মায়ানমার আলাদা আলাদা ভাবে বিভিন্ন সময়ে স্বাধীন হয়, ভারত ভাগের সাথে এর কোন সম্পর্ক ছিলনা। এগুলো আগে থেকেই ছিলো ব্রিটিশদের সাথে মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ কিংবা স্বাধীনভাবে শাসনকৃত রাজ্য।

যেসব প্রিন্সলি স্টেটের প্রধানেরা ভারতের অঙ্গীভুত হতে রাজী হন ভারত তাদের পেনশন এবং অন্যান্য সুবিধাদী প্রদান করে। পূর্বের কিছু রাজ্যের রাজাদের রাজ্যের রাজ্যপাল কিংবা গভর্নরও করা হয়। এর ব্যবস্থা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে রদ করা হয়। পাকিস্তানের প্রিন্সলি স্টেটগুলো ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত স্বায়ন্তশাসিত ছিলো। ১৯৫৬ সালের সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে রাজ্যগুলোকে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান প্রদেশগুলোর সাথে একীভুত করা হয়। পুর্ব পাকিস্তানে বা বর্তমান বাংলাদেশ অংশে এ ধরনের কোন রাজ্য ছিল না।

##
এটাকে আমি গল্প বলছি, কিন্তু এর অনেকটাই সত্যি। যদিও এ ধরনের কিছু নিয়ে লেখার যোগ্যতা আমার নেই। তবু আমি আমার পড়া কাহিনী, জানা ইতিহাস নিজের দৃষ্টিভঙ্গীতে আর মাঝে মাঝে কিছুটা পরিবর্তিত করে তুলে ধরছি গল্পের আঙ্গিকে। আমার জানা ইতিহাসের আর ঘটনার কাঠামোর সাথে অনেকের জানার আর মতের অমিল থাকতেই পারে। যদি তাই হয় তাহলে সেই অমিলটাকে গল্পের প্রয়োজনে নিয়ে আসা কোন অপ্রাসঙ্গিক কথা ভেবে নিলে ভালোলাগবে। অথবা কোন ভুল হয়ে থাকলে সেটাও নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত, নিজের জানার আর বোঝার এখনো অনেককিছু বাকী আছে।

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *