আপোষকামী বুদ্ধিজীবী বনাম আপোষহীন হুমায়ুন আজাদ

আজ থেকে ১১ বছর আগে, ২০০৪ সালের ২৫শে জানুয়ারী রাজাকার ধর্মব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সাঈদি সংসদে দাঁড়িয়ে লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার এবং ব্লাসফেমি আইনের প্রস্তাব করে। রাজাকার সাঈদিকে বাঙলার সংসদ সদস্যের পদ দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার স্বামীর চেতনাকে বাস্তবায়ন করে।


আজ থেকে ১১ বছর আগে, ২০০৪ সালের ২৫শে জানুয়ারী রাজাকার ধর্মব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সাঈদি সংসদে দাঁড়িয়ে লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার এবং ব্লাসফেমি আইনের প্রস্তাব করে। রাজাকার সাঈদিকে বাঙলার সংসদ সদস্যের পদ দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তার স্বামীর চেতনাকে বাস্তবায়ন করে।

২৭শে ফেব্রুয়ারী বইমেলা থেকে ফুলার রোডের বাসায় ফেরার পথে ইসলামিক মৌলবাদীরা হত্যার উদ্দেশ্যে চাপাতি দিয়ে আক্রমণ চালায় এবং ২/৩ টি বোমা বিস্ফোরণ করে। আহত, ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত, মৃত্যু নিকটবর্তী অবস্থানে থেকেও হুমায়ুন আজাদ বলেন, পুলিশের গাড়ির মাধ্যমে তিনি হাসপাতালে যাবেন না। ৭২ ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে আবার জেগে উঠেন। জেগে উঠেই তিনি বলেন, আমি যেমন ছিলাম, তেমনই আছি এবং আগামীতে তেমনই থাকবো। আমার চিন্তাচেতনায় আদর্শে কোন পরিবর্তন আসবে না। তিনি সরাসরি রাজাকার ধর্মব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সাঈদির নাম উল্লেখ করেন।

পরবর্তীতে বিএনপি জামাত চারদলীয় জোট অনবরত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের উপর মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন শহরে ইসলামিক মৌলবাদীরা হুমায়ুন আজাদের ফাঁসির দাবি তোলে। সে সময়ে ৩৬টি ইসলামিক সংগঠন হুমায়ুন আজাদকে নাস্তিক আখ্যা দিয়ে বিবৃতি দেয়। জুম্মার নামাজ শেষে বায়তুল মোকাররমে একাধিকবার ইসলামিক মৌলবাদীরা হুমায়ুন আজাদের গ্রেপ্তারের দাবি তোলে। বিভিন্ন ইসলামিক মৌলবাদী সংগঠন হুমায়ুন আজাদের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে ক্ষুধা মেটায়। জামায়াতে ইসলামি অনবরত হুমায়ুন আজাদের বিপক্ষে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের ক্ষেপিয়ে তোলে। প্রতিনিয়ত ফুলার রোডের বাসার টিএনটি ফোনে হত্যার হুমকি দেয়া হত, বোমা মেরে তিন তোলার বাসা উড়িয়ে দেয়া হবে বলে ভয়ভীতি দেখানো হত। প্রতিদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটারে হত্যার চিঠি পাঠাত।

কিন্তু হুমায়ুন আজাদ শক্তভাবে ছিলেন। তখনও তিনি জামায়াতে ইসলামি যুদ্ধাপরাধীর সমালোচনা করতেন, বিএনপির সমালোচনা থেকে পিছুপা হন নি। কোনভাবেই তাকে দুর্বল করা সম্ভব হচ্ছিল না। কোন ভাবেই তিনি নীতির প্রশ্নে আনিসুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, ড. আনিসুজ্জামান, জাকির তালুকদার, যতীন সরকারসহ অনেকের মত আপোষ করেন নি।

কিন্তু জুলাই মাসের ২৪ তারিখ যখন আমাকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল তখন তিনি প্রথম বিচলিতবোধ করেন। তখন আমি মাত্র ১৩ বছরের। আমাকে ইসলামিক মৌলবাদীরা এসএম হলের ভেতরে নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে নিয়ে প্রায় ৩০ মিনিট যাবত অত্যাচার চালায়। ধর্মান্ধ মৌলবাদীরা আমাকে হুমায়ুন আজাদের সর্বশেষ অবস্থান জানতে চায়। কিন্তু আমি বলি নি। আমার বুকের উপর বারবার লাত্থি মারা হচ্ছিল, মুখে ঘুষি মারা হচ্ছিল, গাছের ডাল দিয়ে পেটানো হচ্ছিল, গলা চেপে ধরছিল, আমার চুল ধরে টানা হেঁচড়া করছিল, বক্সার দিয়ে হাটুতে মারা হচ্ছিল। বলছিল, তোরে কিন্তু মাইরা ফেলুম। কিন্তু ভয় পেয়ে আমি তাদের কিচ্ছু বলি নি। হুমায়ুন আজাদের শারীরিক মৃত্যুর আগে আমার মানসিক মৃত্যু হয়েছিল। হুমায়ুন আজাদের কাছ থেকে শিখেছিলাম, নীতির প্রশ্নে আপোষ কখনোই না।

সাম্প্রতিক, প্রকাশক দীপনকে হত্যা করার পর কয়েকজন লেখক বুদ্ধিজীবী ড. আনিসুজ্জামান, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, জাকির তালুকদার, সেলিনা হোসেন, আকিমুন রহমান, ফারুক ওয়াসিফের প্রতিক্রিয়া পড়লাম এবং বুঝলাম, স্পষ্ট করে কথা বলার মত লেখক বুদ্ধিজীবী আর নেই। সবাই আপোষকামী। বাঙলাদেশই একমাত্র দেশ, যেখানে লেখক হত্যার জন্য সরকার থেকে মদদ পাওয়া যায়। ভয় তো মানুষ পাবেই।

৪ নভেম্বর ২০১৫

২ thoughts on “আপোষকামী বুদ্ধিজীবী বনাম আপোষহীন হুমায়ুন আজাদ

  1. স্যার হুমায়ুন আজাদকে চিনেছি
    স্যার হুমায়ুন আজাদকে চিনেছি ২০০৬ সালে তাঁর “পাকসার জমিন সাদবাদ” দিয়ে! বইটি পড়ে ভয়াবহ রকমের ঘৃণা আর ক্ষোব জন্মেছিল তাঁর প্রতি! কিন্তু তখনো কী জানতাম যে বছর দশেক পরে তিনিই হবেন আমার আদর্শ! আমি মনে করিনা স্যার মরতে পারে! তিনি যে জ্ঞানের বীজ বুনে গেছেন এতোদিনে সেটি হতে চারা গজিয়েছে! এবং একসময় ডালপালা গজিয়ে মহীরূহে পরিণত হবে! হবেই!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *