রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রীয় ফাজলামি

ধার্মিক ও ধর্ম ব্যবসায়ী উভয়ের কাছেই রাষ্ট্রধর্ম একটি বিশেষ সুখের বিষয়, কেননা এতে করে অনেক বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু একই দেশে যদি অন্য ধর্মের ও নিরীশ্বরবাদীরা থাকে সেক্ষেত্রে বিষয়টি খুবই পীড়াদায়ক। রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি দেওয়া দেশে সংখ্যাগুরুরা তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্য দিনরাতে তাদের তবলা বাজাবে এবং একই সময়ে অন্য ধর্ম ও তাদের অনুসারীদের অবজ্ঞা করবে। অন্তত: বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি এই রকমই।


ধার্মিক ও ধর্ম ব্যবসায়ী উভয়ের কাছেই রাষ্ট্রধর্ম একটি বিশেষ সুখের বিষয়, কেননা এতে করে অনেক বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু একই দেশে যদি অন্য ধর্মের ও নিরীশ্বরবাদীরা থাকে সেক্ষেত্রে বিষয়টি খুবই পীড়াদায়ক। রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি দেওয়া দেশে সংখ্যাগুরুরা তাদের নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্য দিনরাতে তাদের তবলা বাজাবে এবং একই সময়ে অন্য ধর্ম ও তাদের অনুসারীদের অবজ্ঞা করবে। অন্তত: বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি এই রকমই।

বাংলাদেশে আদিকাল থেকে মুসলিমরা সংখ্যাগুরু হলে বা রাষ্ট্রধর্ম বিষয়টি হাজার বছরের সংস্কৃতি হলেও সমস্যা ছিল না। সমস্যাটা হল ভারতবর্ষ ভাগের সময় বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে পড়েছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য (যদিও তার কয়েক যুগ আগে এদেশে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল)।

সমস্যাটা হল স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। তার পরের ইতিহাস নোংরা। রাজনীতিবিদদের হাতে অপবিত্র হয়েছে ইসলাম ধর্ম। সেনা-স্বৈরাচার শাসকেরা (জিয়া ও এরশাদ) উভয়য়েই তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য মুসলিম বিশ্বের সাথে খাতির করেছিল। দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। সর্বশেষ এরশাদ ১৯৮৮ সালের ৯ই জুন সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার শত বছরের সংস্কৃতিকে গলা চিপে ধরেছিল।

“রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তনের পেছনে যেসব আজগুবি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল সেগুলো হল: সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জাতীয়তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা; এবং ধর্মীয় উগ্রবাদ বিশেষ করে জামায়াতের উত্থান রোধ করা। সংবিধান সংশোধন বিলটি পাশ হবার পর স্বৈরাচার এরশাদ বলেছিল এদেশে কোরান ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোন আইন করা হবেনা…বলেছিল যে, উগ্রপন্থী ও সমাজতন্ত্রীদের হাতে ইসলাম নিরাপদ নয়।” — সুলতানা কামাল, ১৯৮৮।

দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলগুলো এটা নিয়ে তখন বা এখনো উচ্চবাচ্য করেনি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ২০১১ সালের ঐতিহাসিক সংবিধান সংশোধন মহোৎসবের সময় রাষ্ট্রধর্ম অক্ষত রেখে ধর্ম-নিরপেক্ষতা যুক্ত করে নিজেদের ও দেশের মানুষকে হাস্যাস্পদ করে তোলে। আর জিয়ার দল বিএনপির কাছে এ বিষয়ে কিছু আশা করাটা বোকামি।

এরশাদ সরকারের সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন দেশের ১৫জন বিশিষ্ট শিক্ষক, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং ফয়সালার জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেন। তারা হলেন: বেগম সুফিয়া কামাল, সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দীন হোসেন, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, অধ্যাপক খান সারোয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, মেজর জেনারেল চিত্ত রঞ্জন দত্ত, বদরুদ্দীন ওমর, বিচারপতি কে এম সোবহান, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, কলিম শরাফী, বোরহান উদ্দীন খান জাহাংীর ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ।

অসাম্প্রদায়িক ও মানবীয় গুণাবলীর এই মানুষগুলোর মধ্যে দশজনই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অবস্থা অতোটাই নাজুক যে, বাকী যারা আছেন তারা বছরের পর বছর চুপ করে ছিলেন।

২০১০ সালের ৪ঠা অক্টোবর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে বলেন যে, বাংলাদেশ এখন থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। তবে আদালত রাষ্ট্রধর্মের বিষয়ে কিছু বলেননি। উল্লেখ্য, যে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম যোগ করা হয় সেই সংশোধনীও বাতিল করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মানে সংসদ চাইলে রাষ্ট্রধর্ম ও অন্যান্য সংশোধনী বাতিল করতে পারে।

কেন জানিনা ১৯৮৮ সালে করা আপিলটির শুনানি শুরু হয় ২০১১ সালে, সরকার সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু করার পর। হাইকোর্ট তখন সরকারের ব্যাখ্যা চেয়ে রুল জারি করেন।

৮ই জুনের প্রথম শুনানির দিনে আদালত প্রথমে ১২জন ও পরের দিন আরো দুইজন সিনিয়র আইনজীবীকে এই বিষয়ে মতামত দিতে মনোনয়ন দেন। তারা হলেন: টিএইচ খান, কামাল হোসেন, আমিরুল ইসলাম, রফিক-উল হক, মাহমুদুল ইসলাম, এম জহির, ফিদা এম কামাল, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, আজমালুল হক কিউসি, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এএফএম মেসবাহ উদ্দীন, আব্দুল মতিন খসরু, এএফ হাসান আরিফ এবং আখতার ইমাম।

১৬ই জুন শুনানির দিনে আদালতে তিনজন আইনজীবী তাদের মতামত তুলে ধরেন, কিন্তু বিষয়টি সংসদের উপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। তারা হলেন: এম জহির, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন এবং আব্দুল মতিন খসরু। এম জহির বলেন, একটি রাষ্ট্রের কোন ধর্ম থাকতে পারেনা। তার মতে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। হুমায়ুন বলেন, অষ্টম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের প্রচলন করার পেছনে কোণ বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল, কেননা তখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কোন অবস্থা সৃষ্টি হয়নি।

এরপর আদালত ১৪ই জুলাই শুনানির জন্য রাখলেও তা আর হয়ে উঠেনি। তার আগেই ৩০শে জুন সংসদে পাশ হয় পঞ্চদশ সংশোধনী যার মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্মকে বহাল রেখে ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্ত করে সংসদ। সরকার এখনো সেই রুলের জবাব দেয়নি।

পরবর্তী কার্যক্রম ও সরকারের বক্তব্যে অনুমান করা যায় যে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ে কোন বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা নেই তাদের।

সংবিধান সংশোধনের পর আপিল-কারীদের আইনজীবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে আদালত সরকারের প্রতি আবারো রুল জারি করেন।

সর্বশেষ গত বছরের ৭ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৌমেন্দ্র নাথ গোস্বামী রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেন।

১৯৮৮ সালের আপিল-কারীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কিন্তু কোন এক অজানা কারণে ২৯শে ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট শুনানি করতে ২৭শে মার্চ দিন ধার্য করেছেন। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা আরো কম আইনজীবীর বক্তব্য শুনবেন। প্রধান বিচারপতির তত্ত্ববধানে তিন সদস্যবিশিষ্ট বেঞ্চ গঠন করা হয়।

দেশে যখন ইসলামী জাগরণ তুঙ্গে, উগ্রপন্থী ও সশস্ত্র জঙ্গিরা বিপ্লবের সূচনার অপেক্ষা করছে এবং তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামীলীগ সরকার যখন জঙ্গিবাদের উস্কানীদাতাদের তোষামোদ করছে, সে সময়ে এ ধরণের শুনানি কোন দিকে যাবে বা জনগণের জন্য কি বয়ে আনবে তা ভাবতে গেলেও মস্তিষ্কে ক্ষরণ হচ্ছে।

রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কিছু বিনোদনমূলক বক্তব্য:

* ৪ঠা এপ্রিল ২০০৯ – বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতির বিরোধী রাষ্ট্রধর্ম প্রচলনের জন্য এরশাদের কড়া সমালোচনা করেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ।

* অক্টোবর ২০০৯ – তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

* জানুয়ারি ২০১০ – প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাষ্ট্রধর্ম সংবিধানে যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে।

* ফেব্রুয়ারি ২০১১ – শফিক আহমেদ বলেন, সংবিধানে একই সাথে রাষ্ট্রধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা সাংঘর্ষিক নয়।

* ২৪শে মে ২০১৩ – হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ, আধুনিক ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে তুললে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্বপন পূরণ হবে।

* সেপ্টেম্বর ২০১৪ – জাতিসংঘে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব গোষ্ঠী বিভিন্ন দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিকে নষ্ট করতে চাইছে তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘকে বিশেষ অবদান রাখতে হবে।

* ২২শে মার্চ ২০১৪ – প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ এখন থেকে মদিনা সনদ অনুযায়ী চলবে এবং কখনো কোরান ও সুন্নাহবিরোধী কোন আইন করা হবেনা। অন্য বিশ্বাসের কেউ যেন মুসলিমদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে বিভেদ তৈরি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে বলেন!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *