আমার মেধাবী সহপাঠিরা এবং তাদের এইম ইন লাইফ-‘একটি উৎকৃষ্ট বিয়ে’

স্কুল জীবন থেকেই একাডেমিক পড়াশুনায় আমার খুব অরুচি। আমি কখনই একাডেমিক পড়াশুনা এনজয় করে পড়তে পারিনি। বরাবরই বাধ্য হয়ে একগাদা মুখস্ত করে, পরীক্ষার খতায় তা বমির মতই বের করে দিয়ে আসতাম।
স্কুল, কলেজ জীবনে সবসময়ই কথিত ‘ব্যাকবেঞ্চার’ ছিলাম। শিক্ষকদের কাছে পরিচিত ছিলাম , দুষ্ট, বেয়াদপ, অমনোযোগী নামে। তবে মাঝে মধ্যেই হুট করে কিছু ভালো রেজাল্ট করে ফেলার ইতিহাসও আমার আছে। তখন শিক্ষক, সহপাঠিরা বেশ বিস্মিত হতো বটে।

স্কুল জীবনে অনেক মেধাবী সহপাঠি দেখেছি। তাদের অধ্যাবসায়, মেধাতে সত্যিই অবাক হতাম। আম্মু সব সময় রোল ১ থেকে ১০ এর মধ্যে থাকা সেইসব সহপাঠিদের রেফারেন্স ব্যবহার করে আমাকে তিরষ্কার করতেন। দেখেছিস অমুককে? সারাদিন পড়ে, এমনকি কোথাও ঘুরতে গেলে জামার মধ্যে শিট নিয়ে বের হয়, ফাঁক পেলেই শিট মেলে ধরে পড়তে থাকে, ইশ আমার যদি এমন একতা মেয়ে থাকত। এইগুলো শুনে খুব হতাশাবোধ করতাম। এরপরে, আত্মীয় স্বজনের বাসায় গেলে মাঝে মধ্যে আমিও একটা পড়ার শিট নিয়ে যাবার চেষ্টা করতাম, এতে কিছুটা হতাশা কমতো। কিন্তু কখনো সেই শিট খুলে দেখিনি। নিজে একটু মেধাবী মেধাবী ভাব নিতাম আরকি। কারণ আমার কাছে মেধাবীর সংজ্ঞাটা তখন এমনি ছিল।

ক্লাসে যখন পরীক্ষার খাতা দেখাতো, কান্নাকাটির আহাজারি পরে যেত। কারনটা তখন আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকেছিল, আর এখন আমি ওই কারণ মনে করলে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাই। কারণটা হচ্ছে, আমার কিছু সহপাঠি এক কিংবা দুই মার্কের জন্য হাইয়েস্ট নাম্বার পায়নি। আর এইদিকে আমার খাতার দিকে তাকিয়ে দেখি ৩৩ পেয়ে পাস করেছি। তখন আমি আবারো হতাশা বোধ করতাম। ওরা হাইয়েস্ট মার্ক পায়নি বলে কাঁদছে আর আমি টেনে টুনে পাশ করেছি। আমার কি তাহলে কাঁদতে কাঁদতে মরেই যাওয়া উচিৎ? তবে মাঝে মধ্যে আমি কাঁদার চেষ্টা করতাম। কিন্তু মুখের ভঙ্গিমায় কান্নার ভাব আনতে পারলেও, চোখ থেকে পানি বের হতো না। কম মার্ক পেলে যারা কাঁদে তারা মেধাবী, আমার কাছে বেধাবীর সংজ্ঞাটা তখন এমনি ছিল।

ছোট বেলায় ঈদ ছিল এক কাঙ্ক্ষিত দিন। কত আয়োজন নিয়ে সারা বছর অপেক্ষা করতাম। ওই কাঙ্ক্ষিত দিনেও সামাজিক ভাবে মেধাবী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পেতাম না। আম্মু বলতো, জানিস অমুক ঈদের দিনেও পড়তে বসে, আমার কি আর সেই কপাল আছে যে দেখবো তুই ঈদের দিনেও পড়তে বসছিস?
হায়, আমার ঈদ। আবার সেই হতাশা বোধ করতাম। ঈদের দিনে পড়তে বসলে কিছুটা মেধাবী ছাপে নিজেকে আবিষ্কার করা যাবে হয়তো।

কিন্তু শুধু ক্ষণিকের হতাশাবোধই করতাম, পরক্ষণেই যেই আমি সেই। তাই কথিত মেধাবী হয়ে ওঠা কখনো হয়ে ওঠেনি।

অনেক অনেক পরে, আমার কাছে মেধাবীর সংজ্ঞা আসলে কি তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যখন হঠাৎ সেই স্কুল সহপাঠির সাথে কোথাও হুট করে দেখা হয়ে যায়,কথার প্রসঙ্গে যদি জানতে চাই, তুই প্রীতিলতাকে চিনিস? উত্তরে যখন শুনি ‘না’ । সেই ছোটবেলার মেধাবী নামক চিত্র থেকে তাকে নিমিষেই ডিলিট করে দেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে CGPA ৪.৯২ পাওয়া সহপাঠি যখন বলে ওঠে ‘আই হেইট পলিটিক্স’ তার জন্য মুহুর্তেই আমার করুনা বোধ হয়েছিল, তার জন্য বরাদ্দ করেছিলাম, এক বিদ্রুপ মিশ্রিত হাসি। তার সেই পরিশ্রমের CGPA আমার কাছে ঠেকেছিল একগুচ্ছ কাগজ মাত্র।

আমার সেই স্কুল কলেজ জীবনের মেধাবী মেধাবী সহপাঠিরা যে আসলেই মেধাবী তার প্রমাণ দিয়েছিল, দেশের প্রথম স্তরের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে চান্স পেয়ে।

বর্তমান সময়টা আমার ব্যাসের গ্রাজুয়েশন শেষ হবার সময়। সারা বছর পড়াশুনার জন্য নিবেদিত প্রাণ মূলক কর্মকান্ড দেখেছি তাদের ফেইসবুক টাইমলাইনে। তারা এখন গ্রাজুয়েশন শেষ করেছে, অভিনন্দন জানানোর মত ব্যাপার।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে বেশ কিছুদিন ধরে খেয়েল করলাম, আমার হোম পেইজ বিয়ের ছবিতে ভেসে যাচ্ছে। বিয়ে, হানিমুন, নতুন সংসার ইত্যাদির আপডেট সারাক্ষণ আমার হোম পেইজের দেয়াল জুড়ে।

এই বস্তা বস্তা মেধাবীদের গ্রাজুয়েশন শেষ হবার সাথে সাথে তাদের জীবনের আপডেট দেখে আমি মেধাবীর সংজ্ঞা এখন আরও বেশি সত্যিই গুলিয়ে ফেলেছি। এখন মনে হচ্ছে এই যে এত অধ্যাবসায়, এত পরিশ্রম ভালো রেজাল্টের জন্য, তার এক মাত্র লক্ষ্য ছিল ‘বিয়ে’। বাজারের উৎকৃষ্ট মানের বিয়ের পাত্র পাবার জন্যই কি এই মেধা?

কতটা জাঁকজমকতার সাথে বিয়ে করা যাবে সেটাই যেন এখন মূল অর্যন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিয়ের পরে, বাজারে নিজেকে আরও চরা দামে তুলতে চাইলে কোন দেশ বা কোন জায়গাটা হতে পারে হানিমুনের জন্য যথার্ত সেটাই এখন এক মাত্র ভাববার বিষয় তাদের জন্য। হানিমুন পর্বের পরে, কোন স্পেশাল খাবারটা তার প্রিয় স্বামীর জন্য আজ তৈরি করেছে সেটার রেসিপি সহ আপলোড দেয়াটাই এখন জরুরি।

এমনকি দু একজন তো ‘আমাদের সংসারে নতুন অতিথি আসছে’ কিংবা ‘আমরা দুই থেকে হবো তিন’ টাইপ স্ট্যাটাসেই এখন ব্যস্ত।

সেই ছোটবেলা থেকে যাদের নাম জপে জপে আমার মা আমাকে খোটা দেবার চেষ্টা করে যেতেন, আমার ভেতর জেদের উপস্থিতি দেখতে চাইতেন এবং যেন জেদ করে আমি তাদের মত হয়ে দেখাই। ভাগ্যিস সেটা আমি করিনি। তাহলে তাদের মত অমন মেধাবী হয়ে আজ উৎকৃষ্ট মানের এক স্বামী নিয়ে কক্সবাজার কিংবা থাইল্যান্ডের সমুদ্রে জলকেলি খেলে সেলফি আপলোড দেয়া লাগতো।

পরবর্তীতে আমার কাছে মেধার সংজ্ঞা পাল্টালেও এই প্রথমসারীর বিশ্যবিদ্যালয়ে পড়ুয়া আমার ‘মেয়ে সহপাঠিদের’ কাছ থেকে অনেক প্রত্যাশা করতাম। এরা গ্রাজুয়েশন শেষ করে অনেক ভালো ভালো জায়গায় এরা কর্মরত হবে। অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল হয়ে উঠবে। আমার অমুক সহপাঠি অমুক জায়গায় কর্মরত আছে, এটা বলতে পারার মধ্যেও তৃপ্তি আছে। কিন্তু আমার সেই সহপাঠি, যে রুয়েট থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে এখন ‘গৃহিণী’ পোস্টে কর্মরত আছে, সেটা বলি কি করে? আবার অদ্ভুত ভাবে আমার মত অনেক ব্যাকবেঞ্চার টাইপ ছাত্রী কিন্তু দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বক্ষেত্রে।

মেধবীর সংজ্ঞা কখনই ভালো রেজাল্ট না, গোল্ড মেডেল এগুলো দিয়ে হতে পারে না। আমি হাজারো মানুষের কণ্ঠের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে স্লোগান দিয়ে যা শিখেছি, তা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই মার্কেটিং বিজনেসের ‘সট এনালাইসিসের’ থেকে ঢের বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। সহযোদ্ধাদের সাথে রাষ্ট্রের পুলিশি ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে গিয়ে যা শিখেছি, তা ওই ‘গরুর রচনা’ কিংবা ‘অসুস্থতার জন্য ছুটি চাহিয়া প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন পত্র’ টোটোস্ত মুখস্ত করার থেকে অনেক বেশি কার্যকারী। আমি লাশের মিছিলে অংশগ্রহন করে, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যা শিখেছি তা ওই, ত্রিকোণমিতির সূত্র মুখস্তের থেকে উপাদেয়।

আমি ভাগ্যবান মনে করি নিজেকে যে, আমি কিছুটা হলেও সুশিক্ষাটা পেয়েছিলাম, তা না হলে নিশ্চয়ই আজ আমি বাজারের সব থেকে চাহিদাসম্পন্ন পাত্রী হয়ে সবথেকে দামী পাত্রকে বেছে নিয়ে, ওয়েডেং ডাইরিকে কনট্র্যাক্ট করে নানান রকম নান্দনিক ছবির বন্যায় আমার ফেইসবুক, বাসার দেয়াল ভাসাতাম।

আজ এই মুহুর্তে এসে আমার সেইসকল মেধাবী সহপাঠিদের জন্য করুনা হচ্ছে, যাদের নিয়ে একসময় হিংসা করতাম। যাদের কিংবা যাদের পরিবারের এইম ইন লাইফ ছিল একমাত্র ‘একটি উৎকৃষ্ট বিয়ে’

২ thoughts on “আমার মেধাবী সহপাঠিরা এবং তাদের এইম ইন লাইফ-‘একটি উৎকৃষ্ট বিয়ে’

  1. বিয়ে হল মেধাবী মেয়েদের গৃহকোণ
    বিয়ে হল মেধাবী মেয়েদের গৃহকোণ এ বন্দি করার এক শৃঙ্খল। বিয়ের পরও কিছু নারীরা আজকাল চাকরী যে করছে না তা নয়,তবুও শৃঙ্খল এই আটক থাকতে হচ্ছে-তার বেতনের টাকা খরচের স্বাধীনতা থাকেনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই;স্বামী নামক প্রভুই এখানে সর্বেসর্বা।
    এই মেধাবী নারীদের মুক্তি ঘটুক।ভাল বিয়ের পাত্রের জন্য নয়;মেধাবিনীদের ডিগ্রী কাজে লাগুক নিজেদের স্বাবলম্বী হতে,অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য।

  2. নারীরা সত্যিকার অর্থে মুক্তি
    নারীরা সত্যিকার অর্থে মুক্তি পাক পুরুষতান্ত্রিক সমাজ থেকে….
    এটাই সময়ের সবচাইতে বড় দাবী….
    ধন্যবাদ আপনাকে….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *