প্রসঙ্গঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্পর্ধা/দাবী, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যত এবং বিজয়ী জাতি

পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত আর থাকলেও কোন মাত্রায় থাকা উচিত এটা সাম্প্রতিক সময়ের এক বহুল আলোচিত বিষয়। পাকিস্তান দাবী করছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মুলের জন্যই করা হচ্ছে। যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য এ ধরনের কথা খুবই অপমানজনক এবং আভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপের সামিল। তারা দাবী করে ১৯৭৪ সালের ত্রিপাক্ষিক সমঝোতা কিংবা চুক্তির মাধ্যমেই বিচার সংক্রান্ত সবকিছুর ফয়সালা হয়ে গিয়েছিলো। সিদ্ধান্ত হয়েছিলো সবকিছু ভুলে সৌহার্দ্যপুর্ন সম্পর্ক নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার। আসলে কি ছিলো সেই চুক্তিতে তাও জানা দরকার। ত্রিপাক্ষিক সমঝোতার সম্পুর্ন অংশটি বেশ বড়, তাই সেটা পোস্টের একেবারে শেষে দেয়া হলো যদি কেউ আগ্রহী থাকে তবে পড়ে দেখবার জন্য। আমার কাছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সংক্রান্ত কিছু প্যারা জরুরী মনে হয়েছে। সেগুলোই বাংলায় অনুবাদের চেষ্টা করলামঃ

১৩। উপমহাদেশে বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সৌহার্দ্য পুনঃস্থাপন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরকার সমুহের গভীর আগ্রহের কথা বিবেচনায় নিয়ে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর ব্যাপারে তিন মন্ত্রীর মাঝে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে এ সকল যুদ্ধবন্দীদের দ্বারা অত্যাচার এবং নানাবিধ অপরাধ সংঘটিত হয়েছিলো, যা জাতিসংঘ সাধারন পরিষদের রেজোল্যুশন ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গনহত্যা। এবং সর্বস্তরের দাবী এটাই যে এই ১৯৫ জনের মত যারা এমন অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনানুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ্যা নেয়া হবে। পাকিস্তান সরকারের প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে জানান যে তার সরকার এ ধরনের যেকোন অপরাধের সঙ্ঘটিত হয়ে থাকলে তার নিন্দা জানায় এবং গভীরভাবে দুঃখিত।

১৪। এই সংযোগে, তিন মন্ত্রী মহোদয় এটা দ্রষ্টব্যে রাখেন যে এ ব্যাপারটি সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে তিন দেশের নিরলস প্রচেষ্টার আলোকে দেখতে হবে। মন্ত্রীগন এ ব্যাপারে আরো কিছু স্বীকৃতি দেন, যা হচ্ছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা করেন যে তিনি বাংলাদেশ সফর করবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রনের ফলস্বরুপ এবং বাংলাদেশের জনতার কাছে আবেদন জানান পুর্বের সকল ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করবার এবং ভুলে যাবার জন্য। একইভাবে, বাংলাদেশে চালানো ১৯৭১ সালের নৃশংসতা এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগন কিভাবে ক্ষমা করতে হয় সেটা জানে বলে অবগত করে ঘোষনা করেন যে, তিনি আশা প্রকাশ করেন যে জনগন অতীত ভুলে গিয়ে একটি নতুন সুচনা করবে।

১৫। ভবিষ্যতের দিকে আলোকপাত করে এবং বিশেষ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা বাংলাদেশের জনগনের প্রতি ক্ষমা করে দেবার এবং ভুলে যাবার আবেদনের কথা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান যে, বাংলাদেশ সরকার বিচারকাজ চালিয়ে না যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমাশীলতার পথ বেছে নিয়ে। এ ব্যাপারে সমঝোতা হয় যে, এখন ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীকে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে অন্যান্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে দিল্লী চুক্তিতে উল্লেখ করা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে।

১৬। মন্ত্রীগন এ ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে উপরোক্ত সমঝোতাগুলো ১৯৭১ সালের সংঘাত পরবর্তী সময়ে উদ্ভুত মানবিক সমস্যাবলীর সমাধানের শক্ত ভিত্তি হবে। তারা পুনঃপ্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে তিন দেশের ৭০ কোটি মানুষের শান্তি এবং সমৃদ্ধি অত্যাবশ্যক বিষয় এবং উপমহাদেশে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরন এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ সরকারের প্রচেষ্টার অব্যাহত থাকবে

উপরোক্ত পয়েন্টগুলো থেকেই স্পষ্ট করে বোঝা যায় পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবেই ক্ষমা চেয়েছিলো কিংবা ক্ষমা চাইবার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। কিন্তু আজকে তারা এ সংক্রান্ত সকল দায় অস্বীকার করে। আবার যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কাজ শুরু হবার পরপরই নানা স্তরের মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছিলো যে কিভাবে কোন ধরনের বিচার ছাড়াই এই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলো ১৯৭৪ সালে। এ ব্যাপারেও বিতর্ক চলে যে ওই ১৯৫ জনই ছিলো প্রধান যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের বাদ দিয়ে এই বিচারের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ।

তবে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট প্রমান পাওয়া যায় যে ওই ১৯৫ জন সত্যি যুদ্ধাপরাধী ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো ছিলো সঠিক। ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে সরকারও তাদের এবং এদেশীয় দোসরদের বিচারের জন্য পদক্ষেপ গ্রহন করে, কিন্তু নানা কারনে অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়। এবার আরো পেছনে ফিরে তাকাই। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে গেলে এবং প্রশ্নগুলো চুপ করে যাবার জন্য আমাদের সাধারন কিছু ঘটনাপ্রবাহও জানা দরকার।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি অংশগ্রহন বাঙ্গালীর বিজয় তরান্বিত করে। ভারতীয় বাহিনীর তিনটি কোরের প্রায় দশ ডিভিশন সেনা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সরাসরি অংশগ্রহন করে নৌ এবং বিমান বাহিনীর সহায়তা সহ। তা না হলে যুদ্ধ আরো অনেকটাই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারতো। এটা বাঙ্গালীর বিজয় এগিয়ে আনা ছাড়াও পাকিস্তানী বাহিনীর জন্যও একদিক থেকে আশীর্বাদ স্বরুপ ছিলো। ভারত যেহেতু জেনেভা কনভেনশনের সাক্ষরকারী দেশ ছিলো, তাই পাকিস্তানীরা তাদের হাতেই নিজেদের সমর্পন করে যযেহেতু তারা জেনেভা সনদের সাক্ষরকারী দেশ ছিলো। মুক্তিবাহিনীর হাতে পরলে তাদের যে জামাই আদর করা হতো না সেটা তারা জানতো। স্বাভাবিকভাবেই তাদেরও ভয়াবহ পরিনতি ভোগ করতে হতো।

১৫ই ডিসেম্বর জেঃ নিয়াজী ভারতীয় সেনাপ্রধান জেঃ মানেকশর কাছে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু জেঃ মানেকশ জেঃ নিয়াজীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তাকে পরদিনের মধ্যে আত্মসমর্পন করতে বলেন। তিনি আশ্বাস দেন যে পাকিস্তানী সামরিক এবং আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে আত্মসমর্পন করলে। “আত্মসমর্পনের দলিলেও” এ ব্যাপারটা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা ছিলো। তবে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের ব্যাপারে ভারতের দায় থাকলেও তাদের এদেশীয় দোসরদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়াটা সম্পুর্নরুপে বাংলাদেশ সরকারের অধীনেই ছিলো।

ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান ঘোষনা করেন যে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ৩০ জন উচ্চপদস্থ্য পাকিস্তানী বেসামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে এবং গনহুত্যার অভিযোগে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ ৭ জন বাঙ্গালী শহীদ কর্মকর্তার স্ত্রী ভারত সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান পাকিস্তানী সেনাদের বিচারের ব্যবস্থা গ্রহন করতে। তবে ভারতীয় প্রতিনিধি দুর্গা প্রসাদ ধর সে দাবীকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে জানান যে, “ভারত সরকার তাদের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে কি করা যায় তা পরীক্ষা করে দেখছে।“

বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরপরই যুদ্ধাপরাধের আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়ার সুচনা করেন। ১৯৭২ সালের ২৯শে মার্চ বাংলাদেশ সরকার যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রায় ১১০০ পাকিস্তানী সেনার বিচার প্রক্রিয়া শুরু করবার ব্যাপারে পরিকল্পনার কথা ঘোষনা করেন, যার মধ্যে জেঃ নিয়াজী এবং জেঃ রাও ফরমান আলীও ছিলেন। সরকার এ ব্যাপারে দুই স্তরের বিচার প্রক্রিয়ার কথা জানান। গুরুতর অপরাধের জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত আদালতে প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের এবং বাকীদের জন্য বাংলাদেশের সাধারন আদালতেই এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করবার কথা বলা হয়।

প্রাথমিকভাবে ভারত সরকার সে সকল সেনাদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরে রাজী হয় যাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সাক্ষ্যপ্রমান উপস্থাপন করেছিলো। ১৪ জুন ১৯৭২ সালে ভারত জেঃ নিয়াজী সহ ১৫০ জন যুদ্ধবন্দীকে হস্তান্তরে রাজী হয়। ১৯ শে জুন, ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানীদের বিচারের ব্যাপারে তার অঙ্গীকারের কথা পুনঃব্যক্ত করেন। এর মাত্র দশদিন পরেই জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং ইন্দিরা গান্ধীর বৈঠক হয়। ২রা জুলাই ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত হয় ভারত পাকিস্তানের মধ্যকার সিমলা চুক্তি। এ চুক্তিতে পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীগন, যাদেরকে বাংলাদেশ সরকার বিচারের মুখোমুখি করতে চাইছিলো, তাদের ব্যাপারে কোনকিছুই উল্লেখ ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রায় ৪ লাখের বেশি বাঙ্গালী ছিলেন, যাদের বেশিরভাগকেই যুদ্ধ শেষ হবার পরপরই আটক করা হয়। এদেরই পাকিস্তান সরকার অভিযুক্ত পাকিস্তানী সেনাদের মুক্ত করবার জন্য দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে শুরু করে। প্রায় ১৬০০০ বাঙ্গালী কর্মচারীকে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দিয়ে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। এদের অনেককেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে বন্দীশিবিরে স্থানান্তর করা হয়। এর বাইরে সাধারন বাঙ্গালীরাও ছিলেন নজরদারিতে। তাদের অনেককেই কোন অভিযোগ ছাড়াই কারাবন্দি রাখা হয়। শত শত বাঙ্গালী এ সময় সরকারের নিয়ন্ত্রনের বাইরে থাকা আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা দিয়ে পাকিস্তান থেকে পালাবার চেষ্টাও করেন। পাকিস্তান সরকার প্রতিজন পলায়নরত বাঙ্গালীর ধরিয়ে দিতে পারলে অর্থ পুরস্কারও ঘোষণা করে।
আগস্টের ১০ তারিখ, ১৯৭২ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন যে,

“বাংলাদেশ ভাবছে যে আমাদের বন্দিদের মুক্তির ব্যাপারে তাদের ভেটো দেবার ক্ষমতা আছে। কিন্তু তারা জেনে রাখুক আমাদের হাতেও একটা ভেটো আছে।“

এরপর তিনি নিশ্চিত করেন যে, পাকিস্তান সরকার চীনকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ যদি জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের চেষ্টা করে, সে প্রচেষ্টায় ভেটো দিতে। ভুট্ট জানতেন যে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ লাভ করা খুব জরুরী ছিলো। ২৫শে আগস্ট ১৯৭২ সালে চীন ঠিকই বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মত নিরাপত্তা পরিষদে তার ভেটো ক্ষমতার প্রয়োগ করে যেহেতু বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিলো।

ভুট্টো বারবার এ দাবী জানাচ্ছিলেন যে পাকিস্তান বাংলাদেশকে তখনই স্বীকৃতি দেবে যখন সকল বন্দিকে মুক্ত করা হবে। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ এবং ভারত প্রায় ৬০০০ হাজার যুদ্ধবন্দি পরিবারের সদস্যকে প্রত্যাবর্তন করাবার সিদ্ধান্ত নেয়। বিনিময়ে পাকিস্তানও প্রায় ১০০০০ হাজার বাঙ্গালী নারী ও শিশুকে মুক্ত করে দেবার সিদ্ধান্তের কথা জানায় যারা পাকিস্তানে আটক ছিলো। বাকী বাঙ্গালীদের ভাগ্যের ব্যাপারে বাংলাদশ সরকার তখনো তেমন কিছুই জানতো না।

১৭ই এপ্রিল, ১৯৭৩ সালে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ এবং ভারত যুগপৎভাবে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাবার ঘোষনা দেয়। বন্দি বিনিময়ে অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে প্রস্তাব করা হয় যে ভারত ৯০০০০ পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীর প্রায় সকলকেই ফেরত পাঠাবে। এর বদলে পাকিস্তানকে দেড় থেকে দুই লাখ আটকে পরা বাঙ্গালিকে দেশে ফেরত পাঠাতে হবে এবং প্রায় আড়াই লাখ অবাঙ্গালীকে (বেশিরভাগই বিহারী) ফেরত নেবে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটা পরিস্কারভাবে বলা হয় যে ভারত ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে মুক্তি দিতে পারবে না এবং বাংলাদেশ এদেশীয় দোসরদের সাথে তাদেরও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারের ব্যবস্থা করবে।

পাকিস্তান প্রাথমিকভাবে এ প্রস্তাব মেনে নিলেও মাত্র ৫০০০০ বিহারীকে ফেরত নিতে সম্মত হয়। ভুট্টো বাংলাদেশে পাকিস্তানীদের বিচার কার্যক্রম শুরুর বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান নেন। উনি এই বলে হুমকী দেন যে যদি বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানীর বিচারকাজ শুরু করে তবে তিনিও একইরকমভাবে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে আটকে পরা বাঙ্গালীদের বিচারকাজ শুরু করবেন। তিনি বলেন যে,
“জনতা এখানেও বিচার দাবী করছে। আমরা জানি যে বাঙ্গালীরা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তথ্য পাচার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিস্ট অভিযোগ আনা হবে। কতজনের বিচার করা হবে আমি বলতে পারি না।“

আর এসব যে ফাঁকা বুলি নয় তা প্রমান করতে পাকিস্তান সরকার ২০৩ জন উচ্চপদস্থ বাঙ্গালীকে আটক করে। ভুট্টো বলেন যে, যদি বাংলাদেশ যুদ্ধবন্দীদের বিচার করতে চায়, তবে বিক্ষুব্ধ পাকিস্তানী জনতা দেশের সরকারের পতন ঘটিয়ে ছাড়বে। উনি আরও দাবী করেন যে, তার সরকার এ ধরনের ষড়যন্ত্রের কারনে বেশ কিছু উচ্চপদস্থ্য সামরিক কর্মকর্তাকে গ্রেফতারও করেছে। এরই মাঝে ২৮ আগস্ট ১৯৭৩ সালে দিল্লী চুক্তি সাক্ষরিত হয় ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে। যে চুক্তিতে বাংলাদেশ-ভারত যুগপৎ প্রত্যাবর্তন প্রস্তাবের প্রতি সম্মতি জানানো হয়। এর মাধ্যমে আটকে পরা বাঙ্গালী এবং পাকিস্তানীদের ভারত এবং পাকিস্তান থেকে মুক্তির পথ সুগম হয় যারা প্রায় দুই বছর ধরে আটক ছিলো।

ত্রিপাক্ষিক প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার সুচনা হয় ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ সালে এবং প্রায় দেড় হাজার বাঙ্গালী এবং ১৩০০ পাকিস্তানীকে নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করানো হয়। এর কিছুদিন পরেই ভারত এবং পাকিস্তান একমত হয় যে, ১৯৫ জন অভিযুক্ত পাকিস্তানীর ব্যাপারে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পাকিস্তানও এ সময় আটক করা ২০৩ জন

বাঙ্গালীকে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখে। ত্রিপাক্ষিক কুটনৈতিক পর্যায়ের আলোচনা পাকিস্তানী যুদ্ধবন্দীদের বিচারের প্রক্রিয়াকে ঘোলাটে করে তোলে। যদিও বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে সব প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। সরকার এ ব্যাপারে কোলাবোরেটরস এক্ট, ১৯৭২ জারী করে। এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কারও শুরু করে যাতে এদেশীয় এবং পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ সম্পন্ন করা যায়।

১৫ জুলাই, ১৯৭৫ সালে, বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে সহজ করা হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়,

“No law nor any provision thereof providing for detention, prosecution or punishment of any person, who is a member of any armed or defence or auxiliary forces or who is a prisoner of war, for genocide, crimes against humanity or war crimes and other crimes under international law shall be deemed void or unlawful.”

২০শে জুলাই, ১৯৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ (টাইবুন্যালস) আইন, ১৯৭৩ পাস করা হয়, যাতে মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেই গনহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য যে কোন ব্যক্তিকে আটক, বিচার এবং সাজা দেবার বিধান করা হয়। যদিও পরবর্তীকালে এদেশীয় দোসরদের বিচার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়, তারপরেও আর্টিকেল 47(3) এবং The International Crimes (Tribunals) Act, 1973 দুটাই কোন সরকারই বাতিল করেনি এবং আজ পর্যন্ত বলবত আছে, যার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।
বাংলাদেশ কর্তৃক ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার ইচ্ছার কারনে ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে এক সরকারী বক্তব্য প্রকাশ করে। যাতে বলা ছিলোঃ

“Pakistani government rejects the right of the authorities in Dacca to try any among the prisoners of war on criminal charges, because the alleged criminal acts were committed in a part of Pakistan by citizens of Pakistan. But Pakistan expresses its readiness to constitute a judicial tribunal of such character and composition as will inspire international confidence to try the persons charged with offenses.”

প্রায় একবছর দরকষাকষির পর বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রস্তাব মেনে নেয়। এর পেছনে কারন ছিলো আটকে পরা প্রায় চার লাখ বাঙ্গালীর অনিশ্চিত ভবিষ্যত এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করা। বাংলাদেশ সরকার আশা করছিলো যে পাকিস্তান সরকার ঐ ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার কাজ শুরু করবে নিজেদের আইন অনুসারে। বাংলাদেশ এ কারনে বাংলাদেশের মাটিতেই তাদের বিচার করবার অবস্থান থেকে সরে আসে। এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হবার পর আটকে পরা বাঙ্গালীদের ২০৬ জনের শেষ দলটিকে ২৪শে মার্চ ১৯৭৪ সালে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়। একটা ব্যাপার স্পষ্ট যে, ১৯৫ জন পাকিস্তানীকে কোন অভিযোগ ছাড়াই মুক্ত করে দেয়া হয়নি, বরং সমস্ত অভিযোগ সহকারেই তাদের পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয় যাতে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষই তাদের বিচার করতে পারে।

বাংলাদেশের অবস্থান আনুষ্ঠানিকতা পায় ১০ই এপ্রিল ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানের মধকার ত্রিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তির মাধ্য্যমে। আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে এ সময়ে ব্যাপকভাবে সংবাদও প্রচার করা হয় এটা উল্লেখ করে যে, পাকিস্তান সরকার এদিন বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে।

বাংলাদেশ সরকার কোলাবরেটরস এক্ট এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের অধীনে নিজের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছিলো এবং আশা করেছিলো পাকিস্তান সরকারও এ ব্যাপারে নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে অভিযুক্ত সেনাদের বিচার করবে। তবে তা কোনদিন বাস্তবের মুখ দেখেনি। বিচারপতি হামদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টেও সীমিত আকারে যেসব সুপারিশ করা হয়েছিলো তাও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৭৫ সালে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের “কোলাবরেটরস এক্ট, ১৯৭২” বাতিল করা হয়। ২৪ শে জানুয়ারী, ১৯৭২ সালে জারী করা এই আইনের অধীনে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্রায় লাখখানেক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় এবং এদের মধ্যে ২৮৮৪ জনকে আদালতে বিচারের আওতায় আনা হয়। যাদের মধ্যে ৭৫২ জন দোষী প্রমানীত হয়। ১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু সাধারন ক্ষমা ঘোষনা করেন এই আইনের মাধ্যমে লঘু কিংবা গুরু অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়াদের প্রতি। তবে যারা ধর্ষন, হত্যা এবং লুন্ঠনের মত অপরাধে দোষী প্রমানিত হয়েছিলেন তাদের মুক্তি দেয়া হয়নি। সেই সাধারন ক্ষমার আওতায় অভিযোগ প্রমানিত না হওয়া বাকী ২০৯৬ জনকে মুক্তি দেয়া হয়। তবে রাস্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা ঘোষনা করা হলেও যেকোন অপরাধের অভিযোগে জনগনের আদালতে বিচার চাইবার অধিকার ছিলো।

সাধারন ক্ষমা ঘোষনার পরেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে এই আইন কার্যকর ছিলো কিন্তু এর অধীনে আর একটাও মামলা করা হয়নি। এই যুক্তি দেখিয়েই এই আইন প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তবে সাধারন জনগনের মনে এই আইন বাতিল করা ক্ষোভের জন্ম দেয়। সাধারন জনগন একে মুক্তিযুদ্ধের ঘাতক দালালদের প্রতি নিঃশর্ত ক্ষমা বলেই মনে করেছিলো, যারা ৩০ লক্ষ বাঙ্গালীকে হত্যার সাথে জড়িত ছিলো। এই রাজাকার এবং তাদের দোসরদের বড় একটা অংশ সাধারন ক্ষমার আগপর্যন্ত আত্মগোপনে ছিলো এবং এদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় অনেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে নানা সময়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করে।

এই আইন থাকলে যে দেশের কোন ক্ষতি হতো এ ব্যাপারে কোন যুক্তিই দেয়া যায়না। কিন্তু এর মাধ্যমেই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেইসকল মানুষের ফিরে আসবার সুযোগ তৈরি হলো যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সরাসরি সহযোগিতা করেছিলো। এই আইন বাতিল তাই দেশের ইতিহাসেরই আরেকটা কলংকজনক অধ্যায় হয়ে রইবে। তবে যুদ্ধাপরাধ কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পথ কখনোই রুদ্ধ হয়ে যায়নি, কেবল থমকে ছিলো অনেকটা সময়, একটু বেশিই দীর্ঘ সময়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা অপরাধের বিচার কিভাবে হওয়া উচিত। আমার ব্যক্তিগতভাবে নিম্নলিখিত ব্যাপারগুলো এ ব্যাপারে সঠিক মনে হয়ঃ

১। সরকারের কোন অধিকার নেই কোন অপরাধীকে বিনা বিচারে ক্ষমা করে দেবার। কারন, সরকার জনগনের জন্যই গঠিত হয়। ৭৩ সালের সাধারন ক্ষমার আওতায়ও কেবল তাদেরই মুক্তি দেয়া হয়েছিলো যাদের বিরুদ্ধে বিচারে অপরাধ প্রমানিত হয়নি। যেকোন অভিযোগের ভিত্তিতে জনগনের সাধারন আদালতে বিচার চাইবার অধিকার ছিলো। এমনকি কোলাবোরেটরস এক্ট বাতিল করা হলেও তা বিচারের পথ রুদ্ধ করেনি। দেশের আইনানুসারে সে সময়ের যেকোন অপরাধের ব্যাপারে বিচার চাইবার অধিকার জনগনের ছিলো। প্রশ্ন আসতে পারে কেন বিচার চলেনি আর। উত্তরটা হলো ‘ভয়ে’। একটা সময় সেইসব যুদ্ধাপরাধী সকল রাজনৈতিক দলের ভিতরেই নিজেদের অবস্থান সুসঙ্ঘত করতে সক্ষম হয়, তারা চলে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আজ পর্যন্ত তারা বেশ ক্ষমতাশালী।

২। একটা অপরাধ আজীবন অপরাধই থেকে যায়। সংঘটিত হবার সময়েও অপরাধ, আবার হাজার বছর পরেও সেটা অপরাধই থেকে যায়। আর কোন মানুষ অপরাধ করলে তার বিচার যেকোন সময়ই চাইতে পারে। কারন অপরাধটা আজীবন অপরাধই থাকে। যারা বলে এতো বছর পার হবার পর বিচারের কি দরকার, তাদেরও বিচার হওয়া দরকার।

৩। কোন সরকারই যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে প্রবর্তিত আইনগুলো বাতিল করেনি, কেবল কোলাবোরেটরস এক্ট ছাড়া। সাধারন আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনানুসারেও এই বিচার কাজ যেকোন সময়ে চালিয়ে নেবার সুযোগ ছিলো। যদিও বিচার কাজ শুরু হয় অনেক পরে। তবে বিচারের দাবী কখনোই থেমে থাকেনি। জেঃ জিয়ার আমলে, জেঃ এরশাদের আমলে এমনকি পচানব্বইয়েও যখন আওয়ামীলীগ কেয়ারটেকার সরকারের দাবীতে দেশ তামা তামা করে দিচ্ছিলো তখনো জাহানারা ইমামরা কিংবা অন্য অনেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে মার খেয়ে যাচ্ছিলেন মিডিয়া প্রচারনার অন্তরালে। ২০০৭ সালে আওয়ামীলীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আগেও সব সময়ই এই দাবী নিয়ে আন্দোলন করে গেছে কেউ না কেউ। আওয়ামীলীগ প্রথম আমল শেষ করবার পর দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে জোরেসোরে শুরু করেছে এটা ভালো ব্যাপার। একেবারে না হওয়ার চেয়ে সব যুদ্ধাপরাধীদের স্বাভাবিক মৃত্যুর আগেই ওই সময়ে পাকিস্তানীদের এদেশীয় দোসরদের মাথাদের বিচার হওয়া বাঙ্গালী জাতির জন্য খুব দরকার ছিলো। নাহলে পরবর্তী প্রজন্ম এ ব্যাপারে প্রশ্ন করতো। লজ্জিত হতাম আমরাই।

আবার প্রশ্ন আসতে পারে পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করাকে কিভাবে নেয়া উচিত। আমার মনে হয় বিজয়ী জাতি হিসেবে আমাদের আচরন হওয়া উচিত বিজয়ী জাতির মতই। আমাদের তাই করা উচিত যা একটা বিজয়ী জাতি করে। ওরা সকল তথ্য প্রমান অস্বীকার করবে এটাতে কোন সন্দেহ নেই। জাতি হিসেবে মিথ্যাচার করা পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আমি অপেক্ষা করছিলাম পাকিস্তান সরকারের স্পর্ধার জবাব সরকার কিভাবে দেয় তা দেখতে। আমি যা ধারনা করছিলাম, অনেকটা তাই হয়েছে। সরকার মোটামুটি চুপ করেই গেছে। কারন বর্তমান বিশ্বে কূটনৈতিক শিষ্টাচার বলে একটা কথা আছে। জনগন যেমন গালাগাল করতে পারে, সরকার তা পারে না। সরকারকে নানা দিক বিবেচনা করতে হয়। আচার আচরনে হতে হয় সংযত। তবে এটা রাষ্ট্রের দুর্বলতা নয়, এটাকেও রাষ্ট্রের শক্তিশালী দিকেও পরিনত করা যায়।

অনেক জায়গা থেকে দাবি উঠছে জামাতকে নিষিদ্ধ করতে। তবে এটাও হবে আত্মঘাতী এক সিদ্ধান্ত। নতুন নামে ফিরে আসা কোন ব্যাপারই না। সমর্থকেরা তো সমর্থকই থাকে। অঘোষিত শত্রুর চেয়ে ঘোষিত এবং প্রকাশ্য শত্রু ভালো। তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখা সহজ। বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের সাথে কেমন সম্পর্ক রাখবে কিংবা কতটুকু রাখা উচিত সেটাও বিবেচনায় রাখবার সময় এসেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা কোন সমাধান নয়, এতে সাধারন মানুষই ভোগান্তিতে পরে। তবে সেই সম্পর্কটা হওয়া উচিত সীমিত পর্যায়ের। প্রতিবছর তাবলীগ জামাতের নামে লাখ লাখ পাকিস্তানী এদেশে আসে। এদেশ থেকেও পাকিস্তানে যায়। এদের উপর নজরদারী দরকার। আবার এদের চলাচলে বাধাও দেয়া যাবে না, তাহলে সেটা হয়ে যাবে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত। ধর্মান্ধদের উস্কে দিতে কোন জোরালো ইস্যু লাগে না। তবে এসব যথাসম্ভব নজরদারীতে রেখে পাকিস্তানীদের প্রভাব মুক্ত রাখা উচিত বাংগালী ধর্মপ্রান মুসলমানদের। এই তাবলীগ জামাত এবং প্রধানত করাচীতে কর্মরত লাখখানেক বাঙ্গালীই সম্ভবত পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের প্রধান যোগসুত্র। অন্য কোন ব্যাপারে তেমন সম্পর্ক নেই। সংস্কৃতির ব্যাপারে আটকে রাখা যাবে না কাউকে। যার ভালোলাগবে সে নুসরাত ফতেহ আলী, রাহাত ফতেহ আলী, আতিফ আসলাম, নাজিয়া হাসান, জুনুন কিংবা ফুজোনের গান গুনগুন করবেই। আমি নিজেও করি। খেলার ব্যাপারেও এই একই কথা খাটে। আমি নিজেও বিশ্বাস করি খেলার সাথে রাজনীতি মেশানো ঠিক না। তবে ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে পাকিস্তানীরা খেলার ব্যাপারেও ক্যান্সারের মতন। কেলেংকারীতে ওদের জুড়ি মেলা ভার। তাই এদেশের লীগে কিংবা অন্য কোথাও পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের খেলতে সরাসরি বিধিনিষেধ আরোপ না করলেও আমাদের ফ্যাঞ্চাইজিগুলোর উচিত হবে পাকিস্তানী খেলোয়াড়দের দলে নেবার ব্যাপারে অনীহা দেখানো। রাষ্ট্রের মৌখিক নির্দেশনাই এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ। আইপিএল এ ব্যাপারে আদর্শ উদাহরন।

আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে পাকিস্তানীদের বক্তব্যের যথাযোগ্য জবাব কি হতে পারে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আমার মনে হয়,

১। সরকারের উচিত ৭৪ সালের ত্রিপাক্ষিক সমঝতা চুক্তির একটা কপি আবার পাকিস্তানের কাছে পাঠিয়ে দেয়া এবং সকল সংবাদপত্রে ছাপানর ব্যবস্থা করা। ওরা যে এক অর্থে ক্ষমাই চেয়েছিলো তার অকাট্য প্রমান এই দলিল। ওরা তো সবকিছু ভুলে যায়, মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে বারবার, যতক্ষন পর্যন্ত মাথায় না ঢুকে যায়।

২। পাকিস্তানীদের সরিয়ে নেয়া সম্পদের হিসেবটাও আজও বকেয়া। সেটার ব্যাপারেও সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে। ওই সম্পদ কিংবা সরিয়ে নেয়া অর্থ আমাদের নায্য পাওনা।

৩। এদেশীয় দোসরদের বাইরে ওই ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর ব্যাপারেও আন্তর্জাতিক আদালতেও যেতে পারে বাংলাদেশ সরকার যদি তাদের কেউ বেঁচে থাকে। একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে এই অধিকার আমাদের আছে, আমরা সেটা অর্জন করেছি রক্ত নিয়ে, অনেক আত্মত্যাগ, অনেক সংগ্রামের মাধ্যমে। সারা বিশ্বের জানা উচিত তারা কি করেছিলো ৭১ এ। আর পাকিস্তানীদের হাঁসফাঁসকে বৃদ্ধাংলি দেখিয়ে নির্বিকারচিত্তে তাদের এদেশীয় দোসরদের বাকী যতজন অবশিষ্ট আছে, তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা দরকার। ওদের জানিয়ে দেয়া দরকার, দেশটা আমাদের। আমাদের দেশে যা কিছু হবে সব আমাদের আইন অনুসারেই হবে, হবে আমাদের বিজয়ী জনগনের ইচ্ছামত। আমরা জাতি হিসেবে অপরাধকে অপরাধই বলবো। রাষ্ট্রও নিশ্চিত করবে দেশে ন্যায়বিচার আসলেই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ওরা দূর থেকে চীৎকার করবে, কিন্তু বিচার বন্ধ করতে না পেরে ওদের কষ্ট আরো বাড়বে। আর এটাই হতে পারে বিজয়ী জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে যোগ্য জবাব পাকিস্তান নামক ব্যর্থ রাষ্ট্রের প্রতি।

শুধু বিজয়ের মাসেই নয়, বিজয়ী হিসেবে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র যতদিন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত সবক্ষেত্রেই আমাদের আচরন হোক বিজয়ী জাতির মতই। মানুষের বিনয়ী আচরনের কারনে পৃথিবীর মানুষ আমাদের চিনুক, পৃথিবীর মানুষ বাঙ্গালী জাতির নাম শুনলেই যেনো বলে, ওরা খুব ভালো মানুষ। সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা যেকোনো সুচকে আমরা যেন ওদের থেকে এগিয়ে থাকি। রাষ্ট্র হিসেবে সবদিক থেকে এগিয়ে যেতে পারলেই সেটা হবে ওদের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় জবাব। বিজয়ী জাতি হিসেবে আমরা যেন সর্বক্ষেত্রেই বিজয়ীর হবার লক্ষ্যে এগিয়ে যাই। আমরা যেন ঠিক সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে পারি একটা প্রকৃত বিজয়ী জাতির সেভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

তথ্যসুত্র;
http://shodhganga.inflibnet.ac.in/bitstream/10603/31669/15/15_appendices.pdf
বাংলাদেশ জেনোসাইড আর্কাইভ
উইকিপিডিয়া
নিউইয়র্ক টাইমস
http://archive.thedailystar.net/forum/2010/may/curious.htm

Following is the full text of tripartite agreement signed in New Delhi on 9 April 1974.

1. On 2 July 1972, the President of Pakistan and the Prime Minister of India signed an historic agreement at Simla under which they resolved that “the two countries put an end to the conflict and confrontation that have hitherto marred their relations and work for the promotion of a friendly and harmonious relationship and the establishment of durable peace in the subcontinent.” The agreement also provided for the settlement of “their differences by any other peaceful means mutually agreed upon”.

2. Bangladesh welcomed the Simla Agreement. The Prime Minister of Bangladesh strongly supported its objective of reconciliation, good neighborliness and establishment of durable peace in the subcontinent.

3. The humanitarian problems arising in the wake of the tragic event of 1971 constituted a major obstacle in the way of reconciliation and normalization among the countries of the subcontinent. In the absence of recognition, it was not possible to have tripartite talks to settle the humanitarian problems, as Bangladesh could not participate in such a meeting except on the basis of sovereign equality.

4. On 17 April 1973, India and Bangladesh took a major step forward to break the deadlock on the humanitarian issues by setting aside the political problem of recognition. In a declaration issued on that date, they said that they “are resolved to continue their efforts to reduce tension, promote friendly and harmonious relationship in the sub-continent and work together towards the establishment of a durable peace.”
Inspired by this vision and “in the larger interest of reconciliation, peace and stability in the subcontinent”, they jointly proposed that the problem of the detained and stranded persons should be resolved on humanitarian considerations through simultaneous repatriation of all such persons except those Pakistani prisoners of war who might be required by the Government of Bangladesh for trial on certain charges.

5. Following the declaration, there were a series of talks between India and Bangladesh and India and Pakistan. These talks resulted in an agreement at Delhi on 28 august 1973, between India and Pakistan with the concurrence of Bangladesh, which provided for a solution of the outstanding humanitarian problems.

6. In pursuance of this agreement, the process of three-way repatriation commenced on 19 September 1973. So far nearly three lakh persons have been repatriated which has generated an atmosphere of reconciliation and paved the way for normalization of relations in the sub-continent.

7. In February 1974, recognition took place thus facilitating the participation of Bangladesh in the tripartite meeting envisaged in the Delhi Agreement, on the basis of sovereign equality. Accordingly, Dr. Kamal Hossain, Foreign Minister of Government of Bangladesh, Mr. Swaran Singh, Minister of External affairs, Government of India, and Mr. Aziz Ahmed, Minister of State for Defense and Foreign Affairs of the Government of Pakistan, met in New Delhi from 5 April to 9 April 1974 and discussed the various issues mentioned in the Delhi Agreement, in particular the question of the 195 prisoners of war and the completion of the three-way process of repatriation involving Bangladesh and Pakistani prisoners of war in India.

8. The Ministers reviewed the progress of the three-way repatriation under the Delhi Agreement of 28 August 1973. They were gratified that such a large number of persons detained or stranded in the three countries had since reached their destinations.

9. The Ministers also considered steps that needed to be taken in order expeditiously to bring the process of three-way repatriation to a satisfactory conclusion.

10. The Indian side stated that the remaining Pakistani prisoners of war and civilian internees in India to be repatriated under the Delhi Agreement, numbering approximately 6,500, would be repatriated at the usual pace of a train on alternate days and the likely shortfall due to suspension of trains from 10 April to 19 April 1974, on account of the Kumbh mela, would be made up by running additional trains after April 19. It was thus hoped that the repatriation of prisoners of war would be completed by the end of April 1974.

11. The Pakistan side stated that the repatriation of Bangladesh nationals from Pakistan was approaching completion. The remaining Bangladesh nationals in Pakistan would also be repatriated without let or hindrance.

12. In respect of non-Bengalis in Bangladesh, the Pakistan side stated that the Government of Pakistan had already issued clearances for movement of Pakistanis in favour of those non-Bengalis who were either domiciled in former West Pakistan, were employees of the Central Government and their families or were members of the divided families, irrespective of their original domicile. The issuance of clearances to 25,000 persons who constitute hardship cases was also in progress.
The Pakistan side also reiterated that all those who fall under the first three categories would be received by Pakistan without any limit to numbers. In respect of persons whose applications had been rejected, the Government of Pakistan would, upon request, provide reasons why any particular case was rejected. Any aggrieved applicant could at a time, seek a review of his application provided he was able to supply new facts or further information to the Government of Pakistan in support of his contention that he qualified in one or other of the three categories. The claim of such persons would not be time-barred. In the event of the decision of review of a case being adverse, the Government of Pakistan and Bangladesh might seek to resolve it by mutual consultation.

13. The question of 195 Pakistani prisoners of war was discussed by the three Ministers in the context of the earnest desire of the Governments for reconciliation, peace and friendship in the sub-continent. The Foreign Minister of Bangladesh stated that the excesses and manifold crimes committed by those prisoners of war constituted, according to the relevant provisions of the UN General Assembly resolutions and international law, war crimes, crimes against humanity and genocide, and that there was universal consensus that persons charged with such crimes as 195 Pakistani prisons of war should be held to account and subjected to the due process of law. The Minister of State for Defense and Foreign Affairs of the Government of Pakistan said that his Government condemned and deeply regretted any crimes that may have been committed.

14. In this connection, the three Ministers noted that the matter should be viewed in the context of the determination of the three countries to continue resolutely to work for reconciliation. The Ministers further noted that following recognition, the Prime Minister of Pakistan had declared that he would visit Bangladesh in response to the invitation of the Prime Minister of Bangladesh and appealed to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past in order to promote reconciliation. Similarly, the Prime Minister of Bangladesh had declared with regard to the atrocities and destruction committed in Bangladesh in 1971, that he wanted the people to forget the past and to make a fresh start, stating that the people of Bangladesh knew how to forgive.

15. In the light of the foregoing and, in particular, having regard to the appeal of the Prime Minister of Pakistan to the people of Bangladesh to forgive and forget the mistakes of the past, the Foreign Minister of Bangladesh stated that the Government of Bangladesh had decided not to proceed with the trials as an act of clemency. It was agreed that the 195 prisoners of war might be repatriated to Pakistan along with the other prisoners of war now in the process of repatriation under the Delhi Agreement.

16. The Ministers expressed their conviction that the above agreements provide a firm basis for the resolution of the humanitarian problems arising out of the conflict of 1971. They reaffirmed the vital stake the 700 million people of the three countries have in peace and progress and reiterated the resolve of their Governments to work for the promotion of normalization of relations and the establishment of durable peace in the sub-continent.

Signed in New Delhi on 9 April 1974, in three originals, each of which is equally authentic.

(Kamal Hossain)
Minister of Foreign Affairs, Government of Bangladesh

(Swaran Singh)
Minister of External Affairs, Government of India

(Aziz Ahmed)
Minister of State for Defense and Foreign Affairs, Government of Pakistan.

২ thoughts on “প্রসঙ্গঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্পর্ধা/দাবী, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যত এবং বিজয়ী জাতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *