হাইপেশিয়া: একজন বিপ্লবী নারী বিজ্ঞানী

“আমরা সমাজে বাস করি, সমাজে বাস করার জন্য কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, সমাজব্যবস্থা মেনে চলতে হয়। নিজের ইচ্ছেমত সমাজে চলাফেরা করা যাবে না।” শৈশব থেকেই আমাদের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়া হতে থাকে এই ধরনের মন্ত্র। আর তাই শৈশব ছেড়ে আসার পরেও আমাদের তাড়া করে বেড়ায় এ মন্ত্র! কিছু একটা করতে গেলেই মনের মাঝে উকি দেয় সমাজের ভয়। কিন্তু প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে আকড়ে ধরে রেখে কী নতুন কিছু করা যায়? সমাজের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে থাকলে কী কখনো সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব? না, সম্ভব না। আজ পর্যন্ত যারাই এ পৃথিবীতে নতুন কিছু করতে চেয়েছেন, তাদের এই সমাজের বেড়াজাল ভেঙে বেড়িয়ে আসতে হয়েছে। কারণ সমাজে নতুনত্ব আনতে হলে, নতুন কিছু প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রচলিত ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে হবে; আর এজন্য অবশ্যই প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যেতে হবে। সমাজব্যবস্থা কখনোই কোনো নতুন সৃষ্টির অনুকূলে থাকে না, বরং সৃষ্টিশীলতার পায়ে বেড়ি পড়ানোই এর কাজ। এই কথা শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকদের জন্য যেমন সত্য, ঠিক তেমনি এটি সত্য বিজ্ঞানীদের জন্যেও।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারীর মস্তিষ্ক তার সমবয়সী একজন পুরুষের তুলনায় অধিক পরিপক্ক হয়। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক-“তাহলে ইতিহাসে নারী বিজ্ঞানীদের সংখ্যা হাতে গোণা কেন?” প্রথমেই বলেছি, সৃষ্টিশীলতার পায়ে বেড়ি পড়ানোই সমাজব্যবস্থার কাজ, কেননা সমাজব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে স্বার্থলোভীরা। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা অনুযায়ী পুরুষদের কাজ ঘরের বাইরে, আর নারীদের কাজ চার দেয়ালের ভেতরে। ছেলে স্কুলে যাবে, মেয়ে রান্নাঘরের কাজ শিখবে; ছেলে ক্রিকেট খেলবে, মেয়ে পুতুল খেলবে; স্বামী বাজার করে আনবে, স্ত্রী রান্না করবে; স্বামী অফিসে যাবে, স্ত্রী তিন বেলার খাবারের ব্যবস্থা করে রাখবে। নারীদের সব দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে চার দেয়ালের ভেতরে, আর এমনটাই হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। তাহলে নারীদের বিজ্ঞানী হওয়ার সুযোগটা কোথায়? আর যেই নারীরা এই সব বাধা উপেক্ষা করে এসে বিজ্ঞানী হয়ে উঠতে পেরেছে, তাদের জীবনে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয় নি! তাদের সমাজবিচ্ছিন্ন হতে হয়েছে, সংসার ত্যাগ করতে হয়েছে, লান্ঞ্ছনা বন্ঞ্চনার স্বীকার হতে হয়েছে, এমনকি নিজেদের প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে!

এমনই একজন বিপ্লবী নারী হাইপেশিয়া। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগের কথা, সে সময় মেয়েরা ছিল শুধুই ভোগের সামগ্রী। যাদের ভোগের সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাদের লেখাপড়ার সুযোগ থাকবে এমনটা কল্পনা করাও বিরাট বোকামী। তাই ঐ পরিস্থিতিতে একজন নারীর বিজ্ঞানী হয়ে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। অথচ সেই সময়কার একজন নারী হয়েও হাইপেশিয়া নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একাধারে গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রতিভাময় জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেবে। তবে এক্ষেত্রে তার বাবার ভূমিকাও কম নয়। তার বাবা দার্শনিক থিওন সেই প্রতিকূল সমাজব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে সকল বাধাকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজের মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন। থিওনের স্বপ্ন ছিল যে তার মেয়ে একদিন অনেক বড় বিজ্ঞানী হবে। হাইপেশিয়া তার বাবা থিওনের সেই স্বপ্নকে সত্যিতে রূপান্তরিত করে দেখিয়েছেন। হাইপেশিয়া ছিলেন আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীর সর্বশেষ গবেষক। প্রায় দুই হাজার বছর আগে মিশরে আলেকজান্দ্রিয়া শহরে গড়ে উঠেছিল আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরী। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ থাকত আলেকজন্দ্রিয়া শহরে। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীকে ঘিরে সে সময় গড়ে উঠতে শুরু করেছিল বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতা। সেখানে গবেষকরা গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল ইত্যাদী নানা বিষয়ে গবেষণা করতেন। আর সেই গবেষণা এবং গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফল নিখুতভাবে সংরক্ষণ করা হত লাইব্রেরীর বইগুলোতে। বইগুলোও ছিল মহামূল্যবান, কেননা সেগুলো ছিল হাতে লেখা। সেসময় ছাপাখানা বলতে কিছুই ছিল না, তাই হাতে লেখা বইগুলো বেশ যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হত। বিভিন্ন দেশের বড় বড় গবেষকরা কখনো কখনো তাদের গবেষণার জন্য আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীতে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা জমা রেখে সেই বই ধার নিতেন, তারপর সেই বইয়ের প্রতিলিপি তৈরি করিয়ে নিয়ে পরে বই ফেরত দিতেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা তাদের স্বর্ণমুদ্রার চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আসল বইটি রেখে দিতেন, আর ফেরত দিতেন তার প্রতিলিপি। আনুমাণিক দশ লক্ষের ওপর বই ছিল আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীতে।

সেই বিখ্যাত আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীর সর্বশেষ গবেষক হাইপেশিয়া। তার জন্ম ৩৭০ খ্রিস্টাব্দে। তিনি ছিলেন অসম্ভব সুন্দরী, তার রূপে গুণে মুগ্ধ হয়ে দেশ বিদেশের অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিরা তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। কিন্তু সংসার জীবনে বাঁধা পড়তে তিনি চান নি, তাই কখনো বিয়েও করেন নি। তাঁকে মনে করা হত শাস্ত্রের পণ্ডিত, বলা হত আফ্রোদিতির দেহে প্লেটোর আত্মা। হাইপেশিয়া পার্গের গণিতবিদ অ্যাপোলোনিয়াসের কোণসংক্রান্ত তত্ত্বের উপর রচনা করেন “On the Conics of Apollonius”, এই গ্রন্থটি পরাবৃত্ত, অধিবৃত্ত এবং উপবৃত্ত সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সুস্পষ্ট ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিল। হাইপেশিয়ার ঝোঁক ছিল মূলত ব্যবহারিক প্রযুক্তির উপর, যা তাকে অ্যাস্ট্রবেল(Astrobell) আবিষ্কারে উদ্বুদ্ধ করে। অ্যাস্ট্রবেল ব্যবহৃত হত সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ে। হাইপেশিয়া যন্ত্রটিকে বেশ সুক্ষ্মভাবে তৈরি করেন, যার ফলে এটি থেকে গোলীয় জোতির্বিদ্যার সঠিক সমাধান পাওয়া যেত। এছাড়াও তিনি তরলের আপেক্ষিক গুরুত্ব এবং পরিস্রাবণ ও তরল তলের উচ্চতামাপক যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যার নাম দেয়া হয় হাইড্রোস্কোপ(Hydroscope)। তিনি নিয়মিত আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীতে বিজ্ঞানবিষয়ক বক্তৃতা দিতেন, বিভিন্ন বিষয়ের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তুলে ধরতেন জনসাধারণের কাছে। দেশ বিদেশের জ্ঞানী গুণী গবেষকেরা সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসতেন তার বক্তৃতা শুনতে। তার বক্তৃতা রীতিমত টিকিট কেটে শুনতে হত! বিভিন্ন দেশে তার অনেক ছাত্র ছিল। তার প্রচেষ্টায় সে সময়কার মানুষের মনে জায়গা করে নিতে থাকে বিজ্ঞান, দূর হতে থাকে সামাজিক এবং ধর্মীয় বিভিন্ন কুসংস্কার। বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার অগ্রগতির পথ সুগম করে দিয়েছিলেন হাইপেশিয়া। কিন্তু এতে আঁতে ঘাঁ লাগে স্বার্থান্ধদের, ধর্মব্যবসায়ীদের। মানুষ বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে এবং সচেতন হয়ে উঠছে দেখে মুষড়ে পড়ে তারা। পাছে তাদের ব্যবসা লাটে উঠে যায়, এই ভয়ে তারা হাইপেশিয়ার বিরুদ্ধে লেগে যায়। সে সময় খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার শুরু হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই যেখানে ধর্ম থাকে, সেখানে অধর্মও দানা বেঁধে ওঠে। জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চাকে ধর্মান্ধ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা বেশ খারাপ চোখেই দেখত, বিজ্ঞানের চর্চাকারীদের তারা ধর্মদ্রোহী এবং নাস্তিক আখ্যা দিত। তখনকার খ্রিস্টান আর্চ বিশপের নাম ছিল সিরিল। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীকে কেন্দ্র করে জ্ঞান বিজ্ঞানের যে অগ্রগতি হচ্ছিল, তা সিরিলকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। সিরিল খ্রিস্টানদের ধর্মান্ধতার সুযোগ নিয়ে তাদের হাইপেশিয়ার বিরুদ্ধে চালিত করেন। কিন্তু হাইপেশিয়ার ছাত্ররা তাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার সামনে তারা টিকতে পারে নি। আলেকজান্দ্রিয়ার নগরপাল অরিস্টিসের সাথে হাইপেশিয়ার সুসম্পর্ক ছিল। তাদের দুজনের এই বন্ধুত্ব নিয়েও জঘণ্য সব গুজব রটানো হয়েছিল। কিন্তু হাইপেশিয়ার মান এতটা ঠুনকো ছিল না যে এই গুজবের কারণে তা নষ্ট হবে। এই মিথ্যে গুজবও তার দিগন্ত জোড়া খ্যাতির ওপর এতটুকু আচড় কাটতে পারে নি। হাইপেশিয়াকে থামানোর সব রকম চেষ্টা যখন ব্যর্থ হল, ধর্মের দোহাই দিয়েও যখন হাইপেশিয়ার ভক্তদের বিজ্ঞান চর্চা থেকে ফেরানো গেল না, তখন ষড়যন্ত্রীরা তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিল।

দিনটা ছিল ৪১৭ খ্রিস্টাব্দের একটা দিন। প্রতিদিনের মত সেদিনও তিনি ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে রওনা হয়েছিলেন আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীর উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে তাকে ঘিরে ফেলা হল। তারপর ঘোড়ার গাড়ি থেকে তাকে নামিয়ে মাটিতে ফেলা হল। আর্চ বিশপ সিরিলের নেতৃত্বে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় একটা গির্জায়। সেখানে তাকে বিবস্ত্র করে তার ওপর করা হয় অমানুষিক নির্যাতন! এরপর তার ক্ষত বিক্ষত দেহকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলা হল। এতেই ক্ষান্ত দিল না সেই নরপিশাচেরা, প্রতিভাময়ী এই বিজ্ঞানীর দেহের ছিন্ন ভিন্ন অংশগুলোকে আগুনের মাঝে ছুড়ে দিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে তারা। পৃথিবীর ইতিহাসে এধরনের নৃশংসতার উদাহরণ হয়ত খুব বেশি নেই। হাইপেশিয়া হত্যাকাণ্ডের পর সিরিলকে ক্যাথলিক চার্চ সেইন্ট বানিয়ে দেয়া হয়। হাইপেশিয়াকে হত্যা করার পরও ধর্মান্ধদের ক্ষুধা মেটে নি। হাইপেশিয়ার হাত ধরে বিজ্ঞানের যে অগ্রযাত্রা হয়েছিল, তাকে সমূলে ধ্বংস করে দেয়ার লক্ষ্যেই আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীকে গুড়িয়ে দেয়া হল। আর সেই সাথে আগুনে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হল সেই লাইব্রেরীর দশ লক্ষেরও বেশি বই। যে বইগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লেখা হয়েছিল, যে বইগুলোতে সংরক্ষিত ছিল বড় বড় গবেষকদের সারা জীবনের পরিশ্রম, তা একদিনেই পুড়ে ছাই হয়ে গেল! সভ্যতাকে রুখে দেয়ার জন্য বেশ ভাল বন্দোবস্ত করেছিল তারা। সেই ঘটনার পর প্রায় এক হাজার বছরের জন্য থমকে দাড়িয়েছিল বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। কে জানে, এখন আমরা যেসব জিনিসকে অসম্ভব বলে মনে করি, হয়তবা তার অনেক কিছুই সেসময়কার বিজ্ঞানীরা তাদের মেধাশ্রম দিয়ে সম্ভব করে দেখিয়েছিলেন, যা ঐ বইগুলোতেই সংরক্ষিত ছিল!

আজও বিজ্ঞানের জগতে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় হাইপেশিয়াকে। তার স্মরণেই চাঁদের একটি অংশের নামকরণ করা হয়েছে “হাইপেশিয়া”। এমন একজন তেজস্বী, প্রতিভাময়ী, সাহসী বিজ্ঞানীকে কী সহজে ভোলা যায়? তার দুটো উক্তি আজও অমর হয়ে আছে-

*তোমার চিন্তা করার অধিকার সংরক্ষণ কর। এমনকি ভুলভাবে চিন্তা করা একেবারে চিন্তা না করা থেকে উত্তম।
*কুসংস্কারকে সত্য হিসেবে শিক্ষা দেয়া একটি ভয়ংকরতম বিষয়।

৪ thoughts on “হাইপেশিয়া: একজন বিপ্লবী নারী বিজ্ঞানী

  1. বিজ্ঞানের প্রসারে চার্চগুলো
    বিজ্ঞানের প্রসারে চার্চগুলো সে সময়ে ছিল বড় এক বাধা।আমরা অনেকেই জানি ব্রুনো,কোপার্নিকাস, গ্যালিলিওর মত বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানের প্রসারে চার্চের বাধার কথা।জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাকে ধর্ম সবসময় ভয় করে এসেছে।ইসলাম ধর্মের আদি ইতিহাসেও দেখি তৎকালীন কবিদের নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছে।
    লেখা খুবই ভাল লেগেছে।এবিষয়ে আরো লেখা আপনার কাছ থেকে আশা করছি,সিরিজ হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *