নিয়তি

তপন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। “তুই একেবারে বদ্ধ পাগল হয়ে গিয়েছিস। তা না হলে এমন উন্মাদের মতন কাজের চিন্তা করা কারো পক্ষে সম্ভব না।”

আমি ক্লিষ্ট হেসে বললাম, “তা বলতে পারিস। উন্মাদ। বলতেই পারিস। প্রায়ই এই কথা শুনি। সবার কাছ থেকেই তো। তুই আর বাদ যাবি কেনো?”

তপনের চোখে যেনো বিষাদের ছায়া পড়লো। আমারো একটু খারাপ লেগে উঠলো। সেই স্কুল থেকেই ও আমার বন্ধু। এরপর একই কলেজে। একই ভার্সিটি। বিদেশ থেকে একই সাথে মাস্টার্স। পি এইচ ডি। বহু দীর্ঘ পথ একসাথে পারি দিয়েছি দুই জন। এই ধরনের কথা ওকে আমার বলাটা মোটেও মানায় না। আমি জানি।


তপন আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। “তুই একেবারে বদ্ধ পাগল হয়ে গিয়েছিস। তা না হলে এমন উন্মাদের মতন কাজের চিন্তা করা কারো পক্ষে সম্ভব না।”

আমি ক্লিষ্ট হেসে বললাম, “তা বলতে পারিস। উন্মাদ। বলতেই পারিস। প্রায়ই এই কথা শুনি। সবার কাছ থেকেই তো। তুই আর বাদ যাবি কেনো?”

তপনের চোখে যেনো বিষাদের ছায়া পড়লো। আমারো একটু খারাপ লেগে উঠলো। সেই স্কুল থেকেই ও আমার বন্ধু। এরপর একই কলেজে। একই ভার্সিটি। বিদেশ থেকে একই সাথে মাস্টার্স। পি এইচ ডি। বহু দীর্ঘ পথ একসাথে পারি দিয়েছি দুই জন। এই ধরনের কথা ওকে আমার বলাটা মোটেও মানায় না। আমি জানি।

তপন মৃদু স্বরে বললো,”তোর সমস্যাটা আমি বুঝতে পারছি। এরকম ঘটনায় যে কেউ হতাশ হয়ে পড়বে। আমি মানছি। কিন্তু তাই বলে এই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া লাগবে কেনো? উই অল হ্যাভ এ চয়েজ। সব তো শেষ হয়ে যায় নি।”

আমি চুপ করে থাকলাম। কি আর বলবো। সবই তো তপনের জানা। গত বছর লন্ডন থেকে ফিরে তপন কাজ নিলো আই ইউ টিতে। আমাকেও অফার করা হয়েছিলো। কিন্তু ছোটোবেলা থেকে আমার যেই স্বপ্ন, সেই গবেষণার পথে আগানোর জন্যে আমি প্রস্তাবটি দূরে ঠেলে দেই। আজ এক বছর পর তপন কোথায় আর আমি কোথায়? দেশের অন্যতম মেধাবী তরুন শিক্ষক, সরল ভাষায় বিজ্ঞানের বই লেখে হইচই ফেলে দেয়া তপনকে এখন অনেকেই চেনে। আই ইউ টি থেকে ওরই তত্ত্বাবধানে পাঠানো দল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক জিতেছে। তপন অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

অন্যদিকে আমি। আমারও তো এগোনোর কথা ছিলো। কেনো হলো না? শুধু নিয়তি। আমার চার ইঞ্চি কপাল আমাকে পদে পদে যেনো পিছিয়ে দিতে থাকলো। অথচ দেশে আসার দুই মাসের মধ্যে আমি আবিষ্কার করে বসলাম নেচার সেভিং বেটার ইউটিলাইজেশন সংক্ষেপে নেসেবেই ওয়েল। সাধারণ তেলের চাইতে চার গুণ অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন কিন্তু খরচ অর্ধেক। জীবাশ্ম নয় বরং সাধারন দূর্বা ঘাস থেকেই তৈরি করা যায়। আমার পরীক্ষামূলক গবেষণা চলছিলো তখনই হঠাৎ দেখা গেলো আমেরিকার এক বিজ্ঞানী জন রিচার্ড সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষনা দিলেন প্রায় একই ধরনের তেল আবিষ্কারের। পরিহাস। নিয়তির পরিহাস।

না। হার মানিনি। স্বভাবে নেই। কিন্তু তাই বলে একই ঘটনা বার বার ঘটে চলবে একজনের জীবনে। এর পরের আবিষ্কারটার কথাই ধরা যাক। সোলার এনার্জিকে বহুগুণে বাড়িয়ে একটা মাত্র প্যানেলের মাধ্যমে সারা বাড়ি আলোকিত করার একটা ডিভাইস আবিষ্কার করে বসলাম। সোএ-এড ডিভাইস। বাড়ির ছাদে টেস্ট চালিয়ে আমি তখন আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে। এক বিকেলবেলা এই তপনই ইচ্ছসিত গলায় ফোন করে আমাকে জানালো সাউথ আফ্রিকার বিজ্ঞানী লিও ডুরান্ডের আবিষ্কারের কথা। হুবুহু এক আবিষ্কার। শুধু নামটাই ভিন্ন। ইউনিক সান। ওকে আর আমার কিছু বলা হলো না। এও ঘটে?

চেষ্টা থেমে থাকে নি। যে কোনো মাটিতে, যে কোনো পরিবেশে ব্যাবহার যোগ্য রাসায়নিক সার আবিষ্কার করলাম। ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে থাকে সেই সাথে মাটির উর্বরতাও বাড়ে। যত ব্যাবহার করা হয় ততই। মাটিতেই মিশে যায়, তাই ঘটায় না প্রাকৃতিক দূষণও। লাভ কি? আমার গবেষণা শেষ করার আগেই ঘোষণা দিয়ে দিলো আরেকজন। ছয় ঘন্টার পার্থক্য। মাত্র ছয় ঘন্টা।

এর পর বানালাম হ্যান্ডহেল্ড এয়ার কন্ট্রোলার। হাতেই বহন করা যায়। পাল্টে ফেলা যায় একটা ছোটোখাটো ফ্লাটের আবহাওয়া। গরম থেকে ঠান্ডা। ঠান্ডা থেকে গরম। বিদ্যুৎ খরচ নিয়েও চিন্তা নেই। একটা সিলিং ফ্যান চলতে যতটুকুন লাগে ততটুকুই। কিন্তু ওই যে। সকলের ভাগ্যে থাকে না। এবার আর সহ্য হয় নি। সেদিন রাতেই তপনকে ফোন করে যখন বলেছিলাম ও চলে এসেছিলো আমার বাসায়। সবগুলো আবিষ্কারই দেখিছিলো। কিন্তু কিছুই বলতে পারে নি। পারার কথাও না। উত্তরবিহীন প্রশ্নের আর উত্তর খুঁজবে কে?

এবার আমার জেদ চেপে গেলো। এমন কিছু করতে হবে যেটা আর কেউ কখনো করে নি। যেটা সকলেই স্বপ্নে ভাবে। প্র্যাকটিকাল ভাবে করতে গেলে হয়তো সকলেই পিছিয়ে আসবে। কিন্তু আমি পেছালাম না। বাস্তবে যা করতে গেলে বা করার কথা ভাবলে সকলেই হাসি ঠাট্টা করতো আমি সেটাই বাস্তবে ঘটানোর চেষ্টায় রত হলাম। গত চার চারটা মাস দিন রাত এক করে উন্মাদ, হ্যা, উন্মাদের মতনই খেটে গিয়েছি। সেই আদিকালের পদার্থবিজ্ঞান থেকে শুরু করে কোয়ান্টাম মেকানিক্স কি কি আবার পড়ি নি? এমনকি অখাদ্য কুখাদ্য সায়েন্স ফিকশনও পড়েছি। পড়েছি তো না, গিলেছি। মাথার মধ্যে গড়ে ওঠা আইডিয়াটা ধীরে ধীরে রূপ দিলাম। হ্যা, অবশেষে আমি সফল। সম্পূর্ণ সফল। এই মুহূর্তে আমার বাসার ছোট্টো গবেষণাগারে একটা জলজ্ব্যান্ত টাইম মেশিন বিদ্যমান। অতীত ভবিষ্যৎ এখন আমার হাতের মুঠোয়।

নাউ, ইটস টাইম টু স্টার্ট ইনিশিয়ালাইজিং মাই প্লান।

(চলবে…)

২ thoughts on “নিয়তি

  1. মাঝে মাঝে মনে হয় নিয়তি বলে
    মাঝে মাঝে মনে হয় নিয়তি বলে কিছু নেই, সবই কর্মফল। আবার হাজারো চেষ্টার পরও যখন ব্যর্থতা আসে, কিংবা না চাইতেই কিছু পেয়ে যাই, তখন মনে হয়- সবই নিয়তির খেলা।
    চলুক… :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ:

  2. হাজারো চেষ্টার পরও যখন

    হাজারো চেষ্টার পরও যখন ব্যর্থতা আসে, কিংবা না চাইতেই কিছু পেয়ে যাই, তখন মনে হয়- সবই নিয়তির খেলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *