চিন্তার পদ্ধতিঃ দত্তক প্রসঙ্গে

আমার খুব প্রিয় একজন ঘরোয়া আলাপে সেদিন বললো, ‘ সবাই যদি এঞ্জেলিনা জোলির মতো দত্তক নিতো তাহলে পৃথিবীতে একটাও অনাথ, এতিম বাচ্চা থাকতো না। ‘

কথাটা শুনে প্রথমে তাকে ধন্যবাদ দিলাম। মানুষের প্রতি মানুষের এই যে আবেগ, ভালবাসা এটা খুব জরুরী। পরে তাকে বললাম, তোমার চিন্তা পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। শুনে সে বড়বড় চোখ করে তাকালো।

বললাম, এসো এভাবে চিন্তা করি – পৃথিবীর সকল বাচ্চা যদি অনাথ, এতিম না হতো! ওই শিশুগুলো যদি পিতা-মাতার স্নেহ বঞ্চিত না হতো! তাহলে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অনেকবেশি মানবিক হতো তাই না?


আমার খুব প্রিয় একজন ঘরোয়া আলাপে সেদিন বললো, ‘ সবাই যদি এঞ্জেলিনা জোলির মতো দত্তক নিতো তাহলে পৃথিবীতে একটাও অনাথ, এতিম বাচ্চা থাকতো না। ‘

কথাটা শুনে প্রথমে তাকে ধন্যবাদ দিলাম। মানুষের প্রতি মানুষের এই যে আবেগ, ভালবাসা এটা খুব জরুরী। পরে তাকে বললাম, তোমার চিন্তা পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন আনতে হবে। শুনে সে বড়বড় চোখ করে তাকালো।

বললাম, এসো এভাবে চিন্তা করি – পৃথিবীর সকল বাচ্চা যদি অনাথ, এতিম না হতো! ওই শিশুগুলো যদি পিতা-মাতার স্নেহ বঞ্চিত না হতো! তাহলে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই অনেকবেশি মানবিক হতো তাই না?

এবার এসো ভেবে দেখি, ওই লাখ লাখ বাচ্চা প্যারেন্টলেস কেনো হয়। ওরা কেনো হোমলেস। ওদের কেনো খোলা আকাশের নিচে আধপেটা খেয়ে কিংবা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হয়।

যদি তুমি ভাববাদী না হয়ে থাকো। মানুষের দু:খ, দারিদ্রের জন্য আল্লাহ-ভগবানরে দায়ী করতে না চাও তবে তোমাকে অবশ্যই ভাবতে হবে ওদের এই মানবেতর অবস্থার আসল কারণ নিয়ে।

একজন জোলি কিংবা শামিমা মিতু অল্পকিছু বাচ্চার দায়িত্ব হয়তো নিতে পারবে, মায়ের স্নেহ-ভালবাসায় বড় করে তুলবে হয়তো। কিন্তু ভেবে দেখেছো বাকিদের অবস্থা?

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার মোড়লেরা তোমাকে বলবে, ওই বাচ্চার দায়িত্ব তুমি নাও। এটা তোমার মানবিক কর্তব্য। ওরা কখনোই বলবে না, এই এতিম বাচ্চাদের ভরনপোষণ এবং শিক্ষার দায়িত্ব আজ থেকে রাষ্ট্রের।

অথচ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে জন্ম নেওয়া একটি শিশু জন্মমাত্র কিছু মৌলিক অধিকার নিয়ে জন্ম নেয়। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এগুলোকেই মৌলিক অধিকার বলা হয়। এই অধিকারগুলো বাংলাদেশের কুসুমদিয়া গ্রামের শিশুটির যেমন দরকার হয়, ঠিক তেমনি ফ্লোরিডা কিংবা আফ্রিকার কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরও দরকার হয়। এজন্য এগুলোকে বলা হয় মৌলিক অধিকার। এসব ছাড়া একজন মানুষ, মানুষ হিসেবে বড় হয় না। এরমধ্যে খাদ্য ছাড়া তো বাঁচতেই পারে না।

আমাদের সংবিধানে এগুলোকে অধিকার হিসেবে স্বীকার করা হয় নি। বলা হয়েছে মৌলিক চাহিদা। কারণ, অধিকার বলা হলে ওগুলো পূরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হতো।

কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি, সেই মায়ের কথা, যে শিশু বাচ্চার মুখে খাবার দিতে না পেরে বাধ্য হয়েছিল বাচ্চাকে দত্তক দিতে? এরকম লাখ লাখ মা সারাপৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে আছে। রাষ্ট্র এদের খাওয়া-পরার দায় নিতে অনিচ্ছুক।

অথচ, কার্ল মার্কসের সেই বাণীর মতোই আমাদের ভাবনা হতে পারতো না যে, ‘ প্রত্যেকেই তার সামর্থ অনুযায়ী শ্রম দেবে, এবং প্রয়োজন/চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রের কাছ থেকে গ্রহণ করবে’।

এই অসাম্যের দেশে, এই বুর্জোয়া শাসন ব্যবস্থায়, এই লুটপাটতন্ত্রে কীভাবে সম্ভব বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা? কীভাবে সম্ভব শ্রেণী নির্বিশেষে মানুষের অধিকার সুরক্ষা করা?

ঠিক এ জায়গাটিতেই ভাবতে হবে। নইলে একটি শিশুর দত্তক গ্রহণেই আমাদের তুষ্টি চলে আসবে। আমরা আবেগে আত্মহারা হয়ে পড়বো প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক কারো চাকুরির ব্যবস্থা করে দেওয়ায় কিংবা তার বাসার ব্যবস্থা করে দেওয়ায়।

আমাদেরকে ভাবতে হবে পৃথিবীতে কোনো শিশুকে যাতে কোনো মায়ের দত্তক দিতে না হয়। কোনো শিশুকে যাতে খোলা আকাশের নিচে ঘুমোতে না হয়। প্রতিটি শিশু যেনো মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়ার সমান সুযোগ ও অধিকার পায়।

পুনশ্চ: দত্তক দেওয়া এবং নেওয়ার বিপক্ষে আমি নই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *