জবাব : “নাস্তিকতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন” – (শরীফ তমাল)

ইসলাম মানেন না মানেন, একটা ধর্ম অন্তত মানেন। ধর্ম চরমপন্থি বানায় না, ধর্মই পারে চরমপন্থা রুখতে – (নাস্তিকতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন)

নবীর ঢোল।

এইরকম একটি লেখার সাথে আমি একজন নাস্তিক হিসেবে অনেক কারণে ভিন্নমত পোষণ করি। এখানে তার কিছু যৌক্তিক নমুনা তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।


ইসলাম মানেন না মানেন, একটা ধর্ম অন্তত মানেন। ধর্ম চরমপন্থি বানায় না, ধর্মই পারে চরমপন্থা রুখতে – (নাস্তিকতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন)

নবীর ঢোল।

এইরকম একটি লেখার সাথে আমি একজন নাস্তিক হিসেবে অনেক কারণে ভিন্নমত পোষণ করি। এখানে তার কিছু যৌক্তিক নমুনা তুলে ধরতে চেষ্টা করবো।

১. নাস্তিকতা মানে ঈশ্বর বর্জিত একটি অবস্থা, এর মানে ভালো খারাপ এর ধারণা বর্জিত নয়। ভালো-খারাপ একটি বিমূর্ত ধারণা, যা কিনা দেশ,সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবেশ ভেদে নানা রকম হয়ে থাকে। নানা দেশের নানা আচার পর্যালোচনা করলে এটি খুব সহজেই বোঝা যায়। কোন একটি কাজকে শুদ্ধভাবে ভালো বা খারাপের ধারণা থেকে বের করে আনা যায় না। একজন নাস্তিক তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপেক্ষিতে সবচাইতে মানবিক সিদ্ধান্ত নিবেন এটাই স্বাভাবিক, কারণ নাস্তিকের জবাবদিহিতা নিজের কাছে। পাপ পুণ্যের ধারণার চাইতে এটি অনেক বেশী অর্থপূর্ণ এবং যৌক্তিক। ভালো খারাপের ধারণা বিহীন শুধু কাজের ধারণা একটি অর্থহীন চিন্তা। ব্যতিক্রম আছে, তা না হলে আপনার যুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর সকল বিশ্বাসী মানুষ পাপমুক্ত থাকার কথা।

২. ধর্মবিশ্বাসী সাধারণ ভালো মানুষের যুক্তি হলো এটি – সব খারাপের বিচার হবে পরকালে। একজন নাস্তিক পরকালে বিশ্বাসী নয়। আর একারণেই নাস্তিকের বিশুদ্ধ হবার প্রবণতা এই পৃথিবীতেই। মানুষ হিসেবে জন্ম নিলেই সবাই মানুষ হতে পারে না। আজকে, বেশীরভাগ ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ এবং তাদের পরিচালিত রাষ্ট্র এবং সমাজ পরকালে বিশ্বাসী বলেই একধরণের স্বাপ্নিক আত্মতৃপ্তি অনুভব করে এবং সেই থেকেই আইনের শাসন, বিচার ব্যবস্থা এগুলোতে তাদের কোন উৎসাহ নেই। সবাই অল্প সল্প হালাল পাপের দায় হজ্জ নামাজে স্বীকার করে নিয়ে বেহেশত নিশ্চিত করতে চায়। নাস্তিকের দায় মানবতার প্রতি, নাস্তিকের স্বর্গ এই পৃথিবী, পরকাল নয়। আর এর জন্য নৈতিকতা আর নাস্তিকতা একে অপরের পরিপূরক, অনুপস্থিতি নয়।

৩. ধর্মের ভালো খারাপের নির্দেশনা একটি নির্দিষ্ট সময়ের চিন্তা, ধ্যান-ধারণা, সমাজব্যবস্থা, ভৌগলিক অবস্থান এসবের দ্বারা শৃঙ্খলিত, অন্যায় ভাবে আবদ্ধ। ভালো খারাপের চিন্তায় আরো অনেক প্যারামিটার যোগ হয়েছে। নাস্তিকতার ধারণার সাথে মানুষের চিন্তার ও সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতার তীব্র যোগ রয়েছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান, দর্শন, মানবতা এসব দিয়ে নাস্তিকতা প্রভাবিত এবং নিয়ন্ত্রিত যা কিনা আক্ষরিক অর্থেই সত্যিকার অর্থে সকল ভালোত্বকেই নিশ্চিত করতে চায়। নাস্তিকের জীবন একটিই, আর একারণেই একে মনুষ্যত্বের গুনে অর্থবহ করার লক্ষ্যই একজন আদর্শ নাস্তিকের লক্ষ্য।

৪. আগেই বলেছি। নাস্তিকতা আর মানবিকতার ধারণা আলাদা নয়। একজন নাস্তিকের ভালোবাসার ধারণা একজন বিশ্বাসীর চাইতে অনেক উঁচুমানের। নাস্তিক কখনো নারী পুরুষের পার্থক্য করবে না, মানবিক ভাবে ভালোবাসার অধিকারকে সমান ভাবে বিচার করবে। যৌন অনুভুতি তীব্র হলেই একজন মানুষ অন্যায় ভাবে তা পেতে চাইতে পারে না, আর একজন নাস্তিকের চাইতে একজন ধর্মবিশ্বাসী মানুষই যৌন অনুভূতির তীব্রতার কাছে প্রতিনয়ত পরাজিত হয়। আমাদের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় আচার, ধর্মগ্রন্থ এসবই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

৫. একজন নাস্তিক কখনো ‘না মানলে অসুবিধা কই’ এভাবে কোন কিছুকে দেখে না। বরং, নাস্তিকের মানা বা না মানা নির্ভর করে যৌক্তিকতা, মানবিকতা, প্রয়োজনীয়তা এসবের উপর। ধর্মের থেকে নৈতিকতাকে সরিয়ে নিলে ধর্মের মধ্যে ভালো আর কিছুই থাকে না। আর, নৈতিকতা নিজ গুনেই সকল দেশে নারী পুরুষ, জাতি প্রজাতি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে কোন সাহায্য ছাড়াই অস্তিত্বশীল। আর হ্যাঁ, নৈতিকতার উৎস কোন অবস্থাতেই কোন ধর্ম নয়।

মানুষের পাপ পূন্য জ্ঞান এর সাথে নাস্তিকতার কোন যোগ নেই। মানুষ হবার জন্য যে মৌলিক গুনের প্রয়োজন, তার অভাব ঘটলে নাস্তিক বা ধর্মবিশ্বাসী যে কেউ খারাপ হতে পারেন। ধর্ম মানুষের জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর।

৩ thoughts on “জবাব : “নাস্তিকতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন” – (শরীফ তমাল)

  1. ১ এর জবাবে আমি বলবো, যদি ভাল
    ১ এর জবাবে আমি বলবো, যদি ভাল খারাপের ধারনা বর্জিত হয় কেউ, তাতে কি অসুবিধা? ধরেন, কেউ কাউকে কষ্ট দিয়ে আনন্দের অনুভুতি পাচ্ছে, সেই আনন্দ লাভটা তো তার জন্য ভাল হচ্ছে। আবার যাকে কষ্ট দিচ্ছে তার জন্য খারাপ। কেউ যদি তার আনন্দ কিংবা তৃপ্তির চিন্তাই কেবল করে তাহলে ক্ষতি কি যদি যাকে কষ্ট দিচ্ছে তার সাথে কস্টদাতার কোন সম্পর্কই না থাকে? আমার যুক্তি অনুযায়ী সকল বিশ্বাসী মানুষ পাপমুক্ত হবে না, কারণ বিশ্বাসের মধ্যেও তো গলদ থাকতে পারে, অনেকে পরিস্থিতি কারণে বিশ্বাস ভুলে যায়। আবার অনেকে আবেগ কিংবা রিপুর তাড়নাও এমন হতে পারে যাতে তার নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে হালকা পাতলা কিংবা শক্ত বিশ্বাস থাকবার পরেও। তবে নোইতিকতার কিংবা পাপ পুণ্যের ধারণার যে কোন একটা ভিত্তি থাকলে আমার মনে হয় মানুষের আচরণ সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রনে না আনা গেলেও কিছুটা উন্নতি হবে।

    ২ এর ব্যাপারেও আমি বলবো, যদি কেউ পৃথিবীটাকে স্বর্গ হিসেবে না গড়তে চেয়ে নরকের কার্যকলাপে বেশি তৃপ্তি পায়, তাহলেও তো সে নিজের কাছে খারাপলাগায় নাও ভুগতে পারে। সেটার জন্য তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ্য বলেন আর যাই বলেন। ঈশ্বরে বিশ্বাস বিহীন অবস্থায় আই নিজেকে কল্পনা করলে কিংবা কোন ধরনের হিসাব নিকাশ অথবা বিচার আচার যাও বলেন না কেন, সেসব যদি নাই থাকে তবে কেউ যদি নিজের ভাললাগার জন্যই ইচ্ছামত চলে, সাধারন যুক্তির বিচারে অনাচার করতে থাকে, আর যে যদি এটাকে নিজের ক্ষনিক জীবনের আনন্দ ম্যাক্সিমাইজ করার জন্য সঠিক মনে করে, তবে তাকে কি বুঝিয়ে আটকাবো? তাকে বলবো যে এটা অন্যের জন্য খারাপ্‌ নৈতিক নয় এসব? অন্যের খারাপ কিংবা নৈতিক না হলেও সে যদি আনন্দ পায় তবে তার জন্য ক্ষতি কোথায়? যে জীবনের পর আর জীবন নেই তাতে স্বেচ্ছাচারী হয়ে চললে ক্ষতি কি?

  2. ৩ এর ব্যাপারে আই বলবো, ধর্ম
    ৩ এর ব্যাপারে আই বলবো, ধর্ম আমার কাছে একটা নীতি মাত্র। আমি আমার যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে যেটাকে সবচেয়ে সঠিক মনে হয় তাকে মানলে মানুষের জীবন সামগ্রিকভাবে আরও বেসি সুন্দর হবার কথা যদি না সে নিতিতে ভুল থাকে। ভুল মনে হলে সেটা ধরিয়ে দেব, মানবো না। তবে নীতি একটা থাকা উচিত, একটা ভিত্তি থাকা উচিত। শিক্ষা, মানবতা, বিজ্ঞান এসবের চেয়ে স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য দিয়ে যদি একজন মানুষ কিংবা নাস্তিক তার আওরন তার একমাত্র জীবনে চালিত করতে চায় সেভাবেই তার ভাললাগে বলে তবে সেটাকে আমি আপনি দমিয়ে রাখবো কিভাবে? আর আদর্শ নাস্তিক বলছেন? আদর্শ নাস্তিক হিসেবে একমাত্র জীবনে না চলে আমার ইচ্ছামত চলতে যদি আমার ভাললাগে তবে সেটা কেন আমি করবো না? অন্যের ভাল লাগুক বা খারাপ, মৃত্যুর পর তো আমার কিছু আসবে যাবে না। মৃত্যু মানেই সব হিসাব নিকাশ শেষ।

    ৪। আমি যেভাবে উপলব্ধি করি তা হচ্ছে, ধর্মীয় কিংবা এমন বিধানে বিশ্বাস থাকবার পরেও যে নিপীড়ক হতে পারে, কোন বিধানের ভয় কিংবা নাস্তিক হলে তার আচরণ তো আরও অসংযত হবার কথা। তবে একটা কথা ঠিক যে, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বড় নৃশংসতার ঘটনাগুলো এই ধর্মীয় বিভেদ, আর জাতি বর্ণ এসবে বিদ্বেষের কারনেই হয়েছে। কিন্তু ধর্ম একেবারে না থাকলে এসব করতো না কিংবা এড়াতো এটাও কিভাবে বলি?

    ৫। নৈতিকতা পাপ পুণ্যের ধারনার বাইরে গেলে আসলে কি? একজন মানুষের বোধ উন্নত হবে আরেকজনের হয়তো খুবই নীচুমানের হবে। তাদের আচরণ আর উপলব্ধিতে থাকবে অনেক ফারাক। কোন বিশ্বাসের ভিত্তির বাইরে গেলে কি সেই নৈতিকতার মধ্যেও অনেক পার্থক্য চলে আসবে না? প্রশ্ন চলে আসবে না ওর নৈতিকতা উত্তম আর এরটা অধম? কিন্তু দুজনের শিক্ষা সহ সকল অনুভুতি আর জেনেটিক বৈশিষ্টের কারনেও তো নৈতিকতার উপলব্ধির ব্যাপার অনেক ভিন্ন হবার কথা। কোটি জনের নৈতিকতার রূপ থাকবে কোটি রকম, সুক্ষ কিংবা স্থুল পার্থক্য থাকবেই। তাই আমার মতে একটা নীতি, ধর্ম কিংবা ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে ভিত্তিটা আরও ভালোই হবার কথা। আমার কাছে অন্তত তাই মনে হয়েছে।

    ধন্যবাদ ভাই, আপনি পালটা লজিক দিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। আপনার প্রশ্নের কারনে নিজেকেও প্রশ্ন করছি। এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। বিশ্বাস অবিশ্বাস সবসময় হয়তো ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকবে। অসুবিধা হছে বিশ্বাসের ব্যাপারটাও আমরা সমষ্টিগত করে অন্যের উপর চাপিয়ে দিতে চাই যেটা খারাপ…

  3. আজকে যদি হঠাৎ করে পৃথিবী থেকে
    আজকে যদি হঠাৎ করে পৃথিবী থেকে সব ধর্ম সরিয়ে নেয়া হয় তাহলে সব বিশ্বাসী ও মুমিনদের নৈতিক অবস্থা কি হবে তার দায় দায়িত্ব আমি নিতে চাই না। তবে ধারণা করা যায় ধর্মীয় বিধিনিষেধের আকস্মিক অনুপস্থিতিতে এসব মানুষদের মতি বিভ্রম হওয়াটাই স্বাভাবিক। নাস্তিকের বেলা ব্যাপারটা এরকম নয়। যা ইচ্ছা তা করার নাম নাস্তিকতা নয়। আমরা এসব বিশ্বাস ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বাভাবিক জীবন যাপন করি।ধর্মীয় নৈতিকতাকে অস্বীকার করে মানবতা এবং প্রকৃত নৈতিকতায় উত্তরণের একটি সঠিক রূপান্তর প্রক্রিয়া আছে। আর সেই প্রক্রিয়াতে থাকে দর্শন, শিল্প, কলা, সাহিত্য, কবিতা, বিজ্ঞান, পরিবেশ, মহাকাশ আরো হাজারো রকমের বিষয়ের নিরন্তর চর্চা, যার মাধ্যমে মানুষ এক শূন্য নৈতিকতার স্তরে প্রবেশ করে। যেখান থেকে সে সবকিছুকে বিচার করে তার সেই জ্ঞানের মধ্যে দিয়ে, তার প্রকাশ ঘটেও জ্ঞানের মধ্যে দিয়ে। এই উত্তরণের পথটি অন্যায়ভাবে ব্যহত হয় হচ্ছে ধর্মীয় বিশ্বাস এর তথাকথিত নৈতিকতা বোধের দ্বারা। ধর্ম বিশ্বাস ছাড়াই নৈতিকতার মানদন্ড অস্তিত্বশীল থাকতে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাস এবং তার নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মননশীলতা ও সৃষ্টিশীলতার বিরূদ্ধে সরাসরি প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে। আর যৌক্তিক বিচারে, আপনার কাছে অন্য কোন অল্টারনেট বা অপশন না থাকার কারণে মিথ্যা জেনেও ধর্মীয় বিশাস ও নিয়ন্ত্রণ কে মেনে চলা নিজের সাথে প্রতারণা না হিপোক্রেসি ছাড়া আর কিছুই নয়। কোন একজন মানুষের নৈতিকতার মানদন্ড তৈরী করবে সে নিজে, সে নিজে মানে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, সে নিজে মানে মানুষ সমষ্টিগত ভাবে। কোন মিথ্যা ঐশ্বরিক ধারণা থেকে নয়। এই মানদন্ড হবে আমাদের জ্ঞান ভিত্তিক।

    মানুষ ব্যক্তি হিসেবে কি পালন করবে, কি বিশ্বাস করবে, সে কারো দেখার কথা না। যে অন্ধকারে থাকতে চায় তার সেই অন্ধকারে থাকা অধিকার আছে। তবে, রাষ্ট্র এবং সমষ্টিগত ভাবে ধর্মকে পরিহার করার আর কোন বিকল্প নেই। ধর্মীয় ন্যায় মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *