ধর্ষণের ঘটনায় কেন আসামীসুলভ আচরণ পুলিশের?

গত বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামীর গ্রেপ্তার ও বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে চারজন খুন ও ৫০’র বেশি আহত হওয়ার মতো অদ্ভুত-নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়েছিল কালিহাতি ও ঘাটাইল পুলিশ।

এভাবে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর উপর উন্মত্তের মতো গুলি চালানোর কারণ ছিল খুব সাধারণ: প্রধান আসামী রফিকুল ইসলাম রমা’র সাথে কালিহাতি থানার ওসি শহীদুল ইসলামের খাতির ছিল। শহীদুল রমা’র বাড়িতে ভাড়া থাকতো। কিন্তু ঘটনার পরপর সে তার সব জিনিসপত্র সেই বাড়ি থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়।


গত বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামীর গ্রেপ্তার ও বিচার চাইতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে চারজন খুন ও ৫০’র বেশি আহত হওয়ার মতো অদ্ভুত-নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়েছিল কালিহাতি ও ঘাটাইল পুলিশ।

এভাবে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর উপর উন্মত্তের মতো গুলি চালানোর কারণ ছিল খুব সাধারণ: প্রধান আসামী রফিকুল ইসলাম রমা’র সাথে কালিহাতি থানার ওসি শহীদুল ইসলামের খাতির ছিল। শহীদুল রমা’র বাড়িতে ভাড়া থাকতো। কিন্তু ঘটনার পরপর সে তার সব জিনিসপত্র সেই বাড়ি থেকে দ্রুত সরিয়ে নেয়।

রমা’র অপরাধ সে ১৫ই সেপ্টেম্বর তার স্ত্রীর প্রেমিক ও তার মাকে বাড়িতে ডেকে এনে বিবস্ত্র করেছিল। এক পর্যায়ে মাকে ধর্ষণ করার জন্য ছেলেকে চাপ দেয়; না পেরে রমা নিজেই সেই নারীকে ধর্ষণ করে।

সালিশের বিষয়ে পুলিশ আগে থেকেই জানতো। কিন্তু তারা বাধা দেয়নি। কিন্তু পরে যখন পরিস্থিতি ধর্ষণের দিকে মোড় নেয় তখন তারা রমা’র বাড়িতে হানা দেয় ও তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ রমাকে গ্রেপ্তার না করে পালাতে সাহায্য করেছিল। আর পুলিশের সেই অনৈতিক আচরণের বিরোধিতা করতেই রাস্তায় নেমেছিল আশেপাশের এলাকার কয়েক হাজার ছেলে-মেয়ে-বুড়ো-শিশু। সারাদিনের বিক্ষোভে প্রাণ হারায় তিনজন বিক্ষোভকারী। আহত হন আরো প্রায় ৫০’র অধিক মানুষ। এদের বেশিরভাগের শরীরেই গুলির আঘাত। চতুর্থ আহত ব্যক্তি মারা যান ২০শে সেপ্টেম্বর।

মিডিয়ার কল্যাণে ঘটনার ব্যাপকতা বেড়ে যায়। ঢাকার পুলিশ দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে; প্রাথমিক তদন্তের পর একই দিন কালিহাতি থানার তিনজন এসআই এবং চারজন কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করা হয়। অন্যদিকে স্থানীয় পুলিশ হামলার অভিযোগে ৭০০ অজ্ঞাতনামা গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে।

গুলির ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবী করে ২১শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে। ৩০শে সেপ্টেম্বর আদালত পুলিশকে সব তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ৬০ দিনের মধ্যে দাখিল করতে আদেশ দেয়।

সেই হিসেবে ২০শে নভেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও কমিটিগুলো পুলিশ সদরদপ্তরে তা জমা দেয় ৫ই ডিসেম্বর। এরপর সেই প্রতিবেদনগুলি সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্টারের অফিসে জমা হয় ১৫ই ডিসেম্বর, কিন্তু নির্ধারিত বেঞ্চে আসে ২২শে ফেব্রুয়ারি!

প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানাতে এবার আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো দুই সপ্তাহ সময় দেয়। এবার দেখা যাক, কর্তৃপক্ষ সময়মতো কাজ করে কিনা!

কোথাও কোন অপরাধ ঘটলে এবং সেখানে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা বা অদক্ষতা-অবহেলা থাকলে তারা দোষ স্বীকার না করে মারমুখী আচরণ করে পরিস্থিতি আরো বেশি ঘোলাটে করে তোলে। এই সংস্কৃতির দ্রুত পরিবর্তন আশা করি।

উল্লেখ্য, গত বছরের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও মৎস ভবন এলাকায় বিশের অধিক নারী ও মেয়ে-শিশু যৌন হয়রানির শিকার হলে পুলিশ ও ঢাবি কর্তৃপক্ষ প্রথমে অস্বীকার করলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক সমাজ। টানা বিক্ষোভের এক পর্যায়ে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে বর্বরোচিত হামলা চালায় ঢাকার পেটোয়া পুলিশ বাহিনী।

সুপারিশ
সংবাদ মাধ্যমে জানা যায় যে, দুটি তদন্ত প্রতিবেদনেই ১৩জনের বিরুদ্ধে অদক্ষতা, উদাসীনতা ও কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ এসেছে।

এর মধ্যে একটি প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, ঘটনার সময়কার টাঙ্গাইলের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সঞ্জয় সরকারের বিরুদ্ধে দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া, কর্তব্য কর্মে অবহেলার এবং অদক্ষতার অপরাধ হওয়ায় তাকে জেলা থেকে প্রত্যাহার করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

টাঙ্গাইলের (উত্তর) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে উদাসীনতা ও অদক্ষতার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে বদলি করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ করা হয়েছে।

সুপারিশে বলা হয়েছে, ওয়াচার কনস্টেবল মো. মাহতাব উদ্দিন জেলা বিশেষ শাখার কালিহাতি থানার ডিএসবি জোন তথ্য গোপনের মাধ্যমে কর্তব্য কর্মে নিষ্ঠা, সততা ও চরম গাফিলতির পরিচয় প্রদান করেছেন বলে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত-পূর্বক বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে কালিহাতি থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. শহীদুল ইসলামের (বর্তমানে রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত) বিরুদ্ধে উদাসীনতা, অদক্ষতা, গাফিলতি ও অবহেলার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়েছে।

কালিহাতি থানার এসআই মো. আবুল বাশার, মো. ছলিম উদ্দিন, কনস্টেবল মো. আমিনুল ইসলাম, জিয়াউল হক, তমাল চন্দ্র দেবের বিরুদ্ধে অদক্ষতা, উদাসীনতা, অসদাচরণ, নিষ্ঠা, সততা ও কর্তব্যকর্মে চরম গাফিলতির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের সাময়িকভাবে বরখাস্তপূর্বক কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ রয়েছে প্রতিবেদনে।

ঘাটাইল থানার সাবেক অফিসার ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. মোখলেছুর রহমানের (বর্তমানে খুলনা রেঞ্জে সংযুক্ত) বিরুদ্ধে অদক্ষতা, অবহেলা, উদাসীনতা ও অসদাচরণের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে অনুসন্ধান কমিটি।

সুপারিশে ঘাটাইল থানার এএসআই মো. হারুন-অর রশিদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অদক্ষতার অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দূরবর্তী কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে বদলী-পূর্বক যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলা হয়েছে।

ঘাটাইল থানার এসআই মো. ওমর ফারুক ও এসআই মো. মুনসুপ আলীর বিরুদ্ধে কর্তব্যকর্মে অবহেলা, অদক্ষতা, উদাসীনতা ও অসদাচরণের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদেরকে সাময়িক বরখাস্তপূর্বক অন্যত্র সংযুক্ত করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়েছে।

নয়টি সুপারিশের শেষটিতে ওই ঘটনার তিন মামলা টাঙ্গাইলের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তদন্ত করছে জানিয়ে সেগুলো সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *