বিয়ের আইন ও যৌন অধিকার

যৌন জীবনের সামাজিক ও আইনগত স্বীকৃতির নাম বিয়ে। বিয়ের বয়স নির্ধারণ করে দেওয়ার অর্থ মানুষ নামক প্রাণিটির যৌন অধিকারেরও একটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া। মানুষ ব্যতীত অন্য কোনও প্রাণীর যৌন অধিকারে সীমা নেই। বাধ বিচারহীন যৌনতায় ওই প্রাণিগুলোর বিকাশ, দৈহিক বৃদ্ধি, রোগ-ব্যাধি, মনোবৃত্তি, সামাজিকতা ইত্যাদির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, না কি সহায়ক প্রভাব তৈরি হয় তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। মানুষের যৌনতায় সীমা নির্ধারণের প্রয়োজন ও প্রভাব নিয়েও অনন্ত আলোচনা। উদ্দেশ্য মানুষকে সুখি করা, তথা সুখের সমাজ গড়া। সুখের সঙ্গে সুন্দরের অন্বেষা, প্রেমের অন্বেষাও রয়েছে। বাংলাদেশের সরকার মানুষ ও সমাজের সুখের জন্যই মেয়েদের বিয়ের বয়স সীমা ১৮ বছর থেকে কমিয়ে ১৬ বছর এবং ছেলেদের বিয়ের বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করার আগ্রহ দেখিয়েছে। আবার মানুষ ও সমাজের সুখের তাগিদেই বহু বিশিষ্টজন সরকারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে। কাঙ্খিত বিতর্কে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য যে বিশিষ্টজনদের কারও আলোচনাতেই বিষয়টির আইনি গভীরতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও যৌন অধিকারের প্রসঙ্গগুলো দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে কোনও নারী বা পুরুষের যৌন ইচ্ছা জেগে উঠলেই সে ইচ্ছা পূরণ করা যায় না। দু’জন নারী ও পুরুষ পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত কিংবা সম্মত হলেও স্বাধীনভাবে উপগত হতে পারে না। সেক্ষেত্রে কেবল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা নয় -কিছু আইনি বিধিনিষেধও রয়েছে। পৃথিবীর সকল দেশেই যৌনতার সীমানা সেখানকার আইন, সামাজিকতা ও সাংস্কৃতিক বোধের দ্বারা নির্ধারিত। তবে সীমানাটি কোথাও বিস্তৃত, কোথাও সংকীর্ণ। যৌনতার প্রাচীনতম সীমানা হচ্ছে বিয়ে। বিয়ে বিধি বিধানের দ্বারা সীমায়িত। ইচ্ছে হলেই বিয়ে করার যো নেই। যৌন সম্পর্ক স্থাপন এবং বিয়ের ক্ষেত্রে বয়স (বিশেষ করে নারীর বয়স) আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে বিয়ের বয়স নির্ধারণের মৌলিক আইন হচ্ছে “বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯।” এছাড়াও দণ্ডবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯৫, নারী ও ‍শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০০৩, আদালতের রায় ও ব্যাখ্যা, বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাস এবং প্রচলিত প্রথাসমূহ নর-নারীর যৌনজীবন এর সাথে সম্পর্কিত। মৌলিক আইনসমূহ প্রণীত হওয়ার পর বিয়ের বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্ম বিশ্বাস এবং প্রচলিত প্রথার আইনি গুরুত্ব কমে গেছে। কিন্তু এর সামাজিক গুরুত্ব এখনও প্রবল। বিয়ের বয়সের সঙ্গে নারী নির্যাতন দমন আইনের প্রত্যক্ষ সম্পর্কের কারণে হাজার হাজার মেয়ে দিনের পর দিন জেলে পঁচছে। জেল খাটছে অসংখ্য উঠতি যুবক। যুবকরা এক সময় জামিন পায়। কিন্তু বয়স ১৮ বছরে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত প্রায়শ: জেলেই থাকতে হয় মেয়েকে।

সরকার সম্প্রতি বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনে যেসব সংশোধনীর উদ্যোগ নিয়েছে তার সবগুলোই অভিজ্ঞতা পুষ্ট এবং প্রয়োজনীয়। অধিকার কর্মী এবং শিক্ষিত সুশীল জনগোষ্ঠী শুধু একটি বিষয়ে আপত্তি তুলেছে। আপত্তি এত প্রবল যে আইন সংশোধনের উদ্যোগটি সামগ্রিকভাবেই একটি অশুভ রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে জনসমক্ষে চিহ্নিত হয়েছে এবং সঙ্গত কারণেই সরকার বিয়ের বয়স কমানোর চিন্তা থেকে সরে যাচ্ছে। বোদ্ধা মহলের যে উদ্বেগ তার পেছনের যুক্তিগুলো আপাত: দৃষ্টিতে প্রবল মনে হলেও এর গোড়ায় শেকড় খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের যুক্তিগুলো শেকড়হীনভাবে প্রবল হয়ে ওঠার মূল কারণ ১. তারা আইনটির প্রায়োগিক দিকটি মোটেই খতিয়ে দেখেননি, ২. বিয়ে ও যৌনতার বয়স নিয়ে বিদ্যমান আইনের অসঙ্গতি সম্পর্কে উদাসিন থেকেছেন এবং ৩. এর সাথে সম্পৃক্ত নর নারীর যৌন অধিকারের দিকটি উপেক্ষা করেছেন।

আইনের অসঙ্গতি

কোনও পুরুষ যদি ন্যূনতম ১৪ বছর বয়স্ক কোনও নারীর সাথে (পারস্পরিক সম্মতিতে) যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে তবে তাকে দণ্ডবিধি অনুযায়ী ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে না। তবে ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তাকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে। কারণ ১৪ বছরের কম বয়সী কোনও নারী যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি দিতে পারে না। দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৫ অনুযায়ী স্ত্রী ব্যাতিত ১৪ বৎসরের কম বয়স্ক কোনও নারীর সাথে তার সন্মতিক্রমেও যৌনকর্ম করলে তা ধর্ষণ বলে গণ্য হয়। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অাইন ২০০৩ অনুযায়ী যৌন সম্পর্ক স্থাপনে সম্মতি দেবার বয়স ১৬ বছর। অর্থাৎ দণ্ডবিধি অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পূর্ণ হলে এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুসারে ১৬ বছর হলে একটি মেয়ে কোনও পুরুষকে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য সম্মতি দিতে পারে। অথচ বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী নারীর ১৮ বছরের আগে বিয়ে করার অধিকার নেই।

দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় বিয়ের পবিত্রতা রক্ষা করার জন্য এর ব্যাভিচারকে দুস্কর্ম এবং অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, “কোনও লোক যদি, অপর কোনও নারীর স্বামীর বিনা সম্মতিতে বা যৌনকামনার উপস্থিতি ছাড়া যৌনসঙ্গম করে, এরূপ যৌনসঙ্গম ধর্ষণের অপরাধ না হলে, সে লোক ব্যাভিচার করেছে বলে পরিগণিত হবে ও তাকে যেকোনও বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ সাত বছর পর্যন্ত হতে পারে বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয় দণ্ডে শাস্তিযোগ্য হবে। এরূপ ক্ষেত্রে স্ত্রীলোকটি দুষ্কর্মের সহায়তাকারিণী হিসেবে শাস্তিযোগ্য হবে না”। অর্থাৎ ধর্ষণ ছাড়া কোনও বিবাহিত স্ত্রী লোকের সঙ্গে তার স্বামীর সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তা ব্যাভিচার এবং শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর। কিন্তু তা শুধু পুরুষের জন্য, নারীর জন্য নয়। স্ত্রীর প্রতি কোনও শাস্তির বিধান এই আইনে নেই এবং নারী অবিবাহিতা বা বিধবা হলে এই আইনে পুরুষও কোনও শাস্তি পায় না।

১৯৯৫, ২০০০ এবং ২০০৩ সালের নারী ও নির্যাতন দমন আইনে স্ত্রীর সঙ্গে সম্মতি ছাড়া (জোরপূর্বক) যৌনকর্ম আইনত ধর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৫ এর “ব্যতিক্রম” অনুযায়ী ”যদি কোনও পুরুষ তার স্ত্রীর সাথে যৌন সহবাস করে এবং স্ত্রীর বয়স যদি ১৩ বৎসরের কম না হয় তবে ধর্ষণ বলে গণ্য হবে না।” অর্থাৎ স্ত্রীর ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য বয়স হচ্ছে ১৩ বৎসর। দেখা যাচ্ছে প্রচলিত আইনগুলোতে ১৩-১৬ বৎসরের মেয়েদের বিয়ে একেবারে নিরুৎসাহিত করা হয়নি। কিন্তু বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ফলে দণ্ডবিধি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের মধ্যে বিয়ের বয়স নিয়ে বিরোধ আছে। এ বিরোধের ফলে একটি মেয়েকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। যেমন, প্রেমঘটিত কারণে কোনও কিশোরী যদি অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া তার প্রেমিককে বিয়ে করে তবে মেয়ের অভিভাবক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উক্ত প্রেমিক এবং তার অভিভাবকদের বিরুদ্ধে অপহরণ বা ধর্ষণ অথবা উভয় ধরনের মামলা করে এ অজুহাতে যে, তাদের মেয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক। বয়স প্রমাণের জন্য কোনও সনদপত্রের আইনগত বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা ও এর প্রয়োগ নেই বিধায় মেয়ে যদি প্রাপ্তবয়স্কও হয় তবুও এ ধরনের মামলা করার সুযোগ আছে। মামলা হবার পর মেয়েটিকে নিয়ে তার অভিভাবক, পুলিশ এবং তার প্রেমিক পক্ষের লোকজনদের মধ্যে টানাহেঁচড়া শুরু হয়। এর পরিণতিতে মেয়েটিকে প্রায়শঃ নিরাপদ হেফাজতের নামে জেলখানায় যেতে হয়। স্বেচ্ছায় বাল্যবিবাহকারী কিংবা বাল্যবিবাহের শিকার একটি মেয়ে যতকাল প্রাপ্তবয়স্ক না হবে ততকাল তাকে নিরাপত্তা হেফাজতের জন্য জেলে রাখার আদেশ দিতে পারে আদালত। এর ফলে হাজার হাজার মেয়ে দিনের পর দিন জেল খাটছে। সারা বাংলাদেশের একই চিত্র। ঢাকায় শিশু, কিশোরী ও নারীদের জন্য কিছু আশ্রয় কেন্দ্র আছে। প্রকৃত অর্থে সেগুলোও কারাগার। অপ্রাপ্তবয়স্ক যৌনব্যবসায়ী, মাদকাসক্ত, মানসিক জটিলতায় আক্রান্ত কিংবা স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুৎ মেয়েদেরও আশ্রয়স্থল কারাসেল। এদের ওপর বয়স সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ জজ, আইনজীবি, পুলিশ, মানবাধিকার কর্মী সবার জন্য কষ্টকর অভিজ্ঞতা জন্ম দিয়ে থাকে। পুরুষের বিয়ে করার অধিকার তৈরি হয় ২১ বছরে। তবে কম বয়সে বিয়ে করলেও ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরুষকে জেলে থাকতে হয় না। অথচ অল্প বয়সে কোনও মেয়ের বিয়ে হলে যতদিন না তার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয় ততদিন সেই মেয়েটিকে জেলে থাকতে হয়।

বয়স প্রসঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইনের মধ্যে বিদ্যমান অসঙ্গতি ও দ্বান্দ্বিকতা দূর করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে উপায় হল হয় মেয়েদের যৌনসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেবার বয়স ১৪ ও ১৬ বছরের পরিবর্তে বাড়িয়ে ১৮ বছর করা, অথবা মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করা। ১৮ বছর পর্যন্ত ব্যক্তির যৌন অধিকারকে বাধ্যতামূলকভাবে খর্ব করা বিজ্ঞানসন্মত কাজ হবে কি না ভাবতে হবে। যদি এটা করা হয় তাহলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এর কঠোর প্রভাব তৈরি হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাগুলো আরও শক্ত হয়ে যাবে। পারস্পরিক সম্মতির যৌন সম্পর্ক কিংবা প্রেমঘটিত বিবাহ বিরোধ হতে সৃষ্ট প্রায় সকল মামলায় অপহরণ/ধর্ষণের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে এবং অভিযুক্তদের দীর্ঘমেয়াদী কারাবাসের অনিবার্যতা তৈরি হবে।

আইনের কার্যকরতা

এ যাবৎ কালের প্রতিষ্ঠিত সত্য হল, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের প্রয়োগ আসল জায়গায় নেই। এর প্রয়োগটি বেশি হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোতে। বাল্যবিবাহের অপরাধে নিরোধ আইনের অধীনে মামলার সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। তাছাড়া এই আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহ অগ্রহণযোগ্য এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বিয়েটি অবৈধ বা বাতিল হয়ে যায় না। ফলে এই আইন দিয়ে বাল্যবিবাহ ঠেকানো যায়নি। বর্তমানে দেশে বাল্যবিবাহ কমে আসলেও তাতে আইনের কোনও অবদান নেই। বাল্যবিবাহ কমেছে মূলত; অর্থনৈতিক কারনে। পরিবর্তিত আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় বাল্যবিবাহের হার দ্রুত কমছে। ছেলেরা স্বাবলম্বী হওয়ার আগে বিয়েই করতে চায় না। যৌন চাহিদাকে উপেক্ষা কিংবা অবদমন করে। শিক্ষিত মেয়েদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এরকম। শিক্ষাজীবন শেষ করতেই ছেলে-মেয়েদের ২৫ বছর পেরিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ি দেওয়ার পর তৈরি হয় নতুন জীবন-বাস্তবতা। একটি সম্মানজনক জীবিকা চাই, এর পরে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু দিন অপেক্ষা করা ইত্যাদ। শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পে পেশাগত জীবনের ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় গ্রামের মেয়েরাও আজকাল অল্প বয়সে বিয়ের বিপক্ষে।

বিদ্যমান আইনে বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ সাজা তিন মাস এবং জরিমানা এক হাজার টাকা। নতুন আইনে সরকার এটি সংশোধন করে সাজা সর্বোচ্চ দুই বছর ও জরিমানা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সাজা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সংশোধনীতে বিয়ে বাতিল করার বিধান যুক্ত হতে যাচ্ছে। তবে বাতিলকৃত বাল্যবিবাহের ফলে জন্মগ্রহণকারী শিশু বৈধ হবে এবং এই শিশুর নিরাপত্তা, হেফাজত ও ভরণপোষণের দায়িত্ব আদালত নির্ধারণ করবেন। প্রস্তাবিত সংশোধনীর আরও অনেক দিক আছে। মূল কথা এই আইনটি অনেক বেশি কঠোর হতে যাচ্ছে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর ক্ষমতা দেওয়ায় এর প্রয়োগও অনেক বাড়বে। সুতরাং এর একটা সামাজিক প্রভাব আছে। বিয়ের ন্যূনতম বয়স কমানোর বিধান যুক্ত না হলে ২১ বছরের কম বয়সী ছেলে এবং ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে নিয়ে গ্রামগঞ্জে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

যুক্তি দেখানো হচ্ছে- ১৬ বছরের মধ্যে বিয়ে হলে অপরিণত বয়সের একজন নারীর মা হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং সে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। ছেলে এবং মেয়ে উভয়ের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেই বিয়ে করলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এসব যুক্তির সঙ্গে আমিও একমত। কিন্তু বিজ্ঞজনদের প্রতি আমার প্রশ্ন, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ভয়ে আপনারা কি কেউ দেরিতে বিয়ে করছেন? নাকি দেরিতে বিয়ের মূল কারণ নিজের ক্যারিয়ার সচেতনতা? গ্রামেও ক্যারিয়ার সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। সেখানে অল্প বয়সে বিবাহ এবং সন্তান ধারণের বিরুদ্ধে জন সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে।

আপনারা বলছেন আইনে বিয়ের বয়স কমানো হলে সবাই ১৬ বছর বয়সেই বিয়ে করতে শুরু করবে ? এটা ঠিক নয়। অর্থাৎ শিশু মৃত্যুর হার বাড়বে, মাতৃমুত্যুর হার বাড়বে, মা ও শিশুর স্বাস্থ্যহীনতার কারন ঘটবে, জনসংখ্যা বাড়বে, শিক্ষার হর কমবে, নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্থ হবে -ইত্যাদি ধারনার একটিও সঠিক নয়। কারন এই আইন দেখে কেউ বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেবে না। যারা পরিণত বয়সে বিয়ে করার তারা পরিণত বয়সেই বিয়ে করবে। আইনটি শিথিল করার অর্থ মানুষকে আইনি জটিলতা থেকে কিছুটা রেহাই দেয়া। কারও ঘরের কোন একটি ছেলে বা মেয়ে অল্প বয়সেই বিপরিত লিঙ্গের প্রতি অতিমাত্রায় ঝুকে পড়তে পারে। পরিবার তাকে সামলাতে পারছে না। অগোচরেই হয়তোবা একদিন ছেলেটি বা মেয়েটি বিয়ে করে ফেলল, কিংবা অন্য কিছু। এরপর দুই পরিবারের মধ্যে যদি ইগো সমস্যা বা অন্য কারন থাকে তাহলে শুরু হয় মামলা মোকদ্দমা। পরিনতি বুঝুন। ছেলে মেয়েদের জেলে পাঠানো ছাড়া এই সমস্যার কি আর কোনও সমাধান নেই? শুধু ছেলে-মেয়ে নয় -এক একটি মামলায় মা-বাবা ও পরিবার শুদ্ধ জেল খাটছে। আইন প্রণয়নের সময় এই বিষয়গুলো মানবিকভাবে বিচার করতে হবে।

বাংলাদেশে যুবক-যুবতীর জন্য যৌন অবদমনই একমাত্র নিয়তি। কারণ বিয়ের আগে যৌনতা নয়। আইনে বাধা নেই। কিন্তু সমাজে বাধা আছে, ধর্মে বাধা আছে, লালিত মনস্তত্ত্ব ও মূল্যবোধে বাধা আছে।


যৌন অধিকার

যৌনতার বিধিবিধান বা শর্ত তৈরির দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল উপাদানের লক্ষ্য মানুষের জন্য উন্নততর সুখের সন্ধান, উন্নততর সমাজ ও জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কিন্তু দেখা যায় প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা এসব শর্ত পদে পদে স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। পাশ্চাত্যে প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে যৌন সম্পর্ককে কোনও অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। অনেক দেশেই নর-নারীর যৌন সম্পর্ক একেবারেই জৈবিক, স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত ব্যাপার। সেখানে যৌনতা মানুষের মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের আইনেও নারী ও পুরুষের বিবাহপূর্ব যৌনতায় কোনও বাধা নেই। প্রকারান্তরে অধিকারের স্বীকৃতি আছে। যে কারও সাথে যে কোনও ধরনের যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নারীকে দণ্ড দেওয়ার কোনও বিধান বাংলাদেশের আইনে নেই। পুরুষের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক কুমারি, বিধবা এবং বিবাহ বিচ্ছেদে একা হয়ে যাওয়া নারীর সঙ্গে (বলপূর্বক না হলে) যৌন সম্পর্ক স্থাপনে আইনগত বাধা নেই। তবে এখানকার সমাজ বাস্তবতায় বিবাহ বর্হিভূত সকল প্রকার যৌনতা ভয়াবহ অপরাধ বলে গণ্য হয়। ফলে এই সামাজে যৌনতার চৌর্যবৃত্তি অনেক বেশি। মানুষ এখানে আইন মানতে চায় না। কিন্তু সমাজ বাস্তবতাকে মানে। সমাজ (বিশেষতঃ ধর্মীয় বিশ্বাস) বলছে তুমি যদি যৌনতা চাও তবে বিয়ে কর। বয়স কোনও বিষয় নয়। রাষ্ট্র বলছে ১৮ বছরের (ছেলেদের ২১) আগে তোমার বিয়ের অধিকার নেই।

যৌনতার প্রতি নর-নারীর যে স্বাভাবিক আগ্রহ তা কি ১৮ বছর বয়সে শুরু হয়? তরুণ-তরুণীর যৌন আকাঙ্খাকে রাষ্ট্র কিভাবে দেখবে? যৌন অবদমন কি বাধ্যতামূলক! নারী কিংবা পুরুষের সঙ্গমে সন্মতি দেয়ার বয়স যদি ১৮ বছর করা হয় তবে সামাজিক কঠোরতা রাষ্ট্রীয় আইনে রুপান্তরিত হবে। এতে হয়তো সবার অসুবিধা হবে না। কিন্তু শারিরীক ও মনস্তাত্তিক ভাবে অল্প বয়স থেকে যৌন উগ্রতা ও স্বক্ষমতা নিয়ে বেড়ে ওঠে এমন নর-নারীর সংখ্যা কি অপ্রতুল। তাদের সবাইকে আইন ভাঙতে বাধ্য করা হবে এবং পরিনামে জেলে পাঠানোর বন্দবস্ত রাখা হবে? না কি কেবলই অবদমন? ১৮ বছর কি, …..বাংলাদেশে ২৫-৩৫ বয়স পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক যুবক-যুবতীর জন্য যৌন অবদমন একমাত্র নিয়তি। কারণ বিয়ের আগে যৌনতা নয়। আইনে বাধা নেই। কিন্তু সমাজে বাধা আছে, ধর্মে বাধা আছে, লালিত মনস্তত্ত্ব ও মূল্যবোধে বাধা আছে। রাষ্ট্র ও সামাজিক আচরণে আজব সব বৈপরীত্য! সিনেমায়, নাটকে, গানে, কবিতায় সবটুকু সহানুভূতি ঢেলে দেওয়া হচ্ছে প্রেমিক-প্রেমিকার প্রতি; সাহিত্যে, কলায়, রসবোধে, জীবনের সর্বত্র কিশোর প্রেমকে উপজীব্য করা হচ্ছে; তরুণ মনস্তত্ব ও মূল্যবোধকে প্রেমের প্রতি সহানুভূতিশীল করে গড়ে তোলা হচ্ছে। অথচ নরনারীর প্রেমবোধের বিজ্ঞানকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আইনে মানুষকে বেঁধে ফেলার উপকার ও অপকারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখার জন্য বিজ্ঞজনদের প্রতি অনুরোধ রাখছি।

৪ thoughts on “বিয়ের আইন ও যৌন অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *