অভিজিত্‍ রায় এক মৃত্যুহীন প্রাণ

দেখতে দেখতে একটি বছর পেরিয়ে গেছে । ঐ জায়গাটা থেকে রক্তের দাগটাও শুকিয়ে গেছে । কিন্তু হৃদয় থেকে প্রতিবাদী আগুনটা নিভে যায় নি , হয় নি এখনও শেষ হৃদয়ের রক্তক্ষরন । তীব্র থেকে থেকে তীব্রতর হয়ে জ্বলছে প্রতিবাদের শিখাটা , টুপটুপ করে ফোটা ফোটা পড়ছে রক্ত । প্রতিবাদের আগুনটা শুধু ধর্মবাদীদের পোড়ানোর জন্য জ্বলছে না । আগুনটা জ্বলছে গোটা ধর্মান্ধ সমাজটাকে পুড়িয়ে একটি মুক্তচিন্তার সমাজ গড়তে আর রক্ত ঝরছে চোখের জলকে প্রতিবাদের অগ্নি শিখায় পরিনত করতেই।


দেখতে দেখতে একটি বছর পেরিয়ে গেছে । ঐ জায়গাটা থেকে রক্তের দাগটাও শুকিয়ে গেছে । কিন্তু হৃদয় থেকে প্রতিবাদী আগুনটা নিভে যায় নি , হয় নি এখনও শেষ হৃদয়ের রক্তক্ষরন । তীব্র থেকে থেকে তীব্রতর হয়ে জ্বলছে প্রতিবাদের শিখাটা , টুপটুপ করে ফোটা ফোটা পড়ছে রক্ত । প্রতিবাদের আগুনটা শুধু ধর্মবাদীদের পোড়ানোর জন্য জ্বলছে না । আগুনটা জ্বলছে গোটা ধর্মান্ধ সমাজটাকে পুড়িয়ে একটি মুক্তচিন্তার সমাজ গড়তে আর রক্ত ঝরছে চোখের জলকে প্রতিবাদের অগ্নি শিখায় পরিনত করতেই।

গত বছরের বইমেলায় এসেছিলে বাঙলাদেশে । বন্যা দি’কে সাথে করেই এসেছিলে । প্রিয় পাঠকদের হৃদয় নিঙ্গরানো ভালবাসায় সিক্ত হতে মাতৃভূমিতে ছুটে এসেছিলে তুমি । কিন্তু ভালবাসা নয় আমরা তোমাকে দিয়েছি মৃত্যু । ধর্মের চাপাতির কোপে রক্তাক্ত করেছি তোমার দেহ । ধর্মের জালে আবদ্ধ সমাজে আমরা তোমার মস্তিস্ককে করেছি ছিন্নভিন্ন । ঘাঁড়ে-মাথায় ধর্মের চাপাতি মেরে আমরা দেখিয়েছি আমাদের বাহুর জোর , উলঙ্গ ধর্মের নাচন । আমরা সমাজটাকে পাল্টাতে পারি নি ; পারি নি উলঙ্গ ধর্মকে খেঁদিয়ে একটি আলোময় মুক্তচিন্তার সমাজ গড়ার পথে নিয়ে যেতে , পারি নি তোমার আলো হাতে অভিযাত্রিদের আলোটাকে ছড়াতে বরং আলোটাকে নিভিয়ে দিতে স্ব-চেষ্ট থেকেছি । আমরা বড্ড অপরাধী , বড্ড কাপুরুষ । ক্ষমা কর না আমাদের অভি দা ।

গত বছরের বইমেলা স্ত্রী বন্যা আহমেদকে নিয়ে নিজ মাতৃভূমিতে প্রিয় পাঠকদের কাছে ছুটে এসেছিলেন বিজ্ঞান লেখক অভিজিত্‍ রায় । বইয়ের গন্ধ দেহে মেখে আর প্রিয় পাঠকদের ভালবাসায় হৃদয় রাঙাতে সুদূর আমেরিকা থেকে ছুটে আসেন প্রাণের বইমেলায় । বিজ্ঞান , প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার লেখালেখি করতেন অভিজিত্‍ রায় । এছাড়াও সমাকামীতার ব্যাপারেও ছিলেন তিনি সচেতন এক আন্দোলনকারী । সমাজের অন্যান্যদের মত সমকামীদের অধিকার আছে , আছে নিজস্ব মত প্রকাশ করার স্বাধীনতা । আর সে স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্যই তিনি তার লেখায় সমকামীতাকে প্রাধান্য দিতেন । বিজ্ঞান ও যুক্তি দিয়ে ধর্মের সমালোচনা করতেন , ধর্মান্ধতা থেকে মানুষের মস্তিস্ককে রক্ষা করতে লিখতে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞান বিষয়ক বই । আর এ কারণেই ধর্মবাদীদের কাছে শত্রুতে পরিনত হন অভিজিত্‍ । অনলাইনে প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন অনেক । দেশে পা রাখলেই খুন করা হবে এমন হুমকিকে তোয়াক্কা না করেই গত বছরের ফেব্রুয়ারীতে বাঙলাদেশে আসেন অভিজিত্‍ রায় । কিন্তু আমরা অভিজিত্‍ রায়কে ভালবাসায় সিক্ত করতে পারি নি , পারি নি ধর্মবাদীদের চাপাতির আঘাত থেকে বাঁচাতে । গত বছরের ২৬শে ফেব্রুয়ারী রাত প্রায় ন’টা । বইমেলা থেকে বের হয়ে বাসায় যাবার পথে টিএসসি এলাকায় ধর্মবাদীদের চাপাতির আঘাতে খুন হন অভিজিত্‍ , মারাত্মক আহত হন বন্যা আহমেদ । মুক্তচিন্তা ও বিজ্ঞানের উপর চাপাতির আঘাত , মানবতা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রাস্তায় । মুক্তবুদ্ধির উত্‍স মস্তিস্ক ছিঁটকে পড়ে রইল ফুটপাতে । ধর্মাবাদীদের চাপাতির আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হল মুক্তবুদ্ধি , খানিকটা বাধাগ্রস্থ হল প্রগতির যাত্রা ।

একটা বছর কেটে গেছে স্মৃতির পাতা থেকে , হারিয়ে গেছে একটা বছর , মুছে গেছে সেই জায়গার জমাট বাঁধা অভিজিত্‍ রায়ের তাঁজা রক্ত । কিন্তু হারিয়ে যায় নি অভিজিত্‍ রায় , হারিয়ে যায় নি মুক্তচিন্তা । খুনিরা এখনও মুক্ত হাওয়ায় ঘুরছে , আলো-বাতাসে দিব্বি ঘুরছে খুনিরা । একের পর এক হামলা করে চলছে মুক্তচিন্তার উপর , মুক্তবুদ্ধির উপর চালাচ্ছে ধর্মের চাপাতি । রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা এখন পর্যন্ত খুনিদের গ্রেফতার করতে পারে নি , পারে নি এখন পর্যন্ত খুনিদের কিনারা নির্ধারন করতে । তাছাড়া রাষ্ট্র এই একটি বছরে একটি বারের জন্য শ্রদ্ধা ভরে স্মরন করে নি অভিজিত্‍ রায়কে , জানায় নি একটি বার শোক বার্তা । উপরন্তু খুনিদের না গ্রেফতার করে মুক্তচিন্তক ব্লগার , লেখকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছে , সীমা রেখা টেনে দিয়েছে লেখালেখি করার উপর , ধর্মবাদীদের সাধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমাজটাকে মুক্তচিন্তক শুন্য করে মৌলবাদী সমাজের পথে এগিয়ে দিয়েছে কয়েক ধাপ । তবে কি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় খুন করা হয়েছে অভিজিত্‍ রায়কে ? আঘাত করা হয়ে মুক্তচিন্তার উপর ? এই জন্যই কি প্রায় একটি বছর কেটে যাবার পরও খুনিরা আইনের ধরা ছোঁয়ার বাইরে ? মুক্ত হাওয়ায় ঘুরে যাতে খুনিরা আরও খুন করতে পারে মুক্তচিন্তকদের ? সে জন্যেই কি ধাঁমা-চাপা দেয়ার এক প্রকার চেষ্টা করে যাচ্ছে রাষ্ট্র ?

২৬শে ফেব্রুয়ারী এসে গেছে । যখন ফেব্রুয়ারী মাসটা এসেছে তখনই বুকের ভেতরটা মোঁচড় দিয়ে উঠেছে । ঢুঁকরে কেঁদে উঠেছে বুকের ভিতরটা । অভিজিত্‍ রায় আর আসবে না , ফেসবুকের হোম পেজে পাব না তার স্ট্যাটাস কিংবা ব্লগে পাব না বিশ্লেষনধর্মী কোন লেখা । তাই বলে কি হারিয়ে ফেলেছি তাকে ? না , বরং বুকের ভিতরে , মস্তিস্কে ধারন করেছি অভিজিত্‍ রায়কে । নিজেদের পাল্টে আমরা এক এক জন হয়েছি অভিজিত্‍ ।

#IamAvijit/#WeareAvijit

যতদিন এই সমাজে ধর্মান্ধতা আঘাত হানবে , যতদিন চাপাতি মস্তিস্ককে বিকল করতে উঁচিয়ে উঠবে ততদিন এক একজন অভিজিত্‍ জন্মাবে ধর্মকে ধ্বংস করে মুক্তচিন্তার সমাজ গড়তে ।
অভিজিত্‍ রায়রা মরে না , মরতে পারে না । অভিজিত্‍ রায়রা বেঁচে থাকে আলো হাতে অভিযাত্রীদের মাঝে ।
অভিজিত্‍ মৃত্যুঞ্জয়ী ।
অভিজিত্‍ রায় এক মৃত্যুহীন প্রাণ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *