ফলোয়ার

তুহিন পেপারগুলো আমার টেবিলের ওপর রাখতে গিয়ে নিচে ফেলে দিল। রাগে ওর হাত কাঁপছে। কী করব ঠিক বুঝতে পারছি না। চোখগুলো কেমন যেন অতিপ্রাকৃত লাগছে। মনে হচ্ছে গ্রীক যুদ্ধদেবতা এরিস এখন ট্রয়ে একিলিসকে বধের জন্য দৌড়ে আসছে। ঠিক তার চোখের মত। নিজের সাথে একিলিসের খানিকটা মিল খুজে পাচ্ছি। তুচ্ছ কিন্তু, অতিবিশাল কারণে আমি নিজের ঘরে অথর্বের মত পড়ে আছি। কিছু বলতে পারলাম না। তুহিনই বলল-
-এইবার খুশি হইছিস?
-হুম। অনেক খুশি হইছি। কোন সমস্যা?

তুহিন আমার দিকে রাগী রাগী চেহারায় তাকাল। ভয় পাওয়া উচিত কি’না বুঝতে পাচ্ছি না। মনে হয় পাওয়া উচিত। তাই বললাম, ‘দোস্ত, এমনে তাকাইস না। ডর লাগে।’

তুহিন আরও বিরক্ত হল। সম্ভবত ও আমাকে ভয় দেখানোর জন্য রাগী চেহারায় তাকায় নি। অন্য কোন কারণ থাকতে পারে। কী হতে পারে সেটা? কি জানি! যা খুশি হোক গে। আমার কী?

-পত্রিকার রিপোর্টগুলা পড়ছিস?
-হুম।
-সবগুলো?
-হুম।
-একটাতেও তোর নাম আসছে?
-হুম।
-কী?!
-থুক্কু! আসে নাই।
-ক্যান আসে নাই?
-আজিব তো! ইভেন্ট আতিক ভাইয়ের। আমার নাম আসবে কোত্থেকে? আর আমি কি পত্রিকায় নাম আসার জন্য কাজ করেছি না’কি? আজিব!

তুহিন আবার আমার দিকে রাগী রাগী চোখে তাকাল। মানুষের চোখ থেকে আগুন বের হবার ব্যবস্থা থাকলে সেই আগুনে আমি এখনই ভস্মীভূত হয়ে যেতাম। ভাগ্যিস, স্রষ্টা মানুষকে সেই ক্ষমতা দেয় নাই। থ্যাংকু স্রষ্টা।

এবং স্রষ্টাকে ধন্যবাদ দিতে গিয়েই খেয়াল করলাম, আমার চোখের কোণা ভিজে উঠেছে। অবাক হলাম। এই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমার চোখের কোণায় জল? নিজেকে প্রবোধ দিলাম। আমি ইভেন্টের হোস্ট না। হোস্ট আতিক ভাই। আমি সাধারণ কর্মী। আমার মত আরও দশ-পনেরোটা কর্মী ছিল ইভেন্টে। তমাল, আশিক, কায়েস, আতিক, রাকিব কারও নামই আসে নাই। আমি আসব কোত্থেকে?

সপ্তাহ-খানেক আগে:

মাথার ঘাম পায়ে পড়া নামে একটা বাগধারা চালু আছে বাংলায়। আমার অবস্থা অনেকটা সেরকম কিছুই। মাথায় সৃষ্টি হওয়া ঘামগুলো ঘাড়, পৃষ্ঠদেশ, নিতম্ব বেয়ে পায়ে গিয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে অবশ্য এই তিন জায়গায় সৃষ্ট ঘামের সাহায্য নিচ্ছে। তারপর সবাই মিলে এক সাথে স্যান্ডেল বেয়ে পড়ছে তপ্ত রাজপথে। এবং সাথে সাথে সেই ঘামের পানিটুকু উত্তাপে বাষ্প হয়ে যাচ্ছে এবং সোডিয়াম ক্লোরাইডটুকু রাজপথে পড়ে থাকছে। এর মাঝে খিলগাঁও তালতলার সামনে বসে আছি। বসে বসে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করছি। ‘সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের প্রতিবাদে’ সপ্তাহ-খানেক পর আমাদের একটা মানববন্ধন আছে শাহবাগে। সেটার জন্য।

একদিনে সাড়ে চার’শ সাক্ষর সংগ্রহ করেছি। আতিক ভাই শুনলে নিশ্চয় মারাত্মক খুশি হবে। ফেসবুকে সেলিব্রেটি বলতে যা বোঝায় আতিক ভাই মোটামুটি তাই। সাঁইত্রিশ হাজার ফলোয়ার। চিন্তা করা যায়! আমার তো সাঁইত্রিশটাও নেই। থাকবেই বা কীভাবে? আতিক ভাই যেভাবে সব সময় সোশ্যাল ওয়েলফেয়ারে যুক্ত থাকে, আমি তো তার সিকি ভাগও থাকি না। তাকে দেখলে মনে হয়, সমাজের সব কলুষতা দুর করার দায় যেন গিয়ে পড়েছে একা তার ঘাড়ে। আমি মাঝে মাঝে মনে মনে হাসি। তার একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখলেই একশোটা মানুষ সেই ইভেন্টের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। মানুষের কতটা কাছাকাছি আসতে পারলে এতটা আপন হওয়া যায় আমি ভেবে কুল পাই না। অবশ্য এখন আমার মত অসংখ্য তরুণ নিজেই আতিক ভাইয়ের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করি। তার মত একজন মানুষের কাছাকাছি থাকাও সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন ভেবে মাঝে মাঝে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। আমার মত একটা চালচুলোহীন ছেলেকে পুরো খিলগাঁও এলাকার দায়িত্ব দিয়ে দিল! কতটা বিশ্বাস করে আমাকে! মনে মাঝে প্রায়ই একটা তাড়না অনুভব করি, এই বিশ্বাসটাকে আমি চিরদিন ধরে রাখব।

রাত সাড়ে আটটার সময় বাসায় ফিরেই আতিক ভাইকে কল করে জানালাম, সাড়ে চার’শ সংগ্রহ করেছি। আতিক ভাই প্রশংসাসূচক কিছু কথা বললেন। তাতেই সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে গায়েব হয়ে গেল। ফোনটা রেখেই খেয়াল করলাম ঘামে পুরো শরীর জবজব করছে। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। ঝাড়া আধ ঘণ্টা পর বের হয়েই ফেসবুকে লগ ইন করলাম। হোম পেইজে খানিকটা নিচে নামতেই চোখে পড়ল আতিক ভাইয়ের স্ট্যাটাসটা- “আমাদের ‘সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের প্রতিবাদে’ করতে যাওয়া মানববন্ধনে সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনে আমরা অভিভূত। প্রথম দিনের গণস্বাক্ষরেই আমাদের সাথে সংহতি জানিয়েছেন প্রায় ছয় হাজার মানুষ। আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। এছাড়াও আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি যারা…’

খানিকটা খটকা লাগল। আমি সংগ্রহ করেছি সাড়ে চার’শ। যতটা পরিশ্রম করেছি সেই হিসেবে এতটা বোধ হয় আর কোথাও আসে নি। কিন্তু, যদি বারটা জায়গায়ও স্বাক্ষর নেয়া হয় তাতে এত স্বাক্ষর আসা কখনই সম্ভব না। আবার আতিক ভাইকে কল করলাম- ‘ভাই, সবথেকে বেশি স্বাক্ষর এসেছে কোথা থেকে?’
-খিলগাঁও থেকেই। কংগ্রাচুলেইশন!
-তাহলে সাত হাজার স্বাক্ষর এলো কোথা থেকে?
-আরে বোঝ না? এটুকু তো সেটাপ দেয়াই লাগে।

আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। খানিকক্ষণ চুপ মেরে বসে থেকে কী সব আকাশ পাতাল ভাবলাম। তারপর, কী ভেবে আতিক ভাইয়ের প্রোফাইলে ঢুকলাম। ফলোয়ার ঊনচল্লিশ হাজার ।

তিন দিন আগে:

তুহিন আমার পাশে বসে দরদর করে ঘামছে। আকাশের মতিগতি ভাল না। এতক্ষণ রোদে চিড়বিড় করছিল। আর এখন ভাপসা গরম। সবকিছু গুমোট হয়ে আছে। এমনিতেই ঘামে গোসল করে ফেলেছি। এরপর বৃষ্টি বোধ হয় আর এক বার গোসল করাবে। অবশ্য বৃষ্টি আসলে ভালই হবে। অন্তত মেঘ করার পর থেকে রোদে পুড়তে হচ্ছে না।

তুহিনকে আসতে দেখে বেশ অবাক হয়েছি। ওর এসবে খুব একটা আগ্রহ নেই। তারপরও আমার চেয়ারটার অর্ধেকটা নিয়ে বসে আছে। একটু পর বলল, ‘তোর আতিক ভাই একবারও এদিক এসেছে?’

এতক্ষণে বদের মতিগতি বুঝলাম। শালা এখানেও একটা ক্যাচাল লাগাতে এসেছে। কিন্তু, কী উত্তর দেব ভেবে পেলাম না। আতিক ভাই আসলেই একবারও এখানে আসে নি। অবশ্য কোন গণস্বাক্ষর বুথেই যায় নি। বললাম, ‘আসবে একদিন সময় করে। কত বড় সেলিব্রেটি! তার সময় আছে?’
-তুই কিন্তু ভুলে যাচ্ছিস, এসব করেই আতিক ভাই সেলিব্রেটি হয়েছে। আর আজকে এসবের জন্য তার সময় নেই?

চুপ থাকলাম। কিছু বললাম না। অবশ্য বলার মত কিছু নেইও।

একটু পর তুহিনই আবার বলল, ‘আতিক ভাইয়ের প্রোফাইলে ঢোক।’

ঢুকলাম।

-ফলোয়ারের সংখ্যা দেখ।
-বেয়াল্লিশ হাজার।
-মানে বুঝিস?
-মানে কী?

তারপর তুহিন মিনিট পনের কী সব ঘ্যানঘ্যান প্যানপ্যান করে গেল। অন্য কেউ হলে এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আর এক কান দিয়ে বের করে দিত। আমি এক কানেও ঢোকালাম না। শব্দতরঙ্গগুলো রিফ্লেক্ট করে বের করে দিলাম।

গতকাল:

মানুষের সংখ্যা দেখে গত সাতদিনের ক্লান্তি দুর হয়ে গেল। ফেসবুক দিয়ে যে এত মানুষ আনা যায়, কোনদিন কল্পনাও করি নি। অবশ্য আমাদের গণস্বাক্ষর বুথ থেকেও বহু মানুষ ইভেন্টের কথা জেনেছে। শাহবাগ মোড় থেকে টি.এস.সি. পর্যন্ত মানুষ দাড়িয়ে আছে। শুধু ফেসবুক দিয়ে! কল্পনাই করা যায় না। অবশ্য ইভেন্টটা আতিক ভাই না করে অন্য কেউ করলে এত মানুষ হত কি’না সন্দেহ আছে। আতিক ভাই আজকে প্রচণ্ড ব্যস্ত। মিডিয়া কভারেজ প্রেসক্লাবে বেশি থাকে। কিন্তু, এখানেও এত চলে আসবে বুঝতেই পারি নি। আতিক ভাই সাক্ষাৎকার দিয়ে কূল পাচ্ছে না। কয়েকটা টিভি ক্যামেরাও দেখলাম। প্রচণ্ড ব্যস্ততা চোখেমুখে ফুটিয়ে তুলে সবাইকে সোজা করে লাইনে রাখতে লাগলাম। নতুন কেউ আসলে প্ল্যাকার্ড ধরিয়ে দিতে লাগলাম। কোনোখানে কোন বিশৃঙ্খলা হলেই দৌড়ে সেদিকে গিয়ে সব ঠিক করলাম। সাড়ে তিন ঘণ্টা পর যখন মানববন্ধন শেষ হল আমি, তমাল, আশিক, কায়েস, আতিক, রাকিব সবার রীতিমত হাড় মাংস এক হয়ে গেছে।

আতিক ভাই আমাদের সবাইকে নিয়ে ছবির হাটে ঢুকলেন। চা আর বেনসন শেষ করে যখন বাসায় ফিরলাম শরীরে আর কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই। বাসায় ঢুকেই বিছানায় এলিয়ে পড়লাম।

ঘুম থেকে উঠেই ফেসবুকে লগ ইন করলাম। আতিক ভাই সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিশাল স্ট্যাটাস দিয়েছে, যাতে সাড়ে ছ’হাজারের মত বিশাল সংখ্যক লাইক। প্রথম আলো, বাংলানিউজ, বিডিনিউজ সবগুলোতেই কভারেজ এসেছে। সামু, আমু, সচল সব ব্লগেই বেশ কয়েকটা পোস্ট আমাদের মানববন্ধনের ওপর। সবাই দেশ ও জাতির প্রতি আতিক ভাইয়ের এই অসাধারণ কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছে। খুশিতে উচ্ছ্বাসিত হয়ে আতিক ভাইকে কল করলাম। কল রিসিভ করেই আতিক ভাই বললেন, ‘দেখছিস, এই ইভেন্ট দিয়েই আমার ফলোয়ার পঞ্চাশ হাজার হয়ে গেল।’ তার পর আরও কী কী যেন বলে গেলেন। আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। অনুভূতিগুলো যেন এক নিমেষে মরে গেল। এতটা আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর উচ্ছলতা এক নিমেষে গায়েব হয়ে গেল। আমার এই দেশটার চেয়েও ফেসবুকের ফলোয়ার বড়! একটু পরে আতিক ভাই বললেন, ‘আচ্ছা, এখন রাখি কেমন?’

মোবাইলটা কানের কাছ থেকে নামাতেই কে যেন কল করল। মোবাইলটা সামনে ধরতেই দেখি, তুহিন। রিসিভ করার সাহস হল না।

৯ thoughts on “ফলোয়ার

    1. ভাইজানের ইমোর মাজেজা বুঝলাম
      ভাইজানের ইমোর মাজেজা বুঝলাম না। লেখা কী বেশি খ্রাপ হৈছে না’কি???????

  1. চমৎকার বাস্তবসম্মত কাহিনী এবং
    চমৎকার বাস্তবসম্মত কাহিনী এবং চমৎকার প্রেজেন্টেশন। অবশ্য হিটসিকার হিসেবে নাম মিলে যাওয়ার খানিকটা বিব্রত। তবে সেটা নিতান্তই কাকতালীয় ধরে নিয়ে স্বস্তি বোধ করছি। কারন ফেসবুকে কেউ ফলো করলে অস্বস্তিতে ভুগি। 😀

    1. যখন গল্পটা লেখা হয়েছে, তখন
      যখন গল্পটা লেখা হয়েছে, তখন আপনার নামও শুনিনি। নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *