অঙ্গনা


রোদতপ্ত দুপুর। ব্যাস্ত অফিসপাড়ায় মানুষের কোলাহল আর যানবাহনের আওয়াজে কানের পর্দা ফাটার যোগার। শার্টের হাতা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে একটি দোতলা ভবনের সিড়ি দিয়ে নামছে শাহেদ। আজকাল অধিকাংশ অফিসেই এসির ব্যাব¯ া রয়েছে। কিš‧ শাহেদের অফিসে এখনও ফ্যান চালিয়ে গরম নিবারনের বৃা চেষ্ঠা করে সবাই। শাহেদ বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকায়। যেন ভয়ঙ্কর ক্রোধে অগিড়ববর্ষণ করছে সূয্যিমামা। রাস্তার পিচ গলে গাড়ির


রোদতপ্ত দুপুর। ব্যাস্ত অফিসপাড়ায় মানুষের কোলাহল আর যানবাহনের আওয়াজে কানের পর্দা ফাটার যোগার। শার্টের হাতা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে একটি দোতলা ভবনের সিড়ি দিয়ে নামছে শাহেদ। আজকাল অধিকাংশ অফিসেই এসির ব্যাব¯ া রয়েছে। কিš‧ শাহেদের অফিসে এখনও ফ্যান চালিয়ে গরম নিবারনের বৃা চেষ্ঠা করে সবাই। শাহেদ বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকায়। যেন ভয়ঙ্কর ক্রোধে অগিড়ববর্ষণ করছে সূয্যিমামা। রাস্তার পিচ গলে গাড়ির
চাকায় লেগে যাচ্ছে। শাহেদ মনে মনে বলে “এইবার একটু রেহাই দাও মামা! আর কত জ্বালাবে?” নিজের করা নিরব প্রার্থনায় নিজেই ফিক করে হেসে উঠে শাহেদ। তারপর আবার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকে। একটি টং দোকান দেখে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে সে। পরেক্ষণেই মনে পড়ে দুদিন আগে বউকে কথা দিয়েছে যে আর ধুমপান করবে না। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাহেদ হাঁটা শুরু করে। একবার হা করে বুক ভরে শ্বাস নিতে চায়। কিন্তু শহরের যে বিষাক্ত বাতাস তার ফুসফুসে প্রবেশ করে সেটি নিকোটিনের তুলনায় কোন অংশে কম যায় না। শাহেদের ডানপাশে সেই চিরপরিচিত হোটেলটি। এটাই তার দুপুরের আহারের ¯ ান। ওর বউ অনেকবার বলে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে যাবার জন্যে। শাহেদ বলে “টাকা দিয়েই যদি রেডিমেট খাবার পাওয়া যায় তবে কষ্ট করে রানড়বার দরকার কি ?” তার এমন বেরসিক জবাব শুনে বউ ক্ষেপে যায়। তখন শাহেদ বলে “বাহ্ রাগলে তো বউটাকে বেশ লাগে !” বউ আরও রাগে। শাহেদ তাকে আরও রাগায়। কিছুসময় পর যখন শাহেদ তাকে বুকে টেনে নেয় তখনই এই অনুরাগলীলার মধুর পরিসমাপ্তি ঘটে।

শাহেদ হোটেলে ঢুকে। লোকজনে গিজগিজ করছে। বেশিরভাগই চাকুরিজীবী। একটি মোটামতন লোক
বেসিনে আচ্ছা করে হাত-মুখ ধে․ত করছে। প্রায় দুমিনিট হয়ে গেছে। তবু ধুয়েই চলছে। কিছু কিছু মানুষ আছে এমন পাবলিক প্লেসে দীর্ঘক্ষণ সময় নিয়ে দেহাংশ পরিস্কার করে। এরা সাবানের পরিবর্তে পানি দিয়ে এমনভাবে ত্বক মর্দন করে যে এদের মুখে বুঝি কোন প্রাণী ’পটি’ করেছে! এরকম কাউকে দেখলে শাহেদের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। কোন কান্ডজ্ঞান নেই কিছু নেই। আরও দুই মিনিট পর শাহদ ’ফ্লোর’ পায়। মোটা লোকটি তার ধে․তকর্ম শেষ করে ভেজা হাতদুটি ঝাড়া দিতেই শাহেদসহ আরও দু-একজনের শরীরে পানির ছিটা এসে লাগে। শাহেদ কঠিন কিছু বলে উঠার আগেই মোটা লোকটি বলে উঠে ’স্যরি”। শাহেদের মেজাজ আরও চড়ে যায়। বেটা ক্ষেত কোনখানের; পানি ছিটিয়ে বলে স্যরি ! তবু শাহেদ কিছুই বলতে পারেনা। লোকটি লাজুক হাসি দিয়ে টেবিলে বসে সিঙ্গারা খাওয়া শুরু করে। তাকে মনে মনে কিছু গালি দিয়ে শাহেদ আয়নার সামনে দাঁড়াতেই চোখ যায় শার্টের দিকে। ঘাম মুছতে মুছতে শার্টের হাতার অংশটি ময়লা হয়ে গেছে। এতটাই ময়লা যে দেখতেই ভীষণ বিশ্রী লাগছে। এজন্যই হয়ত একজন সহকর্মী অফিসে ঢুকেই জিজ্ঞেস করেছিল ”শাহেদ ভাই ঘর-দোর সাফ করেছেন নাকি সকাল সকাল ?” শাহেদ মনে মনে লজ্জা পায় । বউ না থাকার কারণেই তার জামাকাপড়ের এই বেহাল দশা। শাহেদ বেশিরভাগই নিজের কাপড় নিজেই পরি¯‥ার করে অভ্যস্ত। এক্ষেত্রে তার থিওরি হল মাসে দুদিন কাপড় পরি¯‥ার করলেই তো চলে। কিš‧ বউ এতে নারাজ। দুদিন পরপরই সে কোমর বেঁধে নেমে যায় পরিচ্ছনড়বতা অভিযানে। শাহেদ তাকে ক্ষেপিয়ে বলে “ডিটারজেন্ট কোম্পানি তো তোমাকে স্পেশাল ডিসকাউন্ট দিবে।” সাথে সাথেই বউ বলে উঠে “ সেটা দিলে তো লাভই হয়। কিন্তু কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি এসে তোমার জামা-কাপড় যেদিন খুলে নিয়ে যাবে সেদিন বুঝবা।” তর্কে হেরে গিয়ে শাহেদ হেসে উঠে।

খাবার এসে গেছে শাহেদের সামনে। খাবার দেখেই তার ব্যাপক ক্ষুধার অনুভূতি জাগে। গোগ্রাসে কয়েকবার মুখে দিয়ে আশেপাশে তাকায়। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। লোকজন তার এই রাক্ষুসে খাওয়া দেখলে নিশ্চয় হাসাহাসি করবে। শাহেদ এবার ধীরে ধীরে খেতে থাকে। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে এখনও বিশ মিনিট সময় আছে। রিলাক্সে খাওয়া যাবে। মোটা লোকটি পাঁচ মিনিট নষ্ট না করলে আরও পাঁচ মিনিট হাতে থাকত। সে আশেপাশে তাকিয়ে লোকটিকে দেখতে পায়না। হয়তো খেয়েদেয়ে বিদেয় হয়েছে। খাওয়া যখন প্রায় শেষের পথে তখন হঠাৎই শোনা যায় নারীকন্ঠের বিকট চিৎকার ! সকলেই নড়েচড়ে বসে। চিৎকারের সাথে ভেসে আসছে ধুপ-ধাপ শব্দ। শাহেদ বুঝতে পারে শব্দ আসছে হোটেলটির পেছনের অংশের রানড়বাঘর থেকে। মহিলাটি কিছু বলতে চাইছে কিš‧ সম্ভবত সে বোবা। এদিকে আঘাতকারী ব্যাক্তিটি অবিরাম অশ্লীল গালিবর্ষণ করছে। শাহেদের হাতে একদলা ভাত; প্লেট আর তার মুখের মাঝামাঝি এসে থেমে আছে। হঠাৎই কি যেন হয়ে যায় শাহেদের। ভাতের দলাটি প্লেটে ছুঁড়ে দিয়ে মানুষের ভিড় ঠেলে ছুটতে থাকে রসুইঘরের দিকে। উপরে লাল রং দিয়ে লেখা “প্রবেষ নিষেদ”। শাহেদ দ্রুতপায়ে রুমটিতে ঢুকে আμমণকারী পুরুষটিকে টান দিয়ে প্রায় ছুঁড়ে দেয়। বয়¯‥
মহিলাটির নাক দিয়ে তখন রক্ত পড়ছে। শাহেদ চিৎকার করে বলে “কেন মারছেন ওকে ? কেন মারছেন ওকে?” লোকটি দোকানের মালিক। শাহেদের মুখচেনা। সে দেয়ালে ধাক্কা খেলেও অগিড়বমূর্তিতে ঘুরে দাঁড়ায়। শাহেদের চোখ দিয়েও যেন আগুন বেরুচ্ছে। কাস্টমারদের অনেকেই এসে দাঁড়িয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত তারা কোন ভূমিকা রাখবে না। শুধু দাঁড়িয়ে দেখবে কি ঘটে। মালিক ক্রুদ্ধ গলায় বলে
– ঐ আপনে কেডা ? কইত্থেইকা আইছেন ? এই বেডির লগে এত পিরীত কিসের
?
শাহেদ তাকে মারতে উদ্যত হলে দুজন কর্মচারী এসে দোকানের মালিককে সরিয়ে নেয়ার চেষ্ঠা করতে লাগল। এবার দর্শকদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ এসে শাহেদকেও বোঝাতে লাগল। এদিকে দোকানের মালিক চেঁচিয়েই চলছে
-ঐ আমারে ছাড়। আমার গায়ে হাত দিছে কত্ত সাহস ! ঐ বেডি যে আমার পাঁচশ টাকার মাছ পুড়াইয়া ফেলল হে কি এই টেকা ফিরত দিব ? আমারে চিনে না ! আমার মামা হইল………..
দোকান মালিকের কথা থেমে যায়। কারন শাহেদ পকেট থেকে হাজার টাকার একটা নোট বের করে মালিকের মুখে ছুঁড়ে মেরেছে। উপ¯ি ত দর্শকবৃন্দ এবার মোটামুটি অবাক। শাহেদ হিসহিস করে বলে
-এই মহিলা ভবিষ্যতে যা যা নষ্ট করবে তার ক্ষতিপূরণ আমি দেব। আরেকবার তার গায়ে হাত দেবার আগে মনে রাখবেন আমি কিন্তু এই শহরের ছেলে ! কথাগুলো বলে শাহেদ খাবারের অবশিষ্টাংশ ফেলে এঁটো হাত নিছেন হনহন করে
বেড়িয়ে আসে হোটেল থেকে। জনতার মাঝে গুঞ্জন শোনা যেতে থাকে। নানা মন্তব্য, সমর্থন, সমালোচনা, ফিসফাস, মহিলার সাথে শাহেদের সম্পর্ক ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু যার জন্য এতকিছু সে উদ্ভূত ঘটনায় ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। তার নাক দিয়ে তখনও রক্ত ঝড়ছে। শাহেদ আবারও টং দোকানের সামনে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত সিগারেট না নিয়েই হাঁটতে থাকে অফিসের দিকে। এতক্ষণে তার খেয়াল হয় যে হাত চটচট করছে। তার অস্বস্তি হতে থাকে।

দ্রুত অফিসে ঢুকে হাত ধুয়ে নিজের চেয়ারে শরীর এলিয়ে দেয়। চোখ বুজে ভাবতে থাকে কয়েক মিনিটের মাঝে কি ঘটে গেল ! সে কি আর ঐ হোটেলে যাবে ? সাথে সাথেই মন প্রবলভাবে বলে উঠে “কখনই না।” এমন চামার মালিকের হোটেলে এতদিন খেয়েছে ভেবেই নিজের উপর রাগ হতে থাকে শাহেদের। সে মোটেও বুঝতে পারে না যে অফিসের প্রায় সবাই তাকে দেখিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। দু-একজন মিটিমিটি হাসছেও। একজন গলা খাঁকড়ি দেয়। শাহেদ ফিরেও তাকায় না। অবশেষে একজন সাহস করে শাহেদের সামনে চেয়ার টান দিয়ে বসে। বলে
-বিষয় কি শাহেদ ভাই ? হঠাৎ করে মেজাজ সপ্তমে ?
শাহেদ কোন কথা বলে না। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িগুলোতে হাত বুলোতে থাকে। বউয়ের অনুপস্থিতির সুযোগে শুশ্রু তার মুখমন্ডল অধিকার করে বসেছে। দাঁড়ি রাখা বউয়ের একদম পছন্দ নয়। শাহেদের কাছে দাঁড়ি কাটা হল সবচেয়ে বিরক্তিকর এবং অপ্রয়োজনীয় একটি কাজ। তবু সংসারে শান্তি রক্ষার্থে সে নিয়মিত ক্ষৌরকর্ম করে। আজও অফিস শেষে সেলুনে যাবার শিডিউল আছে। অবশ্য এক্ষেত্রে শাহেদের শর্ত হল বউকে মাথার চুল লম্বা রাখতে হবে। বউও এতে রাজি। তাই বউয়ের কোমরের নিচ অবধি লম্বা চুল দেখে ফিরে তাকায় অনেকেই। মেয়েরা হিংসায় মরে। আর অতিআধুনিকেরা দুর থেকে ’ক্ষেত’ বলে টিটকারি মারতেও ভুলে না। সহকর্মীটি আবার প্রশ্ন করে
-কি হইল ভাই; বউয়ের সাথে ঝামেলা ?
একজন মহিলা সহকর্মী হেসে উঠে। শাহেদ গম্ভীর কন্ঠে বলে
-না।
-তাইলে ঘটনা কি বলেন । মানে শেয়ার করলে আপনার মেজাজ ঠিক হয়ে
যেতে পারে।
-হবেনা। একই সুরে বলে শাহেদ।
-আরে হবে হবে। অবশ্যই হবে। আপনি মন খারাপ করে বসে থাকলে তো
আমাদের ভাল লাগে না। বলেন তো দেখি।
শাহেদ ধীরে ধীরে হোটেলের ঘটনা খুলে বলে। সেই সহকর্মীসহ আরও কয়েকজন হেসে ফেলে। পরেক্ষণেই সহকর্মীটি খুব জ্ঞানীর মত বলে
-শাহেদ ভাই, এইসব থার্ডক্লাস লোকের সাথে লাগতে যান কেন ? ওদের কোন মানসম্মান নাই, কখন কি করে বসবে পরে আপনার মানসম্মান নিয়া টানাটানি।
-আপনার বাবা কি জীবিত আছেন ?
শাহেদের এই আচমকা প্রশেড়ব একটু ভ্যাবচ্যকা খেয়ে যায় সহকর্মীটি। পরেক্ষণেই সামলে নিয়ে বলে
-মানে শাহেদ ভাই, ঠিক বুঝলাম না; আমার বাবা আমি ছোট থাকতেই মারা গিয়েছেন।
-সে․ভাগ্য আপনার। যান কাজ করুন।
সহকর্মীটি আরও কনফিউজড্ হয়ে পড়ে। অন্যদের মুখের হাসিও মিইয়ে গেছে। হঠাৎ করেই যেন একটা থমথমে নিরবতা চলে আসে অফিসকক্ষে। শুধু একটা ফ্যানের ঘড়ঘড় আওয়াজ শোনা যায়। সহকর্মীটি কিছু বলার চেষ্ঠা করতেই শাহেদ কড়া কন্ঠে বলে “কোন কথা নয়। যান অফিসের কাজ করুন।” সহকর্মীটি উঠে চলে যায়। শাহেদ ল্যাপটপ নিয়ে বসে। ধীরে ধীরে অফিসের কাজে ডুবে যায় সে।


মোটামুটি ভাঙ্গাচোরা একটি ক্লাসরুম। টিনের চালের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে। ক্লাসরুমটি মেরামতের জন্য অনেকদিন ধরেই ¯‥ুলমাঠে কাঁচামাল মজুদ করে রাখা আছে। তবু কোন এক অদ্ভূত কারনে মেরামতকার্য শুরু হচ্ছে না। ক্লাস নিচ্ছেন একজন বৃদ্ধ শিক্ষক। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতা তার কথা শুনছে। স্যার ক্লাসময় হেঁটে হেঁটে পড়াচ্ছেন “বেঁহুশ হালিমাকে ভেতরে ফেলে রেখে আবুল যখন বাইরে বেরিয়ে এল তখন সর্বাঙ্গে ঘামের ¯্রােত নেমেছে ওর……….”। পড়ানোর সাথে সাথে স্যারের সমস্ত দেহ যেন কথা বলছে। ক্লাসময় পিনপতন নীরবতা। পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শতাধিক শিক্ষার্থী। তাদেরই মাঝে একটি ছেলে দুই গালে হাত দিয়ে বসে আছে। তার কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। এই বিশ্বব্রহ্মান্ড ছেড়ে যেন তার দৃষ্টি চলে গেছে অন্য কোন জগতে। চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা হয়ে বইয়ে গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ তার মাথায় কেউ হাত রাখে। ছেলেটি চমকে উঠে তাকিয়ে দেখে স্যার তার মাথায় হাত বুলাচ্ছেন। সে মাথা নিচু করে। স্যার কোমল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করেন “কাঁদছ কেন বাবা ?” ছেলেটি কোন কথা বলতে পারেনা। হু হু করে কেঁদে উঠে। অবাক দৃষ্টিতে সমগ্র ক্লাস তাকিয়ে আছে তার দিকে। স্যার বিব্রতভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্ঠা করছেন। কিন্তু ছেলেটির অশ্রু যেন বাঁধ মানছে না। হঠাৎ সে কোন কথা না বলে দে․ড়ে বেড়িয়ে যায় ক্লাসরুম থেকে। স্যার ডাকতে থাকেন “এই…..এই……..”

শাহেদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। তার নিয়মিত দেখা অনেকগুলি দুঃস্বপেড়বর মাঝে একটি। শাহেদ ভুলতে চায়। কিš‧ অতীত অবিরাম কড়া নাড়তে থাকে তার মনের দরজায়। ঘড়িতে রাত আটটা বাজে। এই অসময়ে ঘুমানোর জন্য আফসোস হতে থাকে শাহেদের। বিছানাময় ছড়িয়ে আছে ল্যাপটপ, টিভি রিমোট,মোবাইলসহ কিছু ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী। এগুলো শাহেদের নিত্য ব্যাবহার্য। মোবাইলটি তুলে দেখে বউ ছয়বার কল করেছে। এমনই মরার মত ঘুমিয়েছে যে শাহেদ একদম টেরই পায়নি। কলব্যাক করলেও ওপাশ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায় না। ব্যার্থ হয়ে শাহেদ বিছানা ত্যাগ করে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়। রঙ্গিন আলোয় আলোকিত
শহর। যান্ত্রিক সময়ে গতিময় শহর। শাহেদ ভাবে প্রতিমূহুর্তে কত না অন্যায় ঘটে চলছে এই আলোর জগতে। যে মূহুর্তে শাহেদ ছাদে দাঁড়িয়ে রিলাক্স করছে সেই সময় না জানি কতজন খুন হচ্ছে, না জানি কতজন ধর্ষিতা হচ্ছে, না জানি কতজন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ! কেউ কি ভাবে এসব? একটিবারও কি ভাবে ?

শাহেদের মনে মাঝেমধ্যেই এসব ভাবনা চলে আসে। বউকে বললে বউ বলে “তা তুমি এখন কি করবে ? স্পাইডারম্যানের মত উড়ে উড়ে সবার বাসা গিয়ে দেখবে কার কি দুঃখ ?”
শাাহেদ আহত হয়ে তাকিয়ে থাকে শুন্য দৃষ্টিতে। বউ তার মন বুঝতে পেরে ওকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রাখে। ওরা চলে যায় অজানা কোন সুখের দেশে, যেখানে সুখ ছাড়া আর কিছু নেই। শাহেদের মোবাইল বেজে উঠে।
-হ্যালো মিতু
-কোথায় গো তুমি ? নিশ্চয় এতক্ষণ ঘুমাচ্ছিলে ?
শাহেদ হেসে বলে – হ্যাঁ গো। তুমি না থাকলে জাগি কিভাবে ?
-খালি শয়তানি না ?
-হুম, তোমার কতক্ষণ লাগবে আর ?
-ওহে গাধা মিয়া আমি তো বাসার সামনে।
-তো গাধীর মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন ?
-চোপ শয়তান। দরজা খোল।
শাহেদের বউ মিতু। তিনদিনের অফিসিয়াল ট্যুর শেষে ফিরছে। শাহেদ ছাদ থেকে নামতে থাকে দরজার দিকে। দরজা খুলতেই দেখে মুখে সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাহেদ বলে
-কোথায় কোথায় বেড়ালে বল।
-আরে বাবা আগে ভেতরে যেতে দাও তো।
ভেতরে গিয়ে মিতু সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। শুয়ে শুয়েই ব্যাগ খুলে একটা প্যাকেট বের করে। বলে “দেখতো এটা কি?” শাহেদ প্যাকেট টা হাতে নেয়। লেভেল খোলার পর তার অদ্ভূত শিহরণ খেলে যায় ওর দেহে। দুটি বড় সাইজের সামুদ্রিক শামুক, তার গায়ে খোদাই করা ওদের দুজনের নাম। মিতু বলে “এই
তিনদিন তোমাকে অনেক মিস করেছি গো।” শাহেদ কোন কথা বলে না। মিতুর চুলে বিলি কেটে দিতে থাকে। মিতু বলে “রাতের খাবার নিয়ে এসেছি। এবার ছাড়, আগে ফ্রেশ হয়ে নিই।” মিতু উঠে যায়, শাহেদ তাকিয়ে থাকে ছাদের দিকে। অনেক সুখে কেটে যাচ্ছে দিনগুলি। অনেক ভাললাগায় কাটছে প্রতিটি
সময়। একা থাকলেই কেন যেন ভয়ানক হয়ে উঠে সময়গুলি। মিতু সেটা জানে। সেজন্যই বাপের বাড়ি কিংবা অফিসের কাজে বাইরে গেলে একটু পর পর ফোন করে। অনেক চাপাচাপি করেছে ডাক্তারের কাছে নেয়ার জন্য। কিন্তু শাহেদ মোটেই এটাকে কোন সমস্যা মনে করেনা। এ নিয়ে মৃদু ঝগড়া – কথা বন্ধ হয়েছে অনেকবার। কোন লাভ হয়নি। মিতুও আর বাড়াবাড়ি করেনি। দুজনের বোঝাপড়া খুবই চমৎকার। ঝগড়া – বিবাদ হলে দুজনে দু’রুমে গিয়ে মুখ গোমড়া করে বসে থাকে। কিছুসময় পর যার অন্যায় হয়েছে সে গিয়ে কথা বলে। পরিসমাপ্তি হয় ঝগড়ার। সারাক্ষণ ঝগড়া না করলেও কোন এক অজানা কারণে বন্ধুবান্ধব ওদের বলে টম এন্ড জেরি। এটা মনে হতেই শাহেদ হেসে উঠে। মিতু বাথরুম থেকে
বের হয়ে বলতে থাকে “খাবার টেবিলে চলো। ক্ষুধা লেগেছে।” শাহেদের বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। এদিকে মিতুর তাড়া চলছেই। মেয়েটার এতটুকু ‣ধর্য্য নেই। মনে মনে বলতে বলতে শাহেদ অনিচ্ছায় বিছানা ছেড়ে এগোতে থাকে ডাইনিং টেবিলের দিকে।

এই পর্যায়ে চলে যায় বিদ্যুত ! দর্শকরা সব হা-হুতাশ করে উঠে। দর্শক বলতে শায়লার বন্ধুসকল। শায়লা এক ঘন্টার এই নাটকটিতে “মিতু” চরিত্রে অভিনয় করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিভিরুমটিতে তখন হট্টগোল, বিদ্যুত বিভাগের চে․দ্দগুষ্টি উদ্ধার চলছে। শায়লার নাটকটির মাঝখানে এভাবে বিদ্যুত বারোটা বাজিয়ে দিল ! একজন বলল
-আরে দোস্ত, ক্যারেক্টারটা ঠিকমত এস্টাবলিশ হবার সুযোগ পাইল না ! তার
সাথে যোগ দিল আরো কয়েকজন-
-পূনঃপ্রচার তো হবেই।
-আসল প্রচারের সময়ই কারেন্ট নাই, আবার পুনঃপ্রচারের সময় আইব নি ?
-আইব……আইব……..না আইলেও তো কয়দিন পরে ডিভিডি পাওয়া যাবে।
-পুনঃপ্রচারের সময় কারেন্ট থাকবে তোরে কইল কে ?
-আরে হাসান সব জানে। সরকারী দলের লোক না….হা……হা………
অতঃপর নাটকের কথা ভুলে শুরু হল রাজ‣নতিক আলোচনা। নিমেষেই তিনটি দল হয়ে গেল। দুই দলে পারস্পরিক সমালোচনায় ব্যাস্ত। বাকী একটি দলটির সদস্যবৃন্দ সিরিয়াস ভাবে সবাইকে বোঝানোর চেষ্ঠা করছে যে সরকার ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এখন থেকে নাকি নিজ খরচে চলবে ! শিক্ষার ব্যায়
বেড়ে যাবে, পড়াশোনা কিভাবে চলবে ইত্যাদি-ইত্যাদি। কিš‧ অবাক বিষয় হল কেউ এই তৃতীয় দলটিকে তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে পড়াশোনার খরচের বিষয়টা আসলে স্ব স্ব পিতৃদেবের দায়িত্ব-কর্তব্য এবং চিন্তার আওতায় পড়ে। তাই এটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামানোর কিছু নেই। দুই বন্ধু রাশেদ ও রাসেল এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই লাইভ টক শো উপভোগ করছিল।
প্রম বর্ষের শিক্ষার্থী বলে তাদের জন্য কোন বসার সিট বরাদ্দ ছিলনা। অন্যদের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করতে করতে তারা শায়লা আপুর নাটকটা দেখছিল। শায়লাদের বাড়ি ওদের পাশের গ্রামেই। ভর্তি হবার দিন হাত নেড়ে নেড়ে হেসে হেসে বলেছিল
-দ্যাখ, আমাদের কি ভাগ্য ! এক এলাকার মানুষ এক জায়গাতেই আসলাম !
রাসেল বলল
-তোর মনে আছে দোস্ত, আমাদের শামসুদ্দিন স্যার এই উপন্যাসটা কত সুন্দর
করে পড়াত ?
-নাটকটা দেইখা মনে হইল। স্যার বোধহয় আর বাঁচব না।
অন্য সময় হলে হয়তো রাসেল দুষ্টুমি করে বলত “মরুক না ! আশি বছর বাঁচছে আর কত বাঁচতে চায় ?” রাশেদের এইধরনের ফাজলামো মোটেই পছন্দ না। কাজেই দুজনে পারস্পরিক জ্ঞান আদান-প্রদানে ব্যাস্ত হতো। কিন্তু আজ রাসেলকিছুই বলল না। একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলল “চল চা খাইয়া আসি।”
অন্ধকার রাস্তায় নেমে রাশেদ বলতে লাগল
-দোস্ত, ছিনাতাইকারী ধরব না তো ?
-ধরলে মাইর শুরু করবি।
-তোর যা বডি, তুই করবি মাইর………!! হা…….হা……..
-তাইলে তুই তো আছসই; এফডিসির নায়ক “বডি বিল্ডার খান”। তুই ঢিসুম
ঢিসুম কইরা আমারে বাঁচাবি !
এ পর্যায়ে খুনসুটি রুপ নেয় হাসাহাসিতে। কথার বানে একে অপরকে ঘায়েল
করে হেসে লুটিয়ে পড়তে থাকে রাস্তায়। রাসেল বলে
-এত হাসিস না, লোকজন নেশাখোর ভেবে পিটুনি দেবে !
বন্ধুত্ব কমিয়ে দেয় পথের দুরত্ব। ধীরে ধীরে ক্যাম্পাস এলাকা পার হয়ে দুই বন্ধু শহরে ঢুকে পড়ে। কিছুদিন আগে তারা একটি ছাপড়া হোটেল আবি¯‥ার করেছে যার চা খুবই সুস্বাদু। রাত-বিরোতে আসলেও সমস্যা নেই। কারন হোটেল সারারাত খোলা থাকে। রাস্তায় এখনো গাড়ি-ঘোড়ার ভিড়। দু বন্ধু ঘেমে নেয়ে উঠেছে। রাস্তাটি সামনে যে জায়গাটিতে বাঁক নিয়েছে সেখানেই একটি চমৎকার দোতলা বাড়ির সামনে দাঁড়াল দুজন। বাড়িটেতে এখন কেউ থাকে না। দরজা তালাবদ্ধ। দেখে মনে হচ্ছে কোন হরর মুভির শুটিংয়ের জন্য আদর্শ স্থান। দোতলায় বামপাশে লতিকাসজ্জিত ব্যালকনিসহ একটি কক্ষ। শায়লা আপুর
প্রেমিকটি যখন স্বামী হল তখন এই রুমে দাঁড়িয়েই হয়ত ঘোষণা করেছিল আর অভিনয় করা যাবেনা। শায়লা আপুর ক্ষতবিক্ষত লাশটিও এই রুমেই পাওয়া যায়। রাশেদ বলে
-শায়লা আপুর হাজবেন্ড তো ছাড়া পাইয়া যাইব তাই না রে ?
রাসেল কিছু না বলে আকাশের দিকে তাকায়। ওর বুকটা যেন কেমন করে উঠে।

ব্রাহ্মমুহূর্ত-বইটিতে প্রকাশিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *