এইসব গোলাপের দিন ৩

১৭.
তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেচা নামে-/ বাবলার গলির অন্ধকারে/
অশথের জানালার ফাঁকে/ কোথায় লুকায় আপনাকে!
– জীবনানন্দ দাশ

বন্ধুটি ভুল বলেছে। আমার স্ত্রী দেখছি বিয়েতে আসে নি। বন্ধুটির বউয়ের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম
– তোমার সাথে বলে জিনিয়া ছিল একটু আগে?
বন্ধুটির বউকে আমি তুমি করে বলি এবং নাম ধরে ডাকি। সে আমার ক্লাসমেট ছিল। ভার্সিটিতে। সে হেসে ভেঙে পড়ে বলল যে
– কি যে কও না। তোমার ওয়াইফতো গাইবান্ধা গেছে।
– না সাজ্জাদ কইল যে।
– আরে ও তো মাল টাল খেয়ে বাদ হয়ে রইছে।

১৭.
তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেচা নামে-/ বাবলার গলির অন্ধকারে/
অশথের জানালার ফাঁকে/ কোথায় লুকায় আপনাকে!
– জীবনানন্দ দাশ

বন্ধুটি ভুল বলেছে। আমার স্ত্রী দেখছি বিয়েতে আসে নি। বন্ধুটির বউয়ের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম
– তোমার সাথে বলে জিনিয়া ছিল একটু আগে?
বন্ধুটির বউকে আমি তুমি করে বলি এবং নাম ধরে ডাকি। সে আমার ক্লাসমেট ছিল। ভার্সিটিতে। সে হেসে ভেঙে পড়ে বলল যে
– কি যে কও না। তোমার ওয়াইফতো গাইবান্ধা গেছে।
– না সাজ্জাদ কইল যে।
– আরে ও তো মাল টাল খেয়ে বাদ হয়ে রইছে।
বন্ধুটির বউ আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে ঐ রুমটাতে ঢুকল, যেটাতে সবাই ড্রিংক করছে। ঘরটির বাতাসে উগ্রতা। অ্যালকোহল আর তামাকের গন্ধ। বন্ধুটির বউ বলল
– তুমি কেমন আছো?
– খুব ভাল।
সে অরেন্জ জুস খাচ্ছে। কমলার ঘ্রাণ ঘুরঘুর করছে আশপাশে। কিন্তু উগ্র গন্ধটা কাটছে না। আমি বললাম
– তুমি একটু মোটা মোটা হয়ে গেছ।
– তা-ই, না?
– ফিগারের গিটগুলা আগের মত নাই।
– গ্লাসটা মাথায় ভাংব বুঝছ।
সে কিরকম করে হাসে। ভার্সিটিতে অন্যভাবে হাসত। হাসির শব্দটি কেমন যান্ত্রিক। আমার দুঃখ হচ্ছিল। মনসুর সাহেবের জন্যেও কেমন মন খারাপ লাগছিল। কিন্তু তারপরো আমি হাসছিলাম। বন্ধুর বউটি আরো দুজনকে জোগাড় করেছে আমাদের পাশে। তাদের একজন নারী একজন পুরুষ। স্বামী স্ত্রী তারা। একজনের হাতে বিয়ারের ক্যান আরেকজনের হাতে সিগারেট। অন্ধকারে আমি চিনতে পারি না এরা কারা। তারপরো বলি যে
– তারপর ভাল আছেন আপনারা।
তারাও উত্তর দেয়।
– জ্বি জ্বি । আপনি ভাল তো।
আরো লোক জমা হয়। আমরা হাসতে থাকি। আমি তাদের চেহারাগুলো চেনার চেষ্টা করি। আমার বিরক্তিবোধ হয়। আমি দূরে গিয়ে একটা বেন্চিতে বসে পড়ি। এক পুরাতন বন্ধু এসে বলে,
– দোস্ত কি খাবি বল।
– টাকা পয়সা নাই বেশী।
– এভরিথিং ইজ অন দি হাউজ।
আমার ক্লান্তি হয়। যেন ভেঙে ভেঙে যাই। বলি যে
– আমাকে দুটা ভদকা দে। স্মির্ণ অফ।
চারপাশে সবাই চিৎকার করতে থাকে।

১৮.

সমস্ত মৃত নক্ষত্ররা কাল জেগে উঠেছিলো- আকাশে এক তিল ফাঁক ছিল না
-জীবনানন্দ দাশ

সবকিছু জলের মত যার গোপন থেকে লোকেদের হাসির শব্দ আসে। জিগেশ করছে সবাই যে আমি ঠিক মত বাসায় যেতে পারব কি না। খুব ঘুরছে সবকিছু। ঘুর্ণায়মানের ভেতর আমি ভাসছি। আর লোকজন খুব হাসছে, দুজন ধরে রেখেছে, আর একজন বলছে হালার খাইতে বইলে হিসাব থাহে না। আমি একা একা পারব যেতে, না না অসুবিধা নেই, আপনারা বাসায় যান, আমার বাসা বেশী দুর না, আরে ধুউর মিয়া আপনারা আমারে নিয়া অত চিন্তা কইরেন্না, আ আ, হ্যা হ্যা, ওকে ওকে, দেখা হবে। এই রাতেও একটা কোকিল ডাকছে কই জানি। আহারে কোকিলটা, কোকিলটা। আমি রাতের রাস্তায় কোকিলটাকে খুঁজতে থাকি।

১৯.
রাগী লোকেরা কবিতা লিখতে পারে না / তারা বড্ড চেঁচায়
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

শরীর খারাপ। বাজে একটা হ্যাংওভার। গতরাতে বেশী খেয়েছি। মাতাল হয়ে গিয়েছিলাম। বাসায় কিভাবে ফিরলাম কে জানে।
ফাঁকা লাগছে বাসাটা । বারান্দায় এসে দাড়ালাম। এই সকালটা খুব সুন্দর। স্ত্রী বলেন যে শরীর খারাপ থাকলে আশপাশের পৃথিবীর সৌন্দর্যে কিছু যায় আসে না। কথাটা ভুল। ফাগুন মাসের সকাল। সোনালী বিরহী রোদ। বাতাসেও বিরহ। আমারও লাগে একটু কেমন কেমন। একটা বিরহের ভাব হয়। যেন আমি খুব একা। মোবাইলটা নিলাম। কেউ, ভাল হত কল দিলে।
তাই কল আসা শুরু হয়। আমি ধরে বলি যে
– হ্যালো
– হ্যালো হ্যা দোস্ত আমি সাজ্জাদ
– সাজ্জাদ আপনি কেমন আছেন?
– আপনে আপনে কেন করতেশো? রাতের নেশা কাটে নাই?
– সরি। সাজ্জাদ তুই আসোস কেমন?
– আছি তো ভালই। তুই ব্যাটা… কালকে একটা সিন করলি।
– কি করশিলাম কিছু তো খেয়াল নাই।
– নেভার মাইন্ড ব্রো। অনুষ্ঠান উৎসব তো এসবের জন্যেই। গেটিং আউট অফ আউয়ার শেল। তো আমি ফোন দিশিলাম এজন্যেই যে তুই কেমন আশিশ।
– তোকে ধন্যবাদ।
আমি ফোন রেখে দিতেই আবার ফোন আসে। তাই ধরি। উৎফুল্ল গলায় বলি
– হ্যালো হ্যালো কে বলছেন গো প্লিজ?
– বাব্বাহ । তোমার গলায় মধু ঝরছে। ঘটনা কি? কার ফোন এক্সপেক্ট করতেসিলা?
স্ত্রী ফোন করেছেন। আমি বললাম
– তুমি কি করছ?
– আমার কথা বাদ দাও। সাজ্জাদের বউ আমাকে ফোন দিসিল। তুমি বলে মাতলামি করস গতকাল বিয়েতে গিয়ে?
– আই এম আউট অফ কন্ট্রোল বেইবি।
– মনসুর ভাইয়ের কাজকর্ম সব শেষ। আমি খুব টায়ার্ড। একদিন রেস্ট নিয়ে ফিরব। এসব তথ্য তোমাকে দেয়ার কোন মানে হয় না যদিও। আমি কখন আসি , কই যাই তোমার তো যায় আসে না।
– আমার এমনিতেই মাথা ধরেছে। আরো বাড়ায় দিও না। ফোন রাখলাম।
আমি লাইন কেটে দেই। সাথে সাথে আবার রিং হয়।
– হ্যালো ? হ্যালো ? কে ?
– আরে শান্ত হউন। আমি মনসুর। আপনার কি অবস্থা?
– ভাল ভাল খুব ভাল।
– বেশী করে লেবুর সরবত খান। হ্যাংওভারে উপকার পাবেন।
– লেবু তো নাই বাসায় ভাই।
– ছাদে চলে যান। আমার নিজের হাতে লাগানো গাছ আছে। লেবু পেয়ে যাবেন।
লাইন কেটে গেল। আবার বাজছে। এখন আমি বিরক্ত হচ্ছি। বারান্দার মেঝেতে আমি মোবাইলটা আছাড় মারলাম।

২০.

তবে কেন ঘন্টায় ষাট মাইল স্পিডে ছুটে যাওয়া একটি মেয়ের এক পলক মুখ দেখে এমন প্রেমে পড়ি যে সাতদিন আহারে রুচি থাকে না?
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ছাদে উঠতে উঠতে ভাবছিলাম আজকাল আমি বেশ ইমোশানাল লোক হয়ে গেছি। অল্পতেই আবেগাচ্ছন্ন হই। কান্না আসে। রাগ হয়। এই যে স্ত্রীর সাথে কথা বলছিলাম, এখন কেমন দুঃখ দুঃখ করছে। আবার মনসুর সাহেব আমার জন্যে লেবুগাছ লাগিয়েছেন ছাদে ভেবেও খুব মায়া হচ্ছে। গতমাসে চাকরীটা গেল। তারপর থেকে এসব বেড়েছে। অল্পতেই কাতরবোধ করি।
আমি লেকচারার ছিলাম। একটা প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে। বেতন দিত পঁচিশহাজার টাকা। খুব মোটা , লম্বা , গলায় ডার্কব্লু টাই পড়া একটা লোক আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন যে,
– আপনাকে আমরা এখানে আর রাখতে পারব না।
আমি খুব অবাক হলাম। জিগেশ করলাম,
– কেন স্যার?
স্যারটি বললেন
– না বলে আপনাকে উপায় নেই, তাই বলছি। আপনার মাথায় সমস্যা আছে। আগে আপনার চিকিৎসা দরকার। তারপর চাকরী বাকরী করবেন।
– আমার মাথা ঠিক আছে স্যার।
– তাহলে তো ভালই। আমরা অবশ্য সেরকম মনে করি না। আর সেকেন্ড কথা হল আপনার কিছু ড্রাগ এডিকশনের কথাও আমি শুনসি। ছাত্রদের ভেতরও এসব কথা প্রচলিত। এরকম একজন লোককে এই মেডিকেল কলেজের সাথে জড়িত রাখা…. আপনে বোঝেন তো।
ছাদে খুব রোদ। পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। আমি লেবু গাছ খুজছি। কিভাবে লেবুগাছ খুঁজতে হয় আমার জানা নেই। আমার কান্না কান্না পায়।

২১.
দাঁতের ডাক্তার আমার পায়ে ঘা করে দিয়েছিল বলে আমি আর কখনও সে শুয়োরের বাচ্চা জীবাণুসমন্বয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাই নি
– সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

– ঘুম থেকে কখন উঠলেন?
দেখলাম যে নার্স। তিনি রোদে ঝিকমিক করছেন। চুলে, ওড়নায় বাতাস। আর তার কচি সবুজ রঙের কামিজ। নার্সটিকে আমার একটি লেবু গাছের মত লাগলো। সে হাত বাড়ায়। দেখি তার হাতে লেবু। বলল যে
– লেবু গাছ দেখে লেবু পেরে ফেললাম কয়েকটা। কার না কার গাছ এখন ভয় ভয় করছে। আমি তো আর এই ফ্ল্যাটের লোক না। আপনি একটু রাখেন তো এগুলো।
নার্সতির মত আমারো সামান্য ভয় করল। আমি লেবুগুলো নিলাম। বললাম থ্যাংকিউ। নার্সটি উত্তরে হাসল। মুচড়ে মুচড়ে।
আমার কাছে জীবনটাকে মনে হল, একটা একা একা বেন্চিতে বসে কারও সাথে আড্ডা দেওয়া। নার্স পানে আমি চেয়ে দেখি। আমাদের চারপাশে খুব লেবুর ঘ্রাণ। এসব কারণে আমি বলি যে,
– আপনাকে বেশ সুন্দর লাগছে।
নার্সটি তাই উদাস হল। হুহু করে বসন্তের বাতাস যায়। বাতাসে লেবু লেবু ভাব।

আগের পর্বগুলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *