আবদুস সালাম: এক সূর্যসন্তানের গল্প


দরিদ্র বাবার বড় সন্তান সালাম। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ার পর আর পড়ালেখা হয়ে উঠেনি। আছে ছোট আরো ছয় ভাইবোন, মা-বাবা। এদের দায়িত্বও তার ঘাড়ে। জীবিকার সন্ধানে ফেনী থেকে ঢাকায় এলো সালাম। কোনোরকমে ছোটখাটো একটা চাকরিও জুটালো সে। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে পিয়নের পদে। পরিবারের দারিদ্রতা এবার কিছুটা হলেও ঘুচবে। নীলক্ষেতে ব্যারাকে থাকার ব্যবস্থা হল তার।



দরিদ্র বাবার বড় সন্তান সালাম। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ার পর আর পড়ালেখা হয়ে উঠেনি। আছে ছোট আরো ছয় ভাইবোন, মা-বাবা। এদের দায়িত্বও তার ঘাড়ে। জীবিকার সন্ধানে ফেনী থেকে ঢাকায় এলো সালাম। কোনোরকমে ছোটখাটো একটা চাকরিও জুটালো সে। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ বিভাগে পিয়নের পদে। পরিবারের দারিদ্রতা এবার কিছুটা হলেও ঘুচবে। নীলক্ষেতে ব্যারাকে থাকার ব্যবস্থা হল তার।

সারাদিনের কাজ শেষে রাতে ব্যারাকে এসে বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলতে বসে অনেক ব্যাপার নিয়ে আলোচনা আড্ডা হয়। পরিবার, ভবিষ্যত, স্বপ্ন আরো কত কি! তবে কয়েকদিন ধরে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু একটা ব্যাপার নিয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে।

‘৪৮এ জিন্নাহ বলেছিল এদেশের মানুষকে নাকি উর্দুতে কথা বলতে হবে, পড়ালেখা হবে উর্দুতে! ঢাকার ছাত্ররা তখনই প্রতিবাদ করেছিল। তারপর অনেকদিন ব্যাপারটা ভিতরে ভিতরেই ছিল। মন্ত্রী এমএলএ-রা আলোচনা, কথাবার্তা বলেছে এব্যাপারে। কিন্তু ২৭ তারিখে খাজা নাজিমুদ্দিন এসে আবার বলেছে, দেশের ভাষা নাকি পাকাপাকি ভাবে উর্দুই হচ্ছে!

“আজীবন বাংলায় কথা বলে এসেছি, এখন নাকি উর্দু আওড়াতে হবে! শালা বললেই হলো তো!” মনে মনে বলে সালাম।
২৯-৩০ তারিখ ছাত্ররা এই ঘোষণার প্রতিবাদে হরতাল পালন করে। ৪ তারিখে প্রতিবাদী ছাত্ররা সভা করে। সভায় সিদ্ধান্ত হয় ২১ তারিখ আবার সমাবেশ হবে এবং হরতাল পালন করা হবে।
সালাম লোকমুখে এসব কথা শুনতে পায়, ব্যারাকের বন্ধুদের সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা করে। সিদ্ধান্ত নেয় ২১ তারিখের সমাবেশে সে ও যাবে।

২০ তারিখে সকাল সকাল কাজে এসে সালাম খবর পায় সরকার আগামীকাল থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে। সব ধরণের সভা-সমাবেশ, মিছিল-মিটিং বন্ধ! মানে কালকের আন্দোলন ব্যর্থ করার জন্য সরকার এটা করেছে!
রাতে ব্যারাকে এসে ভাবতে থাকে কালকে যাবে কিনা।
শালারা বলে উর্দু ছাড়া নাকি কথা বলা যাবে না!
মাকে কি সে আম্মিজান বলে ডাকবে?!!! কি বিচ্ছিরি ভাষা! এ ভাষায় নাকি কথা বলতে হবে! ভাবতেই রক্তগরম হয়ে যায়! নাহ্, কালকে সে যাবেই।

২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২।
আজ আর কাজে যায় না সালাম। ঘুম থেকে উঠে নয়টার সময় হাঁটতে হাঁটতে সে ঢাবি’র প্রাঙ্গনের দিকে যায়। শত শত ছাত্র জড়ো হয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে স্লোগান দিচ্ছে অনেকে!
‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’, ‘রাজবন্দীদের মুক্তি চাই’, ‘সর্বস্তরে বাংলা চালু কর’।
সালামও গলা মিলাচ্ছে তাদের সঙ্গে। কিছুক্ষণ পর ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পুলিশের প্রতিবন্ধকতা ভেঙ্গে, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় নামা শুরু করে। পুলিশ তাদেরকে বাঁধা দিয়েও ধরে রাখতে পারে না। হঠাৎ পুলিশ ছাত্রদের উপর কাঁদানেগ্যাস ছুঁড়তে থাকে এবং গ্রেফতার করতে থাকে। ছাত্ররা কাঁদানেগ্যাসের তীব্রতায় ছুটে পালাতে থাকে। এতে আন্দোলন ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও ছাত্রদের ক্ষুদ্ধতা আরো বেড়ে গিয়েছে!
সালাম কি করবে বুঝতে পারছে না। সে ও অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে নিরাপদে আশ্রয় নেয়।

বেলা দুইটার দিকে ছাত্ররা আবার জড়ো হতে শুরু করে। পরিস্থিতি থমথমে। এমএলএ রা গাড়ি নিয়ে আইনসভায় আসতে থাকে। ছাত্ররা প্রথমে এমএলএ দের গাড়ি আটকানোর চেষ্টা করে। পরে তিনটার দিকে তারা মিছিল করতে করতে আইনসভার দিকে এগোতে থাকে।
সালাম মিছিলের সামনের দিকে আছে। হাতে একটা প্ল্যাকার্ড নিয়েছে সে। স্লোগান দিচ্ছে। পুলিশ আবার ছাত্রদের উপর হামলে পড়ে। এবার আর কাঁদানেগ্যাস নয় এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে।

কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা গুলি এসে লাগে সালামের পেটে। টলতে টলতে পড়ে যায় রাস্তায়। রক্তে ভিজে যায় শার্ট, লাল হয়ে যায় কালো রাস্তা। কয়েকজন তাকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়।

সালামের ম্যাচের কাজের বুয়ার ছেলে তেজগাঁ নাবিস্কুতে কর্মরত সালামের ভাতিজা মকবুল আহম্মদ ধনা মিয়াকে জানান তার চাচা সালাম গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মকবুল ছুটে যান সালামের আরেক জেঠাতো ভাই হাবিব উল্যাহর কাছে। তারা দু’জনে মিলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে দেখেন, পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে সালাম সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মেডিক্যালের বারান্দায় পড়ে আছেন!

তারা ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় টেলিগ্রামে সালামের বাবা ফাজিল মিয়াকে সালামের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি জানান। ফাজিল মিয়া তার অন্য এক ছেলেকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যালে ছুটে আসেন। পর দিন সকাল ৯টার দিকে বেশ কিছু ছাত্র সালামের যথাযথ চিকিৎসা না করার অভিযোগে হাসপাতালে বেশ কিছুক্ষণ হট্টগোল করেন। কেউ সাড়া দেয়নি তাদের চিৎকারে। সালামকে বারান্দাতেই ফেলে রাখা হয়। মকবুল ও হাবিব উল্যাহ হাসপাতালে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকলেও সংজ্ঞাহীন সালামের পাশ থেকে তার বাবা কোথাও আর যাননি। ২৫ ফেব্রুয়ারী বেলা সাড়ে ১১টা।
বাবার উপস্থিতিতে হাসপাতালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আবদুস সালাম। ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টার দিকে সালামের লাশ ঢাকাস্থ আজিমপুর গোরস্থানে নেওয়া হয়। সেখানে সালামের বাবা ফাজিল মিয়া, ভাতিজা মকবুল, জেঠাতো ভাই হাবিব উল্লাহসহ শত শত ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে সালামের জানাজা শেষে দাফন করা হয়।

ঢাকার আজিমপুর এই পুরানো কবরস্থানের হাজারো কবরে ভীড়ে মহান ভাষা শহীদ আবদুস সালাম চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন যার কবরের চিহ্ন সংরক্ষন করা সম্ভব হয়নি তৎকালিন পাকিস্তানী শাসকদের কারণে।

সালামের মত এমন আরো শহীদের রক্তে অর্জিত হয়েছে আমাদের মাতৃভাষা। আমরা হয়তো জানিনা তাদের সবার কথা। হয়তো আমরা যে কয়জন ভাষাশহীদের কথা জানি শহীদ হয়েছে তার চেয়ে বেশি। মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে যে দেশের মানুষ। সেই দেশের মানুষই এখন তাদের রক্তে কেনা ভাষাকে করে ফেলছে মিশ্র ভাষা। কথায় কথায় ইংলিশ না ঢুকালে আমাদের ‘স্মার্টনেস’ থাকেনা! বাক্যের পাঁচটা শব্দের মধ্যে তিনটা ইংরেজি শব্দ না ঢুকালে আমাদের ‘কুলনেস’ থাকে না!
এত এত বাংলা কিবোর্ড থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনো বাংলিশ লিখি।

এই মাতৃভাষা আমাদের জন্য কত গর্বের বিষয়! ভাষার জন্য বাঙালীর ত্যাগ সারা বিশ্ব স্মরণ করে, সম্মান করে। সিয়েরা লিওন বাংলাকে করেছে তাদের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা।
আর আমরা নিজেরাই শিখিনি এই ভাষার সম্মান দিতে! আফসোস!

১ thought on “আবদুস সালাম: এক সূর্যসন্তানের গল্প

  1. তব চরনে নত মাথা।যতদিন
    তব চরনে নত মাথা।যতদিন বাংলাভাষা থাকবে,সালাম তোমার নাম মনে রবে ততদিন। ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে সকল ভাষাসৈনিকের নাম।সেই অকুতোভয় ভাষাসৈনিক দের জানাই সালাম…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *