বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারা থেকে মুক্তি | চ্যাং চুন-চিয়াও

কমরেড চ্যাং চুন-চিয়াও (chang chun-chiao, মান্দারিনে Zhang Chunqiao) এ প্রবন্ধটি লেখেন ১৯৫৮ সালে। চীনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আমলে কমরেড চিয়াও পার্টির নেতৃত্বসারিতে উঠে আসেন। তিনি ছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, তাত্ত্বিক, সাংবাদিক ও লেখক। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া ভাবধারা থেকে সমাজকে মুক্ত করার যে সংগ্রাম ঘোষিত হয়, তিনি ছিলেন তার অগ্রগামী এক সেনা।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কালে বুর্জোয়া প্রবণতা দ্বারা চালিত পার্টি কমরেডরা অনেকেই বাড়তি সুযোগ সুবিধা ভোগ বা তার চেষ্টার দায়ে স্থানীয় জনগণ দ্বারা দোষী সাব্যস্ত হন এবং শাস্তিপ্রাপ্ত হন ও পুনর্গঠনের আওতায় যান। চেয়ারম্যান মাও সেতুঙের মৃত্যুর পর বুর্জোয়া পথগামীরা তেঙ শিয়াও পেঙের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং সামরিক ক্যুর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। এ সময় তারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দানকারী চার শীর্ষ নেতাকে বন্দি করে।

১৯৭৬ সালের অক্টোবরে গ্রেপ্তার হওয়ার পর চ্যাংকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু দেশবাসীর সমর্থন বিবেচনা করে সে দণ্ড রহিত করা হয়। ১৯৯৮ সালে তিনি জেল থেকে চিকিৎসার জন্য মুক্তি পান। বাস্তবে সেই চিকিৎসাও ছিল সেনা শাসকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ২০০৫ সালের এপ্রিলে কমরেড চিয়াও মৃত্যুবরণ করেন। চিকিৎসকরা তার ক্যান্সারের খবর জানিয়েছিল। কমরেড চ্যাং চুন-চিয়াওয়ের আলোচ্য লেখাটি সর্বহারাপথ.কম থেকে নেয়া হয়েছে।

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও চীন বিপ্লবের ইতিহাস সম্পর্কে যে কারো প্রাথমিক ধারণা আছে তারা সবাই জানেন যে, সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে, অফিসার ও অধঃস্তনদের মধ্যে এবং উচ্চতর স্তর ও নিম্নতর স্তরের মধ্যে সমতা, জনসাধারণের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে সম্পর্ক রক্ষা (Handling)র ক্ষেত্রে সর্বদাই মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন চীনা গণমুক্তি ফৌজ এবং বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাগুলোতে শ্রমিক ও কৃষকদের সৈন্যবাহিনীর অস্তিত্ব থেকে অষ্টম রুট বাহিনী, নয়া চতুর্থ বাহিনী ও পিএলএর জন্ম পর্যন্ত এবং চিঙকাংশান থেকে মুক্ত এলাকাগুলো পর্যন্ত সকল বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাগুলো এই নীতি সর্বদাই দেখেছে। কমরেড মাও সেতুঙের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে চিঙকাঙশানের বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকায় এই নীতি প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

সিসিপি কেন্দ্রিয় কমিটির প্রতি রিপোর্টে (“চিংকাঙশানে সংগ্রাম”) কমরেড মাও সেতুঙ লেখেনঃ
“লাল ফৌজের সৈন্যদের অধিকাংশই এসেছে বেতন ভোগী সৈন্যবাহিনী থেকে, কিন্তু লাল ফৌজে এসে এদের চরিত্র বদলেছে। সর্বাগ্রে লাল ফৌজ বেতন দেওয়ার প্রথার বিলোপ ঘটিয়েছে এই অনুভূতি জাগিয়ে যে, তারা নিজেদের জন্য ও জনসাধারণের জন্য সংগ্রাম করছে, অন্য কারো জন্য নয়। তখন থেকে লাল ফৌজে নিয়মিত বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা নেই বরং শস্য, রান্নাবান্নার তেল, লবণ, জ্বালানী কাঠের জন্য টাকা ও শাক শব্জি এবং সামান্য পকেট খরচ ইস্যু করা হয়…”

“হুনান প্রাদেশিক কমিটি সৈনিকদের বৈষয়িক অবস্থার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং একজন গড়পরতা শ্রমিক অথবা কৃষকের চেয়ে অন্তত কিছুটা ভাল করার আহ্বাণ জানায়। প্রকৃতপক্ষে তা আরও খারাপ। শস্যের সাথে সাথে প্রত্যেকে রান্না করার তেল, লবণ, জ্বালানী কাঠ ও শাকশব্জীর জন্য পাঁচ সেন্ট এক দিনের জন্য পায়, আর এমনকি এটাও বজায় রাখা কঠিন। অত্যধিক শীতেও আমাদের অনেক সৈনিকই এখনও কেবল দুই স্তরের পাতলা পোশাক পরছেন। সৌভাগ্যবশত আমরা কঠোর জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তার চেয়ে বেশী, আমাদের সকলে একই কঠোর জীবন যাপনের অংশীদার; কমান্ডার থেকে শুরু করে সকলে শস্যের পাশাপাশি রান্নার জন্য পাঁচ সেন্টের খাদ্য ভাতা পান।”

“পার্টির পালিত ভূমিকার পাশাপাশি যে কারণে লাল ফৌজ দরিদ্র বৈষয়িক অবস্থা এবং ঘন ঘন এমন গণতন্ত্রের অনুশীলন সত্ত্বেও এগিয়ে যেতে পেরেছে তা হল অফিসাররা সৈনিকদের প্রহার করেনা; অফিসার ও সৈন্যরা সমান ব্যবহার পান; সৈন্যরা মুক্তভাবে সভা করতে ও কথা বলতে পারেন; তুচ্ছ আনুষ্ঠানিকতা বিলোপ করা হয়েছে; এবং হিসাব সবার কাছে উন্মুক্ত খতিয়ে দেখার জন্য। সৈন্যরা মেস ব্যবস্থা পরিচালনা করে এবং রান্না বান্নার তেল, লবণ, জ্বালানী কাঠ ও শাক শব্জির জন্য দৈনিক বরাদ্দ পাঁচ সেন্টের মধ্যে প্রত্যেকে প্রতিদিন প্রায় ছয় থেকে সাত পয়সা বাঁচিয়ে ফেলতে পারে পকেট খরচার জন্য যাকে বলে “মেস সঞ্চয়’। এসকলই সৈন্যদের বিরাট তুষ্টি প্রদান করে। নির্দিষ্টভাবে নতুন বন্দী সৈন্যরা অনুভব করে যে আমাদের বাহিনী আর কুও মিনতাঙ বাহিনীর মধ্যে বিরাট ব্যবধান। তারা আত্মিকভাবে মুক্ত মনে করে যদিও লাল ফৌজের বৈষয়িক অবস্থা শ্বেত ফৌজের সমান নয়। শ্বেত বাহিনীতে গতকাল যেসকল সৈনিকের কোন সাহস ছিলনা আজকে লাল ফৌজে তারা খুব সাহসী; গণতন্ত্রের ফলাফল হচ্ছে এমনই। লাল ফৌজ হচ্ছে সেই চুল্লী যাতে সকল বন্দী সৈনিকেরা রূপান্তরিত হয় যখনই তারা আসে। চীনে জনসাধারণের যতখানি দরকার ঠিক ততখানিই সৈন্যবাহিনীরও গণতন্ত্র দরকার। সামন্ততান্ত্রিক ভাঁড়াটে সৈন্যদলকে খাঁটো করতে আমাদের সৈন্যবাহিনীতে গণতন্ত্র হচ্ছে একটা অস্ত্র।”

আমরা যেমনটা জানি, এইসব মার্কসবাদী-লেনিনবাদী ও কমিউনিস্ট সম্পর্কসমূহ বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকায় সম্পর্কের একটা উদাহারণ স্থাপন করে। সমতার এই কমরেডসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখা হয়েছে সৈন্যবাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে, সৈন্যবাহিনী ও সরকারের মধ্যে, ক্যাডারদের মধ্যে, এবং উচ্চতর স্তর ও নিম্নতর স্তরসমূহের মধ্যে। তারা সম্পর্ক পরিচালনা করেছে অস্ত্র ও ক্ষমতার বলে নয়; বরং বোঝানো ও সত্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার মাধ্যমে। গণমুক্তি বাহিনীর মতো বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকার জনগণও একে অপরের সাথে সম্পর্ক পরিচালনা করেছে। অন্য এলাকার থেকে আসা জনগণ মুক্ত এলাকাসমূহে আসা মাত্র খুঁজে পায় যে, অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক যথাযথভাবে পরিচালনা করার মাধ্যমে মুক্ত এলাকাসমূহের সকল জনগণ কঠিন জীবন যাপন করার পাশাপাশি “সৌভাগ্যত একই কঠোর জীবন যাপনের অংশীদার হয়েছিল”।

সকলে এক সরবরাহ প্রথায় জীবন যাপন করছিল যা ছিল কমিউনিস্ট চরিত্রের। যদিও কাজের প্রয়োজনীয়তার কারণে জীবন যাপন মানে বিভিন্নতা ছিল কিন্তু পার্থক্য ব্যাপক ছিল না। রাজনীতি ও গণলাইন সর্বত্র কর্তৃত্ব করেছে, এই কারণে শ্রমিক, কৃষক, সৈনিক, ছাত্র ও ব্যবসায়ীরা একই পরিবারের সদস্যদের মতো ঐক্যবদ্ধ ছিল; তারা শত্রুর বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই চালিয়েছে। আপনাদের কি এখনো মনে আছে বৃহৎ সৈন্যবাহিনীর সৈনিকেরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কীভাবে লড়াই করেছে? গণমুক্তি বাহিনীকে সমর্থন করতে লক্ষ লক্ষ মিলিশিয়া সদস্য সৈন্যবাহিনীকে অনুসরণ করে দক্ষিণে তাদের অগ্রগমণে। সৈন্যবাহিনীর মতো একই সামরিক কমিউনিজমের জীবন তারা যাপন করে। তারা কর্তৃপক্ষ অথবা ধনী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। মজুরীর কোন ভাবধারা, “টুকরো মজুরী” তো দূরের কথা, তাদের মনে আসেনি। বিপ্লবে তারা যোগদান করতে এসেছে নিজেদের খাদ্য সাথে করে নিয়ে এসে। তাদের লক্ষ্য ছিল তিন প্রধান শত্রুকে উচ্ছেদ করা আর সমগ্র দেশকে মুক্ত করা।

বিপ্লবী ঘাঁটি এলাকাসমূহে, পুরুষ ও নারীরা, প্রবীণ ও নবীনরা এবং অগ্রভাগ ও পশ্চাদভাগ একই অন্তকরণ নিয়ে লড়াকু দল গঠন করেছিল। সুসংহতভাবে এটা ছিল সামরিক কমিউনিজম যা মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তা ও কাজের পদ্ধতিকে চিহ্নিত করে। মাও সেতুঙের চিন্তা ও কাজের পদ্ধতি লক্ষকোটি জনের মধ্যে শিকড় গাঁড়ল, প্রস্ফুটিত হলো ও ফল দিল। কমিউনিজমের অস্ত্রে সজ্জিত আর যুদ্ধে পোড় খাওয়া সৈন্যবাহিনী ও জনগণ ছিল অপরাজেয়। চীনা বিপ্লবের ইতিহাস কি একে সম্পূর্ণভাবে জন্ম দেয়নি?

দেশব্যাপী মুক্তি অর্জনের পরেও, “সরবরাহ প্রথা”র দ্বারা চিহ্নিত সামরিক কমিউনিজমের এই জীবন ছিল খুবই জনপ্রিয়। “সরবরাহ প্রথা”য় সবাই গর্বিত হতো, কেননা এটা পুরোনো বিপ্লব ও কঠিন সংগ্রাম দ্বারা চিহ্নিত ছিল। কিছু বিপ্লবী তরুণও “সরবরাহ প্রথা” কামনা করেছিল যখন তারা প্রথম বিপ্লবে যোগ দেয়। তারা এটা দেখাতে চেয়েছিল যে, পুরোনো কমরেডদের মতো তারাও বিপ্লবে আন্তরিকভাবে অংশ নিয়েছে। সরবরাহ প্রথার জীবনে যারা অভ্যস্ত ছিল তারা মজুরী প্রথার প্রতি লোভ করেনি।

জীবনের এই প্রথা, যা সমতার সম্পর্ক প্রদর্শন করেছে, তা তাদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু অল্প কিছুকাল পরেই জীবনের এই প্রথা বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারার দ্বারা আক্রান্ত হল। বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারার শাঁস নিহিত রয়েছে অভিজাততন্ত্রে (Hierarchy)। বুর্জোয়া অধিকার-এর ভাবধারায় সিক্ত লোকজনের দৃষ্টিতে সরবরাহ প্রথা ছিল অনাকাঙ্খিত। তারা একে “গ্রামীণ কাজের স্টাইল” এবং “গেরিলা অভ্যাস” হিসেবে দেখেছে। বুর্জোয়াদের দ্বারা আনীত এমন বক্তব্যে আশ্চর্য কিছু ছিল না। কিন্তু শীঘ্রই বেশ কিছু পার্টি ক্যাডার এই ভাবধারার প্রভাবে পড়লো। তাদের মধ্যে শোনা গেল সরবরাহ প্রথার অধিক দোষত্রুটি ও সমালোচনা আর মজুরী প্রথার অধিক গুণাগুণ। এভাবে, “সরবরাহ প্রথা” প্রায় একটা খারাপ সূত্রে পরিণত হলো।

কাজে উৎসাহ উদ্দীপনার অভাবকে সরবরাহ প্রথার ওপর আরোপ করা হল। সরবরাহ প্রথার দোষত্রুটির ওপর একটা দাপ্তরিক খাম আরোপ করা হল। কারখানা ও গুদামের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক ক্ষতিকে আবারো সবররাহ প্রথার দোষত্রুটির ওপর আরোপ করা হল। এক কথায়, যে কমিউনিস্ট সরবরাহ প্রথা চীন বিপ্লবের বিজয় নিশ্চিত করেছিল তাকে কিছু লোক মারাত্মক আক্রমণাত্মক নিন্দা জানালো যাকে অতি অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে।

সরবরাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি হলো, এটা উৎপাদনে উৎসাহ উদ্দীপনা জাগাতে পারেনা। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি হচ্ছে অর্থনীতিবাদীদের দ্বারা জোর দেওয়া “বৈষয়িক স্বার্থের নীতিমালা”। বলা হচ্ছে যে, সামাজিক ব্যবস্থার অধীনে যেহেতু পুরোনো শ্রম বিভাজন এখনো অস্তিত্বমান, অর্থাৎ মানসিক ও শারিরীক শ্রমের মধ্যে, শ্রমিক ও কৃষকের মধ্যে এবং দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমের মধ্যে কিছু পার্থক্য যেহেতু এখনো বিরাজমান, শ্রমিকদের বৈষয়িক স্বার্থের মাধ্যমে উৎপাদন বিকাশের নীতিকে একটা চমৎকার নীতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, “মজুরী স্কেল” ও “টুকরো মজুরী” শ্রমিকদের উদ্দীপনা জাগাতে পারে তাদের শ্রমের ফলে সর্বাধিক স্বার্থ দেখাতে এবং “সমাজতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা”র উদ্দীপনা জাগায় কারণ উচ্চতর শ্রম উৎপাদনশীলতা উচ্চতর মজুরী দাবী করে। বলা হচ্ছে যে, এই প্রথা হচ্ছে “সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।” এই যুক্তি খুবই বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও জনপ্রিয় ভাষায় পুরোনো প্রবাদটির মতো সংক্ষেপিত “টাকায় কথা বলে”। যদি উচ্চ মজুরী ব্যবহার করা হয় “উদ্দীপনা” জাগাতে, তাহলে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমকে এক পিস্ চকোলেটের মতো কেনা যাবে। এমন একটা তত্ত্বের ব্যাপারে আমাদের কি বলার আছে?

যখন সরবরাহ প্রথা বলবৎ ছিল, লক্ষ কোটি জনগণ কয়েক দশক ধরে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়েছে, তুষারাবৃত পর্বতদেশে আরোহন করেছে, তৃণভুমি অতিক্রম করেছে এবং ২৫,০০০ লি লঙ মার্চ করেছে। সে সময় কেই-বা মজুরী নিয়েছে? এটা কি বলা যাবে যে জাপ-বিরোধী যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ এবং মার্কিনকে প্রতিরোধ কর ও কোরিয়াকে সাহায্য কর যুদ্ধে বিজয় মজুরীর উদ্দীপনায় হয়েছিল? প্রতিটি কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি অপমান বোধ করেন এমন যুক্তি শুনে। নির্মাণ কাজের কথা ধরুন। মূর্তভাবে শ্রমিকরাই, যারা উক্ত অর্থনীতিবাদীদের ভাষ্যমতে মজুরী স্তর নিয়ে সর্বাধিক উদ্বিগ্ন, মৌলিকভাবে বিপরীত মত প্রকাশ করেন।

সাংহাই শ্রমিকরা লড়াই করে, প্রস্ফুটিত করে এবং বিতর্ক করে “রাজনীতিকে কমান্ডার করার বদলে অর্থকে কমান্ডার করার” এই তত্ত্ব ও মানদন্ডের বক্তব্যের উন্মোচন করেন। এই কথাগুলি ষাড়ের চোখে আঘাত করে। অবশ্যই আমরা অস্বীকার করি না যে, কমিউনিজমের প্রাথমিক পর্যায়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ এখনো পুরোনো সমাজের অর্থনৈতিক, নৈতিক ও মতাদর্শিক চিহ্ন বহন করে যার ওপর এটা জন্ম নিয়েছিল, যেমনটা কার্ল মার্কস কর্তৃক “গোথা কর্মসূচির সমালোচনা”য় বিবৃত হয়েছে এবং “বুর্জোয়া অধিকার”-এর বৈষম্য একবারেই বিলোপ করা যায় না। আমরা স্বীকার করি যে, এই স্তরে আমরা কেবল দেখতে পারি “প্রত্যেকে দেবে সাধ্যমতো, প্রত্যেকে নেবে শ্রম অনুযায়ী” নীতি, “প্রত্যেকে দেবে সাধ্যমতো, প্রত্যেকে নেবে প্রয়োজনুযায়ী” নীতি নয়। কিন্তু মার্কস কি আমাদের একথা বলেছেন যে বুর্জোয়া অধিকার ও বৈষম্যের বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্রকে ধ্বংস করা যাবে না বরং সুসংহত করতে হবে ও বিকশিত করতে হবে? তিনি কি বলেননি যে “বৈষয়িক স্বার্থ”-র নীতিমালাকে কেবল আংশিকভাবে জোর দিতে হবে এবং কমিউনিস্ট শিক্ষাকে রাজনৈতিকভাবে, মতাদর্শিকভাবে ও নৈতিকভাবে প্রবল করতে হবে বুর্জোয়া অধিকারকে ভেঙে দিতে?

এটা অন্য কেউ নয় কেবল মার্কস নিজে এই প্রশ্নের উত্তর দেন। তাঁর “ফ্রান্সে শ্রেণী সংগ্রাম”- এ প্যারী কমিউনের অভিজ্ঞতার সার সংকলন করে তিনি প্যারী কমিউনের বীরদের গৃহীত ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন, “কমিউনের সদস্য থেকে নীচের দিকে পাবলিক সার্ভিসকে মেহনতীদের মজুরীতে কাজ করতে হয়েছে। সুদী কারবার ও রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থদের ভাতা উচ্চপদস্থদের সমেত বিলুপ্ত করা হয়েছিল।” ভালভাবে লক্ষ্য করুন, বিশ্বে সর্বহারা শ্রেণীর প্রথম কমিউনের গৃহীত বিপ্লবী প্রথা! প্যারী কমিউন সুনির্দিষ্টভাবে বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্র ধ্বংস করেছিল এবং বৈষয়িক স্বার্থের নীতির বিলোপ করেছিল। এটা কি বলা যায় যে, এই অভিজ্ঞতায় জোর দেওয়ার সময় মার্কস এবং পরে এঙ্গেলস ও লেনিন বুর্জোয়া অধিকারের কথা ভুলে গেছিলেন? এভাবে, মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিন সেইসব অর্থনীতিবাদীদের সেবায় নিয়োজিত হন না যারা বিশ্বাস করেন যে “টাকায় কথা বলে”।

বিপরীতে লেনিন আক্রমণাত্মকভাবে বলেন, “রাষ্ট্র ও বিপ্লব”-এ, “নির্দিষ্টভাবে এই মূর্ত বিষয়েই, রাষ্ট্রের সমস্যা নিয়ে যতদূর চিন্তা করা যায় তাতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্ভবত এই যে, মার্কসের চিন্তাকে সর্বাধিক পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।” এই অভিজ্ঞতার প্রতি দৃষ্টিপাতে, অনেক লোক একে “সেকেলে ও সরল” আখ্যা দেয়। যারা প্রকাশ্যে সরবরাহ প্রথার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয় ও টাকাকে কমান্ডে রাখতে চায়, তারা কি এও বলেনি যে সরবরাহ প্রথা হচ্ছে “গেরিলা স্টাইল” এবং “গ্রাম্য স্বভাব” এবং “সেকেলে”? তারাওকি মার্কসের শিক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যায়নি?

অতীতের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে “সরবরাহ প্রথা”, “গ্রামীণ স্টাইল” এবং “গেরিলা অভ্যাস”-এর ওপর আক্রমণ প্রকৃতপক্ষে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী ট্রাডিশনের ওপর এবং সমতার ভিত্তিতে শ্রমজীবি জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক যথাযথভাবে পরিচালনার কমিউনিস্ট নীতির ওপর আক্রমণ এবং প্রকৃতপক্ষে বৈষম্যের বুর্জোয়া অধিকারকে রক্ষার পরিকল্পনায় রচিত। সকল শোষক ও নিপীড়ক শ্রেণীসমূহ এক কঠিন অভিজাতন্ত্র রক্ষা করে। এই কল্পকাহিনী রচনা করতে দ্বিধা করে না যে, তারা “জন্মগতভাবে মানবজাতির প্রভু”।

চিয়াং কাইশেক নির্লজ্জভাবে দাবী করেছিল তার “চীনের নিয়তি”তে যে, সে ছিল ওয়েন ওয়াংয়ের বংশধর। একটা জীবনীচিত্র দাবী করে, সে হচ্ছে ওয়েন ওয়াংয়ের একজন পুত্র এবং ডিউক চৌ-এর বংশধর। শিয়াও লিন কুয়াং চি তে এই গল্প একটা স্থান দাবী করে কিন্তু এটা আরো দেখায় যে চিয়াং কাইশেক ও তার গং কতটা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিল নিজেদের “সর্বোচ্চ” চীনা হিসেবে দেখাতে। সাংহাই মুৎসুদ্দিরা “উচ্চশ্রেণী চীনা” হওয়াতে গর্ববোধ করতো। আহ কিউ বলেন যে, “আমি পুরোনো জনাব চাওয়ের সমগোত্রীয়” এবং জনাব চাও তার গালে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বলে, “তোমার বংশীয় নাম চাও হয় কিভাবে!”

প্রাচীনকালে সামাজিক প্রতিপত্তি ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রেণী ছিল সর্বাংশে গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু মালিকানা সত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত ছিল, যা ছিল “মালিকানা সত্ত্ব” তা ছিল বৈধ। বুর্জোয়া অধিকার সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। যেসব লোকেরা সরবরাহ প্রথাকে এই ভিত্তিতে আক্রমণ করে যে, এটা উৎপাদনে উৎসাহ জাগায় না তারা প্রকৃতপক্ষে সমতার সর্বহারা সম্পর্কের স্থলে বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্রের “মালিকানা সত্ত্ব” বসাতে চায়। তাদের অনুসারে, এটা উৎপাদনে উৎসাহ উদ্দীপনা জাগাবে। বাস্তবে কি এটাই ঘটনা?

সরবরাহ প্রথার ওপর আক্রমণের ফলশ্রুতিতে অতীতে যে জীবনযাত্রার মধ্যে বেশী পার্থক্য দেখা যায়নি তা আমাদের পার্টি ক্যাডারদের মধ্যে পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং যারা কঠোর জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল না, তারা দ্রুতই ভদ্রলোকী, উচ্চ শ্রেণী চীনা ও পুরোনো জনাব চাওয়ের আচার ব্যবহার শিখে ফেললো। কিছু ক্যাডার দুঃখিত হন যখন তাদের “মাথা” হিসেবে সম্বোধন করা হয় না। এটা সত্যিই কিছু একটার উদ্দীপনা জাগায়। কিন্তু এটা উৎপাদন উদ্দীপনা জাগায় না বরং খ্যাতি ও সম্পদের জন্য লড়ার উদ্দীপনা জাগায়। এটা আবর্জনা জাগিয়ে তোলে। এটা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্নতা জাগায়। কিছু উপাদান শীঘ্রই বুর্জোয়া দক্ষিণপন্থী ও দুর্নীতিগ্রস্থ উপাদানে অধঃপতিত হয়।

কিছু ব্যক্তি এই মত প্রকাশ করেছিল যে, সরবরাহ প্রথা আলস্যকে উৎসাহিত করবে। এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ঘটনা বিপরীত- অভিজাততন্ত্রই আলস্যকে উৎসাহিত করেছে। কিছু ক্যাডার স্রেফ এক ঘন্টা অতিরিক্ত শ্রম দেয়ার পর অতিরিক্ত বেতন আশা করে। সরবরাহ প্রথার অধীনে বিপ্লবী যুদ্ধে যারা সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন, এমনকি তাদের জীবন, তারা কি বেতন দাবী করেছিল? এর চেয়ে মারাত্মক যা, তা হচ্ছে এই অভ্যাস গড়ে ওঠার পর ক্যাডার ও মেহনতী জনগণের মধ্যে সম্পর্ক পরিবর্তিত হয়েছে, “তিন প্রবণতা” এবং “পাঁচ অহংকার” নেতৃত্বস্থানীয় ক্যাডারদের মধ্যে গড়ে ওঠেছে। কিছু লোক পুরোপুরিভাবে এই শিক্ষা ভুলে গেছে যে, রাজনীতিকে অবশ্যই কমান্ডে থাকতে হবে; অন্যদের সাথে অবশ্যই সমতা অনুশীলন করতে হবে, জনগণকে বুঝিয়ে আস্থা অর্জন করতে হবে বলপ্রয়োগে নয়, এবং তাদেরকে জনগণের একজন হতে হবে। তারা এ পর্যন্ত এগোয় যে, যখন পার্টি কেন্দ্র জনগণের মধ্যে দ্বন্দ্বের মীমাংসা সম্পর্কে নির্দেশনা ইস্যু করলো তারা প্রতিরোধ করলো।

এর একটা পুনঃসংগ্রহ প্রত্যেকের জন্য গভীর শিক্ষাগত তাৎপর্যসম্পন্ন। এই প্রক্রিয়ায় আমরা প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, যদিও আমরা ঠিক এই জিনিস সমর্থন করি না ও বিরোধিতা করি এবং এমনকি যদিও আমরা বিভিন্ন প্রভাব দ্বারা আক্রান্ত।

পার্টির ট্রাডিশন হচ্ছে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী এবং তা আমাদের পার্টি ক্যাডার ও জনগণের মধ্যে গভীরভাবে শিকড়-প্রোথিত। যদিও তা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ততটা কঠিন নয়। এখন পার্টি কেন্দ্র ও কমরেড মাও সেতুঙের আহ্বানে এবং শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে এই ট্রাডিশন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো বলতে পারিনা যে, এটা পুরোপুরিভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অধিকারের বুর্জোয়া ভাবধারা ও কুওমিনতাঙ কর্তৃপক্ষীয় অহংকার এখনো জনগণের মধ্যে অনুভূত হচ্ছে। কিছু লোক এখনো জনগণের মধ্যেকার দ্বন্দ্বের সঠিক মীমাংসার কর্মনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

এখনও আমরা দীর্ঘ ও পুনরাবৃত্তিময় সংগ্রামের মোকাবেলা করছি। কিন্তু আন্তঃসম্পর্কসমূহের পুনঃস্থাপনে মহান অগ্রগামী উলম্ফনের জন্য পরিস্থিতি আমাদের কাছে যতখানি অগ্রগামী উলম্ফন দাবী করে, কমিউনিস্ট আদর্শে নিবেদিত সকল কমরেড নিশ্চিতভাবে আন্দোলনের সম্মুখসারিতে দাঁড়াতে সমর্থ হবে এবং নতুন পরিস্থিতির অধীনে আমাদের পার্টির চমৎকার ট্রাডিশন পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও বিকশিত করতে সক্ষম হবেন। নিশ্চিতভাবে তারা বুর্জোয়া অধিকারের ভাবধারা ভেঙে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হবেন, জনসাধারণের সাথে সমতার সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবেন, একটা ঐক্যবদ্ধ নিবিড় একক গঠন করতে সক্ষম হবেন, একত্রে বসবাস ও কাজ করতে সক্ষম হবেন এবং সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের জন্য একই সাধারণ সংগ্রাম করতে সক্ষম হবেন। এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ থাকতে পারে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *