বাঙ্গালী জাতির বাইরে অন্য জাতির ভাষার জন্য সংগ্রামের ইতিহাস – পর্ব ১

ভাষার জন্য বাঙ্গালীদের আন্দোলন এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বেরই জানা। তবে যদি বলা হয় ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য একমাত্র আন্দলনকারী জাতি আমরাই, তবে সেটা ভুল বলা হবে। কিছু ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার বাইরে দক্ষিণ ভারতের সাবেক মাদ্রাজ স্টেট (বর্তমানে তামিলনাড়ু) ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্টির কিছু অংশ সহ বেশ কিছু রাজ্যের মানুষ নিজ ভাষার অধিকার এবং স্বাতন্ত্র রক্ষায় লড়াই করেছে। দু-চারদিনের মিছিল মিটিং করে আন্দোলন নয়, দীর্ঘসময় ধরে চলা আন্দোলন। এর বাইরে, সংখ্যায় অনেক কম এমন কিছু জাতি আছে যারা নিজেদের ভাষাকে ধরে রাখবার সংগ্রামে হেরেও গেছে। তাদের কথা কেউ মনে রাখে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস, ভাষা দিবস করে গর্ব নিবো, কিন্তু নিজের বাইরে অন্য কারো কিংবা কোন জাতির সংগ্রামের কথা জানবো না, সেটাও অনুচিত কাজ হবে।

আমি এই বাঙ্গালীদের বাইরে এই আন্দোলনের কথা শুনি চেন্নাই শহরে থাকতে। সেদিন শনিবার অথবা রবিবার ছিলো। নভেম্বর মাস, ২০১১ সাল। চেন্নাই (সাবেক মাদ্রাজ) এর মেরিনা বীচে গিয়েছিলাম ঘুরতে। সাথে ছিলেন ভারতীয় বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লীডার গনপতি সান্তানাম স্যার। মেরিনা বীচের আশেপাশেই একটা স্ট্যাচু দেখি। উনাকে জিজ্ঞেস করি এটা কার স্ট্যাচু। উনি বলেন,

“এটা এমকের স্ট্যাচু। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা উনার শিষ্য। আমরা একসময় ভাষার জন্য আন্দোলন করেছিলাম, উনি ছিলেন সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা।“

আমি একটূ অবাকই হই। জিজ্ঞেস করি,

“স্যার, আপনারাও ভাষার জন্য আন্দোলন করেছিলেন?”

উনি বলেন,

“হ্যা, লম্বা সময় ধরে আন্দোলন। তামিল এবং দক্ষিণের মানুষ যে নিজেদের আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে আছে, এটা সেই আন্দোলনেরই ফল।“

এরপর আসলেই খেয়াল করি যে তামিলনাড়ুর কোথাও হিন্দীর ব্যবহার দেখাই যায় না। এমনকি হিন্দীতে কোন প্রশ্ন করলে তামিলরা উত্তরও দিতে চায় না। এর বেশকিছুদিন পর তামিলনাড়ুর রাজ্য সরকারের সচিবালয়ে এতে হয় ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে। সেখানে দাঁড়িয়ে সান্তানাম স্যারকে বলি,

“আপনারা আসলেই আলাদা। ভারতের অংশ হয়েও যেভাবে হিন্দীর আগ্রাসন থেকে নিজেদের বাচিয়ে রেখেছেন সেটা অন্যরকম। আমরা তো প্রতিবেশী দেশ হয়েও প্রভাবের বাইরে থাকতে পারছি না।“

এরপর উনি যা বললেন, তা ছিলো আমাদের জন্য গর্বের। সেই সাথে কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দেয় সেই বক্তব্য। উনি বলেন,

“তুমি জান দুঃখের ব্যাপার কি? আমরা এখনো অফিশিয়াল কাজে নিজের ভাষা চালু করতে পারিনি। কিন্তু আমি তোমাদের অফিসের নানা ফরম, কাগজপত্র দেখেছি। তোমরা নিজের ভাষাই ব্যবহার করো। অনেক এগিয়ে গেছো তোমরা। কিন্তু আমরা এখনো এ ব্যাপারেও লড়ছি।“

আমার একটা বদঅভ্যাস হচ্ছে কোনো ব্যাপারে শুনলে সে সম্পর্কে পড়বার আগ্রহ জন্মায়, এড়াতে পারি না। আমি এ ব্যাপারেও একটূ ঘাটাঘাটি শুরু করি নেটে। সত্যিই দক্ষিণ ভারতের লোকেরা এখনো লড়ছে, তাদের আন্দোলনটা চলমান। একই দেশের ভিন্নভাষাভাষীদের কবল থেকে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে। আর এর প্রেক্ষাপটটাও আমাদের সাথে মিলে যায়। দেশ ভাগের আগে এবং পরপরই প্রশাসনিক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে নানা ভাষাভাষীর মধ্যে মতবিরোধ এবং প্রভাবশালীদের নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবার ইচ্ছা। “

শুরুটা হয়, ১৯৩৭ সালে। মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীর স্কুলগুলোতে বাধ্যতামুলকভাবে হিন্দী শিক্ষার নির্দেশ জারী করেন ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের প্রথম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সি রাজাগোপালাচারী (রাজাজী)। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শুরুতেই তীব্র প্রতিবাদ জানায় সাধারণ তামিলরা এবং জাস্টিস পার্টির নেতা ভি রামাস্বামীর নেতৃত্বে। তিন বছর ধরে এ আন্দোলন চলে। নানামুখী আন্দোলনে অনশন, মিছিল মিটিং, পদযাত্রা, পিকেটীং এবং সহিংস আন্দোলন সবই চলেছে। সরকার এ আন্দোলন দমাতে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় এবং পুলিশের গুলিতে দুইজন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয় (এই আন্দোলনকে যদি ভাষা সংক্রান্ত আন্দোলন ধরা হয়, তবে আমার পড়ার মধ্যে এটাই প্রথম রক্তদানের ঘটনা আধুনিক সময়ে)। গ্রেফতার করা হয় নারী এবং শিশু সহ হাজারের বেশী আন্দদোলনকারীকে। বাধ্যতামুলক হিন্দী শিক্ষার নির্দেশ আন্দোলনের মুখে প্রত্যাহারও করে নেয়া হয় মাদ্রাজের ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড আর্সকিনের নির্দেশনায় ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। এরই মধ্যে আন্দোলনের মুখে কংগ্রেসের সরকার পদত্যাগও করে ১৯৩৯ সালের শেষ দিকে।

আন্দোলন সাময়িকভাবে শেষ হয়। কিন্তু এরপরেই শুরু হয় আসল সংগ্রামের। ১০ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতই আরেক কংগ্রেস নেতা লোকসভায় দাড়িয়েও বক্তব্য দিচ্ছিলেন যার নাম আমরা পরে জানতে পারবো (ভারতের খসড়া সংবিধান তৈরীর কাজ চলছিলো এবং অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিলো দাপ্তিরিক এবং রাষ্ট্রীয় ভাষা কি হবে তা নির্ধারণ)। উনি বলেছিলেন,

“যারা হিন্দুস্তানী ভাষা জানে না তাদের ভারতে থাকবার কোন অধিকার নেই। এই অধিবেশনে ভারতের সংবিধান প্রণয়নের জন্য যারা উপস্থিত আছেন কিন্তু হিন্দী জানেন না তাদের এই সংসদের সদস্য হবারই যোগ্যতা নেই। তারা চলে যেতে পারেন।“

চলবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *