জ্ঞান চর্চার সীমা নির্ধারণ

তুুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিত একটি বিষয়। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে বিশেষ কোন ধর্মের নিরেট বিশ্বাস চর্চা করা হয়না। বরং সকল ধর্মের নির্মোহ বিশ্লেষণ করা হয়।


তুুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিত একটি বিষয়। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে বিশেষ কোন ধর্মের নিরেট বিশ্বাস চর্চা করা হয়না। বরং সকল ধর্মের নির্মোহ বিশ্লেষণ করা হয়।

প্রতিটি ধর্ম বিশ্বাসী মানুষ তার নিজের ধর্ম বিশ্বাসই শ্রেষ্ঠ – এরকম ধারনার উপর দাড়িয়ে থাকেন। দশটা ধর্মমত পড়াশুনা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনিত হননা। হাতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় আকৃতির প্রাণী- এধরণের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠলে তিনি গরু, ছাগল, ভেরা, মহিষ, বাঘ, সিংহ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাণী দেখিয়ে বলবেন যে এগুলো সবই আকারে হাতির তুলনায় ছোট হয়। অর্থাৎ অন্যান্য প্রাণীর আকার সম্পর্কে তার একটা পরিস্কার ধারণা আছে। এসব প্রাণির আকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেই তিনি এই সিদ্ধান্তে আসবেন যে হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণি। কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে তার ধারণা এরকম নয়। পরিবার ও সম্প্রদায় শিশুকাল থেকে তাকে ধর্ম সম্পর্কে যে বদ্ধমূল ধারণা দিয়েছে কেবল সেটাই তিনি বলবেন। অন্য ধর্ম যেমন জানেন না, নিজের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কেও তেমনি ইতিবাচক ও নেতিবাচক সকল মতামত পরাশুনা করে তার নিজস্ব বিশ্বাস নির্ধারণ করেন না।

তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস, দর্শন, বৈশিষ্ট, যুক্তিনিষ্ঠতা, পক্ষে বিপক্ষে সমালোচনা সবকিছু পড়ানো হয়। বিশেষ কোনও ধর্মমতকে বড় করা, কিংবা ছোট করার উদ্দেশ্যে পড়ানো হয়না। নির্মোহ জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্যে অধ্যয়ন করা হয়। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধিকাংশ বই ইংরেজী ভাষায় প্রণীত। এসব বইয়ের অনেকগুলোতেই ধর্মবিশ্বাসকে ঠুনকো ও আজগুবি বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ধর্ম দর্শন, জড়ো দর্শন, ইতিহাস, যুক্তিবিদ্যা ইত্যাদি অনেক বিষয়ের পাঠ্যবই পড়লে ধর্ম বিশ্বাস তুচ্ছ হয়ে যায়। বাংলায় এসব গ্রন্থের অনুবাদ করা কি বেআইনি? বাংলা ভাষাতেও প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে অনেক মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। নারীমুক্তি সংক্রান্ত অধিকাংশ বই ধর্মকে সমালোচনা করেছে এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও কুসংস্কারের উর্দ্ধে উঠে নারী-পুরুষ সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী জাগরণের পক্ষে আপিল প্রকাশ করেছে। এসব বইয়ের প্রকাশ কি সরকার নিষিদ্ধ করে দেবে ? লেখক ও প্রকাশকদের গ্রেফতার করে সরকার কি বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার ক্ষেত্রে সীমা রেখা টেনে দিতে চাচ্ছে?

হুমায়ুন আজাদের ‘নারী’ ও অন্যান্য বেশ কয়েকটি গ্রন্থ অতীতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ নিয়ে মামলা মোকদ্দমা হয়েছে। অবশেষে হাইকোর্টের রায়ে সরকারের নিষেধাজ্ঞা বেআইনি বলে প্রমাণিত হয়েছে। অতীত সরকারসমূহ বই নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু লেখককে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়েছে – এমন নজির নেই। বর্তমানে সেটাই হচ্ছে। ভিন্ন চিন্তার লেখকদের হত্যা করা হচ্ছে কিংবা গ্রেফতার করা হচ্ছে। কোন দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

অশীতিপর বৃদ্ধ শামসুজ্জোহা মানিক বহু গ্রন্থের লেখক। তার ব-দ্বীপ প্রকাশণী থেকে অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। “ইসলাম বিতর্ক” নামে যে বইটির জন্য তাকেে গ্রেফতার করা হয়েছে সেটি মূলত একটি অনুবাদ গ্রন্থ। বিভিন্ন লেখকের প্রবন্ধ সংকলন করে বইটি অনুবাদ করা হয়েছে। বইটি ২০১১ সালে প্রকাশ করলেও সরকার তা নিষিদ্ধ করেনি। যে বই নিষিদ্ধ বা বেআইনি নয়, সেই বই বাংলা একাডেমি’র বই মেলায় বিক্রি বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর তাকে গ্রেফতার এবং অবশেষে রিমান্ড !

ব-দ্বীপ প্রকাশনী থেকে আরও পাঁচটি বই জব্দ করেছে পুলিশ। বইগুলো হলো শামসুজ্জোহা মানিক ও শামসুল আলম চঞ্চল রচিত ‘আর্যজন ও সিন্ধু সভ্যতা’, এম এ খান অনূদিত ‘জিহাদ : জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তরকরণ, সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্বের উত্তরাধিকার’, শামসুজ্জোহা মানিকের ‘ইসলামের ভূমিকা ও সমাজ উন্নয়নের সমস্যা’, একই লেখকের প্রবন্ধ সংকলন ‘ইসলামে নারীর অবস্থা’ এবং ‘নারী ও ধর্ম’।
এরকম ঘটনা পৈশাচিকতার যুগে হত। ভিন্নমত প্রকাশের দায়ে হেমলক বিষ দিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল জ্ঞান তাপস সক্রেটিসকে। দর্শন চর্চার ইতিহাসে সম্ভবত: তিনিই প্রথম শহীদ। পঞ্চদশ শতকে ইতালীয় দার্শনিক, ধর্মযাজক, বিশ্বতত্ত্ব বিশারদ এবং ওকাল্টিস্ট জর্দানো ব্রুনোকে প্রচলিত ধর্মের বিরোধিতার (heresy) অপরাধে পুড়িয়ে মারা হয়।

প্যাগান ধর্ম ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে খৃষ্টান ধর্মকে চ্যালেঞ্জ করায় মরতে হয়েছিল হাইপোশিয়াকে। কোপার্নিকাস , কেপলার, গ্যালিলিও, নিউটন, আইনস্টাইন প্রমূখ ব্যাক্তিবর্গ নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ইবনে সিনা, আল দিমিস্কি, আলী দস্তি, অমর খৈয়াম কোরান বিরুদ্ধ মতবাদের জন্য নিগৃহীত ও নির্যাতিত হয়েছেন। তবুও আজ পৃথিবীজুড়ে তাদের তত্ত্ব অধিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের বই পড়ানো হয়।
বর্তমান সরকার কি মধ্যযুগের শাষকদের কাতারে নিজেদের নাম লেখাচ্ছেন? ইতিহাস এদের কিভাবে মূল্যায়ন করবে? মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষের একজন কর্মী হিসেবে সরকারের এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রতিবাদ লিপিবদ্ধ করছি।

২ thoughts on “জ্ঞান চর্চার সীমা নির্ধারণ

  1. সরকার নিজস্ব মতের বাইরে আর
    সরকার নিজস্ব মতের বাইরে আর কোনো মতকেই দাঁড়াতে দিতে চায় না। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো তাই প্রমাণ করে। আমাদের এই আলোচনায় মনোনিবেশ করা উচিৎ যে, রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিভাবে সনজ্ঞহবদ্ধ প্রতিবাদ করা যায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *