জাফর ইকবাল স্যারের পক্ষে একটু খানি ওকালতি !

ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস, কাজেই ধর্মগ্রন্থে যা লেখা থাকে সেটাকে কেউ কখনও প্রশ্ন করেনা,গভীর বিশ্বাসে গ্রহণ করে নেয়। বিজ্ঞানে বিশ্বাসের কোন স্থান নেই। বিজ্ঞানের যে কোন সূত্রকে যে কেউ যখন খুশি প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি-তর্ক, পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে সেই সূত্রের সত্যতা তখন প্রমাণ করে দিতে হয়। কাজেই কেউ যদি বিজ্ঞান ব্যবহার করে ধর্মচর্চা করে কিংবা ধর্ম ব্যবহার করে বিজ্ঞানচর্চা করার চেষ্টা করে তাহলে বিজ্ঞান বা ধর্ম কারোরই খুব একটা উপকার হয় না।”
-মুহম্মদ জাফর ইকবাল,বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চা,কালি ও কলম

ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস, কাজেই ধর্মগ্রন্থে যা লেখা থাকে সেটাকে কেউ কখনও প্রশ্ন করেনা,গভীর বিশ্বাসে গ্রহণ করে নেয়। বিজ্ঞানে বিশ্বাসের কোন স্থান নেই। বিজ্ঞানের যে কোন সূত্রকে যে কেউ যখন খুশি প্রশ্ন করতে পারে, যুক্তি-তর্ক, পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে সেই সূত্রের সত্যতা তখন প্রমাণ করে দিতে হয়। কাজেই কেউ যদি বিজ্ঞান ব্যবহার করে ধর্মচর্চা করে কিংবা ধর্ম ব্যবহার করে বিজ্ঞানচর্চা করার চেষ্টা করে তাহলে বিজ্ঞান বা ধর্ম কারোরই খুব একটা উপকার হয় না।”
-মুহম্মদ জাফর ইকবাল,বিজ্ঞান ও বিজ্ঞান চর্চা,কালি ও কলম

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা একাডেমি কর্তৃক নিষিদ্ধ হওয়া বই ‘ইসলাম বিতর্ক’ এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া ব-দ্বীপ প্রকাশনীর স্টল প্রসঙ্গে জাফর ইকবাল স্যারের একটা মন্তব্য ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার ভাষ্যমতে,

যে বইটির কারণে স্টলটি বন্ধ করা হয়েছে, সেটির কয়েকটি লাইন আমাদের বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান আমাকে পড়ে শুনিয়েছেন। আমি কয়েক লাইন শোনার পর আর সহ্য করতে পারি নি। এত অশ্লীল আর অশালীন লেখা। এই স্টলটিকে আর অন্য দশটি সাধারণ স্টলের সঙ্গে তুলনা করলে চলবে না। তিনি বলেন, আমি মনে করে লেখালেখির সময় কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে। যাতে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না আসে। আর যে বইটির বিষয়ে কথা হচ্ছে, আমার অনুরোধ কেউ যেন এই বইটি না পড়ে।

মূলধারার পত্রিকা গুলোর মধ্যে একমাত্র ইত্তেফাক এই খবরটি প্রকাশ করেছে,সেখান থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল গুলোতে প্রকাশিত হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই স্যারের এই বক্তব্য নিয়ে নানা রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তমনা প্রগতিশীল বলে পরিচিত অংশটি তীব্র ভাবে আক্রমন করেছে স্যার কে। তাঁর নামের আগে ‘মাওলানা’, ‘হযরত’ জুড়ে দিয়ে কিংবা ধর্মান্ধ-জামাত-শিবিরের মত নাম বিকৃত করে স্যারের বিরূদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আমাদের অনলাইন মুক্তমনা সমাজ। অনেকেই তাকে ‘বাতিলের খাতায়’ ফেলে দিয়েছেন, অনেকে বলছেন তিনি নিজের ‘কল্লা’ বাঁচানোর জন্য ‘পল্টি’ মেরেছেন ! খুব সহজেই যেমন আমরা একজন মানুষ কে পীর বানাই,আবার খুব সহজেই তাকে ছুড়ে ফেলে দেই। গোটা ব্যাপারটা ‘মুক্তমন’ নিয়ে বিবেচনা করা যাক।

জাফর ইকবাল স্যার একমাত্র ‘বুদ্ধিজীবী’ যিনি বিভিন্ন সময় ব্লগার হত্যাকান্ডের পর সরাসরি কলম ধরেছেন, লিখেছেন নির্ভীক ভাবে। তিনি একমাত্র বুদ্ধিজীবী যিনি পথে নেমে প্রতিবাদ করেছেন (অনন্ত বিজয় হত্যাকান্ডের পর)। অভিজিৎ দা,অনন্ত দা, দীপন – সবাই কে নিয়েই তিনি লিখেছেন। এমনকি এই ইস্যুতে সজীব ওয়াজেদ জয় এর করা মন্তব্যের প্রতিবাদ করে তিনি আওয়ামি লীগের চক্ষুশূল হয়েছেন। সিলেট আওয়ামি লীগ তাঁর বিরূদ্ধে বিশাল মিছিল বের করেছিল। এই ব্যক্তিটি জামাত-বিএনপি-আওয়ামি লীগ- বাম সব মহলের চক্ষুশূল, এবার মুক্তমনা অংশটির ‘বিরোধী পক্ষে’ও পরিণত হলেন বৈকি! কত সহজেই আমরা তাঁর কাজ গুলো ভুলে গেলাম পত্রিকার খন্ডিত একটা সংবাদ পড়ে? সত্যি কথা বলতে, মুক্তচিন্তা বা মুক্ত ভাবে চিন্তা ব্যাপারটা এত সহজ নয়, ব্যাপারটা ঠিক এখনও আমাদের আয়ত্ত্বে আসেনি।

যে বই নিয়ে এত কথা সে বই সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। ‘ইসলাম বিতর্ক’ বই এর যে প্রবন্ধ টি নিয়ে মূল বিতর্ক সেটা হচ্ছে ‘মুসলিম মানসের যৌন বিকৃতি’ । সেখানে হযরত মুহম্মদ এবং তাঁর পুত্রবধূ যয়নব এর কাহিনী উল্লেখ আছে। কাহিনীটি সত্য না মিথ্যা, উপযুক্ত সূত্র আছে কি নেই এটা বিবেচ্য নয়, বিবেচ্য হল ব্যাপারটার গুরুত্ব কতটুকু, এই ব্যাপারটার চর্চা কতটুকু আলো নিয়ে আসবে- সেটা। আপনি কি মনে করেন এই কাহিনী পড়ে মুসলমানরা নবীকে ঘৃণা করতে শুরু করবে? ইসলামের ভীত ধ্বসে পড়বে? বরং উল্টোটাই সত্য, ব্যাপারটা বিবেচিত হবে ‘উস্কানি’ হিসেবে। কোন ধর্মান্ধ মৌলবাদী জঙ্গি নয়, আপনার বাবা বা আপনার মা বা আপনার কোন নিকটজনই দেখাবে ভয়ানক প্রতিক্রিয়া। কেন? কারণ আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে ‘ধর্ম,ধর্মগ্রন্থ এবং ধর্মীয় পয়গম্বর’ -এই বিষয় গুলোকে ছোট বেলা থেকেই এমন ভাবে আমাদের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় যে অধিকাংশ মানুষ কোন রকম প্রশ্ন ছাড়াই বিষয় গুলো পবিত্র জ্ঞান করে। হয়তো ব্যক্তিজীবনে মানুষটি ধর্মীয় কোন অনুশাসনই মানেনা কিন্তু এই ধরণের কথা গুলো শুনলে সেই-ই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে। এই মানুষ গুলো কিন্তু আমাদের শত্রু নয়,আমাদের আশেপাশে থাকা,আমাদেরই আপন জন।

তবে কি আমরা সত্য উন্মোচন করব না? প্রতিক্রিয়া হতে পারে এই ভেবে চুপ করে থাকব? না,কখনই নয়। কিন্তু আমাদেরকে বুঝবে হবে প্রেক্ষাপট,যে সমাজে আমরাক কাজ করছি সেই সমাজের মানুষের মানসপট এবং সমসাময়িক পরিস্থিতি। হুমায়ুন আজাদ স্যারের ‘শুভব্রত,তার সম্পর্কিত সুসমাচার’ বইটি পড়েছেন? বইটি ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহম্মদ কে ইঙ্গিত করে লেখা। ‘শুভব্রত’ চরিত্রটি মূলত নবী মুহম্মদ কে প্রতিনিধিত্ব করে। সে বইটি পড়ে একজন চিন্তাশীল মানুষ ব্যাপার গুলো নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে, চিন্তা করতে বাধ্য হবে। এই বইটিতেও আছে শুভব্রতের যৌন কাতরতার প্রচ্ছন্ন বর্ণনা। কিন্তু সেটা হয়ে উঠেছে সাহিত্য, স্থূল বিবরণ নয়। হ্যা, এই বইটিও আঘাত করবে অনুভূতিতে কিন্তু ইসলাম বিতর্ক বইটির সাথে এর পার্থক্য হল যার মস্তিষ্ক পরিপক্ক তার পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব হবে মূল বক্তব্য। আবার হুমায়ুন আজাদ ও জাফর ইকবাল স্যারের তুলনা করাও বোকামি। দুজন দুরকম ছিলেন। দুজনই দুরকম ভাবে আমাদের আলো দিয়ে গেছেন,যাচ্ছেন। দুজনেরই দরকার আছে আমাদের।

যেখানে আমাদের দেশের ৯০ ভাগ মানুষের অবস্থাই এমন, সেখানে তাদের কাছে পৌছাতে হলে আমাদের পৌছাতে হবে ধীরে ধীরে। আমি যদি প্রথমেই বলি ‘আপনার ধর্ম তো ভুয়া,সে বলে আকাশ থেকে নাকি মানুষ পড়ছে’ – তাহলে প্রথমেই সেই লোকটি দরজা বন্ধ করে দেবে,আর খুলবেনা কখনও। কিন্তু আমি যদি তাকে বলি আসুন বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা যাক,তখন যদি সে বলেও ‘ইসলাম তো বিবর্তন সমর্থন করেনা’ ,আমি তখন বলতে পারব ধর্মের দিক থেকে চিন্তা না করে আসুন দেখি কী কী প্রমাণ আমরা পেলাম এখন পর্যন্ত…অন্তত তার দরজাটা একটু একটু করে খুলতে পারব আমরা তখন। আমি একটা শিশুকে কখনই বলবনা এই সব ধর্ম টর্ম ভূয়া,আমি তাকে দেব বিজ্ঞানের বই। আমি তাকে শেখাব বিগ ব্যাং থিউরি, বিবর্তনবাদ। তার মধ্যে গড়ে দেব বই পড়ার অভ্যাস, এক সময় সে নিজেই বুঝতে পারবে কোনটা সঠিক,কোনটা ভূয়া। কোনটা দরকারী,কোনটা ক্ষতিকর। শ্রদ্ধেয় অভিজিৎ দা’র চর্চাটাও এমনই ছিল বৈকি।

জাফর ইকবাল স্যার একজন শিক্ষক,দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সাথে কাজ করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এই ধ্রুব সত্যটি জানেন। তিনি জানেন মানুষের কাছে পৌছাতে হলে সঠিক উপায়ে পৌছাতে হবে,মানুষ কে আলোকিত করতে হলে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। সেই আলোতেই মানুষ পরে ভাল মন্দ বিচারের যোগ্যতা অর্জন করবে। তাই তিনি বিজ্ঞান নিয়ে লিখে যান। তিনি বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখেন, তিনি বিগ ব্যাং – স্ট্রিং থিউরি নিয়ে লেখেন, তিনি গণিত নিয়ে লেখেন। একটু একটু করে আলো ছড়িয়ে দিতে চান প্রজন্মের মধ্যে । এই লেখার প্রথমে আমি তাঁর একটা লেখা কোট করেছি। সেখান থেকেই ধর্ম নিয়ে তাঁর অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়। ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকুক, বিজ্ঞান নিয়েই আমরা আগাই। এক সময় আপনা থেকেই যেটা গুরুত্বহীন সেটা হারিয়ে যাবে। মৌলবাদী অপশক্তিটিও ব্যাপারটার ব্যাপকতা বোঝে,তাই কোন লিস্ট তৈরি হলে এক নাম্বারে থাকে জাফর ইকবাল স্যারের নাম।তাকে বলা হয় ‘নাস্তিকদের গুরু’ বলে,যদিও তিনি কখনই নিজেকে নাস্তিক বলে দাবি করেননি। ব্লগ ফেসবুক আসার বহু আগে থেকে তিনি এই মৌলবাদীদের হুমকি ধামকি পেয়ে আসছেন,লড়াই করে যাচ্ছেন এই অপশক্তির সাথে। ভূয়া ব্লগার সেজে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া তথাকথিত মুক্তচিন্তার মানুষরা যখন সেই মানুষটিকে ‘বিক্রি হয়ে গেছে’ বলে গালি দেয়, যে কিনা আরাম আয়েশের সব ছেড়েছুড়ে এই দেশে চলে এসেছেন, তখন হাসি পায় বৈকি!

একারণেই এই বইটির খন্ডিত বিবরণ শুনে তাঁর কাছে মনে হয়েছে অশ্লীল,অযৌক্তিক। সোজা কথায় তিনি ‘অনুরোধ’ করেছেন বইটি না পড়তে। এখন কথা হচ্ছে, এটা তাঁর ব্যক্তিগত মতামত। এই মতামত জানানোর অধিকার কি তাঁর নেই? এই ব্যাপারে একমত নন বলেই তিনি পল্টিবাজ? বইটিকে অশ্লীল বলার কারণে তিনি ‘আদর্শ বিসর্জনকারী’ ? তবে তিনি কয়েকটি ভুল করেছেন-

১। তিনি বলেছেন বইটি যেন কেউ না পড়ে। এমন অনুরোধ তিনি করতে পারেন না। কে কি পড়বে না পড়বে এটা কেউই ঠিক করে দিতে পারেনা। ধরে নিচ্ছি তিনি তাঁর ব্যক্তিগত মতামত দিয়েছেন, মানা না মানা আমাদের ব্যাপার। মতামত দেয়ার স্বাধীনতা তাঁর আছে।

২। অন্য স্টলের সাথে ব-দ্বীপের তুলনা হবেনা- এই কথাটি গ্রহণযোগ্য নয় । কোন বই এর ব্যাপারে যদি অভিযোগ থাকে সেটার বিরূদ্ধে আদালতে অভিযোগ করা যায়,সেই বইটি সড়িয়ে ফেলা যায় কিন্তু গোটা একটি প্রকাশনীর স্টল উঠিয়ে দেয়া ভাল কোন দৃষ্টান্ত নয়। এই ব্যাপারে স্যারের বক্তব্য পরিষ্কার নয়।

৩। প্রকাশক কে গ্রেফতারের ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করেছেন কিনা জানা নেই। একজন প্রকাশক কে এভাবে অন্যায় ভাবে গ্রেফতারের প্রতিবাদ তিনি করবেন এটাই আশা করি।

কোন একটি বই আর প্রকাশনীর ব্যাপারে মন্তব্য করা এক জিনিস আর সামগ্রিক বুদ্ধি-বৃত্তিক স্বাধীনতা,লেখক প্রকাশকের মত প্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপারে মতামত জানানো আরেক জিনিস। পত্রিকার দু লাইনের একটা রিপোর্ট দেখে তাই সরাসরি কোন সিদ্ধানে আসা যৌক্তিক হবেনা। আশা করব স্যার এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখবেন, এই অনুরোধ জানিয়ে আমি তাকে মেইল করেছি।জানিনা উনি আমার অনুরোধ রাখবেন কিনা।

আপনারা কেউ কি ‘ইনোসেন্স অব মুসলিম’ ছবিটি দেখেছেন? আমি এর কিছু দৃশ্য দেখেছিলাম। ছবিটি মোটেও কোন যুক্তিবাদী,জ্ঞান প্রদায়ক কিংবা প্রগতির পরিচায়ক কোন ছবি নয়। এই ছবিটি একটি তীব্র মৌলবাদী,এক্স রেটেড ছবি। যেকোন স্থানে দাঙ্গা হাঙ্গামা শুরু করিয়ে দেয়ার জন্য ছবির যে কোন একটি দৃশ্য যথেষ্ট। এমন না যে ছবিটি দেখে আমার অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। কিন্তু ছবিটি দেখে আমি বিরক্ত হয়েছি এই কারণে যে, এটা মানুষ কে আলোকিত করবেনা,উল্টো অন্ধকারের জীব দের সামনে খাদ্য হিসেবে পরিবেশিত হবে, যা নিয়ে তারা আস্ফালন করে বেরাবে। আমাদের এ সময়ের কিছু কিছু মুক্তমনা মানুষের কর্মকান্ড অনেকটা তেমন। তাদের ‘ইনটেনশন’ ভাল, তারা অন্ধকার দূর করতে চান, সমাজ বদলাতে চান। কিন্তু তাদের পথটা ভুল। নবীর যৌন জীবন নিয়ে লেখার থেকে অনেক বেশি দরকারী বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য, পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার গড়ে তোলার জন্য কাজ করা। অনেক বেশি দরকার বিজ্ঞানের বিভিন্ন জটিল বিষয় গুলোকে সহজ করে লিখে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করা। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের গালাগালি না করে তাদের আলোকিত করতে চেষ্টা করা। বিজ্ঞানভিত্তিক বই গুলো প্রমোট করা,সেগুলো নিয়ে লেখা,সেগুলো থেকে লেখা। সহজ কথায় বলতে গেলে ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। আপনি যাদের সাথে লড়ছেন তারা আপনার শত্রু নয়,তাদের অজ্ঞানতা আপনার শত্রু। সেটাকে দূর করার চেষ্টা করাই মঙ্গল, অধিক কল্যাণকর।

একটা গল্প দিয়ে শেষ করি।খুব সম্ভবত এটা চৈনিক কোন রুপকথা। এক গ্রামের কিছু কৃষক একদিন ক্ষেতে গিয়ে দেখল সেখানে সবুজ রঙ এর বড় আকৃতির কি যেন একটা পড়ে আছে। কৃষকরা ছিল অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক যুবক। সে বেশ শিক্ষিত, পড়াশুনা জানে। কৃষকরা তাকে বলল ব্যাপারটা কী দেখতে। যুবক কাছে গিয়ে দেখল ‘আরে এটা তো একটা তরমুজ!’ কৃষকদের নির্বুদ্ধিতায় সে মজা পেল এবং মজা দেখানোর জন্য তাদের সামনে তরমুজটা ভেঙে খাওয়া শুরু করল। এদিকে কৃষকরা আগে কখনও তরমুজ দেখেনি। বড় আকারের সবুজ একটা জিনিস,তার মধ্যে আবার লাল ! তারা ভাবল এটা নির্ঘাত একটা রাক্ষস না হয়ে যায়না। আর এমন একটা বিচিত্র জিনিস কে যে খেয়ে ফেলতে পাড়ে রক্ত সহ সে তো আরও ভয়ংকর ! তাই তারা যুবক কে তাড়া করল, মেরে তাড়িয়ে দিল!

এবার ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক বৃদ্ধ। বৃদ্ধ ছিলেন জ্ঞানী। কৃষকরা যখন তাকে ক্ষেতের ঐ অদ্ভূত জিনিসটা দেখাল তখন তিনি সাথে সাথেই বুঝলেন এটা একটা তরমুজ। কিন্তু তিনি জানেন এই কৃষকরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন। তিনি তাই যুবকের মত কিছু করলেন না। তিনি বললেন, ‘চলো তো একটু এগিয়ে দেখি।’ তিনি সবাইকে নিয়ে একটু একটু করে এগোলেন। এরপর বললেন, ‘আচ্ছা এটাতো কিছু করছেনা,আস একটু ছুয়ে দেখি তো।’ সবাই তরমুজটা ছুয়ে দেখল। এরপর তিনি বললেন, ‘ আচ্ছা এটার তো মনে হচ্ছে কিছু করার ক্ষমতা নেই। চাকু দিয়ে একটু কেটে দেখে তো।’ কৃষকরা তাই করল। রস বের হতেই বৃদ্ধ একটু রস হাতে নিয়ে বললেন,’এটা তো রক্ত নয়,একটু মুখে দিয়ে দেখি তো।বেশ মিষ্টি তো।এটা কেটে ফেলো তো।’ কৃষকরা তাই করল। এরপর বৃদ্ধ বললেন, ‘আচ্ছা এটা তরমুজ হতে পারে।এর কথা আগে শুনেছি। এটা একটা ফল,খাওয়া যায়,চাষও করা যায়।” এবারে কৃষকরা পুরো ব্যাপারটা বুঝল।

জাফর ইকবাল স্যার কে আমার এই গল্পের বৃদ্ধের মত মনে হয়। আসলেই তিনি তাই। এরপরেও তিনি মানুষ, তাঁর নিজস্ব মতামত আছে। তাঁর সাথে আমার সব মতের মিল হবে এমন না। তাই বলে তিনি বাতিল, বিক্রি হওয়া,পল্টিবাজ এমনটা বলার মত যোগ্যতা আমাদের এখনও হয়নি। যারা গত দুদিন ধরে এই শব্দ গুলো ব্যবহার করে চলেছেন তাদের দেখে অবাক হচ্ছি। কত সহজেই তারা এই লোকটিকে এই সার্টিফিকেট দিয়ে দিল! কিন্তু তিনি আমাদের মত নন যে ব্যাপক কিছু করে সমাজ কে বদলে দিব বলে ভাবি গল্পের যুবকের মত। বরং তিনি সেই প্রজ্ঞাবান বৃদ্ধ যে কিনা আশেপাশে মানুষ গুলোর মনস্তত্ত্ব জানেন এবং সেই অনুযায়ী ধীরে ধীরে আগানো কে সঠিক মনে করেন।

এখন আপনি তাঁর এই নীতি তে বিশ্বাসী নাই হতে পারেন । কিন্তু তাই বলে অপশক্তির বিরূদ্ধে লড়ে যাওয়া মানুষটি কে আপনি ‘বাতিলের দলে’ ফেলে দিতে পারেন না। তেমন কিছু এখনও আপনি করেননি মহাশয় !

পৃথীবির কত বড় বড় মনীষীর হাটুর সমান মেধা নিয়ে শুধুমাত্র ধর্মের লেবাস পড়ে তাদের উপর নিপীড়ন করার উদাহরণ শুধু যে ক্যাথলিক চার্চে ছিল তা নয় অন্য ধর্মেও ছিল। শুধু অতীতে ছিল তা নয়, এখনও আছে।
-মুহম্মদ জাফর ইকবাল,একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা,একটু খানি বিজ্ঞান ১

৭ thoughts on “জাফর ইকবাল স্যারের পক্ষে একটু খানি ওকালতি !

  1. আমি যেটা বুঝি বয়োবৃদ্ধ
    আমি যেটা বুঝি বয়োবৃদ্ধ প্রকাশকদের এভাবে ধরে নিয়ে আটকে রাখা ও রিমান্ডে নেওয়া ভাল কিছু হয়নি। সরকার বরাবরের মতই এবারও মৌলবাদীদের ক্ষেপাতে চায়নি…। আর, জাফর ইকবাল নির্মোহ অসাম্প্রদায়িক ও গণতন্ত্রপন্থী ব্যক্তিদের কাছে অনেক আগেই অপ্রিয় হয়ে গেছেন; এখন বুঝি নাস্তিক আর উগ্র অসাম্প্রদায়িকদের মাঝে অপ্রিয় হওয়া শুরু করলেন।

  2. আসলে আমরা আমাদের প্রিয় নবি
    আসলে আমরা আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মদ (সা) কে কতটা ভালবাসি সেটা আপনাদের ধারনারও বাইরে। তাকে নিয়ে আপনারা যতই অশ্লীল- কুরূচীপুর্ন লিখালিখি করুন না কেন, আমাদের শেষ নবীর প্রতি আস্থা আর ভালবাসা এতটুকু কমবে না। এই বিষয়ে ১০০% নিশ্চিত থাকুন।

  3. হা হা হা ভালো জোক্স
    হা হা হা ভালো জোক্স লিখেছেন,,, জাফর স্যারের ব্যাক্তিগত মতামত যে কি,,,
    তা তার ছাত্রলীগ হামলার পরবর্তী মন্তব্যতেই পরিষ্কার হয়।।

  4. একটা লেবু অতিরিক্ত কচলা-কচলী
    একটা লেবু অতিরিক্ত কচলা-কচলী করলে খাওয়ার যোগ্য থাকে না। মুহম্মদকে নিয়ে এদেশের ধর্ম ব্যাসারদের লিখা লিখি এখন আমার কাছে অখাদ্য লাগে। ব-দ্বীপ প্রকাশক আরেকটা অখাদ্য গেলাতে চেয়েছিল। জাফর ইকবাল ভদ্র-সভ্য বলে ব্যপারটার প্রতিবাদ করেছে।
    এসব ইতরামীর বিরুদ্ধে এদেশের সুশীলদের একাট্টা হতে হবে।

  5. ব্যাপার টা সত্য না মিথ্যা তার
    ব্যাপার টা সত্য না মিথ্যা তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল ব্যাপারটা দরকারি কিনা। আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে কিনা। তারুণ্যের ভেঙে চুরমার করা নয়,প্রবিণ এর প্রজ্ঞাই তার এরকম মন্তব্যের কারণ।

  6. কথিত প্রগতিশীলেরা একটু
    কথিত প্রগতিশীলেরা একটু সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলে এতদিনে “হেফাজতে নাস্তিকি” নামে শাপলা চত্বর দখল দিতো। মুক্তমনা মৌলবাদের উত্থানের ইতিহাসে বাংলাদেশের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *