দেনমোহরের এপিঠ ওপিঠ

প্রথম কথা দেনমোহর কাকে বলে? বিয়ে করার সময় নারী’কে কিংবা স্ত্রী’কে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বাধ্যতামূলক দেওয়ার যে বৈবাহিক আইন আছে তাকে ‘দেনমোহর’ বলে। বাংলাদেশে বিয়ের পর স্ত্রী’কে দেনমোহর দেওয়া হচ্ছে কি হচ্ছে না কিংবা বাসর ঘরে বৌ’র কাছে মাপ চেয়ে ফেলার মতন বিষয়গুলো আমাদের আলোচনা না। আমাদের আলোচনা ‘দেনমোহর’ সমাজে থাকা উচিত অথবা যদি দেনমোহর নিষিদ্ধ করার কথা বলি তাহলে কোন প্রেক্ষিতে নিষিদ্ধের কথা উঠবে কিংবা সমাজে নিষিদ্ধের পূর্বে সামাজিক কোন ধাপগুলো আমাদের অতিক্রম করতে হবে।


প্রথম কথা দেনমোহর কাকে বলে? বিয়ে করার সময় নারী’কে কিংবা স্ত্রী’কে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বাধ্যতামূলক দেওয়ার যে বৈবাহিক আইন আছে তাকে ‘দেনমোহর’ বলে। বাংলাদেশে বিয়ের পর স্ত্রী’কে দেনমোহর দেওয়া হচ্ছে কি হচ্ছে না কিংবা বাসর ঘরে বৌ’র কাছে মাপ চেয়ে ফেলার মতন বিষয়গুলো আমাদের আলোচনা না। আমাদের আলোচনা ‘দেনমোহর’ সমাজে থাকা উচিত অথবা যদি দেনমোহর নিষিদ্ধ করার কথা বলি তাহলে কোন প্রেক্ষিতে নিষিদ্ধের কথা উঠবে কিংবা সমাজে নিষিদ্ধের পূর্বে সামাজিক কোন ধাপগুলো আমাদের অতিক্রম করতে হবে।

দেনমোহরকে দুইভাবে দেখা যায়। এক. নারীর নিরাপদ জীবনের অর্থ। দুই. নারীক্রয়ের মতন বিষয়। নারী যতো বেশি সুন্দরী দেনমোহর ততোবেশি বেশি আরব সমাজের মতন আমাদের সমাজেও এটি রয়েছে। দেনমোহর প্রথা আরব সমাজে প্রচলন যখন ঘটে তখন মূল লক্ষ্য ছিল-নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দান। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা এই জন্যে বলছি যে সে সময় আরব গোত্রগুলোর মধ্যে যে হানাহানির প্রচলন ছিল তেমনি ছিল অধিক নারী গ্রহণ ও বর্জনের মতন ঘটনা। বিধবা নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় স্ত্রী’র সম্পত্তির অধিকার আইন, এবং তালাক-প্রাপ্ত নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক করা হয় দেনমোহর। আরবে যখন ব্যক্তি কিংবা পারিবারিক সম্পত্তির ধারণা প্রতিষ্ঠিত সে সময় ভারতে ব্যক্তি সম্পত্তির ধারণাই ছিল না। সকল মানুষ ছিল রাজা কিংবা রাজ্যের অধীনে প্রজা। ফলে দেনমোহর কিংবা স্ত্রী’কে সম্পত্তি দেওয়ার যে ব্যক্তি মালিকানার পরিস্থিতি আরব সমাজে তৈরি হয়েছে তা ভারত সমাজে হয় নাই।

বর্তমান সমাজে অনেকেই দেনমোহরকে পুরুষতান্ত্রিক নগ্ন প্রথা হিসেবে দেখেন। তাদের ভাবনা যে পুরোটাই ভুল তা বলব না তবে বাতিলের দাবী’তে এখানেও কথা থাকে। যেমন-কল্যাণ-রাষ্ট্রগুলো’তে রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে কোন নারী যদি স্বামী ঘর ছেড়ে চলেও আসে সে তখন আমাদের সমাজের মতন সমুদ্রে পড়ে না। সেই কল্যাণ-রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষ একজন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেখানে আমাদের সমাজে নারী’তে অনেক পরের বিষয় পুরুষগুলো রাষ্ট্রের কাছে এখনো ব্যক্তি হয়ে উঠতে সক্ষম হয় নি। দু’টো মনের ভালোবাসায় দুইজন বিয়ে করবে এমন কথা শুনতে ভাল লাগলেও বাস্তবতা অন্য রকম। আমাদের সমাজে যারা প্রেম করে বিয়ে করছে তাদের বড় অংশ শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। আবার অনেক শিক্ষিত আধুনিক পরিবারও ছেলে-মেয়ের পছন্দকে মেনে নিচ্ছে না। অনেকে আবার পরিবারের মতকে সায় দিয়ে পিছু হটে।

আমাদের সমাজে পুরুষ উপার্জন করে আর বেশির ভাগ শিক্ষিত প্রেমিকাও বিয়ের পরে স্ত্রী হয়েও ঘরে বসে পরিবার সামলান। ঘরের কাজ সহজ কিংবা পরিশ্রম নাই কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নয় এর কারণটা মূলত অর্থনৈতিক। কারণ বর্তমানে ২ হাজার টাকায় যেহেতু ঘর পরিষ্কার করার কিংবা রান্না করার কাজের মানুষ পাওয়া যায় সেহেতু ঘরের কাজ আমাদের কাছে গুরুত্বহীন। এই সাংসারিক জীবন থেকে কোন রমণী যদি গৃহত্যাগী কিংবা তালাক-প্রাপ্ত হওন তাহলে এই পৃথিবীতে সে টিকবে কী করে? অর্থনৈতিক মানদণ্ডের বিচারে হয় তাকে পিতা না হয় ভাইয়ের কাছে আশ্রয় নিতে হবে। সেখানেও যে তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় তা বলা যাবে না। কারণ সবার পরিবার অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী নয় কিংবা নিজেদের পরিবারে অনেকে অন্য কাউকে স্থায়ীভাবে গ্রহণ করতে রাজি নয়। সুতরাং এই তালাক-প্রাপ্ত নারী’র বেঁচে থাকার জন্যে তখন পথ দুইটি: এক. তাকে চাকরি করতে হবে। যদিও সেটি অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব না। কারণ স্বল্প বয়সে বিয়ে হওয়ায় যে টুকু শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন হয়েছে তা দিয়ে এই বাজারে চাকরি মেলে না। দুই, স্বামীর ঘরে পুনরায় নিজেকে আত্মসমর্পণ করা। ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকে সেক্ষেত্রে সে যদি স্বামী কে স্ত্রী ত্যাগ করেন কিন্তু স্বামী যখন বের করে দেয় তখন তো ফিরে যাবার আর পথ থাকে না। সে সমাজে নারী নিজের শিক্ষার অধিকারটুকু ঠিক করে আদায় করে নিতে সক্ষম হয় নি সেখানে দেনমোহরের বিরোধিতা করে তাদের অর্থনৈতিক নিরাপদ ব্যক্তিত্ব কী নির্মাণ করতে সক্ষম হচ্ছি? অনেক পুরুষ বিবাহের পূর্বে দেনমোহরের অর্থ উল্লেখ করলেও বিয়ের পর তা স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেন না। সম্ভবত দেনমোহর চাই কী চাই না এটি নারী বিষয় হলেও অর্থলোভী পুরুষরা দেনমোহর দেওয়ার বিরোধিতায় সামিল হতে পারে।

যারা দেনমোহর নেয় না সেসময় নারী’র অবশ্যই ব্যক্তিত্ব রয়েছে এর মূল কারণ তাদের অর্থনৈতিক শক্তি। মোদ্দা কথা হইল; নারী যদি রাষ্ট্রে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠে তাহলে এমনিতেই দেনমোহর প্রথার বিলুপ্তি সম্ভব। এছাড়া আমাদের সমাজে পিতার সম্পত্তি ভাগ কন্যা পায় না। মুসলিম সমাজে চার ভাগের এক ভাগ পেলেও হিন্দু সমাজের মেয়েদের সেটিও জুটে না। সুতরাং সমাজে পিতার সম্পত্তির উপর কন্যার সমান হক রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় দল ও সংস্থাগুলো অতীতের মতন বিরোধিতা করবে সুতরাং এই সমান হক প্রতিষ্ঠা করাও একটা সংগ্রামের ব্যাপার। অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীন সমাজে নারী অবমাননার কথা বলে দেনমোহরের বিরোধিতা করা কিংবা বন্ধের দাবী তোলা কিলাইয়ে কাঁঠাল কাঁপানোর মতন অবস্থা। কারণ নারী’র ব্যক্তি হয়ে উঠার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কও বিদ্যমান। তাই অর্থনৈতিক ও শিক্ষার উন্নতি ছাড়া সমাজের অনেক প্রথা বাতিল করা সম্ভব হবে না। আলো আসলে যেমন আঁধার দূর হয় তেমনি অর্থনৈতিক ভিত নির্মাণ হলে দেনমোহর প্রথার বিলুপ্তি স্বাভাবিকভাবেই ঘটবে। এর আগে যে যতো কথাই বলুক না কেন সেগুলো মুখেই থাকবে সমাজে কোন পরিবর্তন আনবে না। সবচেয়ে স্মরণে রাখা প্রয়োজন এই প্রথা ভাঙার জন্যে এগিয়ে আসতে হবে স্বয়ং নারী’কে, পুরুষকে নয়। পুরুষ হয়তো সহযোগী হিসেবে থাকতে পারে এর বেশিতে নয়।

৭ thoughts on “দেনমোহরের এপিঠ ওপিঠ

  1. বিয়ে; দেনমোহর এগুলো তো
    বিয়ে; দেনমোহর এগুলো তো আপনাদের জন্য নয়। যারা ধর্মীয় আইন মানে তাদের জন্য। দেনমোহর ছাড়া মুসলিমদের বিয়ে হয় না।
    আপনারা তো দেহসর্বশ্য লিভটুগেদার করেন। যেখানে বিয়ে; দেনমোহর; উত্তরাধিকার ইত্যাদির কোন বালাই নেই।
    ধর্মিয় সমালোচনার চাইতে আত্নসমালোচনা বেশী জরুরী।

    1. লেখাটার সাথে কী আপনার রুচিহীন
      লেখাটার সাথে কী আপনার রুচিহীন কমেন্টটি যায়? নাকি সব জায়গায় এসব অসভ্য কমেন্ট করার একটা বাতিক আছে।… ফালতু কমেন্ট আমি যদি করি তাহলে হজম করা কষ্ট হয়ে যাবে কইলাম।

      1. আপনি আমার মন্তব্যে আহত হয়ে
        আপনি আমার মন্তব্যে আহত হয়ে থাকলে আমি দুঃখিত। আসলে আমি বলতে চেয়েছি প্রত্যেক ধর্মেই বিয়ের আলাদা আলাদা নিয়ন কানুন আছে। ইসলাম ধর্মমতে বিয়েতে দেনমোহর আদায় না করলে বিয়ে শুদ্ধ হবে না। যেমন আপনাদের ধর্মে অগ্নিদেবতাকে ঘিরে সাত পাক ঘোরা একটি নিয়ম ঠিক তেমনি। কেউ যদি দেনমোহর আদায় না করে বিয়ে করতে চায়, তবে আইনত সেই বিয়ে শুদ্ধ নয়।
        এরকম একটা ইনভ্যালিড বিয়ে করা বা না করা একই কথা।
        আশা করি বুঝতে পেরেছেন।

        1. হিন্দু ধর্মের অনেক রকম বিয়ে
          হিন্দু ধর্মের অনেক রকম বিয়ে আছে।

          কাবিন ইস্যুতে আইনত শুদ্ধ নয় কিংবা অশুদ্ধ সেটি বলার আপনি রাইট আছে। আপনার বক্তব্যটি চলে গেছে লেখার বাহিরে। আমি দেখাতে চাচ্ছি কোন প্রেক্ষিতে কীভাবে একটি সমাজের আইন নিষিদ্ধ করা সম্ভব হয় কিংবা কোন প্রেক্ষিতে বিষয়গুলো হতে পারে।

          লিভটুগেদার একটি সমাজে আসতে গেলেও সামাজিক কিন্তু শর্ত পূরণ করতে না। না হলে লিভটুগেদার শরীর ভোগ ছাড়া ভিন্ন কিছু হিসেবে প্রকাশ পায় না। সব কিছুর পেছনে ফিলসফি কিংবা আদর্শ, দর্শন কাজ করে। অনুকরণ প্রিয়তায় আমরা আগ্রহী হওয়ায় ভেতরের আর্দশটুকু অনেকেই ধরতে পারে না। আপনি লিভটুগেদার বিরুদ্ধে কথা বলতেই পারেন। সেই অধিকার অবশ্যই আপনার আছে। কিন্তু ভাষা ব্যবহার যদি সুন্দর না হয় তাহলে দেখা যাবে প্রতিপক্ষ একই রুচিতে কথা বলছে। এটি সবার বেলায় প্রযোজ্য।

  2. দেনমোহর হচ্ছে বর্তমানে
    দেনমোহর হচ্ছে বর্তমানে নারীদের কিনে নেওয়া। যত বেশি সুন্দরী তত বেশি দেনমোহর কথাটা ঠিক। কিন্তু কতজন নারী তার জীবদ্দশায় দেনমোহর পায়? আর কচি মেয়েদের বিয়ে করলেতো কথাই নেই। স্বামী মারা গেলে স্বামীর কোন আত্মীয় স্ত্রীর কাছে মাপ চাইলেই শেষ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *