আমরা যেটাকে গল্প বলি

আমরা বা আমাদের আশে পাশের যারা আছি, আমরা একটা লেখাকে কি কি ভাগে ভাগ করি? গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কৌতুক, রম্যগল্প ইত্যাদি। এসবেই হয়ে যায়? না হয় না। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ আসলে দু’ভাগে বিভক্ত। গদ্য আর পদ্য। আমরা আসলে এসবের চর্চা করি না। আসলে এসব চর্চা করার সময়টাও নেই আমাদের। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এমন।

আজকে গদ্য নিয়ে কিছু কথা বলি।

আমরা বা আমাদের আশে পাশের যারা আছি, আমরা একটা লেখাকে কি কি ভাগে ভাগ করি? গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কৌতুক, রম্যগল্প ইত্যাদি। এসবেই হয়ে যায়? না হয় না। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ আসলে দু’ভাগে বিভক্ত। গদ্য আর পদ্য। আমরা আসলে এসবের চর্চা করি না। আসলে এসব চর্চা করার সময়টাও নেই আমাদের। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই এমন।

আজকে গদ্য নিয়ে কিছু কথা বলি।
গদ্য বলতে সেটা, যেটাকে আমরা গল্প বলি। প্রথমে আসি গল্প কি? গল্প হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গল্পসমগ্র’, কিংবা হুমায়ূন আহমেদ, অ্যাডগার অ্যালান পো, জ্যাক লন্ডন, টমাস হার্ডি, লুস্যন, ফ্রাৎস কাফকা, জ্যাঁ পাল সাঁত্রে, গি দ্য মোঁপাসা, মুজতবা আলী যা লিখেছেন তা ই গল্প। আসলেই তাই?

আসলে সবই গল্প না, কিন্তু সবই গদ্য। গল্প বিভিন্ন ধরণের হয়। ছোটগল্প, অনুগল্প, বড়্গল্প। হুমায়ূন আহমেদ যা লিখতেন লিটল ম্যাগ কিংবা উন্নত সাহিত্য পত্রিকায় সেটা বড়গল্প হিসেবে চলে। মানে বড় গল্পের আকারটা আসলে তেমন। বই হিসেবে বাজারের ছাড়ার জন্য সেটাকে আমরা উপন্যাস হিসেবে পড়ি। গল্পের মধ্যে ‘ছোটগল্প’ বিভাগটিই সবচেয়ে সৃজনশীলতা আর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু ছোটগল্প লিখেই বিখ্যাত হয়ে যাওয়া লেখকের সংখ্যা কম নয়। তাইলে ছোটগল্প কি? ছোটগল্প নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বর্ষাযাপন’ কবিতার সেই বিখ্যাত উক্তি কমবেশি আমাদের সবারই জানা। “ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা/ নিতান্ত সহজ সরল/ সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি/ তারি দু-চারটি অশ্রু জল/ নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা/ নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ/ অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে/শেষ হয়ে হইল না শেষ…।” এই পদ্যদ্যাংশে ছোটগল্পের যে সকল গুণাগুণ বর্ণনা করা হয়েছে তা বহু ছোটগল্পের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এ সকল গুণাগুণের অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য সমন্বিত ছোটগল্প প্রায়শই লিখিত হয়ে থাকে।

“গল্পগুচ্ছ” গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে সকল ছোটগল্প সংকলিত সেগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প হিসাবে অদ্যাবধি বিবেচনীয় এবং বহুল পঠিত। বাংলা ছোটগল্পের সার্থক স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ‘ঘাটের কথা’ ছোটগল্পটি বাংলাভাষার প্রথম সার্থক ছোটগল্পের স্বীকৃতি পেয়েছে। অতঃপর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বনফুল, (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়), বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, আশাপূর্ণা দেবী, জগদীশ গুপ্ত প্রমুখের রচনানৈপুণ্যে বাংলা ছোটগল্প নতুন দিগন্তে প্রবেশ করেছে। ছোট করে বিশাল একটা ভাব প্রকাশ করাই ছোট গল্পের কাজ। সব ছোটগল্পই গল্প বটে কিন্তু সব গল্পই ছোটগল্প নয়। একটি কাহিনী বা গল্পকে ছোটগল্পে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য কিছু নান্দনিক ও শিল্পশর্ত পূরণ করতে হয়। ছোটগল্পের সংজ্ঞার্থ কী সে নিয়ে সাহিত্যিক বিতর্ক ব্যাপক।

এবার আসি গদ্যের কথা। গদ্য কি?
আমরা মুখে যা বলি তা লেখায় প্রকাশ করাই হচ্ছে গদ্য। বাংলা পদ্যের ইতিহাস শুরু হয়েছে চর্যাপদ থেকে; কিন্তু গদ্যের ইতিহাস ততটা প্রাচীন নয়। গদ্যের চারিত্র্য নির্ভর করে শব্দের ব্যবহার এবং বাক্যে পদ (শব্দ) স্থাপনার ক্রমের ওপর। আধুনিক যুগে গদ্যের প্রধার দুটি ব্যবহার হলো কথাসাহিত্য এবং প্রবন্ধ। আঠার শতকে বাঙ্গালা গদ্যের বিকাশ সূচীত হয়েছিল একটি সরল কাঠামো নিয়ে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বাল্মীকির জয়-এর আলোচনা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুরু করেছিলেন এই ভাবে :

“বঙ্গদর্শনে যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, পুনর্মুদ্রিত হইলে তাহা বঙ্গদর্শনে সমালোচিত হইয়া থাকে না। ‘বাল্মীকির জয়’ কিয়দংশে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল কিন্তু গ্রন্থের অধিকাংশই বঙ্গদর্শনে বাহির হয় নাই। উহার যে অংশ প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহাও বিশেষরূপে পরিবর্তিত হইয়া পুনর্মুদ্রিত হইয়াছে। এ অবস্থায় আমরা সমালোচ্য গ্রন্থ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হইয়াছিল বলিয়া স্বীকার করিতে পারি না। অতএব পাঠক যদি অনুমতি করেন, তবে ইহার সমালোচনায় প্রবৃত্ত হই। সম্পাদকের অনুমতি পাইয়াছি।”

লক্ষ্যণীয় যে, এখানে বাক্যের দৈর্ঘ্য সীমিত। সীমিত দৈর্ঘের বাক্য ধারণ করেছে এক-একটি সাধারণ বক্তব্য। বাক্যপ্রকরণের এই অবক্র চারিত্র্য আধুনিক বাংলা গদ্যের প্রাণপুরুষ প্রমথ চৌধুরীর রচনাতেও অব্যাহত থেকেছে।

বাঙলা আদি গদ্য:
পর্তুগীজ ধর্মপ্রচারক মানোএল দা আস্‌সুম্পসাঁউ-এর রচনা রীতি বাংলা গদ্যের অন্যতম আদি নিদর্শন। ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কৃপার শাস্ত্রের অর্থ ভেদ গ্রন্থ থেকে নিম্নরূপ উদাহরণ দেয়া যেতে পারে:

গুরু- অপূর্ব্ব কথা কহিলা। কিন্তু কেহ কহিবে আমি মালা জপি না ; তথাচ আন ধরণ ভজন করি ; জপি খিস্তর কাছে, আর আর সিদ্ধারে ভজনা করি, এহি ভজনার কারণ আশা রাখি স্বর্গের যাইবার, তাহান কৃপায়। তুমি কি বল।

শিষ্য- যে আমি কহি, তাহা তুমি শোন ; সকল যত ভজন ভালো, কিন্তু বিনে ঠাকুরাণী ভজনায় কিছু নাহি, এবং ঠাকুরাণী ভজনা বিনে আর যত ভজনায় বাছ মুক্তি পাইবার পাপ না করিলে। এবং ঠাকুরাণীর ধ্যান সকলের অতি উত্তম মালার ধ্যান। আশ্চর্য বুঝা শোন। (পৃষ্ঠা-৫৪)

প্রথম বাঙালা উপন্যাসের ভাষা
প্যারীচাঁদ মিত্র রচিত আলালের ঘরে দুলাল বাঙালা ভাষায় রচিত আদি গদ্যসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এটি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এই গ্রন্থের ভাষা ‘আলাল ভাষা’ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থে কথ্যরূপী গদ্য একটি পৃথক লেখ্য রূপে উন্নীত হয়।

“বেণীবাবু এ বিষয় ভালো বুঝিতেন এবং তদনুসারে চলিতেন। তিনি প্রাতঃকালে উঠিয়া আপনার গৃহকর্ম সকল দেখিয়া পুস্তক লইয়া বিদ্যানুশীলন করিতেছিলেন। ইতিমধ্যে চোদ্দ বৎসরের একটি বালক-গলায় মাদুলি-কানে মাকড়ি, হাতে বালা ও বাজু, সম্মুখে আসিয়া ঢিপ করিয়া একটি গড় করিল। বেণীবাবু এক মনে পুস্তক দেখিতেছিলেন বালকের জুতার শব্দে চম্কিয়া উঠিয়া দেখিয়া বলিলেন, ‘এসো বাবা মতিলাল এসো- বাটির সব ভালো তো ?’ মতিলাল বসিয়া সকল কুশল সমাচার বলিল। বেণীবাবু কহিলেন- অদ্য রাত্রে এখানে থাকো কল্য প্রাতে তোমাকে কলিকাতায় লইয়া স্কুলে ভর্তি করিয়া দিব।”

আধুনিক বাংলা গদ্য
বাংলা গদ্য শুরুতে ছিল সংস্কৃতি গদ্যের চালে রচিত যার প্রমাণ বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ। প্রমথ চৌধুরী বাংলা গদ্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরোয়া’র আলোচনা থেকে প্রমথ চৌধুরীর গদ্যরীতির সুস্পষ্ট পরিচয়ে মেলে। তিনি লিখেছেন :

‘শ্রীযুক্ত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরোয়া’ পড়লুম। চমৎকার বই। ঘরোয়া মানে ঠাকুর পরিবারের ঘরের কথা। . . . অবনীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র, এবং স্বগুণে স্বনামধন্য, সুতরাং তাঁর কোনও পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। তিনি চিত্রবিদ্যায় একজন আর্টিস্ট বলে দেশে বিদেশে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জ্জন করেছেন। কিন্তু এ পুস্তকে তিনি নিজের কৃতিত্ব বিষয়ে কোনও কথা উল্লেখ করেন নি। তিনি ঠাকুর পরিবারের ঘরোয়া কথা বলেছেন। পূর্ব্বে বলেছি এ-পুস্তক ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস নয়, তাই বলে উপন্যাসও নয়।’

এ গদ্যকাঠমোর চারিত্র্য ঋজু এবং প্রাঞ্জল। অনেকটাই মুখের ভাষার কাছাকাছি যদিও তাতে প্রকাশক্ষমতা হ্রাস পায় নি।

রবি ঠাকুরের গদ্য
পরিচয়-এর কার্তিক ১৩৩৮ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগদীশ গুপ্তের লঘু-গুরু গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। আলোচনার বিস্তারে রবীন্দ্রনাথ কেবল লঘু-গুরুর মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকেন নি, সাহিত্যেও মান-মর্যাদা নিয়েও দু’চারটি কথা বলেছেন :

‘সাহিত্যে সম্মানের অধিকার বহির্নির্দিষ্ট শ্রেণী নিয়ে নয়, অন্তর্নিহিত চরিত্র নিয়ে। অর্থাৎ, পৈতে নিয়ে নয়, গুণ নিয়ে। আধুনিক একদল লেখক পণ করেছেন তাঁরা পুরাতনের অনুবৃত্তি করবেন না। কোনোকালেই অনুবৃত্তি করাটা ভালো নয়, এ কথা মানতেই হবে। নরসংহিতাসম্মত ফোঁটা-তিলকটা, আধুনিকতাও গতানুগতিক হয়ে ওঠে। সেটার অনুবৃত্তিও দুর্বলতা। চন্দনের তিলক যখন চলতি ছিল, তখন অধিকাংশ লেখা চন্দনের তিলকধারী হ’য়ে সাহিত্যে মান পেতে চাইত। পঙ্কের তিলকই যদি সাহিত্যসমাজে চলতি হয়ে ওঠে, তা হলে পঙ্কের বাজারও দেখতে দেখতে চড়ে যায়।’

লক্ষ্যণীয় যে, যে রবীন্দ্র-গদ্য মননশীলতায় ঋদ্ধ ; তথাপি তাঁর ভাষার গাঁথুনিতে তেমন কোন জটিলতা পরিদৃষ্ট হয় না। রবীন্দ্রনাথ স্বীয় চিন্তা-চেতনাকে বোধগম্য ক’রে প্রকাশ করার সুললিত একটি ভঙ্গী বেছে নিয়েছিলেন।

১৮০১ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাঙলা গদ্য সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয়। এবং এজন্যই গদ্য সাহিত্যকে বলা হয় আধুনিক সাহিত্য। গদ্য সাহিত্য প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বলা হয় ‘গদ্যসম্রাট’।

(উইকি’র সাহায্য নিয়ে লেখা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *