আচ্ছা ভালোবাসা কি ?

চুপচাপ শুয়ে আছে ইবুন ।তার এখন শুয়ে থাকার কথানা । আজ তার মন খারাপ ।মন খারাপ থাকলে মানুষ সবসময় ব্যতিক্রমী কিছু করে । অন্য সময় হলে সে ভার্চুয়াল ঘরে গিয়ে সমুদ্রের পাড়ে হেটে বেড়ানোর চেষ্টা করতো অথবা বই পড়তো । বই পড়া তার অনেক পছন্দের একটা কাজ । কিন্তু আজ ইচ্ছে করছে না । আজ ইউনিভার্সিটিতে যা হলো তাই নিয়ে সে চিন্তা করছে ।ইবুন মানবীয় অনুভূতি এবং আবেগ নিয়ে পড়াশোনা করে । আজকে সে তার শিক্ষককে প্রশ্ন করেছিল ভালোবাসা কি ? শিক্ষক এই প্রশ্নটা শুনে তাকে বলেছে সে নাকি ক্লাসে অপ্রাসংগিক প্রশ্ন বেশি করে । এর পরে এমনটি হলে তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হবে । সে খুবই অবাক হয়েছে সে একটি প্রাচীন বই পড়েছিল যেখানে একটা মানবীয় আবেগকে ভালোবাসা নামে প্রকাশ করা হয়েছে । তার পড়ার বিষয়ের সাথে ব্যাপারটা কিভাবে অপ্রাসংগিক হয়ে যায় ? ইবুন কিরিকে ডাকলো । কিরি তার কাজে সহযোগিতার জন্য রোবট । কিরি সব প্রশ্নের উত্তর জানে । কিরিকে ইবুন জিজ্ঞেস করলো ভালোবাসা কি ? কিরি সাধারনত কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে ১ ন্যানোসেকেন্ডের বেশি সময় নেয় না । এক্ষেত্রে সে ১ সেকেন্ড লাগিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করলো মহামান্য ইবুন , ভালোবাসা নিয়ে আমার ডেটাবেজে কোন তথ্য নেই ।তাই আমি কেন্দ্রীয় তথ্য কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে অনেক সময় লেগে গেলো ,সেজন্য আমি দুঃখিত । ইবুন তাকে থামিয়ে বলল তোমার কাছে ১ সেকেন্ড অনেক সময় হতে পারে কিন্তু মানুষের কাছে কিছুই না তুমি যা জেনেছো আমাকে তা জানাও । সে বলতে শুরু করলো সাধারনত তথ্য ভান্ডারে সবকিছুরই অনেক বিস্তারিত তথ্য দেওয়া থাকে কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ভালোবাসা নিয়ে খুব কম তথ্যই আছে । ভালোবাসার সংজ্ঞা দেওয়া আছে ভালোবাসা হলো নিষ্প্রয়োজনীয় অতি প্রাচীন মানবীয় আবেগ । প্রাচীনকালে ভালোবাসা মানুষের মধ্যে খুব আলোড়ন তৈরী করেছিল । এমনকি একটি দিনকে ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হতো । ভালোবাসার কারনেই মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল । কিরি এবার থেমে গিয়ে বলল মহামান্য ইবুন আমি কি আপনার জন্য আরো কিছু করতে পারি ?এর চেয়ে বেশী কোন তথ্য আমার কাছে নেই । ইবুন বলল দরকার নেই ।

অনেক বড় একটা টেবিলের চারদিকে অনেকগুলো লোক বসে আছে। দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই কিন্তু তারা প্রত্যেকেই রোবট । তারা সবাই চিন্তিত । এর কারন ইবুন । ইবুনের ভালোবাসা নিয়ে আগ্রহ তাদের চিন্তার কারন । মানবসভ্যতা ধ্বংসের পর গুটিকতক মানবশিশু আর রোবটগুলো সার্ভাইভ করতে পেরেছিল । তারপর থেকেই পৃথিবী চলে রোবটদের শাসনে । মানবশিশুগুলোকে আলাদা আলাদা ভাবে রোবটদের মাঝে বড় করা হয়েছে যেখানে ভালোবাসা বলে কিছু ছিলনা । এই রোবটদের মাধ্যমে তাদের উপর নজর রাখা হতো । নতুন শিশু জন্মের ব্যাপারটাও তারা ল্যাবেই সম্পন্ন করেছে । তারপরেও ইবুনের এই আগ্রহ তাদের ক্ষতির কারন হতে পারে । তারা সেটা হতে দিতে পারে না । কিছুতেই পারে না ।

ইবুন জেগেই ছিল । কেন জানি মনে হচ্ছে আজ কিছু একটা হবে । সে অনেক কিছুই বুঝে ফেলেছে । মানুষ হওয়ার যেমন সুবিধা আছে তেমনি অসুবিধাও আছে । মানুষের আন্দাজ বেশীরভাগ সময় শতভাগ মিলে যায় । ঘরের মধ্যে আলো ছিল না । খুট করে একটা শব্দ হলো ইবুন তাকিয়ে দেখলো কিরি । তার দুই চোখের লাল আলো ঘরের ভিতরের পরিবেশটা মায়াময় করে তুলেছে । ইবুন কোন একজনকে আশা করেছিল কিন্তু কিরিকে নয় । সে ভুলেই গিয়েছিল কিরিও একটা রোবট । কিরি কথা বলে উঠলো মহামান্য ইবুন আপনি এখনো জেগে আছেন ? ইবুন বলল আমি অপেক্ষা করছিলাম । কিরি জিজ্ঞেস করলো আপনি কি করে জানেন যে আমি আসব ? ইবুন হাসার চেষ্টা করে বলল আমি জানতাম কেও একজন আসবে । ইবুন এখন নিশ্চিতভাবে জানে পৃথিবী ভালোবাসার জন্য ধ্বংস হয়নি । পৃথিবী ধ্বংস হয়েছিল স্বার্থ , হিংসা আর ঘৃনার জন্য । ভালোবাসা কোন জিনিস ধ্বংস করতে পারে না । শাসক রোবটরা জানে শুধুমাত্র ভালোবাসার জোরেই পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠতে পারে । যেখানে তাদের কোন প্রয়োজন নেই । আর এটা জানে বলেই মানুষদের ভালোবাসা ছাড়া বড় করে তোলা হচ্ছে । কিন্তু মানুষকে ভালোবাসা শেখানোর প্রয়োজন পড়েনা । এটা বোকা রোবটরা জানেনা । আপনি হাসছেন কেন মহামান্য ইবুন ? কিরির প্রশ্ন শুনে ইবুন যেন বাস্তবে ফিরে এলো । ইবুন জানে কিরি কেন এসেছে । ইবুন বলল কিরি তুমি যে কাজে এসেছো সেটি করে ফেলো । আমার কোন দুঃখ নেই কারন কাজটি তুমি করছো । তুমি আমাকে ছোট থেকে বড় করে তুলেছ । যদিও তুমি রোবট ।কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি । ইবুন আরো কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল কিন্তু আচমকা এক ধাক্কায় সে ১৪ তালার বাসা থেকে নিচে পড়ে গেলো । একবার নিচের দিকে তাকিয়ে কিরি বলে উঠলো আমি দুঃখিত মহামান্য ইবুন । আমাকে যেমনটি বলা হয়েছে আমি তেমনটিই করেছি ।

কিছুদিন পর কিরিকে দেখা গেলো একটা বইয়ের দোকানে । সে বই কিনে বাড়ি ফিরছে আর বিড়বিড় করে বলছে আমিও তোমাকে ভালোবাসি ইবুন । একটা বাচ্চা তার পরিচারক রোবটকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো এই রোবটটার কি হয়েছে ? পরিচারক রোবটটি উত্তর দিলো মহামান্য লারা রোবটটির যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছে তাই অর্থহীন কথা বলছে । লারা এবার জিজ্ঞেস করলো আচ্ছা ভালোবাসা কি ?

#অফটপিক
ভালোবাসাকে আসলে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব না । ভালোবাসা যেমন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তেমনি সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও । অনেকে বলেন ভালোবাসা নিঃস্বার্থ । কিন্তু ভালোবাসা নিঃস্বার্থ নয় । ভালোবাসাতেও স্বার্থ থাকে আর সেটা হলো ভালোবাসা পাওয়ার স্বার্থ । ভালোবাসা পাওয়ার ব্যাপারটাকে এড়িয়ে ভালোবাসা যায় না বিধায় কোন ভালোবাসাই নিঃস্বার্থ না ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *