এডওয়ার আল্‌ খার্‌রাত – বিশ্ব সাহিত্যের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়

আধুনিক মিশরীয় কথা সাহিত্যের অন্যতম রূপকার, প্রথিতযশা সাহিত্যিক এবং অধুনা আরব কথা সাহিত্যের প্রধানতম একজন পথপ্রদর্শক এডওয়ার আল খার্‌রাত। তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচক এবং প্রবন্ধকার। উল্লেখ্য প্রতিটি শাখায়ই তিনি তাঁর অসামান্য প্রতিভার দৃঢ় ছাপ রেখেছেন অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে এবং সেই সাথে সমৃদ্ধ করেছেন মিশরীয় তথা আরব সাহিত্য সহ বিশ্ব সাহিত্যকে। প্রাণশক্তি হারিয়ে ধুঁকতে থাকা মিশরীয় সাহিত্যকে নতুন প্রাণ দান করার পাশাপাশি তাঁর অসামান্য মৌলিক লেখনী শক্তি একইসাথে বিশ্ব সাহিত্যে উন্মোচন করেছে নতুন দ্বার। ষাটের দশকে মিশরের প্রধানতম আরব সাহিত্যিকদের একজন ছিলেন তিনি। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের পাশাপাশি তিনি বামধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং ত‌ৎকালীন মিশরের বাম সংগঠনগুলোর আন্দোলন-সংগ্রামে বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

এডওয়ার আল খার্‌রাতের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৬ মার্চ মিশরের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেক্সান্দ্রিয়ার এক কপটিক খ্রিস্টান (সেন্ট মার্ক প্রতিষ্ঠিত চার্চের অনুসারী খ্রিস্টান সম্প্রদায়) পরিবারে। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই তিনি তাঁর পিতাকে হারান এবং সেই বয়সেই পড়াশোনার পাশাপাশি ব্রিটিশ নেভি ডিপো-তে ছোট্র একটা চাকরী নিয়ে পরিবারের রুটি-রুজির দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নেন। পরিবারের কঠিন দায়ভার থাকা স্বত্ত্বেও শত প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে আল খার্‌রাত ১৯৪৬ সালে আলেক্সান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেন। আইন পড়া শেষ করার পরপরই তিনি বাম রাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েন এবং সেই ‘অপরাধে’ ১৯৪৮ সালের মে মাসের ১৫ তারিখে তিনি কারাবন্দী হন। প্রায় দু’ বছর কারাবাস ভোগ করার পরে ১৯৫০ সালে তিনি মুক্তি পান। কারামুক্তির পরে তিনি আলেক্সান্দ্রিয়ায় ‘ন্যাশনাল ইনসিওরেন্স কোম্পানি’-তে চাকরী শুরু করেন এবং সেখানকার এক সহকর্মীকে বিয়ে করেন। ১৯৫০ –এর মাঝের দিকে তিনি কায়রোতে চলে আসেন এবং রোমানিয়ান দূতাবাসে প্রেস অফিসার হিসেবে যোগদান করেন।

মিশরীয় সাহিত্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী ঔপন্যাসিক বলা হয় আল খার্‌রাত-কে। ১৯৫৮-৫৯ সালে তিনি তাঁর প্রথম গ্রন্থ “হিতান আ’লিয়া” প্রকাশ করেন। যেটি ছিল মূলত কিছু ছোট গল্পের সংকলন। মিশরের বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচক সাব্‌রি হাফিজের ভাষায় যা ছিল “স্রোতের বিপরীতে সাঁতার” অর্থা‌ৎ ত‌ৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীতে এক দু:সাহসিক লেখনী। বইটি একইসাথে যেমন ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থার দাবীতে মুখর তেমন নতুন নতুন শব্দ চয়ন এবং ভিন্ন ভঙ্গিমার উপস্থাপনে নতুন এক ধারার লেখনীর সূচনায় অনন্য। এর পরে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে ব্যাপক সাড়া জাগানো এই লেখক ১৯৭২ এবং ১৯৭৯ সালে যথাক্রমে “সা’ত আল্‌ কিবরিয়া” এবং “ইখ্‌তিনাখাত আল-ইশ্‌ক ওয়াল সাবাহ্‌” বই দু’টির মাধ্যমে পাঠকের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হন। ১৯৮০ সালে পূর্ণাঙ্গরূপে প্রকাশিত হয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রথম উপন্যাস “রামা এ্যান্ড দ্য ড্রাগন”। মূলত: এই বইটিই আরব সাহিত্যে এক নতুন মাইলফলকের উন্মোচন করে। আল-খার্‌রাত নিজে এই বইটিকে “অনুবাদ অসম্ভব” বলে আখ্যায়িত করেন। এর কারন ছিল বইটির মৌলিকতা। যদিও বইটি ২০০২ সালে “নাগিব মাহফুজ মেডেল ফর লিটারেচার” জেতার পরে ফেরিআল ঘজউল এবং জন ভার্লেনডেন নামক দু’জন বিখ্যাত অনুবাদকের যৌথ প্রয়াসে এর মূলভাবের একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। আরব রাইটার্স ইউনিয়ন বইটিকে আরব সাহিত্যের সেরা ১০০ টি উপন্যাসের র‍্যাংকিংয়ে এটিকে ৮ নম্বরে স্থান দিয়েছেন।

“রামা এ্যান্ড দ্য ড্রাগন” বইটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে একজন মুসলিম মহিলা রামা এবং তাঁর খ্রিস্টান প্রেমিক মিখাইলের প্রেম কাহিনীকে ঘিরে। মৌলিক এবং অত্যন্ত দুর্বোধ্য এই উপন্যাসটিতে মূল কাহিনীর পাশাপাশি চিত্রিত হয়েছে সমাজব্যবস্থা এবং পারিপার্শ্বিকতা। কাহিনীর মূল চরিত্রদুটি একইসাথে এখানে দু’টি আলাদা চরিত্র এবং সাথে সাথে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন জটিলতা-বাস্তবতার প্রতিনিধি। আল-খার্‌রাতের কালজয়ী অমর এই উপন্যাস কোন সাধারন পাঠকের জন্য নয় বরং প্রকৃত সাহিত্যানুরাগী এবং সমঝদার-রাই কেবল এই বইটির সাহিত্যরস আরোহনে সক্ষম।

আল খার্‌রাত এর প্রতিটি সাহিত্যকর্মই স্ব-মহিমায় ভাস্বর। তাঁর অন্যান্য উপন্যাসগুলোও তিনি নিজস্ব ধারা বজায় রেখে লিখে গেছেন। সেগুলোর মধ্যে – “আল-জামান আল-আখার (১৯৮৫)”, “তারাবুহা জা’ফারান”, “বানাত ই সেকেন্দ্রিয়া”, “স্টোনস অব ববেলো”-র নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি বই-ই মিশরীয় ভাষায় লেখা এবং পরে সেগুলো ইংরেজী সহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। এসব মহান সৃষ্টি তাঁকে দাঁড় করিয়েছে মার্সেল প্রাউস্ট এবং জেমস জয়েস-এর মত সাহিত্যিকের কাতারে।

মৌলিক লেখালেখির পাশাপাশি আল-খার্‌রাত সাহিত্যের মানোন্নয়নেও বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ষাটের দশক প্রতিভাবান এবং সমমনা লেখকদের নিয়ে তিনি অপ্রাতিষ্ঠানিক কিন্তু কার্যকর “সিক্সটিস জেনারেশন” নামক এক সাহিত্য সংঘ গড়ে তোলেন। যেখানে বেশিরভাগ কবি-সাহিত্যিক-ই ছিলেন তরুণ। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- সোনাল্লা ইব্রাহীম, বাহা তাহের, ইব্রাহীম আসলান, ইয়াহিয়া তাহের আব্দুল্লাহ এবং গামাল আল-ঘিতানী প্রমুখ। সবার মধ্যে তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ায় তিনিই ছিলেন মূলত: নেতৃস্থানীয় এবং সবার শ্রদ্ধাভাজন। বিভিন্ন সময়ে আল-খার্‌রাত তাঁর অভিজ্ঞতা এবং মূল্যবান পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে এসব তরুণ লেখকের প্রতিভা বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাদের মুখপত্র ছিল- “গ্যালারী ৬৮”, যার প্রতিষ্ঠা এবং সম্পাদনার দায়িত্বেও ছিলেন আল-খার্‌রাত। এছাড়া তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংস্থা যেমন- আফ্রো-এশিয়ান রাইটার্স এসোসিয়েশন, আন্তর্জাতিক সাহিত্য পত্রিকা “লোটাস” এর সম্পাদনার সাথেও ছিলেন সরাসরি সম্পৃক্ত।

এডওয়ার্ড আল-খার্‌রাতের লেখাগুলো সমাজ ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় আচার-ঐতিহ্য, আরবীয় সমাজ ব্যবস্থা, বাম আন্দোলন, বিচক্ষণ ব্যক্তিগত উপলব্ধি দ্বারা প্রভাবিত। এসব উপাদানের পাশাপাশি স্বীয় চিন্তাধারা এবং মৌলিক লেখনী শক্তিতে তিনি বলীয়ান। সব কিছু মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি কর্মই তাঁকে নিয়ে গেছে এক অভিন্ন উচ্চতায়। সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্যের সামনে খুলে দিয়েছে এক নতুন দ্বার। তিনি বলতেন – “আমি কেন লিখি? আমি জানিনা আমি কেন লিখি….সেটা হতে পারে আমি লিখতে বাধ্য হই অতি শক্তিশালী কোন ভেতরগত শক্তির প্রভাবে। আমি লেখাকে একটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করি। যে হাতিয়ার পরিবর্তন আনবে, পরিবর্তন আনবে আমার নিজের এবং বাকি সবার মধ্যে। সেই পরিবর্তন হবে অপেক্ষাকৃত ভাল এবং সুন্দর। বর্বরতা এবং একাকীত্বের গ্লানি ঘোচানোর একটা হাতিয়ার হবে লেখাগুলো…..” গত ০১ ডিসেম্বর, ২০১৫ তিনি মারা যান। শেষ হয় বিশ্বসাহিত্যের এক স্বর্ণযুগের ইতিহাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *