মাদ্রাসায় বাংলাদেশ-বিরোধী বই, নমনীয় কেন সরকার?

ইসলাম শিক্ষার নামে উগ্রবাদ ও জামায়াতী দর্শনের প্রচারণা, এবং বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিকৃতির মাধ্যমে কওমি ও আলীয়া মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশে একটি নতুন ধারা চালু করেছে যার উপর সরকার কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। প্রশাসনে জামায়াতীদের প্রভাব, এবং দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য আমলাদের কারণে এরা দিনকে দিন ক্ষমতাশালী হচ্ছে। ফলে ধর্মীয় উগ্রবাদকে অনুকরণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা এদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

ইসলাম শিক্ষার নামে উগ্রবাদ ও জামায়াতী দর্শনের প্রচারণা, এবং বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিকৃতির মাধ্যমে কওমি ও আলীয়া মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশে একটি নতুন ধারা চালু করেছে যার উপর সরকার কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। প্রশাসনে জামায়াতীদের প্রভাব, এবং দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য আমলাদের কারণে এরা দিনকে দিন ক্ষমতাশালী হচ্ছে। ফলে ধর্মীয় উগ্রবাদকে অনুকরণ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা এদের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
মাদ্রাসা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আরবি ও ইসলামের শিক্ষা বিভাগের পড়াশোনা যুগোপযোগী নয় এবং সেখানে কোরআন ও হাদিসের বিষয়সমূহ ঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেটের জন্য পড়াশোনা করছে এবং ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।

সুখের বিষয় হল আজকাল পত্রিকাগুলো মাদ্রাসা শিক্ষার নানা অজানা দিক নিয়ে লেখা প্রকাশ করছে। তবে বইয়ে ইতিহাস বিকৃতি ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত না করেও বছরের পর বছর ব্যবসা চালু রেখেছে কিছু বিতর্কিত প্রকাশনা সংস্থা, যাদের বেশিরভাগের সাথেই আবার জামায়াতে ইসলামী ও জঙ্গিবাদের ধারক-বাহক ইসলামী দল ও গোষ্ঠী জড়িত। নামকাওয়াস্তে কারণ দর্শানোর নোটিশ বা সতর্কতা দিয়েই তাদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া হচ্ছে। বুঝাই যাচ্ছে এরা ভয়ংকর ক্ষমতাশালী। অবশ্য এরকমই হবার কথা: সংবিধান থেকে অসাম্প্রদায়িকতা বাদ দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ঈশ্বর আল্লাহর প্রতি আস্থা প্রকাশ; ১১হাজার রাজাকারকে মুক্তি দেয়া; গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উগ্র-পাকিস্তানপন্থী দেশ বানানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া-এরশাদ বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৯ই এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ এবং প্রতিকার কমিটির সভা হয়। তাতে সিদ্ধান্ত হয়, কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার যেসব পাঠ্যপুস্তকে ধর্ম অথবা ইতিহাস বিকৃত করে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সুপারিশসহ জানাবেন। সে অনুযায়ী ১৫ই মে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ আলেম, মুফতি, মুফাসসির ও মুহাদ্দিস সমন্বয়ে গঠিত ২১সদস্যের কমিটি প্রতিবেদনটি তৈরি করে। এতে বলা হয়, জামায়াত-শিবিরের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা ১০টি প্রতিষ্ঠান বিতর্কিত বইগুলো প্রকাশ করেছে।

এগুলো হচ্ছে আল-ফাতাহ পাবলিকেশন্স, আল-বারাকা প্রকাশনী, পাঞ্জেরী প্রকাশনী, কামিয়াব প্রকাশনী, আল মদিনা প্রকাশনী, মিল্লাত প্রকাশনী, ইমতেহান প্রকাশনী, ইসলামিয়া কুতুবখানা, মাদ্রাসা লাইব্রেরি ও আল-আরাফা প্রকাশনী।
প্রতিবেদনে জামায়াতি ও মওদুদী দর্শনযুক্ত বই অবিলম্বে বাজার থেকে প্রত্যাহারসহ সাত দফা সুপারিশ করা হয়েছে।
জানা গেছে, উল্লেখিত প্রকাশনা সংস্থাগুলো পরবর্তীতে বই পুনর্মুদ্রণ করলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে সেটাই স্বাভাবিক।

পত্রিকায় প্রকাশিত কিছু বিকৃতির নমুনা:

# ‘ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কোনো কল্যাণমূলক মতবাদ পৃথিবীতে নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতার নামান্তর। ধর্মকে ধ্বংস করার কৌশল হিসেবে রচিত একটি অপতন্ত্র। এটি ইসলামী ধর্ম বিশ্বাসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।’ আলিম (একাদশ) শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য রচিত ‘ইসলামী পৌরনীতি’ বইয়ের ৩৮৭ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা অনুচ্ছেদের একাংশে বলা হয়েছে এসব কথা। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ সিলেবাস অনুযায়ী আল-বারাকা প্রকাশনী বইটি প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অনুমোদনের সিলও আছে।

# ইসলামিয়া কুতুবখানা রচিত আলিম শ্রেণির ‘ইসলামী পৌরনীতি’ বইয়ের ৩৬২ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে ‘মানব রচিত বাতিল ব্যবস্থাকে উৎখাতের চেষ্টার নামই হলো ইসলামী আন্দোলন। এই আন্দোলন সকল নবী-রসূলের আন্দোলন।’ পর্যালোচনা কমিটি মনে করছে, এসব লেখায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইসলামের বিষয়ে যুদ্ধ বা জিহাদের মনোভাব জাগ্রত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

# বর্তমানে ‘মুসলিম বিশ্বে’ ইসলামী মূল্যবোধ জাগ্রত রাখছে কারা? “মধ্যপ্রাচ্যে ইখওয়ানুল মুসলেমীন, ইন্দোনেশিয়ায় শরীয়ত পার্টি, মালয়েশিয়ায় প্যান মালোয়ান ইসলামী এ্যাসোসিয়েশন, ভারতীয় উপমহাদেশ ও আফগানিস্তানে জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রদের মধ্যে সাবেক ইসলামী ছাত্রসংঘ, ছাত্রশক্তি পরে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রভৃতি ছাত্র সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টায় মুসলিম সমাজে অভূতপূর্ব পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বা হচ্ছে।” [আলিম শ্রেণীর পৌরনীতি, আল ফাতাহ পাবলিকেশনস, বাংলাবাজার, ঢাকা, ২০১৩ পৃ. ৫৬]

# পাঞ্জেরী পবলিকেশন্সের বাংলা সহপাঠ সৃজনশীল বইয়ের ১৯৯ নম্বর পৃষ্ঠার ৬৪ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর জন্ম তারিখ কবে? চারটি উত্তর লিখে বলা হয়েছে ২০ মার্চ। ১৭ মার্চের স্থলে ২০ মার্চ উল্লেখ করা হলেও চারটি অপশনের কোথাও সঠিক দিনটি লেখা নেই। সেখানে ১৭ সংখ্যাটিই নেই।

# লেকচার পাবলিকেশন্সের এইচএসসি বাংলা সহায়ক প্রথম পত্র বইয়ের ২৫৮ নম্বর পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর মায়ের নাম সায়েরা খাতুনের পরিবর্তে লেখা হয়েছে সাহেরা খাতুন।

# লেকচার পাবলিকেশন্স লিখেছে, ‘শেখ মুজিবুর রহমান শোষণমুক্ত স্বপ্নের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।’

# মাদ্রাসার তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান ও সমাজপাঠ বইয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, দেশ পরিচিতি, ধর্মীয় জীবন, জীবন সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে কৌশলে পরিহার করা হয়েছে।

# সিলেবাস এমনভাবে প্রণীত হয়েছে যাতে বাংলাদেশ অধ্যায় স্থান না পায়। আলিম থেকে কামিল শ্রেণীর একাধিক বইয়েও মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জাতীয় পতাকা, শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধকে পরিহার করা হয়েছে।

# মাদ্রাসার পাঠ্যবইতে ধর্মীয় ও পারিভাষিক বানানের ক্ষেত্রে কোথাও সমতা রক্ষা করা হয়নি।

# পাঠ্যপুস্তক রচনায় যাদের নাম রয়েছে তারা অনেকেই লেখক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও পরিচিত নন। এমনকি আলেম হিসেবেও তাদের অনেকের পরিচিতি নেই।

সুপারিশঃ
মাদ্রাসার পাঠ্যবই জরুরি ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংশোধন করতে সাত দফা সুপারিশ করেছে পর্যালোচনা কমিটি। সুপারিশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

১. যেসব পুস্তকে জামায়াতি আদর্শ ও মওদুদী দর্শন তুলে ধরা হয়েছে সেগুলো অবিলম্বে বাজার থেকে প্রত্যাহার করা। যারা এসব কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেয়া সমীচীন। কারণ ইসলামের নাম ব্যবহার করে কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শ প্রচার জাতীয় চিন্তা-চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

২. বাজারে প্রচলিত পাঠ্য সহায়ক পুস্তকগুলোও পর্যালোচনা করার জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে পর্যালোচনা করা।

৩. মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে এনসিটিবির ন্যায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিকুলাম প্রণয়ন কমিটি, লেখক নির্বাচন কমিটি, সম্পাদক নির্বাচন কমিটি ও পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনা কমিটি থাকা প্রয়োজন। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ তৈরি করতে হলে এসব কমিটিতে বিশেষজ্ঞ আলেম, ওলামা, মুফতি, মুহাদ্দিস ও মুফাচ্ছিরদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি লেখক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে পাঠ্যপুস্তকে কেউ উদ্দেশ্যমূলক-ভাবে নিজেদের হীন দলীয় স্বার্থ হাসিল করতে না পারে।

৪. মাদ্রাসার উচ্চ শ্রেণীর বইও সরকারিভাবে প্রণয়ন ও বিতরণের ব্যবস্থা করা। আলিম থেকে কামিল পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন লাখ। তাদের বিনামূল্যে বই দিলে সরকারের যে আর্থিক ব্যয় হবে, তার চেয়ে রাষ্ট্রের কল্যাণ অনেক বেশি হবে।

আজ হোক, কাল হোক, মাদ্রাসা শিক্ষার উপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ আনতে না পারলে উগ্রবাদের বিস্তার আরও দ্রুত বাড়বে সন্দেহ নেই। আইনের দ্বারা হোক বা কাউনসেলিং, এসব বাংলাদেশ-বিরোধীদের সঠিক পথে আনতে না পারলে চলমান বিশৃঙ্খলা সবার জন্যই অমঙ্গল বয়ে আনবে।

৫ thoughts on “মাদ্রাসায় বাংলাদেশ-বিরোধী বই, নমনীয় কেন সরকার?

  1. কে বলে সরকার নমনীয়। সরকার খুব
    কে বলে সরকার নমনীয়। সরকার খুব শক্তভাবে এগুলো সাপোর্ট করছে। শফি জমি দিচ্ছে, একদিনে মাদ্রাসা সংস্কার না করে জঙ্গিবাদ উস্কে দিচ্ছে অন্যদিকে জঙ্গিদের পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করছে। এর পরও বলবেন সরকার কাজ করে না।

  2. মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণে
    মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণে সরকার যদি ব্যর্থ হয়, এ জাতির কপালে অপেক্ষা করছে চরম দুর্গতি। আমরা জাতি হিসাবে তলিয়ে যাব অতলে। ঠাঁইহীন এক অন্ধকার সমগ্র জাতিকে গ্রাস করবে। পৃথিবীর এমন কোন দেশ, অঞ্চল, গোষ্টির উদাহরণ কেউ দিতে পারবেনা, যারা মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যমে একটা ভাল প্রজন্ম বা জাতি তৈরি করতে পেরেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা হচ্ছে উত্তরণের পথ পরিক্রমায় পেছন থেকে টেনে নামিয়ে দেওয়ার অস্ত্র, অন্ধকারের নিকোষ কালো আগামীর নির্মানে বাঁধা একটা জগদ্দল পাথর। আমাদের জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর মুখোমুখি করতে একমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা চালু করতে হবে। মাদ্রাসগুলোকে জাতীয় পাঠ্যক্রমের আওতায় এনে ভন্ড ধর্ম ব্যবসায়ীদের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *