পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষন : বিচার কামনার চেয়েও বাঙালিকে ধর্ষক প্রমাণ করাটা যখন অধিক গুরুত্বপূর্ন

আজ কিছু ভিন্ন রকম কাহিনী বলবো। পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষন ও তার প্রতিবাদ এতো বেশি আপনারা শুনেছেন ও নিন্দা জানিয়েছেন যে সেটা নতুন করে কিছুই বলার নেই। আসুন আজ সেসবের সাম্প্রতিকতম কয়েকটি ঘটনার বিহাইন্ড দ্যা সিন দেখে নিই।

আজ কিছু ভিন্ন রকম কাহিনী বলবো। পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষন ও তার প্রতিবাদ এতো বেশি আপনারা শুনেছেন ও নিন্দা জানিয়েছেন যে সেটা নতুন করে কিছুই বলার নেই। আসুন আজ সেসবের সাম্প্রতিকতম কয়েকটি ঘটনার বিহাইন্ড দ্যা সিন দেখে নিই।

কেস স্টাডি ১: ৩ আগস্ট ২০১৪। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের ভাইবোনছড়া এলাকায় রচনা দেবী ত্রিপুরা নামের একজন পাহাড়ি নারীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। তাকে ধর্ষন করে খুন করা হয়েছিল [১]। মজার ব্যাপার কী জানেন? রচনা দেবী হত্যার প্রতিবাদে সামান্য একটি বিবৃতিও দেয়নি পাহাড়ি কোনো সংগঠন – ইউপিডিএফ বা জেএসএস। শুধুমাত্র ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ইউনিয়ন নামেমাত্র মানববন্ধন করেছিল খাগড়াছড়িতে [২]। তাও আবার কয়েকদিন আগে ইউপিডিএফ-এর হাতে একজন ত্রিপুরা মোটর সাইকেল চালকের নির্মম খুনের পর। তাহলে কেন এই নিরবতা? অন্য সময় হলে তো সারা দেশ জুড়ে ঘৃণা আর প্রতিবাদের আগুণে বিবৃতির কাগজ পুড়ে যেত। এবার কেন তা হলো না? কারণ হচ্ছে, এই ধর্ষন ও খুনের ঘটনায় জড়িত স্বয়ং ইউপিডিএফ।

কেস স্টাডি ২: ২০ আগস্ট ২০১৪। এবার রাঙ্গামাটির দেওয়ানপাড়া থেকে হৃদের জলে খুঁজে পাওয়া গেল বিশাখা চাকমার পচা গলা লাশ [৩]! ময়নাতদন্তে তাকেও ধর্ষণ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। অদ্ভুদ ব্যাপার হচ্ছে, ১৪ আগস্ট থেকে বিশাখা নিখোঁজ থাকলেও, প্রশাসনকে কিচ্ছু জানায়নি তার পরিবার [৪]। এবং তার লাশ খুঁজে পাবার পর, এখন পর্যন্ত ইউপিডিএফ বা জেএসএস সামান্য প্রতিবাদ টুকু জানায়নি! কেন? জেএসএস-এর তো মিডিয়া লিংক মারাত্মক ভালো। তারা এবার সামান্য প্রতিবাদও করলো না কেন? কারণ পাহাড়ি অধ্যুষিত এলাকায় এই ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত যার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তার নাম সঞ্জয় চাকমা। যিনি বিশাখা চাকমা’র ‘নিকটাত্মীয়’ও বটে। বাহুল্য তিনি জেএসএস সদস্য। আগেও এই বিশাখাকে ধর্ষন করতে গিয়ে মারাত্মক আহত করে এই সঞ্জয়। সেই ঘটনায় সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলেন বিশাখার বাবা, কিন্তু জেএসএস নেতাদের চাপে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন তিনি [৫]। কয়েকদিন আগে, রাঙ্গামাটিতে এক পর্যটক যুগলকে বিবস্ত্র করে যৌন মিলনে বাধ্য করে ভিডিও করার ঘটনায় সঞ্জয় ও তার চ্যালারা এখন পলাতক [৬]

মজার (এবং আক্ষেপের) বিষয় হলো, বিশাখা হামলার ধর্ষণ ও খুনের বিচার চেয়ে আয়োজিত মানববন্ধনে তার আত্মীয়-স্বজন ও গুটিকয়েক পাহাড়ি ছাড়া আর কেউ সামিল হন নি; হয়েছেন বাঙালিরা। মানববন্ধনের ছবিটা প্রথম আলো ছাপালেও, খবর ছাপে নি।

কেস স্টাডি ৩: ৫ জুন ২০১৪। ধর্ষনের পর খুন হন এনজিও কর্মী উ প্রু মারমা। ধর্ষক বিজয় তঞ্চঙ্গ্যাকে আটক করে পুলিশ [৭]। ঘটনার দুইদিন পর মোসলেম মিয়া নামের এক বাঙালি কাঠ ব্যাবসায়ী নিজের সেগুন বাগানে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে গাছ কাটতে যান। হঠাত করে তাকে বের করে পেটাতে শুরু করে স্থানীয় পাহাড়ি যুবকরা। পরে এসে অংশ নেয় মহিলারা [৮]। শ্রমিকরা পালিয়ে চলে আসলেও, মোসলেম উদ্দীন পারেননি। তাকে মহিলারা পিটিয়ে মেরে ফেলে। সাথেই দাঁড়িয়ে ছিল পুলিশ। কিন্তু যুবকেরা পুলিশকে বাঁধা দেয়, আর মহিলারা লোহা দিয়ে বা বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে মারে মোসলেম মিয়াকে। পুলিশ কিচ্ছুই করতে পারেনি। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে এরপর রটানো হয়, এই মোসলেম মিয়াই উ প্রু মারমার ধর্ষক, তাই মহিলারা তাকে পিটিয়ে মেরেছে। কিন্তু আসল কথা হচ্ছে মহিলাদের দিয়ে মারানো হয়েছিল, কারণ মহিলাদেরকে কিছুই করতে পারবে না পুলিশ। হয়েছেও তাই। পুলিশ ওই মহিলাদের থানায় ডাকলেও কেউ আসেনি! কোনো মিডিয়ায় আসেনি মোসলেম মিয়ার হত্যার নিউজ! অথচ সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও পর্যন্ত বের হয়ে গিয়েছিল। ভিডিওটি দেখলে অনেক কিছুই বুঝতে পারবেন [৯]

এখানে কাজ হলো দু’টো। এক. একজন বাঙালিকে খুন করা হলো। দুই. এক পাহাড়ি ধর্ষককে বাঁচালো, পাছে দোষ চাপলো বাঙালির ওপর।

কেস স্টাডি ৪: ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৪। খাগড়াছড়ি জেলা শহর থেকে প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার দূরে কমলছড়ির একটি পাহাড়ি গ্রাম। সেই গ্রামটা কিছুটা গহীনে হওয়ায় সেখানে বাঙালিদের প্রয়োজন বা নিরাপত্তা কোনোটাই নেই। সেরকম একটি গ্রামে বাড়ির পাশের একটি ক্ষেতে লাশ পাওয়া যায় সবিতা চাকমার। কেউ বলতে পারে না, কে খুন করেছে তাকে। কিন্তু পাহাড়ি সংগঠনগুলো শুরু করলো আন্দোলন-প্রতিবাদ। তাদের দাবি সবিতাকে ধর্ষন করে খুন করা হয়েছে। এমনকি শাহবাগেও সবিতা চাকমা ‘ধর্ষন’ ও খুনের ঘটনায় মানবন্ধন হয়েছে। সেখানে বিচার চাওয়া হয়েছে কোথাকার কোন এক বাঙালি ট্রাক্টর ড্রাইভারের! সে নাকি ধর্ষন করে খুন করে গেছে সবিতা চাকমাকে। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্টে বের হলো, সবিতাকে ধর্ষনই করা হয়নি [১০]! ধর্ষন করা হয়নি, এই দাবির পক্ষে সুরতহাল প্রতিবেদনেই যুক্তি ছিল। সেটি হচ্ছে, সবিতা চাকমার পিরিয়ড চলাকালীন সময়ে তার অতিরিক্ত পোষাকগুলো যথাস্থানেই পাওয়া গেছে। তাই সে ধর্ষিত হয়েছে – এমন দাবি ছিল অবান্তর! নীচে যুক্ত করা হলো ময়নাতদন্ত রিপোর্টের স্ক্যানড কপি।

কেস স্টাডি ৫: তারিখটা মনে নেই। রাঙ্গামাটির লংদুতে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষকের নাম ইব্রাহীম উরফে কঞ্চন কুমার বিশ্বাস। ধর্ষিতা এক পাহাড়ি কিশোরী। ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ফুসে উঠে লংদুর বাঙালি-পাহাড়ি সকলে। কিন্তু পাহাড়ি দলগুলো ‘সেটেলার’ ধর্ষকের ফাঁসির দাবিতে তখন মুখোর। অদ্ভুদ ব্যাপার হচ্ছে, এই ইব্রাহিম সেটেলার, এমনকি পাহাড়েরই ছিল না! ঘটনার বছর তিনেক আগে যশোর থেকে লংদুতে এসে কাঞ্চন কুমার বিশ্বাস ধর্মান্তরিত হয়ে বিয়ে করে স্থানীয় দরিদ্র তাজুল ইসলামের মেয়েকে। নাম ধারণ করে ইব্রাহীম। কিন্তু ইব্রাহীম ‘সেটেলার’ এটা প্রমানেই ব্যাস্ত হয়ে পড়ে পাহাড়ি দলগুলো। পরে কালেরকন্ঠে একটি প্রতিবেদন আসে ‘ঘাতক ইব্রাহিম সেটেলার নয়[১১]। রাজনীতি করার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায়, এবার এই প্রতিবেদকের উপরই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে অনেকে।

আমি জানি না, আপনারা কী বুঝেছেন বা আদৌ কিছু ধরতে পেরেছেন কি না। শুধু এটাই বলবো, অনেক অপরাধের বোঝা বইতে হয়েছে পার্বত্য বাঙালিদের, যেটার জন্য আদৌ তারা কোনোকালেই দায়ী ছিল না। বাংলাদেশে মিডিয়া ক্যু’র সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে পার্বত্য বাঙালিরা। সত্যি কথা বলতে কি, কেউ কেউ আসলে ধর্ষনের মতো ঘৃন্য অপরাধের বিচার চায় না, কিন্তু বাঙালিই ধর্ষক সেটাই প্রমান করতে চায়। বিচার এখানে মূখ্য নয়, ধর্ষনকে কেন্দ্র করে আমি কতোটুকু রাজনীতি করতে পারলাম, সেটাই মূখ্য বিষয়

৬ thoughts on “পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষন : বিচার কামনার চেয়েও বাঙালিকে ধর্ষক প্রমাণ করাটা যখন অধিক গুরুত্বপূর্ন

  1. খুব করুণ ঘটনাগুলো। অনেক তথ্য
    খুব করুণ ঘটনাগুলো। অনেক তথ্য প্রমান এবং উপাত্তসহ ঘটনাগুলো নিয়ে পোষ্ট দিয়েছেন। কষ্টসাধ্য এই পোষ্টের জন্য আপনাকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু খারাপ লাগে, আইনের ফাঁক ফোকর গ’লে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, কোন উপযুক্ত শাস্তির বিধান হয় না বলে এমন ঘটনা কখনোই বন্ধ হয় না। চলতেই থাকে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি দাবি জানাই। আমাদের তথাকথিত মানবতাবাদীদের বিভিন্ন আন্দোলনে জ্বালাময়ী বাণীসমেত ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখি, কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে তারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকে কেন, সেটাই বুঝি না।

    1. ব্যাপারটা সিম্পল। যখন এখানে
      ব্যাপারটা সিম্পল। যখন এখানে ধর্ষক পাহাড়ি, তখন কোনো মানবতাবাদী, পাহাড়ি দল, সাংবাদিক, এনজিও, সিএইচটি কমিশন কাউকে প্রতিবাদ তো দূরে থাক, একটা বিবৃতিও দিতে দেখবেন না, এমনকি ধর্ষিতা পাহাড়ি নারী হলেও তখন তাদের কিছু যায় আসে না! যখন বোঝা যায় না, কারা করেছে আসলে কাজটা, তখন তারা আস্তে করে বাঙালির উপর চাপানোর চেষ্টা হয়। যখন কোনো বাঙালির নাম আসে, তখন তাকে ‘সেটেলার’ প্রমাণ করাটাই মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়। মোদ্দের উপর আমার পোস্টের সারমর্ম হচ্ছে এটি। ধন্যবাদ আপনাকেও কষ্ট করে কমেন্ট করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *