উন্নয়নবাদী বুদ্ধিজীবীদের ভ্রান্তিবিলাস

উন্নয়নের মাতম চলছে। কোন কোন তাত্ত্বিক এই তথাকথিত উন্নয়ন আমাদের এমন ভাবে গেলাতে চাচ্ছেন, এখন মনে হয় ‘এ যুগের সেরা মতবাদ- উন্নয়নবাদ’ এই স্লোগান দিতে হবে। এই উন্নয়নবাদ নতুন কোন তত্ত্ব না, উইলিয়াম জেমসদের প্রয়োগবাদেরই নতুন মোড়ক মাত্র। অবশ্য Pragmatism এর বাংলা অনুবাদ করার ক্ষেত্রে অধ্যাপক যতীন সরকার এর প্রস্তাবিত নাম হল, ‘কার্যসিদ্ধীবাদ’। আজকের বাংলাদেশে উন্নয়নবাদীদের আস্ফালন দেখে মনে হয় পদটির বাংলা ‘স্বার্থসিদ্ধীবাদ’ হলে আমাদের মত আমজনতার বুঝতে সুবিধা হয়।


উন্নয়নের মাতম চলছে। কোন কোন তাত্ত্বিক এই তথাকথিত উন্নয়ন আমাদের এমন ভাবে গেলাতে চাচ্ছেন, এখন মনে হয় ‘এ যুগের সেরা মতবাদ- উন্নয়নবাদ’ এই স্লোগান দিতে হবে। এই উন্নয়নবাদ নতুন কোন তত্ত্ব না, উইলিয়াম জেমসদের প্রয়োগবাদেরই নতুন মোড়ক মাত্র। অবশ্য Pragmatism এর বাংলা অনুবাদ করার ক্ষেত্রে অধ্যাপক যতীন সরকার এর প্রস্তাবিত নাম হল, ‘কার্যসিদ্ধীবাদ’। আজকের বাংলাদেশে উন্নয়নবাদীদের আস্ফালন দেখে মনে হয় পদটির বাংলা ‘স্বার্থসিদ্ধীবাদ’ হলে আমাদের মত আমজনতার বুঝতে সুবিধা হয়।

দৈনিক পত্রিকাগুলোর উপ-সম্পাদকীয় পড়ার আগ্রহ আগেই হারিয়েছি তার অনেক কারণ। সংবাদপত্র মালিকদের বেধে দেয়া সীমার মধ্যে একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখা হয়, কোনোটা মানুষ পড়ে কোনোটা পড়ে না। মাঝে মাঝে গোল বাধে, মানুষের মুখে শুনি অমুকের এক সাপ্তাহিক লেখা তার বাধা পত্রিকা ছাপে নাই অন্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তমুক জাতীয় দৈনিকে লিখে পার্টির লাইন গাছে তুলে ছেড়েছে ইত্যাদি, তখন লেখা গুলো পড়া হয়। আমাদের পার্টি কংগ্রেস এ গৃহীত দলিল এর সাথে সাংঘর্ষিক মতামত পার্টির নেতারাই প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। একটা দুইটা দৃষ্টিগোচর হয়, আলোচনার টেবিল গরম থাকে, আবার সব যেমন তেমন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি’র প্রাক্তন প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রিয় কমিটির নেতা, স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক এমএম আকাশ গেল কয়েকদিন আগে সমকাল পত্রিকায় ‘সব সাপের একই বিষ নয়’ শিরোণামে লিখেছেন। গত বছর জানুয়ারি মাসে তিনি একই পত্রিকায় আরেকটি লেখা লিখেছিলেন। তখন সামান্য আলোচনা উঠেছিল, তার দিন কয়েক পরে সবাই ভুলে গেছে। তখন তিনি ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের দ্বারা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, একটু ফ্যসিবাদী কায়দা অবলম্বনের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন। এবার তারই ধারাবাহিকতায় বলছেন উন্নয়নই একমাত্র আরাধ্য, কে করলো, কিভাবে করলো সেটাও বিবেচনার বিষয় নয়। সেই সাথে তিনি বলতে চান, নব্বই পরবর্তী দ্বি-দলীয় ধারার শাসনে লুটপাটের মাত্রায় তারতম্য বা কমবেশি ছিল। এই পার্থক্যকে বামপন্থীরা সঠিক ভাবে বিবেচনা করেনি, তাই ‘নৌকা-লাঙ্গল-পাল্লা-শীষ সব সাপের একই বিষ’ এমন সার্বিকিকরণ করা হয়েছে। যদিও ‘সব সাপের একই বিষ’ এ স্লোগান কেউ দিয়েছে এমন শুনিনি। ‘সব সাপের দাতে বিষ, তফাৎ উনিশ-বিশ’ এমন কথা কারো কারো বক্তৃতায় শুনেছি বলে মনে পড়ে। তিনি বলতে চান, এই সরল বিশ্লেষণ পরবর্তিতে ঐতিহাসিক বিবেচনায় ভুল প্রমানিত হয়েছে। স্লোগানের যথার্ততা নিরূপণ করা তার লেখার উদ্দেশ্য নয়, বরং স্লোগানের নেপথ্যে যে রাজনৈতিক লাইন সেটাকেই তিনি ভুল বলতে চাচ্ছেন। তিনি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চান নব্বই উত্তর বিএনপি-আওয়ামী লীগের দ্বি-দলীয় শাসনে কোন এক পক্ষ কম লুটপাট করেছে। সেটা কে তা অবশ্য তিনি বলেন নি। বুঝে নেয়া আমাদের দায়িত্ব।

একি শুনি আজ! ‘ব্যবসা ও লুটপাটের ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, জামাতে ইসলামীর ব্যবসা শৃঙ্খলা আওয়ামী লীগ অনুসারীদের ব্যবসা-শৃঙ্খলার চেয়ে পোক্ত।’ এ কথার অর্থ কি! আওয়ামী লীগের লোকেরা লুটপাটে জামাতের চেয়ে কম পাঁকা! ক্ষমতাসীন দলের মালিকরা কম শোষণ জানে, হিন্দু পরিবারের জমি দখল করতে একেবারেই জানে না! আমি তো গ্রাম-গঞ্জ থেকে নগর-বন্দর সর্বত্র এদের একসাথে মিলে মিশে ব্যবসা করার উদাহরণ দেখছি। জামাতকে তার মতাদর্শ ও কৃতকর্মের জন্য পিন-পয়েন্ট অভিযুক্ত করতে না পারলে ক্ষতি। তাই ধান বানতে গিয়ে শিবের গীত না গাওয়াই ভালো।

অধ্যাপক আকাশ এর বর্ণনা অনুযায়ী বাস্তবতা হল, গণতান্ত্রিক-আধা গণতান্ত্রিক-সামরিক কোন আমলেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেমে থাকেনি। লুটপাট হয়েছে, বৈষম্য আর অগণতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা বেড়েছে, খুব দুর্নীতি হয় কিন্তু এসব আসলে একটা ‘বিকাশমান’ বা বড় হচ্ছে, এমন আলোর অন্ধকার দিক। তিনি বলছেন, এই অন্ধকার না থাকলে আলো আরো উজ্জ্বল হতো। তার পরের কথা, বাংলাদেশের কোন উন্নতি হয় নাই, কেবলই লুটপাট চলে এবং বৈষম্য শুধু বাড়ছেই একারণে আগামীকালই বিপ্লব হবে এই তিনটা কথা অধিকাংশ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেনা। তার এই আলোচনার মর্ম যা বুঝি তাতে উন্নয়নই মানদণ্ড। এতদিন যারাই শাসন করেছে তারা সবাই উন্নয়ন দিয়েছে কম বেশী আর তাতেই জনগণ খুশী। যেটুকু অন্ধকার আছে তা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছে। ওনার পর্যবেক্ষণে শোষক-শোষিত নাই, বৈষম্য বাড়লেও ভ্রুক্ষেপের দরকার নাই, আছে শুধু উন্নয়নদাতা আর উন্নয়ন ভক্ষক নির্বিকার জনতা। একজন মার্ক্সবাদী লোকের এমন বিশ্লেষণ আর বয়ান আমাদের গভীর চিন্তায় ফেলে দেয়। এতদিন ধরে তার ক্লাস করেও উন্নয়ন, উন্নতি এ সমস্ত ধারণা সম্পর্কে আমার তো কোন জ্ঞান হয় নাই। এসব পরিমাপের কোন মাপকাঠি সম্পর্কেও তো জানতে পারি নাই। লেনিনের পথে ‘বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ’ যদি এমন হয়, তাহলে তো আমাদের সমস্ত চিন্তা ভাবনা নতুন করে সাজাতে হবে। এমন কি সমস্ত দাবি-দাওয়া আর সংগ্রাম ত্যাগ করে উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নাম লেখানোটা কর্তব্য হয়ে দেখা দিতে পারে।

যা কিছু ঘটে চলেছে তার অনিবার্যতার গান গাওয়া এবং সাথেসাথে এসব অপরিবর্তিত ভাবে বিদ্যমান থাকবে এমন বিশ্বাস নিয়ে থাকাটা একটা মতাদর্শিক দৈন্যতা। আজকে আমাদের এই প্রতিক্রিয়াশীল বিচ্যুতি হচ্ছে। আর সে বিচ্যুতি ঢাকতেই এক অহেতুক আলোচনা সামনে আনা হচ্ছে, বলা হচ্ছে ‘আগামীকালই তো আর বিপ্লব আসছে না’। ‘ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের কারণে আগামীকালই বিপ্লব হচ্ছে’, এ কথা কেউ কি বলেছে? ‘অধিকাংশ মানুষের সমর্থন ছাড়াতো বিপ্লবও যথাযথ ভাবে হবে না’ এটুকু বুঝলাম, এটা মানিও। কিন্তু এর পর কিছু বলতে চান যদি সেটা পরিষ্কার করে বলেন, আমরা ভেবে দেখি একমত হতে পারি কি না।
বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীকে বিভক্ত রূপে দেখে অধ্যাপক আকাশ এদের সব গ্রুপেরই ভালো দিক আছে আবার সবারই খারাপ দিক আছে এটাই প্রমান করেছেন। সেটা করে তিনি নিজের ধাধায় নিজেই পরেছেন এবং দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, ‘তাই বলে কি বিশ্বে মৌলিকভাবে খারাপ ও ভাল নেই?’ এ প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না, এমন তো হওয়ার কথা নয়। তিনি বলছেন, ভালো-খারাপ আছে, খারাপের মধ্যে ভালো আর ভালোর মধ্যে খারাপ আছে, রাজনীতিতে ভালো-খারাপের সংঘাত মেটানোর পথটাও তিনি বাতলে দিচ্ছেন এ লেখায়। ‘… খারাপের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সময় তার ভালো দিকগুলোর কথাও ভাবতে হয়- কীভাবে খারাপের খারাপ দিকটাকে পরাজিত করতে হয় সেই কৌশল খুজে বের করতে হয়। যদি সেখানে কিছু ভালোদিক থেকে থাকে তা যত কমই হোক তাকে রক্ষা করা এবং তাকে ভালোর পক্ষে রাখার চেষ্টা করাও দরকার।’ এটাই নাকি দ্বান্দিক দৃষ্টিভঙ্গী। সাপের বিষের পার্থক্য থেকে ভালো মন্দের এই ফ্যাসাদী তত্ত্বের কাছে হার না মেনে পারা যায় না। আকাশ স্যারের দেখানো পথে রাজনীতিতে ভালো আর মন্দের যে দ্বন্দ তা জয় করতে হলে, মেয়েদের স্কুল-কলেজের সামনে বখাটে শায়েস্তা করার দায়িত্ব দিতে হবে ইসলামী ছাত্র শিবিরকে। শিবির যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করতে না পারে সেটা দেখার দায়িত্ব দিতে হবে ছাত্রলীগের ওপর। ছাত্রলীগের দখল-সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের দায়িত্ব দিতে হবে ছাত্র ইউনিয়নকে। দ্বান্দিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যে, তরমুজের বাইরের সবুজ খোল, ভেতরের লাল রসালো অংশ আর বিচি সমস্ত আলাদা করে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রত্যেকটির ভালো খারাপ বিচার করতে হয়, এ আমার জানা ছিল না। সব বস্তুর বিকাশের পথেই দ্বন্দ আছে, প্রতিটি পার্থক্যই দ্বন্দ। আবার প্রতিটি বস্তুর নিজস্ব সুনির্দিষ্ট দ্বন্দ আছে এবং আছে তার সুনির্দিষ্ট সারবস্তু। সেই বস্তুসার আর দ্বন্দের আপেক্ষিকতার কথা ভুলে দ্বান্দিক ভাবে দেখা সম্ভব কিভাবে?

যা বুঝলাম আজকের পৃথিবী আগের মত আর সরল নয় তাই, ডান-বাম, সাদা-কালো, ভালো-মন্দ, লুটেরা-উৎপাদনশীল, প্রতিযোগীতামূলক-একচেটিয়া, গণতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক এই ভাবে এখন আর বলা যাবে না। হিসাব করে বলতে হবে চলমান আওয়ামী শাসন গণতন্ত্র থেকে এতটা দূরে আর স্বৈরতন্ত্রের এতটা কাছে আছে। এটা কে নসিহত বলবো কিনা জানি না, এরশাদ কে নিয়ে কোন সার্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না, তাকে দেখতে হবে খণ্ড খণ্ড করে, ভালো-মন্দ মিলিয়ে এমনটাই অধ্যাপক আকাশ বলছেন। তার মূল আর্জি সবাইকে একই বাক্সে ঢুকাবেন না, এতে বিরাট ভুল হবে। একথার মানে হয়, এ দেশের শাসক বুর্জোয়া শ্রেণীর যে বিভিন্ন অংশ সেগুলোকে এক আটিতে না বেধে তাদের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক কাউকে বাছাই করা। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে এটাকে মহৎ কাজ মনে করি, এমন তার আরো কিছু কাজ সমর্থন করার আছে, তাই তাকে আলাদা করলাম, বিএনপি-জামাত-জাতীয়পার্টি থেকে উত্তম মনে করলাম। এরপর কি করতে হবে সেটা স্যার কবে বলবেন তার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তো এই অধমের আর কিছু করার আছে বলে মনে হয় না।

আজ শাসক শ্রেণীর বিদ্যমান বিকল্প গুলোর মধ্যে কে অধিক গ্রহণযোগ্য এই প্রশ্ন মূখ্য হয় কিভাবে? কেন এই তথাকথিত উন্নয়ন আমাদের আরাধ্য এবং বিচারের মানদণ্ড হবে? মুক্তির প্রশ্ন তাহলে কি আজ বাতিল বলে গণ্য হবে, নাকি কিছুদিনের জন্য লুকানো থাকবে? আজ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি এদেশের দুইভাগে বিভক্ত শাসক শ্রেণীর কোন একদিকে না ঝুকে, এদের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভিত্তিতে যে বিকল্প গড়ে তুলতে চায়, সে বিকল্পের পথ কে কি ভুল পথ বলতে চাচ্ছেন? পেটি বুর্জোয়া অবস্থান থেকে শাসক শ্রেণীর মতাদর্শকে আকন্ঠ গিলে, তার সেবাদাশের মতো সেই মত প্রচার করার নজির ইতিহাসে ভুরিভুরি খুজে পাওয়া যায়। সে পথে চিন্তা হাটলে এক সময় মনে হবে ‘স্বর্গরাজ্যের কোন পরিবর্তন নেই, এর নিয়ম-বিধিও সব অপরিবর্তনীয়’। সেই চিন্তা শোষিতের মুক্তি সংগ্রামে কখনো পথ দেখাবে না।
২৭ জানুয়ারি, ২০১৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *