নবকালের নবদায়ঃ হরেক নব সম্প্রদায়… (পর্ব-১)

কতিপয় যুবক-যুবতী বিগত আড়াই মাস ধরিয়া ফাল পাড়িতেছে ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই, রাজাকারের ফাঁসি চাই’ বলিয়া। উহাদের ঘরবাড়ি নাই, দিনরাত্রি নাই; কেবলই আস্ফালন, ‘জামাত- শিবিরের রাজনীতি, আইন করে নিষিদ্ধ কর’। তাহারি মধ্যে এই মুল্লুকে জন্ম লইল কতিপয় নতুন সম্প্রদায়। আজিকে এই ভুঁইফোড়দের লইয়া কয়খানা কথা কহিতে প্রাণ আইঢাই করিতেছে বলিয়া না লিখিয়া পারিলাম না। লিখিতে গিয়া যদি আমার কি-বোর্ডের বোতাম চাপাচাপিতে কাহারো প্রাণ আঘাত লাগিয়া যায়; নির্বোধ বালক জ্ঞানে ক্ষমা করিয়া দিলে কৃতার্থ থাকিব।
বলগার কথনঃ
এই হঠাৎ গজাইয়া উঠাদের দলভুক্ত প্রথম সম্প্রদায়ের নাম ‘বলগার সম্প্রদায়’। দেশব্যাপী তরুণ প্রজন্মের গণজোয়ারের মধ্যিখান দিয়া হঠাৎ করিয়া এই সম্প্রদায়ের জন্ম। ঢাকায় শাহবাগ মোড়ে প্রজন্ম চত্তরে্র ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ হউক আর খুলনা শিববাড়ি মোড়ে ‘নির্দলীয় গণমঞ্চ’ই হউক; লোকে বলাবলি শুরু করিল ইহারা সব বলগার। শাহবাগ-শিববাড়ি সর্বত্র যাহারা জীবনে কোন ব্লগে দুইখানা লাইন লেখেনাই, কিন্তু আন্দোলনে আসিয়াছে আত্মার টানে; উহারা চোদনা সাজিয়া ভাবিতে লাগিল ‘শালার আমি তালি কেঠা’। আবার নতুন করিয়া আরেক দলের উৎপত্তি হইল; যাহারা প্রথমোক্ত দলের মত জীবনে কোন ব্লগে দুই কলম না লিখিলেও, নতুন পরিচয়ের সময় লোক দেখিয়া হাত বাড়াইতে লাগিল, ‘হায়! আই এম এ ব্লগার। নাইস টু মিট ইউ বাডি’। আর এই অধম আদুভাইয়ের মত ছাত্ররা বিড়ি ফুঁকিতে ফুঁকিতে ভাবতে লাগিল, ‘আজব বটে!’
এই বলগারদের মধ্যিখানে আবার জাত-পাত ভেদে শ্রেণীবিভক্তিও খুঁজিয়া পাওয়া যায়। যেমন; কুক্কুরুকু বলগার, ছাগু বলগার, পাগু বলগার, আস্তিক বলগার, নাস্তিক বলগার, নব্য বলগার, এবং হাম্বা-গাম্বা গৃহপালিত বলগার।
এইবার আসি ইহাদের সংজ্ঞা লইয়া।
১। কুক্কুরুকু বলগারঃ ইহারা বহু দিন যাবত কতিপয় ব্লগে লিখিয়া আসিয়াছেন । ইহারা জামাত ও শিবিরের অস্তিত্ব মুছিয়া দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, আবার হাম্বাগণের দুষ্কর্মের জবাব দিতেও সর্বদা প্রস্তুত। গোলাপী ও তাহার ফর্সাবরণ পুত্রগণের অপকর্মের বিরুদ্ধেও ইহারা কথা বলিয়া যান নিরন্তর। সাবেক সেনাচাচাও ইহাদের হাসি- তামাশার পাত্র। হাম্বাগণ নিজেদের স্বার্থে যখন দাদাদিগের পদসেবা করিয়া যান, ইহারা তখন কি-বোর্ডে যুদ্ধ চালাইয়া যান। আবার গোলাপী যখন পাক-সার জমিনের স্মৃতি রোমন্থন করিয়া লাঠিয়ালদের ডাকিতে থাকেন, ইহারা তখনো জাগিয়া উঠিবার ডাক দিয়া যান। আবার জামাত-শিবির দুষ্ট চক্রের বিনাশ না ঘটা পর্যন্ত ইহাদের শান্তি নাই। ইহারা কাহারো ধার ধারেন না, আবার অনলাইনে ৫৪ ধারার অপপ্রয়োগ লইয়াও ইহারা সোচ্চার। প্রত্যুষের মোরগের মত নতুন দিনের আহ্বান করিবার সদিচ্ছা হইতেই ইহাদের নাম কুক্কুরুকু বলগার। ইহারা বর্তমানে অতিশয় বিপদের মধ্যে রইয়াছেন। আইনও ইহাদের বাধিতে চায়, হেফাজতও ইহাদের বধিতে চায়।
২। ছাগু বলগারঃ মহাভারতে পড়িয়াছিলাম, এক রাজার হঠাৎ করিয়া নদীপথের মধ্যিখানে রমণেচ্ছা প্রবল হইয়া উঠে। সামলাইতে না পারায় জায়গাতেই বীর্যস্খলণ ঘটিয়া যায়। আর তাহা পান করিয়া এক মৎস্য জন্ম দিয়া বসে সত্যবতীর। পূর্বে গল্পখানাকে কল্কির প্রভাব ভাবিলেও, ছাগু বলগারগণ এই গল্পের সত্যতা নিশ্চিত করিয়াছেন। রাজাকার পিতার ঔরসে, পাকিস্তানি পাহাড়ী ছাগলের গর্ভে, এবং মঊদুদীর জাদুতে বঙ্গদেশে ইহাদের জন্ম। ইহাদের লইয়া কথা বাড়ানো সম্ভব নহে। আমার বমি পাইতেছে। প্রিয় পাঠক, আজ্ঞা করুন, একটু হালকা হইয়া আসি।
৩। পাগু বলগারঃ সারা প্রানী জগতে এই এক আজব প্রানী। ইহারা কি ভাবিয়া কি কহেন, আর কি ভাবিয়া কি করেন দিশা পাইনা। ভবিষ্যতে ইহারা বুদ্ধিজীবি বলিয়া স্বীকৃতি পাইবেন কোন সন্দেহ নাই। ইহারা কখনো মজহারি মজহাবীগণের কথা শুনিয়া কি-বোর্ডে লাফাইয়া পড়েন, আবার অপর পক্ষের কথাতেও গলিয়া পড়েন। চুষিকাঠি ইহাদের প্রিয় খাদ্য।
৪। আস্তিক বলগারঃ ধর্মজ্ঞান আর ধর্মচর্চার মানসে নহে, পিঠ বাচানোর স্বার্থে ইহারা ধার্মিক হইয়া উঠিয়াছেন। দেশময় আস্তিক-নাস্তিক জুজুবুড়ির রব উঠিবার পর ইহারা আগে অন্য সম্প্রদায়ভুক্ত থাকিলেও বর্তমানে তাহারা পাজামা খুলিয়া লোকজন ডাকিয়া দেখাইতেছেন, ‘দেখিয়া যাও, আমি নাস্তিক নহি’। ইহারা বলিতে পারেননা, শাহবাগে কি শিববাড়ি কোথায়, কখন ধর্ম লইয়া উলটাপালটা কিছু বলা হইয়াছে কিনা। কিন্তু, ইহারা বাকি সকলের গায়ে নাস্তিক সিল মারিয়া তাহাদের পিছনে গিয়া ফাঁসিও দাবি করিয়া বসেন। পাছে লোকে কিছু বলে সেই ভয়ে তাহাদের আন্দোলনে আগমন, এবং পাছে লোকে মারিয়া বসে সেই ভয়ে ইহাদের পলায়ন। আবার হাম্বাগণের কৃপালাভের আশায় তাহাদের সাথে মিশিয়া ‘এই মুহুর্তে দরকার, হোঁদল কুতকুত সরকার’ বলিয়া জুতা চাটিতেও ইহারা দ্বিধাবোধ করেননা। মজহার মজহাবীদের গালি দিলেও, বাম বাম ভোলা মজহারবাবা যদি এখন ভোল পাল্টাইয়া হাম্বাহাম্বা রব তুলেন, তা হইলে তাহার দলে ট্যাগ হইয়া যাইতেও ইহারা অতিশয় গর্ববোধ করিবেন।
৫। নাস্তিক বলগারঃ জাতে উঠিবার মানসে একদা ইহারা নিজেদিগকে নাস্তিক বলিয়া প্রচার করিতেন। তাহার পর কেহ পাত্তা দেয়না বলিয়া ইহারা নাস্তিক্যবাদী ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করিয়া বসেন। উগ্রতার সিমা পরিসীমা নাই বলিয়া মৌলবাদী হেফাজত কিংবা শিবসেনা কাহারো সাথে ইহাদের তফাত নাই বলিলেই চলে। হেফাজত যেমন যাহার আগা ছেদন করা হয়নাই তাহার আগা ছেদন করিতে চায়, তেমনি ইহারাও যাহার আগা ছেদন হইয়াছে তাহার আগা মুড়িয়া দিতে চায়। মৌলবাদী শিবসেনা বা হেফাজতের মতন ইহারাও সমান ভয়ংকর। মনে রাখিতে হইবে, উগ্রতা এক ভয়ংকর মানসিক রোগ। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করিবার অধিকার কাহারো নাই। ধর্ম পালন করিবার কিংবা না করিবার ব্যাপারখানা নিজস্ব। জোর করিতে গেলে মৌলবাদ নতুন করিয়া মৌলবাদের জন্ম দিয়া বসে।
৬। নব্য বলগারঃ ‘কাদম্বীনি মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। নতুন করিয়া এক ব্লগ লিখিয়া আমিও কহিতেছি, আমিও এতদিন ব্লগ লেখি নাই। সেই হিসাবে আমি নিজেও এই দলের অন্তর্ভুক্ত। তবে এই নব্য বলগারগণের মধ্যে একদল ব্যক্তিকে দেখিয়াছি যাহারা আজিও কিছু লেখিলেন না, জামাত-শিবির-রাজাকার বিরোধী এই আন্দোলন শুরু হইবার পর হইতে তাহারাও নিজেদের বলগার বলিয়া পরিচয় দিতে লাগিলেন। কিন্তু কেহ স্বীকার করিলনা, বলগারগণের বদলে যদি জনৈক রাম-শাম-যদু-মধুও ডাক দিয়া বসিত, মানুষ আসিত। কারণ, দলগুলার কীর্তিকলাপে প্রতিটা প্রাণ বিরক্তির চুড়ায় গিয়া বসিয়া আছে। সে যাহাই হউক, এই নব্যগণের মধ্যিখানে যদি কেহ অনলাইনে টিকিয়া যান, তবে ভবিষ্যতে দেখা যাইবে ইহারা কে কোথায় গিয়া বসেন।
৭। হাম্বা-গাম্বা গৃহপালিত বলগারঃ ইহারা কোন না কোন দলের ভক্ত। ইহাদের দলের যত অপকর্ম সব ইহাদের চক্ষু এড়াইয়া যায়, আবার নিজ নিজ দলের বিকল্প নাই বলিয়া ইহারা চিৎকার করিতে সদাব্যস্ত। আবার কেহ কেহ বলিয়া থাকেন, ইহারা প্রত্যহ ভাড়া খাটিয়া থাকেন। টাকার বিনিময়ে ইহারা চিত হইয়া পশ্চাদ্দেশ উঁচাইয়া ধরেন, এবং বোতাম চাপিয়া যান। ইহারা আবার সর্বাধিক প্রভাবশালিও বটে। কারণ শুনিয়াছি, ইহাদের পেছনে জোর আছে বটে। টাকাও লইয়া থাকেন, দলীয় আশির্বাদও লইয়া থাকেন। ইহাদের আবার অনেকগুলান চামচা অনলাইনে ইহাদের দেবত্ব প্রমাণে ব্যস্ত। কিন্তু আমার মত কতিপয় মুর্খ দুই দিন ইহাদের দেবত্বে মুগ্ধ হইয়া তাকাইয়া থাকিয়া পরবর্তীতে একসময় বুঝিয়া লয়, শিয়াল এক চতুর প্রানীই বটে। শাহবাগ আন্দোলনের সর্বনাশ ইহারাই করিয়াছেন বলিয়া জনান্তিকে প্রচার আছে। কারণ, দলকে আগাইয়া দিয়া দেশকে পিছাইয়া দিতে ইহারা সদাসতর্ক। ইহাদের মতের সাথে না মিলিলে ছাগু কিংবা পচাবাম বলিয়া গালি খাইতে হয়। যদিও শাহবাগের সর্বনাশ করিয়া ইহারা ছাগুদের উপকারই করিয়াছেন বটে। ইহাদের আরেক গুণ, মস্তিষ্ক প্রক্ষালণে ইহারা অতিশয় ওস্তাদ। হাম্বাগণের নামানুযায়ী গোলাপীর গৃহপালিত পশুদিগকে গাম্বা বলিয়া আখ্যায়িত করিলাম। কেহ কিছু মনে লইলেও লইতে পারেন, না লইলেও লইতে পারেন।
বলগারগণের বিষয়ে বক্তব্যের এইখানেই যতি টানিলাম। কারণ বলগারির আকাশে নামিয়া আসিয়াছে হেফাজতির ঘনঘটা। কে দিবে আশা! কে ধরিবে ছাতা! বলগারির আকাশে নামিয়া আসিয়াছে হেফাজতির ঘনঘটা।
এই বিষয়ে বিদগ্ধ বলগারগণের মস্তিষ্কে প্রদাহের সুত্রপাত হইবেক পরবর্তী পর্বে। ততক্ষণ পর্যন্ত শিলাজিতের একখানা গান শুনিবার জন্য পরামর্শ দিয়া যাইতেছি। গান খানার নাম ‘পাগল’। অন্তর্জালে খুজিলেই পাওয়া যাইবে। উপমহাদেশের রাজনীতির এত চমৎকার করিয়া বর্ণনা দিতে কাহাকেও শুনি নাই।

৮ thoughts on “নবকালের নবদায়ঃ হরেক নব সম্প্রদায়… (পর্ব-১)

    1. পচানোর কিছু নাই। পচন ধরে গেছে
      পচানোর কিছু নাই। পচন ধরে গেছে বলে দরকার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো। তাতে যদি কিছু নাহয় তখন যে কি করা দরকার, সেটা যে ধরতে পারবে তাকেইতো এখন সবচে বেশি দরকার

  1. এক কথায় বলব- চমৎকার ও নির্মম
    এক কথায় বলব- চমৎকার ও নির্মম সত্য বলিয়াছেন। আপনার রম্যর মধ্যে দারুণ একটা ছন্দ আছে। আপনি ছন্দ-রম্য ব্লগার গোত্রের অর্ন্তভুক্ত। পরবর্তী পর্বের জন্য অপেক্ষা করিতেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *