মহাভারতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তাঃ ২


কৃষ্ণ ব্যতীত মহাভারতের অপরাপর রাজনৈতিক চরিত্রগুলোঃ

(কর্ণ,ভীষ্ম ও শকুনি)



কৃষ্ণ ব্যতীত মহাভারতের অপরাপর রাজনৈতিক চরিত্রগুলোঃ

(কর্ণ,ভীষ্ম ও শকুনি)

কর্ণঃ কুন্তির কানীন (কুমারী অবস্থায় জাত) পুত্র । দুর্বাসা মুনি কুন্তিকে বর দিয়েছিলেন যে, কুন্তি যে কোনও দেবতাকে আহবান করে তাঁর সন্তান গর্ভে ধারণ করতে পারবেন। এই বরের তাৎপর্য বুঝতে না পেরে কুন্তি কুমারী অবস্থাতেই সুর্যকে আহবান করেন। ফলে সূর্যের মত তেজস্বী কবচ-কুণ্ডল সহ এক পুত্র কুন্তি প্রসব করলেন। কলঙ্কের ভয়ে সদ্যোজাত পুত্রকে একটি পেটিকাতে পুরে কুন্তি সেটি নদীতে বিসর্জন দিলেন। সূত-বংশজাত অধিরথ ও তাঁর স্ত্রী রাধা নদী থেকে সেই পুত্রকে উদ্ধার করে বসুষেণ নাম দিয়ে তাঁকে মানুষ করেন। পরে নিজে কুন্তি-পুত্র জানলেও, বসুষেণ আজীবন নিজেকে রাধেয় বলে পরিচয় দিতেন। বসুষেণ একাধিক সূতদুহিতাকে বিবাহ করেছিলেন।কর্ণ ছিলেন স্পষ্টভাষী এবং অহংকারী! তাঁর কথার মধ্যে মিষ্টতা ছিলনা তাই ভীষ্ম, দ্রোণসহ অনেকেই কর্ণকে পছন্দ করতেন না কিন্তু দুর্যোধন কর্ণের উপর প্রচন্ড ভরসা করতেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় কর্ণ স্বাভাবিকভাবেই কৌরবদের পক্ষে যোগ দিলেন। কর্ণ অর্জুনকে সহ্য করতে পারত না। কারণ তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তীরন্দাজ হতে চায়তেন আর তিনি জানতেন অর্জুন থাকলে তা সম্ভব নয়।কর্ণের যেমন অহংকারী ও রূঢ় ছিলেন তেমনই ছিলেন দানশীল। তাঁর কাছে কেউ কিছু চায়লে তিনি তা অবশ্যই দিতেন। কর্ণ ছিলেন পাণ্ডব মাতা কুন্তীর সন্তান। বেড়ে উঠেন এক সারথির ঘরে।সূতপুত্র বলে কখনো পাননি যোগ্য সম্মান।যা তিনি খুঁজে পান দূর্্যোকধনের কাছে।কর্ণের ধনুর্বিদ্যায় মুগ্ধ হয়ে অর্জুনের যোগ্য প্রতিদ্ধন্ধী বিবেচনায় তাঁকে অঙ্গ দেশের রাজা করে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলেন।ফলে আজীবন বিস্বস্ত সহচর হিসেবে দূর্যোধনের পাশাপাশি উপস্থিত থেকে লড়াই করেছেন তিনি।জীবন ও দিয়েছেন তার সেনাপতি হিসেবে কুরুক্ষেত্রে।মহাভারতের এক নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক চরিত্রের নাম কর্ণ।

ভীষ্মঃ কুরু বংশের রাজা শান্তনু এবং গঙ্গা দেবীর অষ্টম পুত্র ভীষ্ম (দেবব্রত অথবা পিতামহ ভীষ্ম)[১]। ইনি মহাভারতের একজন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। পান্ডব এবং কৌরব, উভয় বংশের পিতামহ বলে ইনি পিতামহ ভীষ্ম নামেও পরিচিত।মায়ের সাথে থাকাকালীন ভীষ্ম দেবগুরু বৃহস্পতির কাছে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বশিষ্ঠ মুনির কাছে বেদ ও বেদাঙ্গ এবং পরশুরাম মুনির কাছে ধনুর্বিদ্যা শিখে একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠেন। এমনকি তিনি গুরু পরশুরামের বিরুদ্ধেও বিজেতা হন। সে যুদ্ধ ২৩ দিন ব্যাপী চলেছিল।ভীষণ প্রতিজ্ঞা গ্রহণ এবং তা সর্বাত্মকভাবে পালন করার জন্য রাজকুমার দেবব্রত ভীষ্ম নামে ভূষিত হন। রাজা শান্তনু ধীবর(জেলে) রাজকন্যা সত্যবতীর প্রেমে পড়ে তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। ধীবর রাজ বলেন যে যেহেতু দেবব্রত শান্তনুর প্রথম পুত্র তাই সত্যবতীর ছেলের কোনদিন রাজা হওয়ার সুযোগ আসবে না। সুতরাং তিনি রাজা শান্তনুর এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তখন রাজকুমার দেবব্রত প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি কোনদিন রাজা হবেন না। দূরদর্শী ধীবর রাজ তার পর বলেন, যদি দেবব্রতর উত্তরসুরীরা রাজসিংহাসন দাবি করে তাহলেও এ বিয়ে সম্ভব নয়। তখন দেবব্রত আরো প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি কোনদিন বিয়েই করবেন না। এই ভীষণ প্রতিজ্ঞার জন্য তাঁর নাম হলো ভীষ্ম। ধীবর রাজ এই দুই শর্তে রাজি হয়ে রাজা শান্তনুর হাতে কন্যাদান করেন। রাজা শান্তনু খুশি হয়ে ভীষ্মকে স্বেচ্ছামৃত্যুর বর দিলেন। কখনো সিংহাসনে আসীন না হলেও একজন তৎকালীন সম্রাটের যা যা গুন থাকা আবশ্যক ছিল সবই পিতামহ ভীষ্মের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তিনি একাধারে যেমন ছিলেন আদর্শ ক্ষত্রিয়, অন্যদিকে ছিলেন একজন শৃঙ্খলাপরায়ন তাপস। আদর্শ ক্ষত্রিয় হিসাবে তিনি কখনো অহেতুক আবেগ অথবা রাগ প্রকাশ করেননি। তিনি ছিলেন সত্য ও কর্তব্যের প্রতিভূ।এইরকম ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হয়েও দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাঁর জীবন ছিল একাকিত্ব, হতাশা আর দুর্দশায় ভরা। এবং এইভাবেই বশিষ্ঠ মুনির অভিশাপ ফলেছিল। দুর্ভোগ সহিত মানবজীবনের অভিশাপ অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু অব্দি ছিল যথেষ্ট যন্ত্রনাদায়ক। এইরকম দুর্দশাময় জীবন হওয়া সত্বেও তিনি কোনদিন সত্য, দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে আপস করেননি এবং কাছের মানুষদের ভালবাসতে ভোলেননি।

শকুনিঃ মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ রাজনৈতিক চরিত্র শকুনি।তিনি ছিলেন গান্ধার অর্থাৎ বর্তমান আফগানিস্তানের রাজা।কৌরবদের মাতা মাদ্রীর সহোদর ছিলেন তিনি।প্রচণ্ড ভালোবাসতেন ভগ্নীকে।শক্তির দাপট দেখিয়ে জন্মান্ধ ধৃতরাস্ট্রের জন্য মাদ্রীকে জয় করেন ভীষ্ম।এই অপমান কখনো ভুলতে পারেননি শকুনি।তাই হস্তিনাপুরের উপর চরম ক্ষিপ্ত ছিলেন তিনি।যার কারণে ছোতবেলা থেকেই নানারকম কুমন্ত্রণা দিয়ে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে কৌরবদের ক্ষেপিয়ে তোলেন তিনি।তার কুটিল পাশাতে রাজ্যহারাহণ যুধিষ্ঠির।যার পরিণতিতে সংগঠিত হয় কুরুক্ষেত্রের ভাতৃঘাতী যুদ্ধ।অসাধারণ তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ছিকেন তিনি।যার তুলনা একমাত্র কৃষ্ণের সাথেই দেয়া যায়।কিন্তু নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ফলে শকুনি চরিত্র একটি নেগেটিভ রাজনৈতিক চরিত্র হিসেবেই বিবেচিত হয়।

(সম্পাদিত) (চলবে)

১ thought on “মহাভারতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তাঃ ২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *