মহাভারতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তাঃ ১


প্রাচীন ভারতের এক অমর মহাকাব্য মহাভারত।কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ’ নামে কৌরব এবং পান্ডবদের যুদ্ধের বর্ণনায় মহাভারত মহাকাব্যটি রচিত।মধ্য এশিয়া থেকে খাইবার পাস হয়ে আর্যরা এই ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডে আসতে থাকেন খৃষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ – এই সময় সীমার মধ্যে। খৃষ্টপূর্ব ১৭০০ থেকে ১১০০ সালের কাছাকাছি সময়টাই হল আদি বৈদিক যুগ। এই সময়ই রচিত হয় ঋক্বেদ। এরই সমকালীন ইতিহাস হল মহাভারত।


প্রাচীন ভারতের এক অমর মহাকাব্য মহাভারত।কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ’ নামে কৌরব এবং পান্ডবদের যুদ্ধের বর্ণনায় মহাভারত মহাকাব্যটি রচিত।মধ্য এশিয়া থেকে খাইবার পাস হয়ে আর্যরা এই ঔপনিবেশিক ভূখণ্ডে আসতে থাকেন খৃষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ – এই সময় সীমার মধ্যে। খৃষ্টপূর্ব ১৭০০ থেকে ১১০০ সালের কাছাকাছি সময়টাই হল আদি বৈদিক যুগ। এই সময়ই রচিত হয় ঋক্বেদ। এরই সমকালীন ইতিহাস হল মহাভারত।

মহাভারতের জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে খোদ মহাভারতেই উল্লেখিত আছে,
“যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্যাসদেব কুরুক্ষেত্র ত্যাগ করে নিজ আশ্রমের পথে যাত্রা করেন শিষ্য সমেত। কিন্তু তার আশ্রম অনেক দূরের পথ ছিল। এই দীর্ঘ পথ যেতে যেতে বিভিন্ন জায়গায় তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন। এর মধ্যে মহর্ষি জৈমিনি সহ আরো দুই জন শিষ্য বৃদ্ধ বয়স হেতু আর পথ চলতে পারবেন না বলে একেক জায়গায় থেকে যান। বাকি রইলেন শুধু বৈশম্পায়ন। বৈশম্পায়নের সাথে আলাপের এক পর্যায়ে তিনি বুঝলেন যে তিনি শান্তি ও ধর্মের জন্য অনেক গ্রন্থ রচনা করলে তা সাধারণ মানুষে কাছে পৌঁছায় নি, বরং পুস্তকগুলো পণ্ডিত ও সাধু সন্তদের মধ্যে কেবল সমাদৃত ছিল। অর্থাৎ তাঁর লেখাগুলো সহজ পাঠ্য ছিলনা বলে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছায় নি। তাই তিনি “ভরত” বংশের কাহিনী নিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য বই লিখবেন বলে মনস্থির করলেন।যেহেতু পাণ্ডব ও কৌরব উভয়েই তাঁরই বংশ তাই তিনি এক চোখা হতে পারেন না। বৈশম্পায়নকে বললেন, “আশ্রমের পথ অনেক দূর এখনো। সেখানে আমাদের অনেক সহায়ক গ্রন্থ ও শিষ্য আছে যারা আমাদের বই লেখায় সাহায্য করতে পারে। আমরা অতিবৃদ্ধ, দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, আমাদের তিন জন সাথি দুর্বলতা হেতু আর পথ চলতে অস্বীকার করেছেন। আমরাও জানিনা কখন আমারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ব। তুমি আমার চেয়ে বয়সে ছোট এবং এখনো তোমাকে তেমন কাহিল দেখাচ্ছে না। তাছাড়া তোমার অদ্ভুদ স্মরণশক্তি। আমাদের হাতে সময় খুব কম। আমাদের একদিকে আশ্রমে পৌঁছাতে হবে বই শেষ করার জন্য, অন্যদিকে লডাই করতে হবে মৃত্যুর সাথে। এই চলার পথে আমি তোমাকে মুখে বলতে থাকব। তুমি ঠিক ঠিক মনে রাখবে। আশ্রমের সন্যাসীরা আমাদের লিখতে সাহায্য করবে। আমি যে গ্রন্থটা লিখব তার নাম ‘জয়’, আমি নিরপেক্ষভাবেই এই গ্রন্থ লিখব, এখানে সকল চরিত্র জয়ী, সকলে পরাজিত। এখানে ন্যায়বানের কথা থাকবে, অপরাধীর কথাও থাকবে। মানুষ এখান থেকে বেছে নিবে কে ভাল কে মন্দ। এখানে থাকবে চরিত্রবান ও দুশ্চরিত্রের কথা, থাকবে ধর্ম ও অধর্মের কথা।”

পথ চলতে চলতে ব্যাসদেব বলতে থাকলেন আর বৈশম্পায়ন তা স্মরণে নিতে থাকলেন। এভাবেই মুখে মুখে রচিত হয় মহাভারত যার আদি নাম “জয়।” ভরত বংশের কাহিনী বলেই পরবর্তিতে এই বইয়ের নাম হয় মহাভারত।”

ধরে নেয়া হয়, কুরুক্ষেত্রযুদ্ধের কাল খ্রী-পূ ৩০০০ অব্দের কাছাকাছি[1] এবং এর কিছুদিন পরে মহাভারত রচিত। যদিও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের তেমন কোন ঐতিহাসিক প্রমান নেই। মোটামুটি ভাবে মহাভারতের সংস্কৃত থেকে এর রচনাকাল আন্দাজ করা যেতে পারে-যা হবে প্রায় গৌতম বুদ্ধের জন্মের কয়েকশো বছর আগে। এবং ভাষা থেকে এটাও প্রমানিত হয় প্রায় ৫০০ বছর ধরে গ্রথিত হয়েছে এ কাহিনী। অর্জুনের নাতি ‘রাজা জানামজায়া’(Janamejaya) মহাভারত মহাকাব্যকে গ্রন্থিত করার জন্য ভাইস্যম্পনা’র মাধ্যমে তার শিষ্যকে নিয়োগ করেন। তারপর ভাইস্যম্পনা(Vaisampayana) থেকে জানামজয়া’র করা ফিরিস্থি আবার অনেক ঋষি’র উপস্থিতিতে ‘উগ্রাস্রাভা সূতি’(Ugrasrava Sauti) নামের একজন পেশাদার বেদকে দিয়ে নথিভুক্ত করা হয়।থম দিকে মহাভারতের শ্লোকসংখ্যা ছিল ৮৮০০ তখন নাম ছিল – জয়সংহিতা , পরে ২৪ হাজার শ্লোকসংখ্যা হওয়ায় এর নাম হয় – ভারত সংহিতা ,শেষে এক লক্ষ ছাড়িয়ে যাওয়ায় এর নাম হয় মহাভারত বা শতসাহস্রী সংহিতা ।৭৪,০০০ এর অধিক শ্লোক, কতগুলো দীর্ঘ গদ্য এবং মোট প্রায় ১.৮ মিলিয়ন শব্দের সঙ্গে গ্রন্থিত এই বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্য মহাভারত। সাতনা জেলার মধ্যপ্রদেশে থেকে(৫৩৩-৫৩৪ খ্রিষ্টাব্দে) মহারাজা সার্বানাথ(Sharvanatha) এর সময়ের প্রথম তামার শিলালিপিতে খোদাইকৃত অবস্থায় মহাভারতের ১০০,০০০ শ্লোক সংগ্রহ করা হয় এবং এ থেকে আরোও প্রমাণ মেলে ১৮টি পর্বের (বইয়ের) সম্পাদনা হয় মূলত ৩য় কিংবা ৪র্থ শতাব্দীতে। আমাদের জীবনে যেসব উপলদ্ধি-তার প্রায় সবটাই মহাভারতে আছে।

সাতনা জেলার মধ্যপ্রদেশে থেকে(৫৩৩-৫৩৪ খ্রিষ্টাব্দে) মহারাজা সার্বানাথ(Sharvanatha) এর সময়ের প্রথম তামার শিলালিপিতে খোদাইকৃত অবস্থায় মহাভারতের ১০০,০০০ শ্লোক সংগ্রহ করা হয় এবং এ থেকে আরোও প্রমাণ মেলে ১৮টি পর্বের (বইয়ের) সম্পাদনা হয় মূলত ৩য় কিংবা ৪র্থ শতাব্দীতে।


মহাভারতের অনুবাদক পণ্ডিত কালীপ্রসন্ন সিংহ মহাভারতের ভূমিকায় বলেছেন,
“মহাভারত অতি বৃহৎ গ্রন্থ। সংস্কৃত ভাষায় এতাদৃশবিস্তীর্ণ গ্রন্থ আর দেখিতে পাওয়া যায় না। ইহা ইতিহাস বলিয়াই প্রসিদ্ধ; কিন্তু কোন কোন স্থলে ইহা পুরাণ এবং পঞ্চম বেদ শব্দেও উক্ত হইয়াছে। বস্তুতঃ মহাভারতে পুরাণের সমস্ত লক্ষণ বিদ্যমান আছে, এবং স্থানে স্থানে বেদের আখ্যানও বর্ণিত হইয়াছে। ইহাতে দেবচরিত, ঋষিচরিত ও রাজচরিত কীর্ত্তিত হইয়াছে এবং নানাপ্রকার উপাখ্যানাদিও লিখিত আছে। অতি বিস্তৃত মহাভারত গ্রন্থে অনেক প্রকার রাজনীতি ও ধর্ম্মনীতি উক্ত হইয়াছে, এবং নানাবিধ লৌকিকাচার ও বিষয়-ব্যবহারও বর্ণিত আছে। যাহাতে ভারতবর্ষের পূর্ব্ববৃত্তান্ত সমস্ত জ্ঞাত হইয়া সম্পূর্ণরূপে চরিতার্থ হইতে পারা যায়, সংস্কৃত ভাষায় এতাদৃশ কোন প্রকৃত পুরাগ্রন্থ দৃষ্ট হয় না। কিন্তু মহাভারত পাঠ করিলে সে ক্ষোভ অনেক অংশে দূর হইতে পারে। যেরূপ পদ্ধতি অনুসারে অন্যান্য দেশের পুরাবৃত্ত লিখিত হইয়া থাকে, মহাভারত তদ্রূপ প্রথানুক্রমে রচিত নহে, কিন্তু কোন বিচক্ষণ লোকে মনোযোগপুর্ব্বক ইহার আদ্যোপান্ত পাঠ করিয়া দেখিলে যে ভারতবর্ষের পূর্ব্বকালীন আচার, ব্যবহার, ধর্ম্ম ও বিষয়-ব্যবহারের অনেক পরিচয় প্রাপ্ত হইতে পারেন, তাহাতে আর সন্দেহ নাই।

কোন কোন বিষয় বিবেচনা করিলে মহাভারত যেমন পুরাবৃত্তমধ্যে পরিগণিত হইতে পারে, সেইরূপ কোন কোন অংশে ইহাকে নীতি-শাস্ত্র বলিলেও বলা যায়। ইহার অনেক স্থানে সুষ্পষ্টরূপে অনেক উপাখ্যানাদি বর্ণিত হইয়াছে। মহাভারতের রচনাকর্ত্তা এবং ভারতবর্ষীয় অপরাপর পূর্ব্বতন ঋষিগণ উল্লিখিত অসামান্য গ্রন্থের অধ্যয়ন ও শ্রবণের যে সমস্ত অসাধারণ অলৌকিক ফলশ্রুতি বর্ণন করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে আস্থাশূন্য হইলেও ইহার শ্রবণ ও অধ্যয়ন দ্বারা নীতি, জ্ঞান ও বিষয়-ব্যবহার জ্ঞানাদি অনেক প্রকার উপকার লাভ করিয়া সুখী হওয়া যাইতে পারে, সন্দেহ নাই।”

মহাভারত সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–“ইহা কোনও ব্যক্তি বিশেষের রচিত ইতিহাস নহে, ইহা একটি জাতির স্বরচিত স্বাভাবিক ইতিহাস। রামায়ণ-মহাভারতআমাদেরইইতিহাস।”

রাজমেখর বসু বলেছেন–“প্রচুর কাব্যরস থাকলেও মহাভারতকে মহাকাব্য বলা হয় না, ইতিহাস নামেই এই গ্রন্থের প্রসিদ্ধি।”

হোক এইকথা স্বীকার করতে আপত্তি নেই যে মহাভারত একটি মহাকাব্যগ্রন্থ – শক্তিশালী লেখকদের গ্রন্থনায় একটি অতুলনীয় রূপকথার কাহিনী। এর খন্ড খন্ড কাহিনী নিয়ে প্রচুর যাত্রা পালাও হয়েছে। রবিঠাকুর কর্ণ-কুন্তী সংবাদ আর চিত্রাংগদা লিখেছেন সাহিত্যের ভিত্তি কল্পনায়-সেই কল্পনার জগতেই মহাভারত চিরজাগরুক
মহাভারত কাহিনী মূলত পাণ্ডু ও ধৃতরাষ্ট্র এই দুই ভাইয়ের পুত্রদের মধ্যকার যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত। পাণ্ডুর পাঁচ পুত্রের মধ্যে যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠ। অন্যদিকে ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী গান্ধারীর গর্ভজাত দুর্যোধন, দু:শাসন, দু:সহ, দুর্মুখ ইত্যাদি নামীয় শত পুত্র। পঞ্চপাণ্ডব ভ্রাতাদের স্ত্রী দ্রৌপদী। রাজা পাণ্ডুর মৃত্যুর পর অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুর্যোধন অন্যান্য ভ্রাতা সহযোগে পঞ্চপাণ্ডবকে রাজ্যচ্যুত করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করেন। তিনি যুধিষ্ঠিরকে দ্যূতক্রীড়া বা জুয়া খেলায় পরাজিত করে রাজ্যচ্যুত করেন এবং এরপর সর্বসমক্ষে রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করেন। পঞ্চপাণ্ডব দেশত্যাগ করেন। অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হয় যাতে বহু সংখ্যক রাজা এবং সেনাবাহিনী যোগদান করে। এই যুদ্ধে দুর্যোধন পক্ষ পরাজিত ও ধ্বংস হয়। পঞ্চপাণ্ডব রাজ্য ফিরে পান এবং যুধিষ্ঠির সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু জ্ঞাতিহত্যা ও বিপুল রক্তক্ষয়ে যুধিষ্ঠিরের মন অশান্ত ছিল। ছত্রিশ বৎসর রাজ্য শাসন করার পর তিনি তার ছোট ভাই অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিৎকে রাজ্যভার দিয়ে মহাপ্রস্থানে গমন করলে দ্রৌপদী এবং বাকী চার ভাই তাঁকে অনুসরণ করেন। তাঁরা সকলে স্বর্গলাভ করেন। তবে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির স্বশরীরে স্বর্গে প্রবেশ করেন।

আর কুরুক্ষেত্রের এই মহাসংগ্রামের সাথে ওতপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে শ্রী কৃষ্ণ নামের এক প্রবল প্রতাপশালী রাজার কাহিনী। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যাকে বিবেচনা করেন ভগবানের অবতার বা স্বয়ং ভগবান বলে।
বারীন্দ্রনাথ দাশের বই ‘শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেব’ এ বলছেন-“ধারনা ছিলো জরাসন্ধ আর দুর্যোধন একত্র হলে আর্যাবর্ত তাদের করায়ত্ত হবে, কুরু পাঞ্চালের বিশাল অঞ্চলে উৎপাদন হতো প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্যশস্য।” মগধ রাজ্যের সাথে সামুদ্রিক বাণিজ্যের সম্পর্ক ছিল পশ্চিমের যবন রাজ্যের। তাই মগধের সাথে মিত্রতা ছিলো ধৃতরাষ্টের কাম্য। এটিও ছিলো আরেকটি কারণ। মূলত যুধিষ্ঠির পাশা খেলায় হারলে কৌরবরা রাজসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করে আর এর প্রতিশোধ নিতে কৌরব এবং পান্ডবদের যুদ্ধ নিশ্চিত হয়ে পড়লে কুরুক্ষেত্র নামক ময়দানে এই যুদ্ধ হয় বলে একে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বলে।
মহাভারতে বর্ণিত সবগুলো ঘটনার ঐতিহাসিকভাবে কোন প্রমাণ নেই (তবে দু’য়েকটার থাকলে থাকতে পারে)। খ্রীস্টপূর্ব ৬ম-৭ম শতাব্দীর দিকে কুরুরাজ্য থেকে থাকতে পারে, এবং সে রাজ্যে অন্তত কোন একটা যুদ্ধ বা গণ্ডগোল এরকম কিছু হয়েছিল যেটা তৎকালীন ভারতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এমন একটা বিশ্বাস বৈধ গবেষকদের মধ্যেও আছে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে উভয় পক্ষে মাত্র ১১-১৩ জন যোদ্ধা বেঁচেছিলেন আর মারা গিয়েছিল প্রায় চল্লিশ লক্ষ সৈন্য/সেনাপতি/রথি/মহারথি/যোদ্ধা এবং আরো অনেক হাতি -ঘোড়া ও মাহুত। যুদ্ধের প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ শুরুর পূর্বে অর্জুন যখন যুদ্ধ করবেন না বললেন তখন অনেক কথা বলতে বলতে একসময় শ্রীকৃষ্ণ বললেন – “এখানে তুমি পক্ষে ও বিপক্ষে যাদের দেখছ তাদের কেউই আর বেঁচে থাকবে না। তুমি কেবল নিমিত্ত হও। রাজ্য ভোগ বা জয় পাওয়ার জন্য নয় তুমি যুদ্ধ কর একজন যোদ্ধা(ক্ষত্রিয়) হিসেবে। তুমি এই যুদ্ধের কারণ নও, এই যুদ্ধ নিজ থেকে তোমার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে। এখন যদি তুমি যুদ্ধ ক্ষেত্র পরিত্যাগ কর তাইলে যেসব যোদ্ধা তোমার অনেক খ্যাতি ও সম্মান করত তারা তোমাকে দূর্বল ভাববে। দুর্যোধনেরা সারা জীবণ তোমার নিন্দা করে যাবে। অসম্মান অপেক্ষা মৃত্যুই শ্রেয়। …”

কৃষ্ণ যুধিষ্ঠির এবং অর্জুনকে নির্দেশ দেন যাতে তারা ভীষ্মের দেওয়া যুদ্ধজয়ের বর ফিরিয়ে দেয় কেননা ভীষ্ম স্বয়ং সেই যুদ্ধে পাণ্ডবদের প্রতিপক্ষ হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।ভীষ্মকে এ কথা জানানো হলে তিনি একথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে কীভাবে তিনি অস্ত্র পরিত্যাগ করবেন সে উপায় পাণ্ডবদের বলে দেন।তিনি বলেন যদি কোন নারী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে তবেই তিনি অস্ত্রত্যাগ করবেন।সেদিনের পরদিন কৃষ্ণের নির্দেশে শিখণ্ডী নামের একনারী অর্জুনের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেন এবং ভীষ্ম তাঁর সকলঅস্ত্র নামিয়ে রাখেন।

কৃষ্ণ ধৃতরাষ্ট্রের জামাতা জয়দ্রথকে হত্যা করতে অর্জুনকে সহায়তা করেন।জয়দ্রথের কারণেই অর্জুনের পুত্র অভিমন্যু দ্রোণাচার্যের চক্রব্যূহে প্রবেশ করেও বেরিয়ে আসার উপায় অজ্ঞত থাকায় কৌরবদের হাতে নিহত হয়েছিলেন।অর্জুন ঘোষণা দিয়ে প্রতিজ্ঞা করেন পরদিন
সূর্যাস্তের আগেই জয়দ্রথকে হত্যা করবেন।বিপদজনক এ প্রজ্ঞাপণ শুনে জয়দ্রথ পালানোর পথ খুজতে শুরু করেন।সেদিনের এক ক্ষীপ্র হামলায় শ্রীকৃষ্ণের সহায়তায় খুব কম সময়ের ব্যাবধানে অর্জুন জয়দ্রথকে হত্যা করতে সমর্থন হন।

কেউ যতই যুদ্ধ করুক সত্যকথা বলার উপর তাঁর সম্মানদেখানোই তাঁকে মহামানবে পরিণত করে।কৃষ্ণের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল।কৃষ্ণ কৌরবদের সেনাপতি দ্রোণাচার্যের পতনও সম্পন্ন করেছিলেন।তিনি ভীমকে নির্দেশ দিয়েছিলেন অশ্বত্থামা নামক একটি হাতিকে হত্যা করতে এবং তাৎপর্যপূর্ণভাবে দ্রোণাচার্যের পুত্রের নামও অশ্বত্থামা।এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে যুধিষ্ঠির দ্রোণাচার্যকে গিয়ে বলেন যে অশ্বত্থামা নিহত হয়েছেন এবং তারপর খুব মৃদুস্বরে বলেন যে সেটি একটি হাতি যেহেতু যুধিষ্ঠির কখনও মিথ্যাচার করতেন না।কিন্তু দ্রোণাচার্য তাঁর প্রথম কথাটি শুনেই মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন ও অস্ত্র পরিত্যাগ করেন।এরপর কৃষ্ণের নির্দেশে ধৃষ্টদ্যুম্ন দ্রোণাচার্যের শিরশ্ছেদ করেন।যুধিষ্ঠিরের রথের চাকা তার সত্যবাদিতার কারণে কখনও মাটি স্পর্শ করত না, মাটি থেকে একটু উপরে থাকতো। কিন্তু এই ঘটনার পর যুধিষ্ঠিরের রথের চাকা মাটিতে নেমে যায়।

কর্ণের সাথে অর্জুনের যুদ্ধের সময় কর্ণের রথের চাকা মাটিতে বসে যায়। তখন কর্ণ যুদ্ধে বিরত থেকে সেই চাকা মাটি থেকে ওঠানোর চেষ্টা করলে কৃষ্ণ অর্জুনকে স্মরণ করিয়ে দেন যে কৌরবেরা অভিমন্যুকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে যুদ্ধের সমস্ত নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তাই তিনি নিরস্ত্র কর্ণকে হত্যা করে অর্জুনকে সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতে আদেশ করেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষপর্যায়ে কৌরবপ্রধান দুর্যোধন মাতা গান্ধারীর আশীর্বাদ গ্রহণ করতে যান যাতে তার শরীরের যে অঙ্গসমূহের উপর গান্ধারীর দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হবে তাই ইস্পাতকঠিন হয়ে উঠবে।তখন কৃষ্ণ ছলপূর্বক তার ঊরুদ্বয় কলাপাতা দিয়ে আচ্ছাদিত করে দেন।এর ফলে গান্ধারীর দৃষ্টি দুর্যোধনের সমস্ত অঙ্গের উপর পড়লেও ঊরুদ্বয় আবৃত থেকে যায়।এরপর যখন দুর্যোধনের সাথে ভীম গদাযুদ্ধে লিপ্ত হন তখন ভীমের আঘাত দুর্যোধনকে কোনভাবে আহত করতে ব্যর্থ হয়।তখন কৃষ্ণের ইঙ্গিতে ভীম ন্যায় গদাযুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করে দুর্যোধনের ঊরুতে আঘাত করেন ও তাকে হত্যা করেন।এইভাবে কৃষ্ণের অতুলনীয়
ক্ষীপ্র,তীব্র ও অপ্রতিরোধ্য কৌশলের সাহায্যে পাণ্ডবেরা কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ জয় করে।এছাড়াও কৃষ্ণ অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিতের প্রাণরক্ষা করেন যাকে অশ্বত্থামা মাতৃগর্ভেই ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে আঘাত করেছিলেন।পরবর্তীকালে পরীক্ষিতই পাণ্ডবদের উত্তরাধিকারী হন।

দূর্যোধন শ্রীকৃষ্ণ শঙ্খে ফূঁ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সমাপ্তিঘোষণা করেন সপরিবারে প্রভাস তীর্থে গমন ও যদুবংশ বিনাশ: মহাভারত অনুসারে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ফলে গান্ধারীর একশ পুত্রের মৃত্যু ঘটেছিল। দুর্যোধনের মৃত্যুর আগেররাতে কৃষ্ণ গান্ধারীর নিকট শোকজ্ঞাপন করতে যান।কিন্তু শোকাহত গান্ধারী ভেবেছিলেন যে কৃষ্ণ ইচ্ছাকৃত ভাবে যুদ্ধের অবসানের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।শোকে দুঃখে কাতর হয়ে তিনি কৃষ্ণকে এই বলে অভিশাপ দেন যে কৃষ্ণ অন্যান্য সমস্ত যাদবদের সাথে ৩৬ বছর পরে ধ্বংস হয়ে যাবেন।এরপর একদিন কয়েকজন যাদব কৃষ্ণের পুত্র শাম্বকে গর্ভবতী স্ত্রীবেশে সজ্জিত করে কয়েকজন মুনিকে কৌতুকবশতঃ প্রশ্ন করেন যে নারীর ছদ্মবেশী শাম্বর সন্তান পুত্র হবে না কন্যা।তখন সেই ঋষিরা ধ্যানে সব জানতে পেরে ক্রুদ্ধ হয়ে সেই যাদবদের অভিশাপ দেন যে স্ত্রীবেশী শাম্ব একটি লৌহ মুষল প্রসব করবে এবং সেই মুষলের দ্বারা সমগ্র যদুকুল ধ্বংস হয়ে যাবে।এই অভিশাপে তারা ভীত হয়ে যদুপ্রধান কৃষ্ণের কাছে যায় এবং কৃষ্ণ তাদের প্রভাস নামক তীর্থে গিয়ে সেই সদ্যপ্রসূত মুষল পাথরে ঘষে ক্ষয় করার উপদেশ দেন।যাদবেরা কৃষ্ণের পরামর্শ অনুসারে মুষল ক্ষয় করলেও একটি ছোট অংশ নদীর পানিতে নিক্ষেপ করেন।ঘটনাচক্রে সেই লৌহখণ্ড একটি মাছ ভক্ষণ করে এবং এক ধীবরের হাত হয়ে এক ব্যাধ সেই মুষলখণ্ড লাভ করে।সেই ব্যাধ তখন সেই লৌহখণ্ড দিয়ে এমন এক বাণ প্রস্তুত করেন যার দ্বারা কিছুকাল পরে যদুকুল বিনষ্ট হয়।

এর কিছুকাল পরে একদিন কৃষ্ণ উপলব্ধি করলেন যে দ্বারকা নগরী জনবসতিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।ষোল হাজার রমণী ও অষ্টমহিষী থেকে জাত স্বয়ং কৃষ্ণের অসংখ্য পুত্রপৌত্রাদিতে যদুবংশ বিপুল আকার ধারণ করেছে।এছাড়াও অন্যান্য যাদবদের পরিবারও প্রচুর।তাই তিনি অগ্রজ বলভদ্রের সাথে পরামর্শ করে পৃথিবীর ভার লাঘবার্থ বিপুল যদুবংশ ধ্বংস করা কথা স্থির করলেন।তিনি দ্বারকার নারীদের গৃহে রেখে সকল যাদবদের প্রভাস তীর্থে গমনের আদেশ করলেন ও স্বয়ং সেখানে গেলেন।সেখানে সুরাপানের ফলে যাদবদের মধ্যে তীব্র অন্তর্কলহের ফলে তারা নিজেরাই নিজেদের হত্যা করে।

সনাতন ধর্মালম্বী হিন্দু সম্প্রদায়ের মুল ধর্ম গ্রন্থ হলো শ্রীমদদ্ভগবদ গীতা। আর গীতা হলো ভগবান শ্রী কৃষ্ণের মুখনৃর্সিত বাণী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় শ্রী কৃষ্ণ অর্জুনের রথের সারথি হয়ে ধর্মযুদ্ধের পক্ষে অর্জুন কে যে উপদেশ গুলোর দিয়েছেন সেটার লিপিব্ধ হলো গীতা। স্বাভাবিক ভাবে একজন আদর্শবান শিক্ষক বলতে আমরা বুঝি যে শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো পাঠ দিতেন পারেন,যে শিক্ষক শুধু তার শিক্ষার্থীকে পুথিগত বিদ্যাদান ই করেন না তিনি তার শিক্ষার্থীকে একজন আদর্শবান ব্যক্তি হতে জীবনের পথ চলাতে নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন তিনিই একজন আদর্শবান শিক্ষক। এই শিক্ষক তার ছাত্রদের কাছে পরম পুজনীয় হয়ে থাকেন। একজন ছাত্র তার শিক্ষকরে পরামর্শে জীবনের চলার ভালো পথ পেলে সেই শিক্ষক তার নিকট দেবতার মতাে হয়ে থাকে। একজন ভাল শিক্ষক এর পরামর্শেই ছাত্র-ছাত্রীরা বিপথ জ্ঞামী হয় না,মাদকা শক্ত হয়না, অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে এবং সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ ভাবে পথ চলতে পারে। গীতার ১৬ টি অধ্যায়ে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ এমন উপদেশ দিয়েছেন যা মানুষকে সব ধরনের পাপ কাজ থেকে দুরে থাকতে সহয়াতা করবে এবং ন্যায় অন্যায় বুঝবার জ্ঞান যোগাবে। এবং কোন কাজ করা যাবে আর কোন কাজ করা যাবে না সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করবে।

গীতায় শ্রী কৃষ্ণ বলেছেন
‘যদা যধা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুথানধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম:
পরিত্রাণয় সাধূনং বিনাশায় চ দুস্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে:

এই শ্লোকের অর্থ হলো যখনই ধর্মের গ্লানি ও অধর্মের অভ্যুথান হয়,তখনই আমি ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে সাধুদের রক্ষা এবং দুস্কৃতিকারিদের ধ্বংশ করে ধর্মের সংস্থাপন করি।

দ্বাপর যুগে ভাদ্রমাসের অষ্টমী তিথিতে এক ঝড় বৃষ্টির রাতে কংসের কারাগারে জন্ম হয় শ্রী কৃষ্ণের। বসুদেব ও দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান যুগবতার ভগবান শ্রী কৃষ্ণ। কংসের হাত থেকে নবজাতক কৃষ্ণ কে রক্ষা করার জন্য সেই ঝড় বৃষ্টির রাতে বসুদেব তাকে যমুনা পার হয়ে গোকুলে নন্দাআলয়ে রেখে আসেন। এই থেকেই বোঝা যায় সেই সময়ে সাধুরা দুষ্ট কংসের অত্যাচারে কেমন ভীত সংকিত ছিলো। তাই সেই সময়ে শ্রী কৃষ্ণের আর্বিভাবটা ছিলো একটি সময়পযোগী মাহেন্দ্রক্ষন। তিনি কংসকে বধ করে বাবা-মা কে মুক্ত করেছেন কারাগার থেকে। ভগবান শ্রী কৃষ্ণের বাল্যকাল থেকে শুরুকরে তিরোধন পর্যন্ত তার প্রত্যেকটা কাজ এবং বানী আমাদের সকলের জীবনে একটি দিকনির্দেশনা হয়ে গেছে। শ্রী কৃষ্ণ যেমন একজন বন্ধুবৎসল,ভ্রাতৃপ্রীতম, প্রেমিক,রাজ্যশাসক এবং দক্ষ রাজনিতীবদি। তিনি মানুষকে দেখিয়েছেন সৎ ভাবে চলার পথ,শুনিয়েছেন গীতার অমৃতবাণী। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুনের বিপক্ষে নিজ আতœীয় পরিজনকে দেখে কাতর অর্জুন কে সাহস যোগাতে শ্রী কৃষ্ণ শুনিয়েছিলেন সাত শত শ্লোকের অমরবানী। আতœার অবিনাশিতা,সমদর্শন,ধর্মযুদ্ধ,মানুষের আচরনীয় বিষয়সমুহ বহুবিধ বিষয়ে সখা অর্জুনকে যোগস্থ ভগবান শ্রী কৃষ্ণ উপদেশ দিয়েছেন। বড় উপদেশ হলো ক্লৈবং মাস্ম গমঃ পার্থ।মনের সকল ক্লিবতা দুর করো পার্থ। অর্জুন কে যে বানী গুলো শুনিয়েছেন এবং সেই শিক্ষাথেকে অর্জুন শিক্ষিত হয়েই যুদ্ধে জয়ের পাশাপাশি রাজ্যচালনার জ্ঞান এবং শক্তি দুই পেয়েছেন।

মহাভারতের একটি অংশের নাম গীতা । গীতা অর্থ গীত বা গান । কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এই গান রচিত হয়েছিল । কৃষ্ণ (কাল) অর্জুন (সাদা) প্রতীকের মাধ্যমে কথোপকথন এই গানের বিষয়বস্তু । গীতার মতে যুদ্ধক্ষেত্র কুরক্ষেত্র, ধর্মক্ষেত্ররূপে স্বীকৃত । ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেত যুযুৎসব I অর্জুন শুভ্র বা কোমল অন্তরের মানুষ । তিনিযুদ্ধ, হত্যা রক্তপাত পছন্দ করতেন না । তিনি ছিলেন যুদ্ধবিরোধী শান্তি প্রিয় সাদা অন্তরের মানুষ । অপরদিকে কৃষ্ণরূপে যাকে চিত্রিত করা হয়েছে তিনি ছিলেন যুদ্ধের পক্ষে । হত্যা এবং ধ্বংস তার কাছে অতি সাধারণ বিষয় । অর্জুন যখন বললেন, আমি যুদ্ধ করব না তখন কৃষ্ণ বললেন হে পার্থ কাতর হইওনা । এই পৌরুষ হীনতা তোমাকে শোভা পায়না (২/৩)। প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তিরা কি মৃত, কি জীবিত কাহারও জন্য শোক করেন না (২/১১) । গতানূগতা সূংশ্চনানু শোচন্তি পন্ডিত । অতএব তুমি যুদ্ধ কর (২/১৮) যুধ্যস্ব ভারত । ধর্ম যুদ্ধ অপেক্ষ ক্ষত্রিয়ের পক্ষে শ্রেয় আর কিছু নাই । ধর্মাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োহনাৎ ক্ষত্রিয়স্য নবিদ্যতে (২/৩১) হত বা প্রাপ্ন্যসি স্বর্গ জিত্বাবা ভোক্ষ্য সেম হীম (২/৩৭)এই যুদ্ধে হত হলে স্বর্গ লাভ আর জয়ী হলে পৃথি বীলাভ । এত সব লোভনীয় বক্তব্যের পরও অর্জুন অস্ত্র ত্যাগ করে বসে আছেন । তিনি কোন মতেই যুদ্ধ করবেন না । অপরদিকে কৃষ্ণ বার বার বলে যাচ্ছেন, নিরাশী নির্মমোভূত্বা যুধ্যস্ব বিগত জ্বর(৩/৩০) কামনা ও মমতা শূণ্য হয়ে শোক ত্যাগ করে তুমি যুদ্ধ কর ।গীতা কোন আবতীর্ণ গ্রন্থ নয় । কুরুক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে অবতার কৃষ্ণ এহেন দীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেছিলেন বলেও গুণীজন বিশ্বাস করেন না । বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায় বলেছেন , গীতা গ্রন্থখানী ভগবত প্রণীত নহে, অন্য ব্যক্তি ইহার প্রনেতা ( রচনাবলী,৬৯৩পৃঃ ) তিনি আরো বলেছেন, যুদ্ধ ক্ষেত্রে উভয় সেবার সস্মুলে রথ স্থাপিত করিয়া কৃষ্ণার্জুনে যথার্থ এইরূপ কথোপকথন যে হইয়াছিল তাহা বিশেষ সন্দেহ (রচনাবলী ) অনেকের মতে গীতা শঙ্করাচার্য প্রণীত । রচনার পর এটিকে মহাভারতে ঢুকিয়ে দেয়া হয় (ভারতেবিবেকানন্দ, ৪২৪পৃঃ) গীতা মহাভারতের অংশ কিনা সে বিষয়েও পন্ডিতদের সন্দেহ (শ্রী রাধার ক্রম বিকাশ, দর্শনে ও সাহিত্যে ,৫৯পৃঃ) । মহাভারতএক হাতের রচনা নয় । এক সময়ের লেখাও নয় (বঙ্কিমরচনাবলী, ৯০৩পৃঃ)। ভারতে কৃষ্ণ নামে বহু লোকের জন্ম হয়েছে । উইনটারনিস বলেছেন, পান্ডব দিগের সখা ও পরামর্শ দাতা কৃষ্ণ, ভগবত গীতার তত্ত্ব।

সিদ্ধান্তের প্রাচারক কৃষ্ণ, যুবসভার বীর ও অসুর নিসুদন কৃষ্ণ । গোপী দিকের প্রিয়তম ও বল্লভকৃষ্ণ এবং পরিশেষে দেব শ্রেষ্ঠ বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ যে এক ও অভিন্ন ব্যক্তিহ ইতে পারেন তাহা বিশ্বাস করা কঠিন । ইহা অধিকতর সম্ভব যে , দুই বা কতিপয় কিম্বদন্তী পরষ্পরাগত কৃষ্ণ ছিলেন, তাহারা পরবর্তী কালে একই দেবতারূপে সংমিশ্রিত হইয়াছিল (A Histroy of Indian Literature ,Vol-1 , Page -456) ৬: প্রফুল্ল ঘোষ বলেছেন , মহাভারতের কৃষ্ণ, ছান্দোগ্যো উপনিষদের কৃষ্ণ, শ্রীমত ভগবতের কৃষ্ণ, আর শ্রী রাধার মানভঞ্জনকারী কৃষ্ণ এক কিনা একথা জোর করে বলা শক্ত (প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস , ১৩পৃঃ) । (সম্পাদিত)

৬ thoughts on “মহাভারতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তাঃ ১

  1. গোমূত্র পানকারী তোমার মুখোশ
    গোমূত্র পানকারী তোমার মুখোশ খসে পড়েছে।
    তুমি দিব্যি ইসলাম নিয়ে ট্রল করেছো এখন দেখা যাচ্ছে তুমি তাদের চেয়েও ক্ষেত ও যুদ্ধবাজ।
    তুমি আর যাই হও মুক্তমনা নও,তুমি মুখোশধারী চাড্ডি।।
    তুমি যে এখনো চটি ধর্ম চোনাধনে বিশ্বাসী

  2. আপনি যদি প্রমাণ দিতে পারেন যে
    আপনি যদি প্রমাণ দিতে পারেন যে আমি ব্লগের কোথাও ইসলাম নিয়ে একবার ও ট্রল করেছি, তাহলে জীবনে আর কখনো ব্লগিং করবোনা। আর ফেক নামে এসে এসব ত্যানা প্যাচানো বাদ দিন। পাবলিক আপনাদের ভালোমতোই চেনে। শ্রাবণ রায়, যদিও ওটা আপনার আসল নাম নয়।

  3. এটা সিরিজ আকারে প্রকাশ করা
    এটা সিরিজ আকারে প্রকাশ করা যায় না?? ভাল হয়েছে। তবে, ভক্তির দিকটি কমিয়ে রাজনীতি ও সেই সময়ের সমাজনীতির প্রতি বেশী গুরুত্ব দেবার অনুরোধ রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *