ছিটেফোঁটা জীবন (অফিস জীবন : স্মার্টফোন পর্ব)

হঠাৎ মাঝে মধ্যে কিছু মজার কথা মনে পড়ে যায়। সেরকম একটা ঘটনা, আমার ব্যাংকেরই কোন এক ব্রাঞ্চের অভিজ্ঞতা। সেখানে আমার এক সহকর্মী আছেন। আমার অনেক, অনেক, অনেক জুনিয়র। যদিও আই.টি ডিপার্টমেন্টের সাথে ওর কাজের কোন সরাসরি সম্পর্ক নাই, বা কম্পিউটার রিলেটেড ব্যাকগ্রাউন্ডও ওর না, তবুও কম্পিউটার, মোবাইল-ফোন এইসব বিষয়ে সে বেশ খবরাখবর রাখে। চাকরির সাথে সাথে সাথে টুকিটাকি হার্ডওয়্যারের ব্যাবসাও সে করে। কারো ঘরের জন্য কিছু, যেমন পোর্টেবল হার্ড-ডিস্ক, ক্যাবল, মাউস, কি-বোর্ড ইত্যাদি দরকার হলে তার কাছ থেকেই নেয়। সে খুব কম দাম রাখে। এন্ড্রয়েড বা আই-ফোন ঝামেলা করলে সে টিপাটিপি করে সারিয়ে দেয়। মোট কথা এই বিষয়ে তার বেশ সুনাম, ডিগ্রী-নাই বিশেষজ্ঞ যাকে বলে আর কি। ছেলেও অবশ্য খুব ভালো। সদালাপী, হাসিমুখ। তো একদিন ও আমার সাথে কথা বলছে। বিভিন্ন বিষয়ে। কথায় কথায় মোবাইল ফোন, ফোনের এ্যাপ এইসব বিষয় চলে আসলো।

– স্যার, আপনার ফোনটা কি কাজে বেশী ব্যাবহার করেন?
– এইতো ফেসবুক দেখি, উইকিপেডিয়া দেখি, ব্রাউজিং করি…, এইসব।
– স্যার কি দিয়ে ব্রাউজ করেন?
– গুগল দিয়েই করি সবসময়।
– স্যার কি চরম ব্যাবহার করেন?

আমি হালকা ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। ইন্টারনেটের চরম ব্যাবহার? এইটা আবার কেমন প্রশ্ন? তাহলেতো একেবারে দিন-রাত, নাওয়া-খাওয়া, সমাজ-সংসার, চাকরি-বাকরি সব ভুলে মোবাইল ফোন নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিতে হবে। গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম-টাম উঠে একাকার হয়ে যাবে। যাই হোক, কোনরকমে ভ্যাবাচ্যাকা হজম করে বললাম,

– আরে না, ওভাবে কি ব্যাবহার করা যায় না কি? এই টুকটাক এইটা-ওইটা দেখি।
– বলেন কি? তাইলেতো অনেক স্লো ব্রাউজ করেন! চরম ব্যাবহার করলে না পরে আরাম পাইতেন।
– আরে ভাই, সময় কই এতো?

এবার আমি খানিকটা বিরক্ত। টেক-ফ্রিক আমি না, তাই বলে আমি কি আবুল, না মফিজ? সেই ডায়াল-আপের আমল থেকে নিজের কম্পিউটারে ইন্টারনেট ব্যাবহার করি। কি-বোর্ডে আমার টাইপিং স্পিড দেখলে পাবলিক ভ্যাবাচ্যাকা খায়। আর এক জুনিয়র আমারে আসছে ব্রাউজিং শিখাইতে? তাও আবার বলে চরমভাবে না করলে নাকি আরাম নাই! কোনমতে বিরক্তি চেপে চুপ করে থাকটাই শ্রেয় মনে করলাম। কিন্তু তাতে তার উৎসাহে ভাটা পরলো না।

– বুঝছেন স্যার, চরম ইউজ করে দেখেন। ব্রাউজিং এর আসল মজা পাইবেন। আজকেই বাসায় গিয়ে নামায়া নিয়েন। তখন বুঝবেন আমি কি বলসি।

আমি আবার সেকেন্ড ডোজ ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম। চরম কি শিকেয় তোলা নাকি যে নামিয়ে নেব?

– বল কি? চরম আবার কোত্থেকে নামাবো?

এরপর ওর যা চেহারার ভংগী হলো সেটা দেখলে দু’চোখে ছানিপরা লোকও বুঝবে যে আমার মত একটা ব্যাকডেটেড অকাট মূর্খ কি করে এতবড় একটা ব্যাংকের এরকম একটা পদ “আলোকিত” করে বসে আছে সেটা ভেবে সে চরম বিরক্ত, হতাশ ও মর্মাহত। যাই হোক, চরম বিরক্তি হতাশা ও করুনা চেহারায় ধারন করেই সে বললো,

– খুব সহজ স্যার। ফোনের গুগল প্লে এ্যাপটা ওপেন করে সার্চ এ গিয়ে টাইপ করবেন C, H, R, O, M, E… তারপর…

তার বাকী কথা আর শোনা হলো না। আমার মাথার ভেতর পাক খেয়ে উঠলো। মগজের ভেতর প্রয়াত কবি জীবনানন্দ দাশ যেন বলে উঠলেন,

“অর্থ নয়, র্কীতি নয়, সচ্ছলতা নয়-
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে”

১ thought on “ছিটেফোঁটা জীবন (অফিস জীবন : স্মার্টফোন পর্ব)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *