বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্ব ব্যাঙ্কের লোলুপ দৃষ্টি

বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে ১৮৮ টি দেশের সমন্নয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যার নাম বিশ্ব ব্যাঙ্ক কিন্তু কি এক অদ্ভুত কারণে সেই সংস্থাগুলোতে ঐতিহ্যগতভাবে আইএমএফের প্রধান নির্বাচিত হন ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আর বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাচিত হন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। অনেকেই হয়তো ভাবছেন দারিদ্র বিমোচনে এই সংস্থার অবদান অপরিসীম, আসলে মোটেই তা নয় | বিশ্ব ব্যাঙ্কের আসল উদ্দেশ্য ও নিয়ম অনুযায়ী দরিদ্র দেশ গুলোকে বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেকে সহজতর করা এবং পুঁজির বিনিয়োগ নিশ্চিত করা | এবার আসুন এই সংস্থার কার্যকর্ম নিয়ে কিছু আলোচনা করা যাক | এই ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফ্রান্স ছিল প্রথম ঋণ গৃহিতা দেশ | কঠিন শর্তের অধীনে চিলি ও পোল্যান্ডকে ডিঙিয়ে তদানীন্তন ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জন ম্যাকক্লয় ফ্রান্সেকে ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছিলেন যদিও চিলি ও পোল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল সব চাইতে বেশী, ফ্রান্স দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে আমারিকার সহযোগী থাকার কারণেই সর্ব প্রথম এই সুবিধা পেয়েছিলো আর অনেকেই তা ধারণা করে থাকেন |
এই সংস্থার দুর্নীত ও শোষনের চিত্র আমারা ইকনমিক হিট ম্যান খ্যাত জন পারকিন্স এর বিভিন্ন বই পড়লেই বিশদ ভাবে জানতে পারবো | আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ হাসিল করার উদ্দেশ্যেই জন পারকিন্সকে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে বিশ্ব ব্যাঙ্কে নিযোগ করা হয় | জন পারকিন্স এর কাজ ছিল ইকুয়েডর, পানামা, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশেগুলোতে বিপুল পরিমানে অর্থ দিয়ে ঋণের জালে আবদ্ধ করা আর এই ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে অনেক দেশকেই বিশ্ব ব্যাঙ্ক ঋণের উপর ঋণ নিতে বাধ্য করে | ঘুষ, হুমকি, দুর্নীতি আর বানিজ্য ছিল জন পারকিন্স এর নিত্য দিনের সঙ্গী, এই সব ঘটনা সঠিক ভাবে জানতে হলে আমার অনুরোধ আপনারা এই লেখকের একটি বই word-of-mouth পড়ে দেখবেন, সেই বইতেই জানতে পারবেন তিনি কি ভাবে বিশ্বের দরবারে এই দুর্নীতি পরায়ন বিশ্ব ব্যাঙ্কের মুখ উন্মোচিত করেছেন | একজন অর্থনৈতিক হিট ম্যানের স্বীকারোক্তিতে আরও আরো জানতে পারা যায় যে আমেরিকার স্বার্থ উদ্ধারে গ্রীসের মত একটি দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে কি ভাবে ক্ষত বিক্ষত করা হয় |
বর্তমানে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতক উন্নতি সাধিত হচ্ছে তার প্রতি বিশ্ব ব্যাঙ্কের লোলুপ দৃষ্টি আছে আর তা থাকাটাই স্বাভাবিক , বিশ্ব ব্যাঙ্ক নিজেদের ব্যবসা প্রসারে ১৯৫০ সাল থেকেই বিশ্বের দরিদ্র দেশ গুলোকে ব্যবহার করে আসছে আর তাই আমাদের পদ্মা সেতুতে তাদের অর্থ বিনিযোগের সুযোগ গ্রহনে বাংলাদেশকে অনেকদিন যাবত প্রলোভন দেখিয়ে আসছে ও ভবিষ্যতেও করবে |
বিশ্বব্যাংকে কি দুর্নীতি হয় না ? হয় তো বটেই.. তাই বলে আমি বিশ্বব্যাংকের গুনগান গাইতে বসি নাই, আমি ইচ্ছে করলেই বিশ্বব্যাংকের অজস্র দুর্নীতির কথা উল্লখ্য করতে পারবো, কিন্তু লেখাটা অযথাই বড় করতে চাই না |
আজ নাহোক কাল একদিন হয়তো বাংলাদেশের মানুষ বুঝতে পারবে বর্তমান প্রধানমন্তী শেখ হাসিনা বিশ্ব ব্যাঙ্ক এর দ্বারগ্রগ্রোস্থ না হওয়ার বিষয়ে এই সাহসী পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্যে কত উপকারী একটা পদক্ষেপ | বিশ্ব ব্যাঙ্ক হচ্ছে আমেরিকার পক্ষে তাবেদারী একটি সংস্থা যার মাধ্যমে আমেরিকার ব্যবসা বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়ে থাকে | ১৯৫০ সাল থেকেই এই সংস্থার দ্বারগ্রোস্থ পৃথিবীর অনেক অনেক দেশ সুদের বেড়াজালে পড়ে আজ পর্যন্ত মাথা তুলে দাড়াতে পারে নাই | ২০১৩ থেকেই আমাদের মানণীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেবের এই বিশ্ব ব্যাঙ্ক প্রীতিটা আমাকে দারুন ভাবে নাড়া দিয়েছিল, আজ নিশ্চয়ই আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি যে নিজেদের মান ইজ্জৎ বিসর্জন দিয়ে বিশ্ব ব্যাঙ্ক এর দিকে হা করে বসে থাকার কোনই কারণ ছিলো না, কারণ আজ আমাদের সামর্থ আছে যা ২০ বছর আগে ছিল না | বিশ্ব ব্যাঙ্ক এর কাজটাই হচ্ছে যে সব দেশে উন্নতির কিছুটা সম্ভাবনা দেখা যায় বিশ্ব ব্যাঙ্ক সেখানেই বিভিন্ন ধরনের অবাস্তব উন্নয়নের প্রকল্পের প্রলোভন দেখিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে, এ সত্যটাকে আজ বিশ্বের কোনো অর্থনীতিবিদ অস্বীকার করতে পারবেন না | বিশাল পরিণামে অর্থ বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে শুধু মাত্র বিত্তশালীদের আরো বিত্তবান অথবা দুর্নীতিগ্রস্থ করে তোলাই হচ্ছে তাদের কাজ আর সেই সুযোগে সেই দেশ থেকে বিশাল পরিমানের অর্থ হাতিয়ে নেয়া , তাদের হাত থেকে মিন্ত্রী, শিল্পপতি, সরকারী কর্মকর্তা কেউই রেহাই পায় না, সুদের দায়গ্রস্থ জর্জরিত দেশটি যখন দেনার টাকা পরিশোধ করতে পারে না, তখনি আমেরিকা সেখানে সুদের টাকা পরিশোধ এর বিনিময়ে সেখানে তাদের সৈন্য ঘাটি বসাবার প্রস্তাব দিয়ে বসে, সস্তায় জ্বালানি কিনে নেয় , রেল ব্যবস্থা, যাতায়াত ব্যবস্থা গ্রাস করে বসে, কলের পানির মতো আধুনিক কায়দাতে ঋণগ্রস্থ দেশটাকে শোষণ করতে থাকে | ১৯৫৩ সালে ডক্টর মোহাম্মদ মশাদেককে ক্ষমতা থেকে সি আই এ পরিকল্পনা করে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে বাদশা শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়, একমাত্র কারণ ছিলো জ্বালানি তেল | আমেরিকা ১৯৫৩ সালে গুয়াতেমালার প্রসিডেন্ট জেকব অর্বেনস গুজ্মানকেক কমুনিস্ট অপবাদে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে বিশ্ব ব্যাঙ্ক এর মাধ্যমে সেই দেশে বিশাল পরিমানের টাকার খেলা শুরু করে | ইকুয়াডর এর প্রেসিডেন্ট জামি রল্দোস এগুইলেরাকে আমারিকা কোনো ভাবেই বশে আনতে না পেরে সি ই এ ১৯৮১ সালে একটি বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু ঘটায়, পানামার একজন অতি জনপ্রিয় নেতা প্রেসিডেন্ট ওমর তরীয়সকে আমেরিকা কোন ভাবেই প্রলোভিত করতে না পেরে নাই | পানামা চ্যনেলকে নিজের দেশের কর্তৃত্বে নিতে প্রেসিডেন্টকে সি ই এর ষড়যন্ত্রে ১৯৮১ সালে তাকেও ক্ষমতা থেকে চলে যেতে হয়, তিনি তার দেশ আর মানুষ কে অসম্ভব রকম ভালোবাসতেন | এখন কথা হচ্ছে ভেনুজুএলার জনপ্রিয় নেতা হুগো চাভেজর মৃত্যু না হলে তিনি কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন, যদিও ২০০২ সালে তার বিরুদ্বেও একটা মিলিটারি কু করানোর চেষ্টা হয়েছিলো | ইরাকের সাদ্দাম হুসাইনকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করে আমারিকা ইরাকে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে, ঠিক সঠিক করে এখনো বলা যাচ্ছে না, আমারিকা কতটুকু সফল হতে পারবে | বাংলাদেশে একটি সম্ভবনাময় দেশ, এখানে গ্যাস তেল পওয়া যাবে, অতি সস্তায় মানব শক্তি, এ দেশের মানুষ সরল সোজা, ধনী গরীবের ব্যবধান বিশাল, আই এম এফ, বিশ্ব ব্যাঙ্ক অথবা আমেরিকার দৃষ্টি অবশ্হই আমাদের দেশের উপর পরে আছে, ধনী গরীবের এই বিশাল ব্যবধান আমার কমিয়ে আনতে চাইলেও অসীম শক্তিধর এই অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো আমাদের প্রধান বাধা | ডক্টর ইউনুস সাহেব তো আছেনই, শান্তির পুরস্কার কাধে নিয়ে গরীবের ঘাড়ে বসে এখন অনেক অনেক টাকা কমিয়ে দিব্বি আমেরিকার চামচামি করে বেড়াচ্ছেন | মাননীয় প্রধানমন্তী শেখ হাসিনাকে আবারও ধন্যবাদ আপনার সাহসী পদক্ষেপ ভবিষ্যত বাংলাদেশকে আরো অনেক অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে |
মাহবুব আরিফ (কিন্তু)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *