আমেরিকার স্বাধীনতার লড়াই এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের নির্মম পরিনামের ইতিহাস (পোষ্টটি মানবতা কারবারি অ্যামনেস্টিকে উৎসর্গ করা হইলো)

কোন অঞ্চল বা ভূ-খন্ডকে উপনিবেশে পরিনত করার চর্চা অনেক প্রাচীন। গ্রীক, রোমান, পারস্য-সহ আরো অনেক প্রাচীন সাম্রাজ্য এই কাজ নিয়মিত করেছে। মধ্যযুগের কাছাকাছি সময়ে এসে আরবরা, তুর্কীরাও একই কাজ করেছে। আমরা বাঙালিরাও বখতিয়ার খিলজি দ্বারা তুর্কী উপনিবেশে পরিনত হয়েছিলাম। আমাদের স্বাধীনতা হরন সেই তো শুরু।


কোন অঞ্চল বা ভূ-খন্ডকে উপনিবেশে পরিনত করার চর্চা অনেক প্রাচীন। গ্রীক, রোমান, পারস্য-সহ আরো অনেক প্রাচীন সাম্রাজ্য এই কাজ নিয়মিত করেছে। মধ্যযুগের কাছাকাছি সময়ে এসে আরবরা, তুর্কীরাও একই কাজ করেছে। আমরা বাঙালিরাও বখতিয়ার খিলজি দ্বারা তুর্কী উপনিবেশে পরিনত হয়েছিলাম। আমাদের স্বাধীনতা হরন সেই তো শুরু।

সেই সময়ে যে সব প্রাচীন সাম্রাজ্য অন্য স্বাধীণ ভূ-খন্ডকে নিজের করদ রাজ্যে পরিনত করতো তার পেছনে যে ভাবনা কাজ করতো তা হচ্ছে এটা তাদের অধিকার। তারা মানবজাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। অন্যকে শাসন করা তাই অধিকারের মধ্যে পড়ে। এর পেছনে সম্পদ হরনের লোভ যে ছিল না তা না। তাও ছিল। কিন্তু তার আগে গৌরবটাকে বেশি করে দেখানো হত।

ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপিয়ানরা এই “গৌরবত্বের” চর্চা থেকে বের হয়ে আসে। তারা বেশ উদাম হয়েই ঘোষনা করে আমরা মুনাফার জন্য অন্য দেশকে করায়ত্ব করি। এর একটা ভারী নামও দিল তারা “Mercantilism”। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় অন্য দেশ দখল করে সেটাকে নিজেদের বাজারে পরিনত করে পকেট ভারী করি। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পুরো ইউরোপ এই তত্ত্বের উপর ভর করে নিজেদের পকেট ভারী করেছে আর সম্পদের পাহাড় গড়েছে।

আমেরিকা ক্রিস্টোফার কলম্বাস আবিষ্কার করেন এইটা আমরা সবাই জানি। তিনি স্পেনের রানী ইসাবেলার ব্যাক্তিগত অর্থে তিনটা জাহাজ ভাসিয়ে ভারতে আসতে গিয়ে আমেরিকায় উপস্থিত হন। ব্রিটিশরা স্পেনিশদের পিছু পিছু এসে হাজির হয় আমেরিকার ফ্লোরিডাতে। ধারনা করা হয়, প্রথম ব্রিটিশ সেটেলার আসে ১৬২০ সালে। ফ্লোরিডা তখন স্পেনের অধীনে। চালাক ব্রিটিশরা স্পেনিশদের সাথে সংঘাতে জড়ায় নাই।
স্পেন উত্তর আমেরিকার দিকে সাম্রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দেয়। ব্রিটিশরা আজকের যে আমেরিকাকে আমরা চিনি তার তেরোটা রাজ্যকে নিজেদের মূলকে পরিনত করে। এর বাইরেও অনেক রাজ্যে তাদের অবস্থান ছিল কিন্তু খুব পাকাপাকি নয়।

এই তেরোটা কলোনি মূলত ইংরেজি ভাষাভাষীদের দখলে থাকায় তাদের ধর্ম ছিল ‘প্রটোস্টান ক্রিশ্চিয়ানিটি”। ধর্মের কথা এ কারনে উল্লেখ করলাম, সে সময়ে ধর্ম এক ছাতার নীচে আসার একটা গুরুত্বপূর্ন প্রভাবক ছিল। ব্রিটিশদের কর চাপিয়ে দেয়ার প্রবনতা আমরা আমাদের ইতিহাস থেকে জানি।
একই ঘটনা তারা আমেরিকার এই তেরোটা রাজ্যেও ঘটিয়েছিল। ফলাফলে, ১৭৫০ এর সময় হতে সেখানে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। রাজ্যগুলোর স্বাধীনচেতা মানুষদের লক্ষ্য, ভাষা, সংস্কৃতি এক থাকায় পরষ্পরের মধ্যে এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি হয়। ক্রমান্ময়ে তারা দুইটা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। একটি হচ্ছে “Rights of Englishmen (বাংলায় ইরেজি ভাষাভাষীদের অধিকার আইন)”।

অন্যটি হচ্ছে “No Taxation without representation”। এর ব্যাপকতা আসলে অল্প কয়েক শব্দে বুঝানো সম্ভব নয় বলে বিশদ লিখতে হচ্ছে। এটা আসলে মূলত একটা স্লোগান। ১৬৮৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট “Bill of 1689” পাশ হয়। এই আইনের উদ্যোক্তা ছিলেন জন লক যিনি পরবর্তীতে ব্রিটেনের জনপ্রিয় রাজনীতিবিদে পরিনত হন। এই আইন মোতাবেক ইচ্ছে করলেই কর চাপিয়ে দেয়া থেকে ইংরেজি ভাষাভাষী এবং প্রটোস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের রেহাই দেয়া হয়।

আমেরিকার তেরোটি রাজ্যের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ১৭৫০ সাল থেকে ১৭৬০ সাল নাগাদ এই ধারনা ছড়িয়ে পড়ে, তাদের উপরে অতিরিক্ত কর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইংরেজি ভাষাভাষি এবং ধর্মীয় কারনে তাদের যে ছাড় দেয়া হয়েছে আইন মোতাবেক তা তারা পাচ্ছেন না। ব্রিটিশরা শোষনের জন্য যত কালা-কানুন করেছিল সব তাদের উপরে নিয়মিতভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কিন্তু যে আইনগুলো তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক তা কাগজে কলমে আছে। প্রয়োগ নেই। বাঙালি যেমন পশ্চিম পাকিস্তানীদের আপন ভাবছিল শুধু ধর্মের জন্য। আমেরিকার ইংরেজি ভাষাভাষীরা ব্রিটিশদের আপন ভাবছিল শুধু মাত্র ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে মিল থাকার কারনে। কিন্তু আমাদের মত তাদেরও মোহমুক্তি ঘটে। সময়কাল ১৭৫০-১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ। এই সময়ের মধ্যে তারা বুঝতে পারে ব্রিটিশরা ব্রিটিশ আর তারা আমেরিকান।

তেরোটা ব্রিটিশ কলোনীর স্বাধীনচেতা মানুষেরা মিলে সিদ্ধান্ত নেয় তারা স্বাধীনতার দাবিতে অস্ত্র হাতে নিবে। কলোনিগুলো হচ্ছে- ডেলায়ার, পেনিসেলভেনিয়া, নিউ জার্সি, কানেক্টিকাট, ম্যারিল্যান্ড, ম্যাসাচুয়েটস বে, ভার্জিনিয়া, নিউ হ্যাম্পশায়ার, সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, রোড আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক এবং প্ল্যান্টেশন্স প্রভিডেন্স। ১৭৭৬ সালের ২’রা জুলাই তারা সম্মিলিতভাবে “ইউনাইটেড অফ স্টেটস” নামের দেশ হিসেবে ঘোষনা দেয়। যদিও তারা স্বাধীনতা দিবস পালন করে জুলাইর চার তারিখে। জুলাই মাসের চার তারিখে যেহেতু এই ঘোষনানামা প্রকাশ করা হয় তাই সর্বসম্মতিক্রমে এই দিনটিকে তারা বেছে নেন।

(প্রথম প্রকাশিত স্বাধীনতা ঘোষনার দলিলের প্রথম পাতা।)

(শিল্পী জন ট্রাম্বেলের তুলির আঁচড়ে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষনার খসড়া প্রনয়নের কার্যক্রম।)

আমেরিকার স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার পরপর গনতন্ত্রের শক্ত ভিত স্থাপনের জন্য ১৯৭৩ সালে আমেরিকার বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রিচার্ড মরিস সাত জনকে স্থপতি পিতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। তারা হচ্ছেন- জন স্মিথ, জর্জ ওয়াশিংটন, থমাস জেফারসন, জেমস মেডিসন, জন জে, বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন, আলেক্সান্ডার হ্যামিলটন। এদের মধ্যে তিনজন যথাক্রমে জন এডামস, থমাস জেফারসন, বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন স্বাধীনতা ঘোষনার দলিলপত্রের খসড়া তৈরি করেন। জেমস মেডিসন, জন জে এবং আলেক্সাজান্ডার হ্যামিল্টন সংবিধান তৈরি করেন। যা ধাপে ধাপে ১৭৮৭ থেকে ১৭৮৮ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। ইতিহাসে যা বিখ্যাত “The Federalist papers” হিসেবে।
জর্জ ওয়াশিংটন স্বাধীনতার যুদ্ধের সমরে নেতৃত্ব দেন। ভাগ্য ভালো, তারা আমেরিকাতে জন্মেছেন। আমাদের দেশে হলে বিএনপি কিংবা সমমনা দলগুলা বলতো, আরে জর্জ ওয়াশিংটন বাদে বাকিরা ফ্রেঞ্চদের কোলে বসে বাতাস খেয়ে বেড়িয়েছে। যুদ্ধ করে নাই।


জর্জ ওয়াশিংটন


জন এডামস


বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন


আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন


জন জে


থমাস জেফারসন


জেমস মেডিসন

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেমন আমরা রাজাকার দেখেছি তেমনি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধেও রাজাকার ছিল। তারা পরিচিত “টরি বা লয়ালিস্ট” হিসেবে। আমাদের স্বাধীনতার সময়ে এই অঞ্চলে মুসলিম লীগারদের অর্থ বিত্ত অপেক্ষাকৃত বেশি ছিল। যেমন, সাকা চৌধুরীর বাবা ফকা চৌধুরী কিংবা খান এ সবুরের মত লোক। তারা মূলত ছিলেন শাসকশ্রেনীর আনুকূল্যে সুবিধাভোগী। আমাদের এখানে যা হয়েছে আমেরিকাতেও ঠিক তাই হয়েছে। এই সুবিধাভোগীরা স্বাধীনতার দাবির বিরুদ্ধে গিয়ে ব্রিটেনের রাজা ২’য় জর্জের আনুগত্য প্রকাশ করে। রবার্ট মিডলক্যাফের “দ্য গ্লোরিয়াস কজঃ দ্য আমেরিকান রেভ্যুলেশন ওয়ার ১৭৬৩-১৭৮৯” বই থেকে জানা যায় লয়ালিস্টরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। যারা প্যাসিফিস্ট (Pacifist) এবং একটিভিস্ট (Activist) নামে পরিচিত।
প্রথমোক্তরা খুব বেশি ঝামেলা পাকায় নাই। শুধু মাত্র রাজনৈতিক মতামতের জায়গা থেকে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। শেষের দল আমাদের এখানে জামাতে ইসলামি যা করেছে তার তেমন কিছু বাদ রাখেনি। তবে জামাতিরা যে মাত্রায় ধ্বংসযজ্ঞ করেছে তার তুলনায় তারা বালক। ইতিহাসবিদ রবার্ট মিডলক্যাফের মতে, সে সময়ের আমেরিকার জনসংখ্যার ১৫-২০ ভাগ ছিল স্বাধীনতার বিপক্ষে। বাকিদের মধ্যে ৫০-৬০ ভাগ ছিল স্বাধীনতাকামী। ২০ ভাগের মতিগতি বুঝা যায় নাই। চুপচাপ ছিল।


(ইতিহাসের পাতায় শিল্পীর চোখে লয়ালিস্ট বা টোরিদের বিবরন।)


(যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লয়ালিস্টদের প্রোপাগান্ডার একটি অংশ। জামাতের মত এরাও মুক্তিকামীদের নানাভাবে নেতিবাচকভাবে এবং নিজেদের নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। বেঈমানদের চরিত্র সম্ভবত সারা বিশ্বের সব সময়ে এক প্রকারের হয়।)


(বইয়ের প্রচ্ছদে ব্রিটিশদের হয়ে সরাসরি যুদ্ধ করা একজন লয়ালিস্টের কার্যক্রম। একেবারে সংক্ষেপে ইতিহাসের বর্ননা। একজন মুক্তিকামী সেনাকে গ্রেপ্তার করার পরে তার দন্ড পরে শোনানো হচ্ছে। পাশে দাঁড়ানো একজন দাস। যাকে যুদ্ধ শেষে মুক্তির লোভ দেখিয়ে প্রানপনে যুদ্ধ করার জন্য উজ্জীবিত করা হয়েছে।
লয়ালিস্টরা অধিকাংশ অভিজাত এবং ধনী হওয়ায় তাদের আফ্রিকা থেকে ধরে আনা কিংবা দাস-দাসীদের গর্ভে জন্ম নেয়া অনেক দাস ছিল। নানা সূত্রমতে, প্রায় ৪ হাজার দাস মুক্তির লোভে লয়ালিস্টদের হয়ে যুদ্ধ করে।)

আমেরিকানরা স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষনা করতেই ফ্রেঞ্চরা সাহায্য করার জন্য হইহই রৈ রৈ করতে তেড়ে আসলো। মাত্র কিছুদিন আগে ব্রিটিশদের সাথে তারা “সপ্তবর্ষ ব্যাপী” যুদ্ধে হেরেছে। সেই ঝাল উসুল করতে অস্ত্র, রসদ, ঘোড়া, টাকা এমন কিছু নেই যা দিয়ে তারা আমেরিকার স্বাধীনতাকামীদের সহযোগিতা করে নাই। এখানেও নিজের দেশের প্রশ্ন টানি। আমাদের এক শ্রেনীর পাকিমনা নাগরিক আছেন যারা সুযোগ ফেলেই বলেন পাকিস্তানের সাথে ভারতের শত্রুতা থাকায় আমাদের সাহায্য করেছে। খুবই সত্যি কথা। ফ্রান্স একই কারনে আমেরিকাকে সহায়তা করেছে।
কিন্তু বিগত প্রায় তিনশো বছরের ইতিহাসে তারা কোনদিন ভূলেও মুখ দিয়ে বলেনি, ইংল্যান্ডের সাথে শত্রুতা উসুল করতে ফ্রেঞ্চরা আমাদের সাহায্য করেছে। তাদের যে বলার মুখ নেই ব্যাপারটা একদম তা না। উপকার তো করেছে, কেন করেছে সেটা তারা জানলেও ভাবনাতে আনতে চায় না। পাছে উপকারকারীকে ছোট করা হয়, তার চাইতেও বেশি ছোট করা হয় নিজের জাতিকে।


(শিল্পীর কল্পনায় একজন আমেরিকান কালো বর্নের সৈন্যের ছবি। যে স্বাধীনতাকামীদের হয়ে লড়ছে একাই শত ব্রিটিশ এবং লয়ালিস্ট সেনার বিপক্ষে।)

১৭৭৫ থেকে এই যুদ্ধ শুরু হয়ে ১৭৮৩ সালে শেষ হয়। বিজিত আমেরিকানরা তাদের দেশের রাজাকার “লয়ালিস্টদের” সাথে কি আচরন করে আসুন জেনে নেই।

এ ব্যাপারে সবচাইতে ভাল বর্ননা পাওয়া যায় দুই ইতিহাসবিদের বইতে। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ উইলিয়াম নেলসনের ” দ্য আমেরিকান টরি” এবং মার্কিন ইতিহাসবিদ লেল্যান্ড বাল্ডোইনের ” দ্য স্ট্রিম অফ আমেরিকান হিস্টোরি”।

লেখকদ্বয়ের গবেষনা মতে, যুদ্ধের প্রাথমিক কয়েকবছরে কার্যত কোন কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাবস্থা ছিল না। প্রতিটা কলোনি বা স্টেট যে যার মত করে নিজ নিজ প্রশাসন পরিচালনা করেছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে তাদের মধ্যে গায়েবি সমঝোতা হয়ে গিয়েছিল লয়ালিস্ট বা বেঈমান পেলে মেরে দাও।
এমনকি, স্বাধীনতাকামী কলোনিগুলোর নেতারা সংযুক্ত দেশ কিভাবে দেশ চলবে সে আইন প্রনয়নের আগে এই আইন জারি করেছিলেন যে, সকল লয়ালিস্ট বা টোরিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ফলতঃ আমেরিকার জাতীয় বেঈমানদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হবার আগেই এত আতংক ছড়িয়ে পড়ে যে তারা পালে পালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত অনান্য জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করে।

সূত্রমতে, আনুমানিক প্রায় ৬০ হাজার আমেরিকান রাজাকার দেশ ছাড়ে। এদের মধ্যে চল্লিশ হাজার পাড়ি জমায় ব্রিটিশ অধিভূক্ত কানাডায়, দশ হাজার ইংল্যান্ডে, বাকিরা ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে।


(ব্রিটিশ দালাল লয়ালিস্টদের একজনকে ধরে আনার পরে প্রাথমিকভাবে উত্তম মধ্যম প্রদান।)

১৭৮৩ সালে “ট্রিটি অফ প্যারিস বা প্যারিস চুক্তির” মাধ্যমে ব্রিটিশ সেনারা আত্মসমর্পন করে। ব্রিটিশরা পাকিস্তানিদের মত রাজাকারদের ফেলে পালায় নাই। প্যারিস চুক্তিতে লয়ালিস্টদের দেশ ত্যাগের সুযোগ রাখা হয়। যারা খুন, ধর্ষন, অগ্নিসংযোগ এবং মুক্তিকামীদের বিরুদ্ধে নানা সামাজিক অপপ্রচার চালিয়েছে তাদের এই সুযোগের বাইরে রাখা হয়।
বাকিরা যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ নেই তাদের সম্মতিক্রমে ইংল্যান্ড সারা বিশ্বের নানা উপনিবেশে তাদের পুনর্বাসন করে। ধারনা করা হয় এই সংখ্যা চল্লিশ হাজারের কাছাকাছি।


(আমেরিকার স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের উপরে চালানো নির্বিচার হত্যাকান্ডের একটি প্রতীকী চিত্রকর্ম।)


(ফাঁসিতে লটকে দেয়া ইতিহাস শিল্পীর তুলিতে।)

এরপর শুরু অপরাধী “লয়ালিস্টদের” শাস্তির পালা। শুরু হয় গনহারে খুন। বিজয়ের প্রথম দিকে ক্ষোভে, ঘৃণায় জান্তব হয়ে উঠে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে ১৭৭৫ সালে আরেক নায়ক স্যাম এডামস বাদবাকি নেতাদের উৎসাহে গঠন করেন “Sons of Liberty”। যার প্রধান কাজগুলোর একটি ছিল স্বাধীনতা বিরোধীদের খুন করা। তাদের প্রথম আক্রমন হয়েছিল গভর্নর হাচিনসন এবং তার শ্যালকের বাড়িতে। পরিবারদ্বয় হামলার আগেভাগে টের পেয়ে পালাতে সক্ষম হলেও তাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়। তার আগে গহনাগাটি, নগদ টাকা, মূল্যবান কাগজপত্র, এমনকি ওয়াইনের কাষ্ঠ নির্মিত ব্যারেল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়।

অবস্থা বেগতিক আকার ধারন করলে কিছুদিনের মধ্যে আমেরিকার সদ্য স্বাধীন সরকার আইন প্রনয়ন করেন এই মর্মে যে, লয়ালিস্টদের মধ্যে যে বা যারা কোন অপরাধ করেন নাই কিন্তু স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছেন তারা যদি কাগজে কলমে রীতিমত বাইবেল ছুঁয়ে আমেরিকার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন তবে তারা আইনী সুরক্ষা পাবেণ। আইনে বলা না থাকলেও পরোক্ষভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয় আনুগত্য প্রকাশ না করলে যার যার দায়িত্ব তার তার। থাকলে নিজ দায়িত্বে থাক, নইলে ভাগো। রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিবে না। বলাই বাহুল্য, এরপরে আনুগত্য প্রকাশের হিড়িক পড়ে যায়।

ইতিহাসবিদ রবার্ট ক্যালহোনের মতে, প্রায় পাঁচ লক্ষ লয়ালিস্ট ছিল। তাদের তিন ভাগের একভাগ সরাসরি ব্রিটিশদের সহায়তা করেছে। বাকিরা চুপচাপ ছিল। সহায়তাকারীদের অধিকাংশ সময় থাকতে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী বুঝে জাহাজে চেপে পালিয়ে যায়। ঠিক কতজন সহায়তাকারী নিহত হয়েছে সে ব্যাপারে সঠিক কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় নাই। আমেরিকার ইতিহাসের এটি একটি অদ্ভুত ব্যাপার। হয়তো ব্যাপারটা খুব নির্মম বলে ব্যাপারটা চেপে যায়।


(যুদ্ধের প্রথম ধাক্কাতে নানা জায়গায় বেহাল হয়ে যাওয়া ব্রিটিশ রাজকীয় সেনাবাহিনীর অফিসারেরা দালালদের কোন সুরাহা না করে ভেগে যাবার প্রতীকী চিত্র।)

১৯৬৮ সালে রবার্ট ম্যাডিকেফের গবেষনা মতে, প্রায় পঞ্চাশ হাজারের মত ব্রিটিশ দালালকে মেরে ফেলা হয়। সরাসরি সহায়তা করেছে সকল দালালের জন্য একটাই শাস্তি ছিল মৃত্যু। ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার স্বাধীনতাকামী সরকার সমাজের নানা শ্রেনীর লয়ালিস্টদের জন্য যুদ্ধ কৌশলে অভিনবত্ব আনা এবং সাধারনের মনোভাব বুঝে মোটমাট ৩০ বারের মত একই আইনে নানা প্রকারের সংশোধন আনেন। চূড়ান্ত সংশোধন মতে, যেসব লয়ালিস্টকে মাপ করে দেয়া হয় তাদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এমনকি, পিতা স্বাধীনতাকামী কিন্তু পুত্র লয়ালিস্ট সেক্ষেত্রে কি করনীয় সে ধারাও রাখা হয়। পুত্রকে সরাসরি সম্পত্তির ক্ষেত্রে “অবৈধ ঘোষনা করা হয়।


(১৭৮৩ সালে যুদ্ধে পরাজয়ের পর ভেগে যাচ্ছে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জাহাজ।)

আমেরিকার স্থপতি পিতাদের একজন বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন তার ছেলে উইলিয়াম ফ্র্যাংকলিনকে কোন অপরাধ থাকা না স্বত্ত্বেও শুধু মাত্র সমর্থনকারী হবার কারনে আইন মোতাবেক সম্পত্তি পাবার ক্ষেত্রে “অবৈধ” ঘোষনা করেন।
এই আইন মোতাবেক কোন লয়ালিস্ট যদি কখনো প্রকাশ্যে বা গোপনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং ইংল্যান্ডের রাজার কোন গুনকীর্তন করার প্রমান, স্বাক্ষী পাওয়া যায় তবে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড।
একই সাথে চিরতরে বিদায় দেয়া হয় তাদের রাজনৈতিক মতবাদকেও। ঠিক যেভাবে আমরা জামাত এবং তার আদর্শকে বাংলার মাটি থেকে চিরতরে নিষিদ্ধের জন্য সংগ্রাম করছি।

আমাদের দেশের সাথে আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু মিল আছে। সব চাইতে অনন্য ব্যাপার হচ্ছে, পৃথিবীর ইতিহাসে আমেরিকা এবং বাংলাদেশ এই দুই দেশের সেনাবাহিনী শুধু মাত্র যার যার স্বাধীনতা লড়াইয়ে রীতিমত আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ দেশের সরকারের অধীনে যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে ছিল জামাত। আমেরিকায় টোরিরা।

পার্থক্য “অক্সিলারি বা সহযোগী বাহিনী” হিসেবে কাজ করাদের বিচারের জায়গায়। আমরা ট্রাইবুনালে বিচার করছি। তার আবার নানা ধাপ আছে। প্রথমে ট্রাইবুনাল, এরপরে আপিল, তা শেষ হবার পরে আবার রিভিউ। সর্বশেষে আছে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাইবার সুযোগ। আমেরিকানরা তাদের মত করে কোন আইনী প্রক্রিয়া ছাড়াই অধিকাংশ ব্রিটিশ দালালকে হত্যা করেছে কিংবা নামে মাত্র। সহজভাবে বলি, বিচার প্রক্রিয়া এমনটা ছিল-

জাজঃ এইটা কে?

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটরঃ জনাব, এর নাম মাইকেল। অভিযোগ লয়ালিস্ট ছিল। ব্রিটিশদের সহযোগী।

জাজঃ হুম, আসামীপক্ষের উকিল কি কয়।

আসামী পক্ষের উকিলঃ জনাব, বাড়ির থেকে এক মাইল দূরে ব্রিটিশ সেনাদের ক্যাম্প ছিল। শখ কইরা একদিন এক টিন মুড়ি দিয়া আসছিল।

জাজঃ (হাতুড়ি ঠুইকা) বুঝছি। এরে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হইলো। ঝূলায়ে দে। নেক্সট?

আসামী পক্ষের উকিলঃ জনাব, এইটা কেমন বিচার? আগেরজন দুইশো মানুষ মারছে তারে দিলেন ফাঁসি। এরেও দেখি ফাঁসি দিলেন। তাও এক টিন মুড়ি খাওয়াইছে বইলা।

জাজঃ বেঈমান তো বেঈমানই। তার আবার ছোট-বড় কি। ওর মুড়ি খায়া গায়ে গতরে শক্তি পায়াই তো ব্রিটিশরা একদিন যুদ্ধ করার লিগা বেশি শক্তি পাইছে। তোরেও তো সন্দেহ হয় রে, মুমিন।

আসামী পক্ষের উকিলঃ না, না, দেন দেন, ঝুলায়ে দেন।


(বিচারের পরে দালাল ঝুলিয়ে সাধারন মানুষের উল্লাস। রাজাকারের ফাঁসি হলে আমরা একাই কাচ্চি বিরিয়ানি আর বারবিকিউ পার্টি করি নাই।)

(এই ছবিটা ব্রিটিশ দালালদের পক্ষে সহানুভূতি জানিয়ে সেই যুগের অ্যামনেস্টি করা মানুষের চিত্রকর্ম। শাহবাগে আমরা “সাকা মুজাহিদ ভাই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই” শ্লোগান দিলেও সেটা পারি নাই।
কিন্তু আমেরিকানরা এক দড়িতে হালি হিসাবে ঝুলিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ানো দেশী বিদেশী অ্যামনেস্টি মানুষেরা যেভাবে আমাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবিতে আন্দোলন করা মানুষদের বর্বর বলে ঠিক তেমনিভাবে সেকালের তারাও আমেরিকার স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষদের “অসভ্য” “জংলী” হিসেবে প্রতীকী অর্থে উপস্থাপন করেছে।)

এই আমেরিকা এবং তার নানা দালাল মানবাধিকার সংগঠনগুলো আমাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে কি কি খুঁত আছে দেখে। মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চীন, দক্ষিন কোরিয়া, ফ্রান্স,জর্মনী, ভিয়েতনাম-সহ আরো অনেক দেশ করেছে। নানা ভাবে করেছে। কিন্তু আমাদের বিচারে যুদ্ধাপরাধীদের যে লম্বা আইনী প্রক্রিয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে তা ইতিহাসে কোন দেশ দেয় নাই।
এরপরেও আমাদের বিচার নাকি ওদের মানের মত করে হয় নাই। আমরাও বলি হয় নাই। ওদের মত করে সরাসরি ঝুলায়ে দেয়ার দরকার ছিল।

এখন আবার আবদার তুলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার করতে হবে। লয়ালিস্টদের খুন করার জন্য “সনস অফ লিবার্টির” কথা মনে আছে কি, অ্যামনেস্টির জনাবদের? সেই সংগঠনের হর্তা কর্তা, নাটের গুরু কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন পেলেপুষে অন্যের অধিকার, সার্বভৌমত্ব হরনের দেশ আমেরিকার সাত স্থপতি পিতা। তবে তাদের মরনোত্তর বিচারের দাবি তুলছেন না কেন?

—————————-
চিত্রশিল্প সূত্রঃ উইকি এবং গুগল

রেফারেন্সঃ

THE STREAM OF AMERICAN HISTORY by Leland D. Baldwin

THE AMERICAN TORY by William H. Nelson

A Great Improvisation: Franklin, France, and the Birth of America
by Stacy Schiff

The Essential Federalist and Anti-Federalist Papers by David Wootton

The Birth of the Republic, 1763-89 by Edmund Morgan

১৯ thoughts on “আমেরিকার স্বাধীনতার লড়াই এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের নির্মম পরিনামের ইতিহাস (পোষ্টটি মানবতা কারবারি অ্যামনেস্টিকে উৎসর্গ করা হইলো)

  1. সমস্যা কি জানেন আযম খান ভাই,
    সমস্যা কি জানেন আযম খান ভাই, বাংলাদেশে উগ্র জাতীয়তাবাদী শাহবাগী লোকজন আর উগ্র আওয়ামী লীগাররা ছাড়া আর সবাই কিন্তু এই ট্রাইবুনাল ও ট্রায়ালের সমালোচনাই করেচে। আপনারা মানেন আর নাই মানেন, এই বিচারগুলো ত্রুটিপূর্ণ আর অস্বচ্চ এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রহসন যা ন্যায় বিচারের পরিপন্থি !

      1. সমস্যা হচ্ছে আপনেগো যদি বলি
        সমস্যা হচ্ছে আপনেগো যদি বলি যে, আমি সাদা রঙ পছন্দ করিনা, তাইলে কইবেন যে কালা রঙ আমার পছন্দ। সাদা আর কালো রং-এর মাঝখানে যে আরও অনেক রঙ আছে, সেটা বুঝবার ক্ষমতা আপনেগো নাই। আপনেগো লক্ষ্য কইরাই আমি এই কবিতাটা লিকচিলামঃ

        শাহবাগের দেয়াল ( http://istishon.blog/node/14697 )

          1. ফারাবী তো উগ্রবাদী; আর যারা
            ফারাবী তো উগ্রবাদী; আর যারা কিনা ফেসবুকের কাভার পেজে নাতসী বাহিনীর ছবি লাগিয়ে রাখে তারাওতো উগ্রবাদী, ফারাবীর জাতভাই। তাদেরই জানার কথা ফারাবী কেমন আচে।

          2. হাহাহাহা, ওরে মূর্খ, ওটা সেই
            হাহাহাহা, ওরে মূর্খ, ওটা সেই ছবি যেখানে সবাই হিটলারকে স্যালুট দিলেও একলোক দেয়নি। ঐটাই ছবির মূল উপজীব্য। অন্যায়কে না মেনে নেয়ার পরাক্রম। অফ টপিকঃ ফারাবির পোষ্টের লাইকা থিকা কবে সেক্যুলার হইলেন?

  2. বিচারের পরে দালাল ঝুলিয়ে

    বিচারের পরে দালাল ঝুলিয়ে সাধারন মানুষের উল্লাস। রাজাকারের ফাঁসি হলে আমরা একাই কাচ্চি বিরিয়ানি আর বারবিকিউ পার্টি করি নাই।

    শাহবাগী- এমেরিকান ভাই ভাই, খুশির আর সীমা নাই ! :হাসি:

  3. অসাধারণ ও তথ্যবহুল লেখা।
    অসাধারণ ও তথ্যবহুল লেখা। আমেরিকার ফ্যাসিস্ট রূপের অসাধারণ চিত্রায়ণ। অনেক অজানা তথ্য জানলাম।

  4. আমাদের দেশের রাজাকারদের ফাঁসি
    আমাদের দেশের রাজাকারদের ফাঁসি দেখে যাদের মন কাঁদে তারা বাঙালি নয়, পাকিস্তানী। আর এদেরও বিচার হওয়া উচিত।
    ভালো লেখার জন্য ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা আপনাকে।

  5. বাহ, অনেক তথ্যমুলক লেখা
    বাহ, অনেক তথ্যমুলক লেখা
    পড়লাম। ৫৭-ধারার কারণে কোন মন্তব্য করবো না।
    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *