বোরকা, হিজাব পরেও ধর্ষিত হচ্ছে মাদ্রাসার মেয়েরা!


বাংলাদেশের ধর্ষক ও ধর্ষকামী পুরুষরা নানা যুক্তিতে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণকে জায়েজ করার চেষ্টা করে। এসব ফালতু যুক্তির মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত হলো ‘মেয়েটির জামাকাপড় ঠিক ছিল না, সে পুরুষটিকে ধর্ষণ করতে উৎসাহ দিয়েছিল, বোরকা-হিজাব না পড়লে এমন হতেই পারে… ইত্যাদি ইত্যাদি। বক্তব্যগুলো শুধু যে হুরমুখি ধর্মপ্রাণরা বলে বিষয়টি তাও নয় অনেক শিক্ষিত মানুষজনকেও একই কথা বলতে দেখা যায়। স্কুল কলেজ কিংবা বাসে যে শুধু যৌন হয়রানি হচ্ছে বিষয়টি তা নয়। পবিত্র হজ্ব পালনের সময়ও যৌন হয়রানির মতন ঘটনা ঘটে থাকে। বিষয়টি হয়তো খুবই স্পর্শকাতর তারপরও বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

গত কয়েক বছরে পড়াশুনা বা চাকুরীর জন্য নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া এবং একই সাথে পথে-ঘাটে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও নামাজের খুতবায় নারীদের পর্দা করার ফতোয়া জোরেশোরে চলছে। ফলে সম্প্রতি বোরকা ও হিজাব ব্যবহারের হার রকেটের গতিতে বাড়ছে। আবার অনেক পরিবার থেকেই মেয়েশিশু ও নারীদের চলাচলের উপর নেমে আসছে কড়াকড়ি। এইসব মোল্লা ছাড়াও সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের অনেক কর্তারাই মনে করেন মেয়েরা নিজেদের ঢেকেঢুকে রাখলে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটবে না।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে।

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে অনেকেই মাদ্রাসা পড়ুয়া রক্ষণশীল ছাত্রী, যারা বোরকা বা হিজাব পড়ে ঘর থেকে বের হয়। আক্রান্তদের মধ্যে কয়েকজন ছেলে শিশুও আছে যারা অসুস্থ বা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। নির্যাতিতরা মুখ খুলছেন বলেই এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার ভিকটিম সংখ্যাই প্রকৃত সংখ্যা নয়। বরং ঘটে যাওয়া ঘটনার সামান্য অংশই প্রকাশিত হয়। গত বছর প্রকাশিত ঘটনার মোট সংখ্যা ছিল ৮০টি।

মাদ্রাসার ছাত্র/ছাত্রীদের যারা ধর্ষণ করেছে তাদের মধ্যে অনেকেই একই মাদ্রাসার শিক্ষক বা ছাত্র। উল্লেখ্য, প্রায় সব ধর্ষিত ছাত্র-ছাত্রীর বয়স ১২-এর নীচে!

# ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে সারাদেশে কমপক্ষে চারজন মাদ্রাসা-পড়ুয়া মেয়ে শিশু ধর্ষণ ও একজন অপহরণের পর গন-ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এদের মধ্যে একজনকে মেরে ফেলা হয়।

# ২০১৫ সালে মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। ডিসেম্বর মাসের তিনটি ধর্ষণের ঘটনার একটিতে অভিযুক্ত একজন হলো লক্ষ্মীপুরের মাদ্রাসা শিক্ষক আব্দুল মতিন যে কিনা চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছিল। আরেকটি ঘটনায় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ৪/৫জনের দ্বারা গনধর্ষণের শিকার হয় চতুর্থ শ্রেণীর এক মাদ্রাসা ছাত্রী।

# নভেম্বরের চারটি ঘটনায় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১০বছরের কম বয়সী মেয়ে শিশুরা। ধর্ষকদের একজন নারায়ণগঞ্জের পীর শাহজাহান যে কিনা তার মুরিদের ১০বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণ করেছিল ২২শে নভেম্বর।

# অক্টোবরে সংঘটিত ১১টি ধর্ষণের মধ্যে ৪টি গনধর্ষণ, একজনকে মেরে ফেলা হয়। এর মধ্যে একটি ঘটনায় চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার আট সন্তানের পিতা মোহাম্মদ আলী, ৫০, ছয় বছরের এক মাদ্রাসার ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। জামালপুরের বকশীগঞ্জে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে, বরগুনায় এক তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ও সিলেটের শিবগঞ্জে পঞ্চম শ্রেণীর আরেক মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়। গনধর্ষণের শিকার চারজন শিশুর বয়স নয় থেকে ১২। এছাড়া লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে নারায়নপুর ইসলামিয়া জুনিয়র মাদ্রাসার দুই ছেলেশিশুকে ধর্ষণের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় একই মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মাকসুদুল্লাহকে।

# সেপ্টেম্বরে সারাদেশে কমপক্ষে ১৩জন মাদ্রাসার ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে একজনকে ধর্ষণের পর ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ধর্ষণ করেছে পাবনার একটি মাদ্রাসার ৫শিক্ষক। রংপুরের কাউনিয়াতে ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া মেয়েকে ধর্ষণ ও গর্ভবতী করার অভিযোগে মেয়ের মা মাদ্রাসার শিক্ষকের নামে মামলা করেন। এছাড়া চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে ছয় বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণ করে তোবারক মুন্সী, ৬০; নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ধর্ষণের শিকার হয় আট বছর বয়সী এক শিশু; সিরাজগঞ্জে ধর্ষিত হয় নয় বছর বয়সী এক ছাত্রী; গাইবান্ধায় মাদ্রাসার শিক্ষকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয় তৃতীয় শ্রেণির আরেক ছাত্রী। কক্সবাজারের উখিয়াতে এক মানসিক প্রতিবন্ধী মাদ্রাসার ছাত্রীকে, ১৩, ধর্ষণ করে সেলিম, ২৮; ষোল বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করায় ফেনীর একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়; অপহরণের পর দুইদিন ধরে ধর্ষণ করা হয় নীলফামারীর অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে; এছাড়া কুড়িগ্রামে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে গনধর্ষণ করে চার যুবক।

# আগস্ট মাসে প্রকাশিত মাদ্রাসা ছাত্র-ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা কমপক্ষে ১৮টি। এদের মধ্যে তিনটি ছেলেশিশুকে ধর্ষণের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও সাতক্ষীরার তিন মাদ্রাসার শিক্ষককে। গনধর্ষণের শিকার হয়েছেন যশোরের ঝিকরগাছায় নবম শ্রেণী পড়ুয়া দুই বোন; রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী; সিলেটের জকিগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুরের সোনাপুরে ষষ্ঠ শ্রেণির দুই ছাত্রী; এবং বরগুনার বামনায় ১৫ বছর বয়সী এক ছাত্রী। এছাড়া ঢাকায় আলাদা দুটি ঘটনায় দুইজন ধর্ষিত হয়েছেন – ধর্ষকদের একজন ধোলাইপাড় মাদ্রাসার শিক্ষক। গাইবান্ধায় ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে ভিডিও করার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে একই মাদ্রাসার এক শিক্ষক শফিউর রহমানকে। এছাড়া কুমিল্লার দেবীদ্বারে অপহরণের পর হত্যা করা হয় অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে।

# জুলাইয়ে সারাদেশে তিনজন মাদ্রাসার ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে পিরোজপুরের জিয়ানগরে ১২ বছর বয়সী একজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এছাড়া ভোলার লালমোহনে দশম শ্রেণি পড়ুয়া একজনকে গনধর্ষণ করে স্থানীয় দুই যুবক এবং যশোরের বসুন্দিয়াতে তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রী ধর্ষিত হন।

# জুনে তিনজন মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় তিনজনকে – মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে এক মাদ্রাসার শিক্ষক, টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে একজন ও বাগেরহাটের কচুয়াতে একজন।

# গত বছরের মে মাসে অন্তত: আটটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের মে মাসে অন্তত: আটটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে তিনজন শিশুকে ধর্ষণের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় কিশোরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহের দুই মাদ্রাসা শিক্ষক ও এক কর্মচারীকে। এছাড়া শ্যাওড়াপাড়ার হলি ক্রিসেন্ট স্কুলের আরবি শিক্ষক মিনহাজ উদ্দীনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় একটি আদালত। সে ২০১৪ সালের ১১ই মার্চ স্কুলের ভেতরে ৫বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছিল।

# এপ্রিলে দুটি গনধর্ষণের ঘটনা ঘটে – গাজীপুরের শ্রীপুরে ১২বছর বয়সী এক ছাত্রী এবং টাঙ্গাইলের শফিপুরে দশম শ্রেণির একজন। শেরপুরের শ্রীবর্দীতে ১৩বছর বয়সী এক ছাত্রীকে কয়েকবার ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও স্থানীয় মসজিদের ইমাম হেলাল মিয়াকে সালিশের মাধ্যমে দুই লাখ টাকায় দায়মুক্তি দেয়া হয়। এছাড়া ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে নয় বছরের শিশুকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ছেলে ইউসুফ আলীকে, ১৪, পুলিশের হাতে তুলে দেন তার বাবা।

# মার্চে সংঘটিত তিনটি ধর্ষণের ঘটনায় দুইজনই শিশু। এদের একজন নারায়ণগঞ্জের এক মাদ্রাসার আট বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছিল তারই শিক্ষক জয়নাল আবেদীন, ৩২। এছাড়া চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে দশম শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রীকে গনধর্ষণ করে স্থানীয় তিন যুবক।

# ফেব্রুয়ারিতে কুমিল্লার দেবীদ্বারে সরকারবাড়ি জামে মসজিদের এক ইমামকে পাঁচ বছরের এক শিশু ছাত্রীকে মসজিদের ভেতরে ধর্ষণের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া মৌলভীবাজারের খালিশপুর আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা শফিকুর রহমান নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করে। ঢাকা, মাদারীপুর ও কিশোরগঞ্জে অন্য তিনটি ধর্ষণের ঘটনার শিকার ছাত্রীরা সবাই শিশু।

রিলেটেড-বাবা কর্তৃক ধর্ষণ: মুখ খুলছেন নির্যাতিতারা

৪ thoughts on “বোরকা, হিজাব পরেও ধর্ষিত হচ্ছে মাদ্রাসার মেয়েরা!

  1. গুগল সার্চ করলে কিছু পাওয়া
    গুগল সার্চ করলে কিছু পাওয়া যাবে। এছাড়া প্রতিটি ঘটনার আসামীর নামসহ স্থানের নাম উল্লেখ আছে। সুতরাং ঐ এলাকার পুলিশ স্টেশনে খোঁজ নিলেই সব ফকফকা হয়ে যাবে।

  2. দেখে মনে হচ্ছে: কিছু মানুষ
    দেখে মনে হচ্ছে: কিছু মানুষ যেন পৃথিবীতে জন্মেছে ধর্ষণ করার জন্য। এই ধর্ষণকারী-হারামজাদাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। আর মাদ্রাসার ছাত্রীদেরও নিরাপত্তা নাই। এসব কীসের আলামত?
    আপনাকে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *