“ঈশ্বরের রহস্যময় হাসি” ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব–১

ঈশ্বরের রহস্যময় হাসি
ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব–১
সাইয়িদ রফিকুল হক

১.
ইয়াসিন বাসায় ঢুকেই বুঝতে পারলো তার বউ আজও ক্ষেপে আছে। ইয়াসিন এর কোনো মানে খুঁজে পায় না। আজকালকার বউরা কেন যে এমন মাতলামি করে তা ইয়াসিন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। আর তার মতো আরও অনেকেই এখন এসব বুঝতে পারে না। আসলে, এদের কী হয়েছে?
এমনিতে অফিসে আজকাল তাদের কতজনের মুখঝামটা খেতে হয়। তার ওপর বাড়িতে এসে যদি এরকম উৎকট সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে, শান্তি পাওয়া যাবে কোথায়? শান্তি কোথায়? কোথায় শান্তি আছে এই দুনিয়ায়? এই দুনিয়ায় কে এই হতভাগাদের একটু শান্তি দিতে পারবে?


ঈশ্বরের রহস্যময় হাসি
ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব–১
সাইয়িদ রফিকুল হক

১.
ইয়াসিন বাসায় ঢুকেই বুঝতে পারলো তার বউ আজও ক্ষেপে আছে। ইয়াসিন এর কোনো মানে খুঁজে পায় না। আজকালকার বউরা কেন যে এমন মাতলামি করে তা ইয়াসিন কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না। আর তার মতো আরও অনেকেই এখন এসব বুঝতে পারে না। আসলে, এদের কী হয়েছে?
এমনিতে অফিসে আজকাল তাদের কতজনের মুখঝামটা খেতে হয়। তার ওপর বাড়িতে এসে যদি এরকম উৎকট সমস্যায় পড়তে হয়, তাহলে, শান্তি পাওয়া যাবে কোথায়? শান্তি কোথায়? কোথায় শান্তি আছে এই দুনিয়ায়? এই দুনিয়ায় কে এই হতভাগাদের একটু শান্তি দিতে পারবে?

ইয়াসিনের মনটা আজ হঠাৎ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। আর তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, “ঈশ্বর, তুমি আমার কথা একটু শুনিও। আমি তোমারই সৃষ্টি একজন ইয়াসিন। আমার কী অপরাধ? আমার কী অপরাধ? আজ আমি ঘরে-বাইরে কোথাও একটু শান্তি পাই না। ঘানির বলদের মতো শুধু ছুটে চলেছি দিনরাত। আমার একটু বিশ্রাম নাই। স্বস্তি নাই। শুধু অবিরাম ছুটে চলা। আর যে-সংসারের বন্ধনে তুমি আজ আমাকে বেঁধেছো, সেই সংসারে আজ আমি সুখ খুঁজে পাচ্ছি না। এখানে শুধু রোজ-রোজ একশ’-একটা দায়িত্বপালনের অবিরাম মহড়া। হে ঈশ্বর, আমার দিকে একটু তাকিও। আর আমাদের সবার দিকে একটু তাকিও।” কিন্তু সে মুখফুটে কিছুই বলতে পারলো না। তার দুটো ছেলে-মেয়ে আছে। আর ওরা নেহায়েত ছোট্ট শিশু। ছিঃছিঃ ওরা কী ভাববে!
এসব ভেবে ইয়াসিন আপনমনে লজ্জা পেয়ে এবার শান্ত হয়ে যায়।

ইয়াসিন বউয়ের গরমমেজাজ দেখে আজ আর দমে না গিয়ে খুব মনখারাপ করে বাসায় ঢুকেছে। সে কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে বসে রইলো নিজেদের শোবার রুমে। তারপর কী যেন চিন্তা করতে-করতে উঠে এসে কম্পিউটার-রুমে ঢুকলো।
সবেমাত্র সে কম্পিউটারটা চালু করে একটা-কিছু লিখবে, অমনি তার বউ পাশের রুম থেকে ফোঁড়ন কেটে বললো, “কবি হবে, কবি, মহাকবি। তাইতো এতো লেখালেখি। কেউ তো খায় না ওসব।সবি তো পড়ে থাকে কম্পিউটারে। তার জন্য এতো আদিখ্যেতা।”
সব শুনে ইয়াসিন গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলো। সে কী লিখবে?তার লেখার ভাবটা একনিমিষে যেন উবে গেছে। আর-একটু পরে সে শান্ত হয়ে যেই কম্পিউটারের কী-বোর্ডটা চাপাচাপি শুরু করেছে, অমনি তার স্ত্রী আবার মুখঝামটা দিতে আরম্ভ করলো।
ইয়াসিন লেখাটা বন্ধ রেখে শুধু বললো, “শান্ত হও নীলিমা, শান্ত হও।”
এতে ইয়াসিনের স্ত্রী নীলিমা এবার আর-একটু জোরে স্বামীকে শুনিয়ে-শুনিয়ে বলতে লাগলো, “এতোই যদি বাংলা-ইংরেজি লিখতে পারো, তবে নীলক্ষেতে গিয়ে সন্ধ্যার পরে বসলেও তো মাসে কয়েক হাজার করে টাকা আসে। কিন্তু তা রেখে, উনি সাহিত্যচর্চায় মেতেছে। এমন বোকা লোক আমি জীবনে দেখি নাই। আর এই বোকা-লোকটাই আমার ঘাড়েই এসে জুটেছে!” সে কথাগুলো শেষ করে রাগে গজ গজ করতে-করতে আর-একদিকে চলে গেল। কিন্তু, তবুও যেন তার রাগের রেশটা এখনও চারদিকে রয়ে গেছে। ইয়াসিন তাই আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো।
অনেকক্ষণ পরে এবার ইয়াসিন যেন একটু স্বস্তি পেলো। তবে তা স্বল্পসময়ের জন্য। সে ভাবতে লাগলো: এইসব স্ত্রীলোক নিজেদের কী ভাবে? এদেরই বুঝি সব বুদ্ধিসুদ্ধি! আর দুনিয়ার
মানুষের-স্বামীদের কোনো বুদ্ধি নাই? তাহলে, আমরা চলছি কীভাবে?

সে আপাততঃ লেখালেখি বাদ দিয়ে আপনমনে আরও ভাবতে লাগলো: আধুনিক দুনিয়ার প্রায় সব স্ত্রীরাই বুঝি এমন। স্বামীদের প্রতিভাবিকাশের জন্য কোনো প্রেরণা তো দিবেই না, উপরন্তু আরও বাধার সৃষ্টি করবে। আর তারা সকল কাজে শুধু অর্থ খোঁজে। এদের মধ্যে দেশপ্রেমটা একেবারে কমে যাচ্ছে। অথচ, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বাংলাদেশে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যুদ্ধ করেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো সেই সময় মায়েরা স্বামীদের, সন্তানদের যুদ্ধে যেতে দিয়েছে। সত্যিই তাঁরা মহীয়সী। এযুগের ফ্যাশন-প্রিয় মেয়েরা তাঁদের ধারেকাছেও ভিড়তে পারবে না। এখনকার মেয়েদের বেশিরভাগই ভোগবাদী। আর তাই, এদের মুখে এখন শুনছি: শুধু আমার-আমার, আর আমার শব্দটি। এরা বুঝি দেশপ্রেম ভুলেই গেছে। এরা কবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য জাগবে? ইয়াসিন বুঝে গেছে, তার সাহিত্যসাধনার এখন একমাত্র শত্রু তার নিজের স্ত্রী। সে ভেবে দেখলো, কারও কাছে এসব কথা বলে কোনো লাভ নেই। তারচে বোবা হয়ে আগের মতো লেখালেখিটা চালিয়ে যেতে হবে। আর পারলে এখন থেকে অফিস-ছুটির পরে এতো তাড়াতাড়ি বাসায় না ফিরে অফিসের কম্পিউটারে লেখালেখির কাজটা শেষ করে আসতে হবে। আর নয়তো বউটা ঘুমালে তখন চুপিচুপি জেগে আস্তে-আস্তে লেখালেখি চালিয়ে যেতে হবে। সে লেখালেখি কিছুতেই ছাড়তে পারবে না। কারণ, এটার প্রতি তার স্কুলজীবন থেকে প্রগাঢ় ভালোবাসা। কিন্তু তখন এতো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। এখন অনলাইনে লেখালেখির এক বিশাল পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে। আর তাই, ব্লগে-ফেসবুকে মানুষ এখন লেখালেখির বিশাল জগৎ গড়ে তুলেছে। আর ইয়াসিন কয়েক বৎসর যাবৎ এই জগতে মিশে আছে। আগে তার বউটা এতো খটমটি করতো না। এখন একটু বেড়ে গেছে। এরও একটা কারণ আছে। তার স্ত্রী দীর্ঘদিন যাবৎ একটা কাজের মেয়ের দাবি করে আসছে। কিন্তু আর্থিক কারণে ইয়াসিন তা এখনও পূরণ করতে পারেনি। তাই, নীলিমা ক্ষেপে যায়।
ইয়াসিন ক্ষেপে না। সে বরাবর ঠাণ্ডাপ্রকৃতির মানুষ। তার বাবাও শান্তপ্রকৃতির মানুষ। ইয়াসিন বাবার সেই গুণটিই হয়তো পেয়েছে। তাই স্ত্রীর এতো মুখঝামটা সত্ত্বেও সে নীরবে তা হজম করতে পারে। আসলে, ভদ্রলোকদের এখন এসব সহ্য করতে হচ্ছে। সংসারের বন্ধন এমনই। আর এখানে ভদ্র-ছেলেরা সবসময় মুখরা-রমণীকে জীবনসঙ্গিনী হিসাবে পেয়ে থাকে। আর এটাই নাকি এই জগতের খেলা। দুষ্টলোকের নাকি বউ হয় মিষ্টি, আর শিষ্টজনের বউ নাকি হয় দুষ্ট-রুষ্ট! ইয়াসিন এই জগতরীতির কোনো মানে খুঁজে পায় না। একসময় সে এসবকিছুকে ঈশ্বরের লীলা বলে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।
সে তরফদার-বাড়ির বড় ছেলে। এজন্য তার ওপর পারিবারিক চাপটা বেশি থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাড়ির অবস্থা ভালো হওয়ায় এদিক থেকে তার কোনো সমস্যা নেই। সে ভাবছে: তার চাকরিটা আর-একটু ভালো হলে সে কোনো চিন্তাই করতো না। আর তখন সে নীলিমার জন্য একটা কাজের মেয়ে রেখে দিতো। তার ইচ্ছা আছে কিন্তু শক্তি নাই। তবুও তার স্ত্রী কিছুই বুঝতে চায় না।
একসময় তার মনটা একটুখানি শান্ত হলো। সে উপন্যাসের বাকী-অংশটুকু লেখায় মন দিলো। সে দরজার দিকে একটু উঁকি দিয়ে বুঝতে পারলো তার স্ত্রী এখন আর এদিকে আসবে না। সে এখন মেয়েকে পড়াতে বসেছে। আর এই সুযোগে ইয়াসিন দ্রুত লিখতে থাকে। আজ সে লিখতে-লিখতে অনেকদূরে চলে যাবে। দ্রুত এই উপন্যাসটা শেষ করতে পারলে বাংলাবাজারের এক-প্রকাশকের কাছে তা জমা দিতে পারবে। আর এটি ছাপা হলে সে কিছু টাকাও পেতে পারে। তখন সে নীলিমার জন্য একটা কাজের মানুষ রাখতে পারবে। আর এব্যাপারে তার আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। সেও সংসারে শান্তি চায়। কিন্তু এইমুহূর্তে তার পক্ষে একটা কাজের মানুষ রাখা অসম্ভব। এখন এসব তার সামর্থে্যর বাইরে। নইলে প্রায়-প্রতিদিন স্ত্রীর মুখঝামটা কার এতো ভালো লাগে?

সে আগে কবিতা লিখতো বেশি। কিন্তু কিছুদিন পরে সে বুঝতে পারলো: এই দেশে কবিতা বোঝা, পড়া ও সমালোচনা করার মতো লোকের বড় অভাব। এরা সস্তা জিনিস বড় ভালোবাসে। এখানে জোর করে হলেও গল্প-উপন্যাস খাওয়ানো যাবে। কিন্তু কখনও কবিতা নয়। সে আরও মনে করে, সেকালের অনেক কবি যদি একালে জন্ম নিতো, তাহলে, তারা ভয়ে হয়তো কবিতা লেখা ছেড়ে দিতো। আর নয়তো সমাজ থেকে পালিয়ে যেতো। এমনকি অনেক কবি না-খেয়েও মারা যেতো। এই ভয়ে ইয়াসিন ইদানীং কবিতা লেখাটা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। এই দেশে খুব শিক্ষিত ও মার্জিত লোকেরাই শুধু কবিতা পড়ে। এমনকি দেশে বর্তমানে যে-সব ব্যবসাবহুল-দেশবিরোধী দৈনিক পত্রিকাগুলো রয়েছে, তার নামকাওয়াস্তে সাহিত্যসম্পাদকও কবিতা বোঝে না। পড়ে না। আর সে কবিতার মানেও জানে না। তবুও সেই গাধাটা একটা তথাকথিত-পত্রিকার সাহিত্যসম্পাদক হয়ে বসে আছে। এরা আজকাল নিজেদের পরিচিত-লোকজনের ও সুন্দরীদের লেখা ব্যতীত আর কারও লেখা ছাপে না। এরা প্রত্যেকে সাহিত্যসম্পাদক-নামধারী সমাজের ভদ্রবেশী-রমণীমোহনবাবু। এদেরই কয়েকজনের কাছে ইয়াসিন গিয়েছিলো তার লেখাগুলো ছাপাতে। আর তার ইচ্ছে ছিল একটা উপন্যাস সে ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় ছাপাবে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সেই রমণীমোহনবাবুরা তাকে নিরাশ করেছে। সেই থেকে ইয়াসিন এখন ব্লগে লেখে। এখানেই শান্তি। সে এখন আজেবাজে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যসম্পাদকের নাম শুনলে তার মুখে সরাসরি প্রস্রাব করে দিবে। ইয়াসিন বুঝতে পেরেছে, কতকগুলো লম্পট, বদ্ধমাতাল, নারীলোভী, নারীদেহলোভী, বিকৃত ও রিরংসাবৃত্তির চিরপূজারী পাপিষ্ঠ-পামররা এখন নিজেদের সাহিত্যসম্পাদক ভেবে বসে আছে। এরা আসলে এই সমাজে পুরুষ-যৌন-কর্মী। আর একেকজন সরাসরি বেশ্যা। আর এরা কবিতার কী বোঝে? এরা নিজেদের নামের আগে কবি-উপাধী আর কবি-নামটি ব্যবহার করছে ওই পরিচিতজনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে। এরা এখন সমাজের মিডিয়া-সর্বস্ব-কবি। ইয়াসিন এই জাতীয় সুনির্দিষ্ট লম্পটদের কখনও কবি মনে করে না। আর এদের জন্যই আজ সাহিত্যের এই জরাজীর্ণ দশা।
সে গল্প লেখার চেষ্টা করছে। আর মন-খুলে লিখছে উপন্যাস। আর এটায় সে বেশ সাড়া পেয়েছে। তাই, তার লেখার মোড় ঘুরে গেছে।
ইয়াসিন একটা অধ্যায় সবেমাত্র লিখে শেষ করেছে। আর-একটি অধ্যায় শুরু করবে। এমন সময় তার স্ত্রী নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো, “এইসব লিখে লাভ কী? এইসব কেউ পড়ে? খামাখা সময় নষ্ট। তারচে তুমি নীলক্ষেতে বসে বাংলা-ইংরেজি-টাইপ করলেও কত টাকা রোজগার হয় মাসে।”
সে রাগ না করে ধীরে-ধীরে বললো, “শুধু পয়সাই সবকিছু নয়। মানুষের জন্যও তো কিছু করে যেতে হবে। নইলে তো আমাদের মানবজন্মই বৃথা।”
নীলিমা কর্কশকণ্ঠে বললো, “কীসের মানুষ, নিজে না বাঁচলে কারও কথা ভেবে লাভ নেই।”
ইয়াসিন আগের মতো শান্তস্বরে বলতে থাকে, “লাভ আছে। এই দেশ, এই মানুষই তো আমাদের সব। আমরা আজ বেঁচে আছি। আর অনেকের চেয়ে ভালো আছি। আমাদের পরে আসছে আরেক প্রজন্ম। এদের কাছে আমাদের জাতির কথা লিখে যেতে হবে না? আমরা তো শুধু নিজের না। আমরা এই জাতির, আর আমরা এই মানুষের, আর আমরা এই দেশের। তাই, আমাদের দেশের কথা ভাবতেই হবে।”
তবুও নীলিমা বলতে থাকে, “এসব ভেবে লাভ নেই। আগে নিজেদের কথা ভাবো। কবে আমাদের একটা ফ্ল্যাট হবে, গাড়ি হবে, আর একটা-দুটো কাজের মানুষ হবে। এখন সবাই এসবই ভাবে।”
ইয়াসিন এবার ভিতরে-ভিতরে একটু রেগে গেল। তবে সে বাইরে জোর করে শান্তভাবটা বজায় রেখে বললো, ওরা মানুষ নয়। ওরা পশু। আর যারা স্বার্থপর, তারা আসলেই পশু। এদের জন্যই তো আজ সমাজ-রাষ্ট্র উচ্ছন্নে যেতে বসেছে। তুমি যাই ভাবো না কেন, আমি এদের মতো হতে পারবো না। আর আমি মানুষ। আমি এখন নতুন করে পশু হবো কীভাবে?”
“তা পারবে কেন! তুমি মহাকবি হবে। আর তুমি নোবেল পুরস্কার পাবে।”—কথাগুলো তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে নীলিমা পাশের রুমে চলে গেল।
ওর কথায় ইয়াসিন একটুখানি কষ্ট পেলেও আবার স্বস্তিও পেয়েছে যে, তবুও এবার কিছুটা সময় লেখা যাবে। এই সুযোগটুকু সে এখন কাজে লাগাতে চায়।
ইয়াসিন লিখতে-লিখতে ভাবতে থাকে: ওরা মাত্র চারজন মানুষ। এরজন্য আবার মাসে তিন-চার হাজার টাকা খরচ করে একটা কাজের মেয়ে রাখার দরকার কী? এখনকার মেয়েরা যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। এরা শুধু ভোগ করতে জানে। ত্যাগের মহিমাটা এদের হয়তো জানা হয়নি। কিন্তু এদের মধ্যে তো এই ত্যাগের মহিমা জাগিয়ে তুলতে হবে। তা-না-হলে আমাদের পরবর্তী-প্রজন্ম তো চরম স্বার্থপর হয়ে উঠবে। এদের আর স্বার্থপর হতে দেওয়া চলবে না। এদের এবার থেকে এই দেশ ও মানুষের জন্য ত্যাগের মহিমা শেখাতে হবে। তার লেখায় সে মনুষ্যত্ব-প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।

ইয়াসিন নিজের চোখে দেখেছে, তার মা ছয়টি ছেলে আর দুটি মেয়েকে একাই কীভাবে লালনপালন করেছেন। আবার নিয়মিত ঘরের কাজও করেছেন। তাও সেটা গ্রামে। সেখানে কত অসুবিধা। আর এখানকার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার কোনো বালাই নেই সেখানে। আর সেটা কত আগের কথা! আর এই ঢাকা-শহরে এখন সবকিছু একটা মেয়ের হাতের মুঠোয়। তবুও সে কাজের মেয়ের জন্য দিন-দিন হন্যে হয়ে উঠছে। আর তাদের মাত্র দুইটি ছেলে-মেয়ে! সে আরও ভাবে: এখনকার মেয়েরা কত নিষ্ঠুর! তারা এখন দুইটি-একটির বেশি সন্তানও ধারণ করতে চায় না! এরা আসলে কী চায়? ইয়াসিনকে এইসব বিষয় আরও বেশি করে ভাবিয়ে তুললো। তার অন্তরাত্মা এইসব অনিয়ম ও ভ্রান্তনীতি একমুহূর্তের জন্যও মানতে রাজী হয় না।

সে লিখতে থাকে। আর তার উপন্যাসের নায়িকাকে তার মায়ের চরিত্রে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সে এই জায়গায় আর কাউকে বসাতে পারলো না। আহা! তার মায়ের কণ্ঠস্বর কত মধুর। তার মা কখনও তার বাবাকে মুখঝামটা দেয়নি। সে বাড়ির বড় ছেলে—আর সবকিছু তো তারই জানার কথা। সে লিখতে-লিখতে মায়ের মুখখানি স্মরণ করে, আর তার জন্য মনে মনে দোয়া করতে থাকে। তার স্ত্রীর ব্যহারের কারণে তার মা এখানে এসে খুব একটা বেশিদিন থাকে না। তবুও তার মা আসে। কারণ, তিনি মমতাময়ী। আর এখানে এসে তিনি এখনও সবার সঙ্গে মানিয়ে চলেন। একেই বলে মমতাময়ী-মা।

সে আজ রুদ্ধশ্বাসে লিখতে থাকে। নারীকে হতে হবে মমতাময়ী। এই জীবনে তাদের শুধু একজন খাওয়া-পরা-শোওয়া-বসা ভাবনাসম্পন্ন সাধারণ মেয়ে হলে চলবে না। নারীকে ‘এসি’র মতো হতে হবে। ঘরে এলে যেন মনটা শীতল হয়ে যায়। আর কেউ এসি ফেলে গাছতলায় বসে থাকে না। পুরুষ-মানুষটি ঘরে এলে যদি তার পালাতে ইচ্ছে করে, তাহলে, আগামীদিনে মানুষ সংসার করবে কীভাবে? ঈশ্বর, তুমি এই নারীদের কোমলমতী বানিয়ে দাও। এদের সত্যিকারের নারী বানিয়ে দাও। আর এদের সীতা-সাবিত্রী-জাহ্নবীর মতো বানিয়ে দাও।
এই পর্যন্ত লিখে ইয়াসিন আবার ভাবতে থাকে। আর সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়: সে সারাজীবন দেশের মানুষের জন্য লিখে যাবে। তাকে লিখতে হবে। এই সমাজের অনাচার-ব্যভিচার নীরবে হজম করার জন্য তার জন্ম হয়নি। দুঃখ তার আমৃত্য সঙ্গী হলেও সে লিখে যাবে। আর ঈশ্বর হয়তো একদিন-না-একদিন তাদের দিকে সত্যিই মুখ-তুলে তাকাবেন।

(চলবে)
সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

২ thoughts on ““ঈশ্বরের রহস্যময় হাসি” ধারাবাহিক উপন্যাস: পর্ব–১

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *