আজ যেমন করে অথবা আ যে ক

মনের ঠিক ঠিকানা নাই কোন। উত্তরে যায়, পশ্চিমে যায়, পূর্বে যায়, কিন্তু দক্ষিণে যায় না। ওদিকে গেলে আর আসবে না। আচ্ছা, আমরা বিনা কাজে বসে থাকি কেন? এটা কি শুধুই আলসেমি! নাকি অন্যকিছু? বারান্দার গ্রিলে যে পাখিটা বসে আছে, ওর কি কাজ ওখানে? ওদেরও কি আলসেমি আছে? সায়েন্স কি বলে? উহু! কখনো তো বইয়ে পড়িনি। খাবারের সন্ধানে বেরোতে পারে, তবে ওখানে বসে কি? কাউকে কি খুঁজছে? নাহ এটা সায়েন্সের ব্যাপার না। ফিলোসোফির ব্যাপার। বিকেলে একবার সুবলদা’র কাছে যেতে হবে। সুবলদা ফিলোসোফিতে পড়ে। ও বলে ফিলোসোফিতে নাকি সবকিছুর সমাধান আছে। কি আছে সেটা দাদাই জানে।


মনের ঠিক ঠিকানা নাই কোন। উত্তরে যায়, পশ্চিমে যায়, পূর্বে যায়, কিন্তু দক্ষিণে যায় না। ওদিকে গেলে আর আসবে না। আচ্ছা, আমরা বিনা কাজে বসে থাকি কেন? এটা কি শুধুই আলসেমি! নাকি অন্যকিছু? বারান্দার গ্রিলে যে পাখিটা বসে আছে, ওর কি কাজ ওখানে? ওদেরও কি আলসেমি আছে? সায়েন্স কি বলে? উহু! কখনো তো বইয়ে পড়িনি। খাবারের সন্ধানে বেরোতে পারে, তবে ওখানে বসে কি? কাউকে কি খুঁজছে? নাহ এটা সায়েন্সের ব্যাপার না। ফিলোসোফির ব্যাপার। বিকেলে একবার সুবলদা’র কাছে যেতে হবে। সুবলদা ফিলোসোফিতে পড়ে। ও বলে ফিলোসোফিতে নাকি সবকিছুর সমাধান আছে। কি আছে সেটা দাদাই জানে।

আজ এত সকালে কেন যে ঘুমটা ভেঙে গেল! ক্লাসও নেই আজ। সামনে অবশ্য পরীক্ষা। মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে এখনো ইয়াবড় একটা বই পড়া বাকি। ক্লাস নেই, ল্যাপটপে নতুন কোন মুভি নেই, বাইরেও যেতে ইচ্ছে করছে না। সকাল সকাল মা’ও টিভি দখল করে বসে আছে। স্টার জলসা! কি যে করি! কিছু পুরোনো মুভি আছে অবশ্য, ওগুলোই দেখা যায়। কিন্তু… না থাক। দেখব না। ছুটির দিনে সবাই লম্বা ঘুম দেয়, আর আমি! ধুর! সুমন, নাদিয়া নিশ্চয়ই এখন ফোন অফ করে ঘুমোচ্ছে। হুম বুদ্ধি পাইসি। নাদিয়াকে একবার ফোন দিয়ে দেখা যায়। হুম ফোন খোলা
: হ্যালো! (বেচারি কত কষ্ট করে যে কথাটা বলল!)
: হ্যালো, আমি সৌম
: হারামজাদা এত সকালে ফোন দিসিস কেনো?
: ঘুম ভাঙে গেল তো। কিছু করার না….
: আবার ঘুমা ***
: …………

থাক আর কাউকে ফোন দিব না। ঘুমের সময় ডিস্টার্ব না দেয়াই ভাল। আচ্ছা ঘুমানোর সময় সবার সৌন্দর্য বেড়ে যায় কেনো? সেদিন পুষ্পা ক্লাসের বেঞ্চে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছিল। কি যে সুন্দর লাগছিল! আচ্ছা পুষ্পা কি করছে এখন! ও কি ঘুমোচ্ছে? ঘুমোচ্ছেই বোধ হয়।

বারান্দা দিয়ে অবশ্য সুন্দর একটা সকাল উঁকি দিচ্ছে। এটা দেখেও অবশ্য দিনটা পার করে দিতে পারি। বারান্দায় যাই। সিগারেটের প্যাকেটে মাত্র আর দু’টো সিগারেট। ধুর! কালই তো আনলাম!

এ বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়া আমার কাছে খুব সুন্দর কিছু মুহূর্তের একটা। আমার এ বারান্দাটার মত আর কোথাও থাকতেই পারে না। আমাদের এ বাসাটা বেশ পুরোনো। আমার শৈশব, কিশোর এখানেই। পুরাতন বাসায় থাকার মধ্যে একটা খানদানি ভাব আছে বটে। বেশ বড় বারান্দাটা। বড় মামা অবশ্য বেশ কয়েকবার বাসা পাল্টানোর প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল। বাবাও রাজি ছিল। কিন্তু আমি আর মা প্রতিবারই না করে দিয়েছি। পুরাতন বাসাতেই যদি আনন্দে থাকা যায় তবে নতুন বাসার দরকার কি? জীবনে যদি এমন দু’চারটা সুন্দর সকাল না ই দেখলাম তবে জীবনের মূল্য কি!

এখানে আমাদের আশে পাশে শুধু একটা দোতালা বাসা আছে। বাকি সব একতলা। বেশির ভাগই টিন শেডেড। আমাদের নিচের তলায় সুবল’দারা থাকে। সুবলদা আমারউ ভার্সিটে পড়ে। এবার গ্র্যাজুয়েশন করবে। সূর্যটা এখন ঠিক নারিকেল গাছটার দুটো পাতার মাঝে। দেখতে বেশ লাগছে। আকাশে অবিচ্ছিন্ন পাখির দল। টিউবওয়েল আর গোসলের জন্য পানি ঢালার শব্দ নতুন একটা মাত্রা যোগ করেছে। মাঝে দু’একটা রিকশা ক্রিং ক্রিং শব্দ করে রাস্তা দিয়ে অলস ভঙিতে চলে যাচ্ছে। এখনো কোন যাত্রি জোটেনি কপালে। রাস্তার বেশির ভাগ যাত্রি ইশকুল ইউনিফর্মে। ছোটবেলায় আমিও ছিলাম ও দলে। ও দলেই বেশি আনন্দ।

ছোটবেলার সেইসব আইসক্রিম গাড়ির সেই মায়ালাগা টিংটিং শব্দগুলো এখন খুব অনুভব করি। বেলিসিমো’র বাহারি মোড়ক চুষে খেয়েছে নারকেলের প্রতিটা দানা। হাওয়াই নারুও আজ রং পাল্টে ধারণ করেছে বিশাল অট্টালিকা’র প্রতিরূপ। আগের সেই বারোভাজা আজ বিরল বস্তু। ছোট ছিলাম যখন বারোভাজাই পাওয়া যেত সবখানে, এখন মুড়িমাখা। হঠাৎ কখনো দেখা যেত সার্কাসের সঙের মত লাল-হলুদ বাহারি পোশাক পড়া মুড়িমাখাওয়ালা। হাতে টিনের দেশি হ্যান্ডমাইক আর মাথায় টুপি। খুব আকর্ষণ করত সেই গম্ভীর ডাক, “মুড়ি… মুড়ি…।” সপ্তাহে একদিন হলেও দেখা যেত দই-সন্দেশওয়ালাকে। ছবি আঁকার গ্রামীণ ক্যানভাসে যার ছবি আঁকা ছিল আবশ্যকীয় ব্যাপার। আধুনিক মিষ্টান্ন ভান্ডার খেয়েছে সেই দইওয়ালা দেখার আনন্দের দিনগুলো…
: ভাই… য়া….!
হঠাৎ স্নেহার ডাকে এ বেলায় ফিরে এলাম। ওহ স্নেহার কথা আগে বলি নি। ও আমার ছোট বোন। এবার মেট্রিকুলেশান দিবে। ছোটবোন হিসেবে দিনরাত্রি ভাইয়ের সাথে ঝগড়া করা এবং দু’দিন পর পর ফোনে টাকার জন্য নিজ হাতে চা বানিয়ে রুমের গেঁটে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা ওর মত আর কেউ পারে বলে আমার মনে হয় না।
: কিরে!
: কি দেখতেসিস ওখানে দাঁড়ায়! এতক্ষণ ধরে মা ডাকছে শুনছিস না? নাস্তা দিসে আয়। বাবাও ডাকছে।
: আসছি যা। … স্নেহা শুনতো
তোর বয়ফ্রেন্ডটা কেমন আছে রে? কি যেন নামটা!
: মা…
: মাও জানে নাকি!
: ভাইয়া মাইর খাবি কিন্তু!

সুন্দর সকাল দেখার মাঝে এই নাস্তা এবং বাবা একটা ডিস্টার্ব।
টেবিলে সবাই। মানে বাবা, মা, স্নেহা।
: কতবার বলসি সিগারেট খায়ে আমার সামনে আসবি না
: আচ্ছা আসব না আরর
: আজকে ক্লাস নেই?
: না বাবা
: তো চাচা বলল, তুই নাকি টিউশিনি করছিস!
: ঠিক শুনেছো। কোন সমস্যা আছে নাকি?
: কতদিন থেকে বলছি দোকানে একটু বসতে। একটু আসতে তো পারিস!
: সময় নেই।
পরোটার টুকরোটা মুখে দিয়ে দিব্যি বলে দিলাম। আড়চোখে দেখছি বাবা খাওয়া থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মা’র মুখে হাসি কিন্তু হাসতে পারছে না।
: ভার্সিটিতে উঠলি কদিন হল মাত্র। এখনই বেয়াদবি শুরু করেছিস!
: মা চা দাও

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। বাবা বরাবরের মত চিৎকার করছে, ‘এ বাড়িতে ওর খাওয়া বন্ধ করে দিব!…. টিউশনি করে তবু…’

এসব কথা শোনার কোন মানে নেই। গত চার- পাঁচ মাস থেকে শুনে আসছি। আমি অভ্যস্ত। আবার সকাল দেখায় মনোযোগ দিলাম। এটাই ভাল। রাস্তা দিয়ে মিছিলের মত কিছু লোক যাচ্ছে। মাথায় টুপি সবার। ও আচ্ছা। কেউ মারা গেছে। সামনে লাশ। কিন্তু কে? ওই যে রাজু!
: ওই রাজু…!
: কি সৌম’দা?
: কে রে?
: তুমি চিনবা না। ওই কোণের বাড়িটাতে নতুন এসেছিল। ফাসি দিসে
: ও আচ্ছা।

সব অপ্রয়োজনীয়। আচ্ছা, সবুজ বলে আত্মহত্যা পাপ। আবার মোসলমানেরা বলে, মানুষের জীবন মৃতু ঈশ্বরের কাছে। সব ঠিক করা। তাহলে আত্মহত্যা পাপ কেন? যে আত্মহত্যা করলো তার দোষ কি? তার মৃত্যু তো ঠিক করাই ছিল! উহু… চিন্তার বিষয়।
দেখতে দেখতে লাশের মিছিলটা মিলিয়ে গেল রাস্তার শেষ মাথায়…

নাহ আরেকটা ডিস্টার্ব। সবাই আমামার সকালটা খারাপ করার পিছনে লেগেছে। যাই গান ছেড়ে আসি ল্যাপটপে। এমন সকালে রবী’দার কোন বিকল্প নাই।
“আজ যেমন করে… গাইছে আকাশ
তেমনি করে গাও গো
আজ যেমন করে…”

আহ এবার ঠিক আছে। রবী’দাকে সামনে পেলে এখন জিজ্ঞেস করতাম, ‘আপনি কি এমন সুন্দর সকাল কখনো দেখেছিলেন? আপনি কি সকালে ঘুমোতেন নাকি সকালেই উঠতেন?’

শেষ সিগারেটটা নিয়ে আবার বারান্দায় এলাম। মাহাবুব ভাই পেপার নিয়ে আসছে। রাস্তার মোড়ে সাইকেল দেখা যাচ্ছে। সূর্যটা এখন নারিকেল গাছটা থেকে বেশ উপরে। পাশের একমাত্র দোতালা বাড়িটার বারান্দায় বাড়ির মেয়েটা চুল ঝাড়ছে…

“… আজ যেমন করে চাইছে আকাশ
তেমনি করে চাও গো, আজ যেমন করে…
… তেমনি করে আমার বুকের মাঝে
কাঁদিয়া কাদাও গো
আজ যেমন করে…”

(বি.দ্র: নামটা মহীনের ঘোড়াগুলির “আজব উড়ন্ত বস্তু বা আ উ ব” অ্যালবাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নেয়া)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *