আশফাক হোসেনের একদিন

আশফাক হোসেনের ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে। চোখ খুলেই দেখল ফান বন্ধ। কারেন্ট নেই। গরমে মাথা ব্যথা যেন আরও বেড়ে গিয়েছে। কালকে রাতে দুই বোতল ডাইল খেয়ে শুয়েছিল, তারই জন্যে এই মাথা ব্যথা। এমনিতে ডাইল খেলে তার এরকম হয় না। কালকের ডাইলটা বেশ ভালো ছিল। ধরেও ছিল ভালো। অনেকদিন পর এরকম ডাইল খেলো সে। এখন তো ভালো কোন কিছুই পাওয়া যায় না। সবকিছুতেই ভেজাল।

আশফাক হোসেনের ঘুম ভাঙল প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে। চোখ খুলেই দেখল ফান বন্ধ। কারেন্ট নেই। গরমে মাথা ব্যথা যেন আরও বেড়ে গিয়েছে। কালকে রাতে দুই বোতল ডাইল খেয়ে শুয়েছিল, তারই জন্যে এই মাথা ব্যথা। এমনিতে ডাইল খেলে তার এরকম হয় না। কালকের ডাইলটা বেশ ভালো ছিল। ধরেও ছিল ভালো। অনেকদিন পর এরকম ডাইল খেলো সে। এখন তো ভালো কোন কিছুই পাওয়া যায় না। সবকিছুতেই ভেজাল।
মাথা ব্যথা নিয়েই উঠল আশফাক হোসেন। ঘড়ি দেখল ১১টা বাজে। কিছু খাওয়া দরকার। মুখ ধুয়ে বাসা থেকে বের হল। বাসার সামনের হোটেলে গিয়ে ঢুকল। পরাটা,সবজি আর ডিম দিতে বলল। আর ভাবতে লাগল যে আজকের কি কি কাজ আছে। আসলেই তার তেমন কাজ নেই। শুধু এই জায়গায় ওই জায়গায় ঘোরাঘুরি করা।
এরকম চিন্তা করতে হটাৎ হাসি পেলো আশফাকের। তার চাকরিই তো এটা। ঘুরাঘুরি করা।মানুষের কাজকর্ম দেখা। কাজকর্ম দেখা মানে এলাকার কোথায় কে কি করে, সেটার খবর রাখা। সে পুলিশের ইনফর্মার।
তার এই কাজটা পাওয়া অনেকটা লটারিতে প্রাইজ পাওয়ার মতো। তার বাড়ি ঝিনাইদহে। এক ডিগ্রি কলেজে পড়ত। পরীক্ষায় নকলের জন্যে বহিস্কার হয়ে পড়া শেষ হয় তার। বাড়িতে বসে খাওয়া আর এলাকায় মাতবরি করা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না তার। এর মাঝে একদিন ঢাকায় চলে আসে বোনের বাসায় ঘুরতে আর কাজ খুঁজতে। বোন এর জামাই ছিল থানার কনস্টেবল। তো কয়েকদিন থাকতে মিশুক স্বভাবের আশফাকের অনেকের সাথেই খাতির হয়ে যায়। ওই সময়ই তার দুলাভাই তাকে কাজ করার প্রস্তাব দেয়। ইনফর্মারের কাজ। আশফাকের না করার কোন কারণ ছিল না। আসলে কাজ তেমন কিছু না। সব এলাকা ঘুরে বেড়ানো, সব জায়গার খোঁজ খবর রাখা। দোকান থেকে চাঁদা উঠানো। ইয়াবা আর সব ড্রাগ ডিলার এর কাছ থেকে মাসোহারা নেয়া। পলিটিকাল মানুষজনের সাথে সম্পর্ক রাখা আর কোন কিছু এদিক ওদিক মনে হলে পুলিশকে জানানো।এলাকার যেকোনো জায়গায় যেকোনো দুই নম্বরি কাজের গন্ধ পেলেই তার কাজ পুলিশকে জানানো। এ আর এমন কি কাজ! থানার কিছু টাকা পয়সার ভাগ সেও পেতো। সেই টাকার পরিমাণও নিতান্ত কম না। এরকম সুখের চাকরি আসলেই তার স্বপ্নের বাইরে ছিল। সে এভাবে কাজ করছে প্রায় ২ বছর হবে। তার দুলাভাই এর বদলি হয়েছে, তবুও থানার সবার সাথে সে কাজ করে যাচ্ছে এখনো। এই থানার সবাই জানে আশফাক হোসেন বেশ কাজের। থানায় নতুন কেউ বদলি হয়ে আসলে আশফাকই এলাকার ভাবসাব তাদেরকে বুঝায়। থানার ইনফর্মার হয়ে বেশ ভালই দিনকাল যাচ্ছে তার।
চিন্তা থেকে বাস্তবে ফিরে আসলো আশফাক হোসেন। নাস্তা এখনো দেয়া হয় নি। ১০ মিনিট পার হয়ে গেছে। মেজাজ গরম হয়ে হোটেলের কাউন্টারের ছেলেটার দিকে চিৎকার করে উঠলো।
-“ওই হারামি! এতক্ষণ লাগে নাস্তা দিতে?”
-“ স্যার! আর একটু সময় দেন!” কাছে এসে কাচুমুচু হয়ে বলল কাউন্টার এর কমবয়সী ছেলেটা।
-“তোর সময় আমি……”
– “স্যার, আমাদের হোটেলে নাস্তা ১০টায় শেষ হইয়া যায়। সব নতুন করে এখন করতে হচ্ছে আপনার জন্যে। আটার দলা থেকে পরাটা বানাইতে তো একটু সময় লাগে স্যার। আর সবজি কাঁচা ছিল, ভাজতে দিছি। একটু সময় দেন আর, হয়ে যাবে…”
– “শুয়োরের বা…!” বলে উঠে কষায় একটা চড় লাগাল আশফাক।
রান্নাঘর থেকে একটা লোক এসে সরিয়ে নিল ছেলেটাকে। কাঁদতেছে সে।
-“তাড়াতাড়ি দে!” আবার ঝাড়ি দিয়ে উঠলো আশফাক।
মনে মনে একটু আনন্দও পাচ্ছিল সে। ইনফর্মার এর চাকরির সবচেয়ে বড় মজা হল এটাই। ‘ক্ষমতা’। সে এই এলাকার যেকোনো দোকানে গিয়ে দাদাগিরি করতে পারে, চাইলে ফাউ খেতে পারে। তাকে চেতালেই পুলিশ এসে হেনস্থা শুরু করবে। কি দরকার তার! তার চেয়ে আশফাক হোসেনের একটু ‘যন্ত্রণা’ সহ্য করলেই হয়!
তাই এলাকার টং এর চাওয়ালা থেকে শুরু করে প্রায় সব দোকানদারই তার সাথে একটু ভালো সম্পর্ক রাখতে চায়। আশফাক হোসেন এই ক্ষমতাটা বেশ ভালভাবেই উপভোগ করে। সে যখন যা চায়, তাই পেতে পারে চাইলে।শুধু সাধারণ জিনিস না সে চাইলে ইয়াবা, ডাইল, গাঁজা সব চাওয়ার সাথে সাথেই পেতে পারে, যেকোনো সময়।
নাস্তা চলে এসেছে। খেয়ে দেয়ে বের হল সে। অবশ্যই বিল না দিয়ে। দেরি করে নাস্তা দিয়েছে, বিল দেয়ার প্রশ্নই উঠে না।
পুরো এলাকায় একবার ঘুরে দেখল সে।সবকিছু স্বাভাবিক ,গতানুগতিক। দিনের বেলা আসলে তার তেমন কিছু করার থাকে না। সন্ধ্যার পর থানায় পুলিশের সাথে ডিলিং আর বাকি সব কাজ করে।
সব শেষে চৌরাস্তায় গিয়ে টং এর দোকান এ বসে চা খেতে বসল সে। সাথে সিগারেট। তখন বাজে প্রায় ১টা। সেই চা খেতে খেতেই সে দেখল রুনা বের হল বিল্ডিং এর গেট দিয়ে। সাথে একটা ছেলে।
আশফাক যে চৌরাস্তায় টং এর দোকানে বসে চা খাচ্ছিল সে চৌরাস্তা থেকে একটু সামনে গিয়ে ডানের বিল্ডিং এ রুনা সাবলেট থাকে। । রুনার সাথে আশফাক হোসেনের সম্পর্ক বুঝাতে গেলে এক কথায় বলতে হয়- রুনা হচ্ছে আশফাক হোসেনের ‘ক্রাশ’ ।
আর বাকি সব কিছুর মতনই আশফাক হোসেন চাইলেই মেয়েমানুষ পেতে পারে মনোরঞ্জনের জন্যে। তাদের এলাকায় মেয়েমানুষের কারবার না থাকলেও কিছুদূরের একটা জায়গায় আছে। থানার এক কন্সটেবলের মাধ্যমে পরিচয় তাদের সাথে। ফোন দিলেই ব্যবস্থা হয়ে যায়। সে যে প্রেম করে নি কখনো তাও কিন্তু না। বস্তির সুন্দরী মেয়ে বা গার্মেন্টস এর মেয়েদের সাথে সে বেশ কয়েকটি প্রেমও করেছে। বাসায় এনে ভালোমতো মজা নিয়ে সেই সব সম্পর্ক এর ইতি টেনেছে সে। তার মন কাউকেই বেশিদিন ভালো লাগাতে পারে না।
এর মধ্যে একদিন রুনাকে দেখে। মেয়েটা কোন এক কলেজে অনার্সে পড়ে। এখানে কয়েকমাস হল এক বাসায় সাবলেট নিয়ে থাকে।বেশ শালীন আর ভদ্র চলাফেরা। মেয়েটাকে দেখে কেন জানি খুব আকৃষ্ট হয় আশফাক। সে জানে সে রুনার মতো মেয়েদের লেভেলের না,রুনার মতো মেয়েদের তার শ্রেণির মানুষকে পছন্দ করার কারণ নেই, তাও তার আকর্ষণ কমে না তার। দিনে দিনে তার আকর্ষণ বেড়েই চলে। সে বুঝতে পারে রুনাকে বিছানাতে পেতেই হবে তার, না হলে শান্তি পাবে না। একদিন মরিয়া হয়ে সে একদিন রাস্তায় বলেই ফেলে রুনাকে। রুনা প্রথমে ভদ্র ভাবেই না করে। তার পর আশফাক হোসেন জোর করা শুরু করলে রুনা রেগে আশেপাশের লোকজন ডাকা শুরু করে। অবশেষে সে ক্ষান্ত দেয়।
যাই হোক সেই রুনা এখন একটা ছেলের সাথে বের হল বিল্ডিং থেকে। ছেলেটাকে একটা রিকশায় তুলে দিল। ছেলেটাকে কম বয়স্কই লাগলো। রুনা আবার বিল্ডিং এ ঢুকে গেলো।
আশফাক হোসেন টং এর চা ওয়ালা কে জিজ্ঞেস করল যে সে ছেলেটাকে আগে দেখেছে কিনা। চা ওয়ালা বলল দেখে নি। আশফাক হোসেন আর কিছু না বলে চা খেতে লাগলো।
চায়ে চুমুক দিতে দিতেই তার মাথায় একটা পৈচাশিক বুদ্ধি আসলো। একটা কাজের বুদ্ধি। সেই বুদ্ধি আসার সাথে সাথে মুখে হাসি ফুটে উঠলো তার। একটু চিন্তা করে দেখল। তারপর সিদ্ধান্ত নিল সে এই কাজটা করবেই।
টং এর দোকান থেকে বের হল সে। থানার দিকে গেল। থানাতে গিয়ে দেখল এস.আই আছে। তাকে একটা খবর দিল সে। এই খবর নিঃসন্দেহে হট কেক হয়ে যাবে এখানে। আশফাক হোসেনের কাজ এখন শুধু বসে বসে দেখা।
সে থানা থেকে বের হল। তার খালাতো বোনের স্বামীর টাইফয়েড, হাসপাতালে ভর্তি। সেখানে যাওয়ার কথা আজকে দুপুরে, সে ভুলেই গিয়েছিল। সে রওনা দিল। ফিরে এসে বাকি কাহিনী দেখবে।
আশফাক হোসেনের ফিরে আসতে বেশ দেরি হয়ে গেল। রাত বাজে তখন ৯.৩০টা। চৌরাস্তা পার হওয়ার সময় দেখল রুনার বাসার সামনে একটা টেবিল, তোষক,ব্যাগ, মেয়েদের কাপড় আরও অনেক জিনিস পড়ে আছে।
সে সরাসরি থানায় চলে গেলো।
ঢুকেই কনস্টেবল জাকির এর সাথে দেখা। জাকির তাকে দেখে অমায়িক একটা হাসি দিল।
“আরে আশফাক ভাই আপনি এখন আসলেন! আজকে তো থানায় ব্রেকিং নিউজ চলতেছে পুরা, আপনিই খবর দিছেন না?”
আশফাক হোসেন হাসি দিল একটা।
আশফাক দুপুরে যাওয়ার সময় থানায় খবর দিয়ে গিয়েছিল, রুনার নামে। রুনা নাকি তার বাসায় অবৈধ ব্যবসা চালায়।সে যে বাসায় সাবলেট থাকে, সেই বাসার কর্তা আর কর্ত্রী দুইজনই চাকরি করে, তাই সারাদিন বাসা ফাঁকাই থাকে। তার বাসা থেকে বেশ কয়েকটা ছেলে বের হতে দেখা গিয়েছে। সে ছাড়াও টং এর দোকানদার দেখেছে। পুলিশ গিয়ে প্রথমে টং এর দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলে সে স্বীকার করে যে সে দেখেছে বেশ কয়েকদিন রুনার সাথে কয়েকটা ছেলেকে বের হতে। বাঙালি সবকিছু তে রং চড়ায় বলতে পছন্দ করে, তাই একটা ছেলে থেকে কয়েকটা ছেলে হতে সমস্যা হয় না।এমনকি আশেপাশের কয়েকজনও সাক্ষী দেয় যে তারাও দেখেছে এটা।
এরপর পুলিশ গিয়ে বিকালে রুনা কে থানায় নিয়ে আসে। রুনার বাড়িওয়ালা এ সব শুনে রুনার সব জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দেয় রেগে গিয়ে।
আশফাক হোসেন থানার ভিতরে গিয়ে দেখল রুনা বসে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে।এস.আই তাকে মুখে বাঁকা হাসি নিয়ে প্রশ্ন করছে।
– “কতদিন হল এই ব্যবসা?”
– “আমার কোন ব্যবসা নেই”
– “এতোগুলা মানুষ তাহলে মিথ্যা কথা বলছে?”
– “স্যার, উনাদের কোন ভুল হয়েছে নিশ্চয়ই”
– “আজকে তাহলে কি দেখেছে সবাই দুপুরে?”
– “ও আমার ছোট ভাই ছিল স্যার”
– “হ্যাঁ। সবাই এভাবে ধরা পড়ার পরে খদ্দেরকে বাপ ভাইই বানায়” মুখে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল এসআই।
রুনার কান্নার শব্দ একটু বেড়ে গেলো।
ওসি সাহেব থানাতে ঢুকলেন এর মাঝে। সারাদিন উনি কোন কাজে বাইরে ছিলেন। রুনাকে দেখে জাকিরকে জিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছে, সে এখানে কেন।
জাকির সব বলার পর উনি মুখে মুচকি হাসি হেসে উনার রুমে ঢুকে গেলেন। জাকিরকে বললেন রুনাকে তার রুমে নিয়ে আসতে।
এবার মুচকি হাসি ফুটে উঠলো আশফাক হোসেনের মুখে। ওসি সাহেবকে যারা চিনেন সবাই ভালোভাবেই জানে তার মেয়েদের প্রতি দুর্বলতার কথা। ‘মেয়েখোর’ নামে তার বিশেষ পরিচিতি সব জায়গায়। সুযোগ পেলেই তিনি যে কোন মেয়েকে বিছানায় নিবেনই। রুনার ভাগ্যে তাইই আছে। আশফাক হোসেন ভালোভাবেই জানে যে রুনার কপাল ভালো থাকলে আজকে রাতের পর সে মুক্তি পাবে আর যদি ওসি সাহেবের তাকে ভালো লেগে যায় তাহলে সেই ভালো লাগা থাকা পর্যন্ত মৃত্যু ছাড়া আর মুক্তি নেই।অদ্ভুত এক পৈচাশিক আনন্দ পেতে লাগলো আশফাক হোসেন। সেটা প্রতিশোধের নাকি অন্যকিছুর সে জানে না।
গল্প টল্প করে ১২টা বাজার একটু আগে সে বের হল থানা থেকে। ক্ষুধা লেগেছে তার খুব। থানার কাছেই একটা মোরগ পোলাও এর দোকান আছে, বেশ ভালো। তার মোরগ পোলাও খেতে ইচ্ছা করছে। ওই দোকানের দিকে এগুতে লাগলো সে। এগুতে এগুতে সে দেখল দোকানটা বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়। শাটার অর্ধেক নামানো, বাইরে ডেকচি ধোয়া হচ্ছে। ধীর গতিতে দোকানের দিকে এগুতে লাগলো সে।

১ thought on “আশফাক হোসেনের একদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *