ইয়াজিদি ধর্মগ্রন্থ- মিশেফা রেশ, ‘কালো গ্রন্থ’- ৪র্থ পর্ব

[তৃতীয় পর্বের পর…]


[তৃতীয় পর্বের পর…]

এবং জেনে রাখো, নোয়াহের বন্যার পাশাপাশি এই পৃথিবীতে আরও একটি বন্যা হয়েছিলো। এরপর আমাদের অংশ, ইয়াজিদিরা অবতীর্ণ হলো নওমি থেকে, যিনি একজন সম্মানিত ব্যাক্তি, শান্তির রাজা। আমরা তাকে ডাকি মালিক মিরন। অন্য অংশরা অবতীর্ণ হলো হাম থেকে, যে তার পিতাকে অবজ্ঞা করতো। জাহাজটি নিশ্চল হয় আইন-সিফনি নামক গ্রামের নিকটে, মসুল থেকে পাঁচ পারাসাং দূরে। প্রথম বন্যার কারন ছিলো আমরা ভিন্ন বাকিদের ছলনা; ইহুদি, খ্রিস্টিয়ান, মুসলিম এবং অন্যান্যরা, যারা আদম এবং ইভ থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলো। অপরদিকে আমরা, কেবলমাত্র আদম থেকেই অবতীর্ণ হয়েছি, যা ইতিমধ্যেই বিবৃত। দ্বিতীয় বন্যা এসেছিলো আমাদের, ইয়াজিদিদের উপর। জল বাড়তে শুরু করলো এবং জলযান চলতে আরম্ভ করলো। এটি সিনজার পর্বতের কাছাকাছি এসে জলমগ্ন চড়ায় আক্রান্ত হলো এবং একটি পাথরখণ্ডে বিদ্ধ হলো। একটি সাপ নিজেকে পিঠার মতো পাকিয়ে নিলো এবং গর্ত বন্ধ করলো। তারপর জলযানটি চলতে শুরু করলো এবং জুদি পর্বতে এসে নিশ্চল হলো।

তারপর সাপেদের প্রজাতিরা সংখ্যায় বেড়ে গেলো এবং মানুষ এবং প্রাণীদের কামড়াতে শুরু করলো। শেষ পর্যন্ত তারা ধরা পরলো এবং তাদের পুড়িয়ে ফেলা হলো, এবং তাদের ছাই থেকে সৃষ্টি করা হলো পতঙ্গসমূহ। বন্যার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত সাত হাজার বছর। প্রত্যেক হাজার বছরে সাতজন ঈশ্বরের একজন বিধান, সংবিধান এবং আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য অবতীর্ণ হন এবং তারপর পুনরায় ফিরে যান তার অধিবাসে। এখন যেমন, তিনি আমাদের মধ্যে বাস করছেন, যেনো আমরা প্রত্যেক প্রকার পবিত্র ভূমির সন্ধান পাই। এই শেষ সময়ে ঈশ্বর আমাদের মাঝে বেশি সময় যাবত বাস করছেন; অন্যান্য ঈশ্বরদের চেয়ে, যারা তার পূর্বে এসেছিলেন। তিনি তার সন্তদের নিশ্চিত করেন। তিনি কুর্দি ভাষায় কথা বলেন। এমনকি তিনি ইশমাইলিয়দের নবী মহাম্মদকেও আলোকিত করেন, যার মুয়াবিয়া নামক একজন অনুগত ছিলো। যখন ঈশ্বর দেখলেন মহাম্মদ তার উপর আর ন্যায়নিষ্ঠ নেই, তিনি তাকে মাথাব্যাথা দ্বারা পীড়িত করলেন। তখন নবী তার অনুগতকে বললেন মাথা মুণ্ডন করে দেয়ার জন্য, কারন মুয়াবিয়া জানত কিভাবে মুণ্ডন করতে হয়। সে তার কর্তাকে তড়িঘড়ি করে মুণ্ডন করে এবং সেখানে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিলো। ফলস্বরুপ সে তার মাথা কেটে ফেলে এবং রক্তাক্ত করে। এবং ভয় পায় যে রক্ত মাটিতে পতিত হবে, তাই মুয়াবিয়া সেটা জিহ্বা দিয়ে চুষে নেয়। অতঃপর মহাম্মদ জিজ্ঞাসা করে- ‘মুয়াবিয়া, তুমি কি করছো?’ সে জবাব দেয়- ‘আমি আপনার রক্ত আমার জিহ্বায় ধারন করেছি, কারন আমি ভয় পেয়েছিলাম তা ভূমিতে পতিত হবে।’ তখন মহাম্মদ তাকে বললো- ‘তুমি পাপ করলে, হে মুয়াবিয়া; তুমি তোমার জন্য একটি জাতিকে নির্দিষ্ট করে নিবে, তুমি আমার অংশকে অস্বীকার করবে।’ মুয়াবিয়া উত্তর দিলো এবং বললো- ‘তাহলে আমি এই পৃথিবীতে প্রবেশ করবোনা। আমি বিয়ে করবো না।’

কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ঈশ্বর মুয়াবিয়ার নিকট একটি বিছে পাঠান, যা তাকে কামড়ায়; তার মুখে বিষক্রিয়ার ছাপ ফুটে উঠে। ডাক্তাররা তাকে মৃত্যুর পূর্বে বিয়ে করার জন্য বলেন। এটা শুনে, তিনি সম্মতি দেন। তারা তার জন্য আশি বছর বয়স্কা একজন বৃদ্ধ মহিলাকে নিয়ে আসেন, যেনো সে কোনো শিশুর জন্ম দিতে না পারে। মুয়াবিয়া তার স্ত্রীকে জানতো; এবং সে সকালবেলা পঁচিশ বছর বয়সী কোনো পূর্ণ যুবতীর মতো হয়ে গেলো, মহান ঈশ্বরের ক্ষমতাবলে। এবং সে সন্তানসম্ভবা হলো এবং জন্ম দিলো আমাদের ঈশ্বর ইয়াজিদকে। কিন্তু বিদেশী সুত্রে এই ঘটনাকে অস্বীকার করা হয়, বলা হয় আমাদের ঈশ্বর এসেছেন বেহেশত থেকে; মহান ঈশ্বর কর্তৃক ঘৃণিত এবং বিতাড়িত। এই কারনে তারা তাকে তিরস্কার করে। এই কারনে তারা পাপ করে, পথভ্রষ্ট হয়। কিন্তু আমরা ইয়াজিদিরা; এটা বিশ্বাস করি না, কারন আমরা জানি যে তিনি পূর্বোল্লিখিত সাতজন ঈশ্বরের একজন। আমরা জানি তার ব্যাক্তিরূপ এবং তার প্রতিকৃতিরূপ। এটি একটি মোরগের আকার, যা তিনি ধারন করেন। আমাদের মধ্যে কেউ তার নাম উচ্চারন করার অধিকার রাখে না, বা যা কিছু তার নামের উচ্চারনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। যেমন- এইতেন, আইতেন, আর, আত এবং এই রকম আরও। না আমরা উচ্চারন করতে পারবো মালন বা লানত বা নাল বা অন্যান্য শব্দ, এই একই রকম আওয়াজের। তার সম্মানের জন্য এই সমস্তই আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। একই সাথে হাস বাদ দেয়া হলো। আমরা এটা খাই না, কারন এটার উচ্চারন আমাদের নবীপত্নি হাসিয়ার মতো। মাছ নিষিদ্ধ, নবী যোনাহের সম্মানে। অনুরূপভাবে হরিন, কারন হরিন আমাদের চারজন নবীর একজনের পবিত্র মেষ। ময়ূর নিষিদ্ধ আমাদের শেখ এবং তার শিষ্যদের জন্য, আমাদের মালিক তাউসের উদ্দেশ্যে। একই সাথে লাউ বাদ দেয়া হলো। দাঁড়িয়ে থাকা জল অতিক্রম করা নিষেধ; অথবা জনগণের রীতি অনুযায়ী বসে পোষাক পরিবর্তন করা অথবা বসে পায়খানায় যাওয়া অথবা বসে গোসল করাও নিষেধ। যাই হোক, এর বিরুদ্ধে যে যাবে সেই ধর্মদ্রোহী। এখন অন্যান্য অংশরা- ইহুদি, খ্রিস্টিয়ান, মুসলিম এবং অন্যরা, এই সব বিষয় সম্পর্কে অবগত নয়; কারন তারা মালিক তাউসকে অপছন্দ করে। অতঃপর, তিনি না তাদের শিক্ষা দেন, না তাদের নিকটবর্তী হন। কিন্তু তিনি আমাদের মধ্যে অবস্থান করেন; আমাদের প্রদান করেন তার মতবাদ, বিধান এবং ঐতিহ্য; উত্তরাধিকারের মতো তার সমস্ত কিছু, যেমন প্রদান করেন পিতা পুত্রকে। তারপর মালিক তাউস ফিরে যান বেহেশতে।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *