স্বাধীন-বাংলাদেশে মোটামুটিভাবে আট-শ্রেণীর রাজাকার এখনও জীবিত আছে। এবং তারা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে ধৃষ্টতার সঙ্গে বংশবৃদ্ধি করে..

স্বাধীন-বাংলাদেশে মোটামুটিভাবে আট-শ্রেণীর রাজাকার এখনও জীবিত আছে। এবং তারা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে ধৃষ্টতার সঙ্গে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে।
সাইয়িদ রফিকুল হক


স্বাধীন-বাংলাদেশে মোটামুটিভাবে আট-শ্রেণীর রাজাকার এখনও জীবিত আছে। এবং তারা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে ধৃষ্টতার সঙ্গে বংশবৃদ্ধি করে চলেছে।
সাইয়িদ রফিকুল হক

১৯৭১ সালের ২৫-এ মার্চ আমরা ছিলাম ঘুমিয়ে। আর এমতাবস্থায় “রাতের আঁধারে” আমাদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী। কিন্তু তা সত্ত্বেও “প্রতিরোধ-যুদ্ধে” আমরাই জয়লাভ করি। আর আমাদের জয়লাভের পর পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনী আমাদের কাছে “মাফ” চেয়ে “জীবনভিক্ষা” নিয়ে পশ্চিমপাকিস্তানে ফিরে যায়। কিন্তু রয়ে যায় তাদের “বীজ” রাজাকার-আলবদর-আলশামস ও সর্বস্তরের “শান্তিকমিটির” সদস্যগং। আর এদের বংশবৃদ্ধি আজও অব্যাহতভাবে চলছে। কিন্তু এদের আর বাড়তে দেওয়া চলবে না।
যাক, বলছিলাম বর্তমান বাংলাদেশে আটরকমের রাজাকার আছে। আর এই আটশ্রেণীর রাজাকার মিলেমিশে “বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকে” ঘায়েল করার সর্বাত্মক-প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এখানে, খুব সংক্ষেপে এদের পরিচয় তুলে ধরার সামান্য চেষ্টা করা হলো।

১. প্রথমশ্রেণীর রাজাকার: এরা ১৯৭১ সালে সরাসরি রাজাকারি করেছে। আর কায়মনোবাক্যে পাকিস্তানের গোলামি করেছে। এরা সরাসরি “রাজাকারবাহিনী” কিংবা “আলবদরবাহিনী” কিংবা “আলশামসবাহিনী” কিংবা “শান্তিকমিটি”র সক্রিয় কর্মী-নেতা-সদস্য ছিল। এরা এখনও বাংলাদেশ আর আওয়ামীলীগের নাম শুনলে ক্ষেপে যায়। আর গালিগালাজ করে। আর একটু সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক ফায়দা-লুটতে এরা আওয়ামীলীগকে সবসময় “ধর্মহীন” ও “নাস্তিক” বলে গালিগালাজ করে থাকে। আর সবসময় পাকিস্তান-ভাঙ্গার জন্য ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’কে দোষারোপ করে তাঁকেও প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে গালিগালাজ করে থাকে। এরা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ রাজাকার। এবং এই জাতিরাষ্ট্রের জন্য এখনও হুমকিস্বরূপ। কারণ, এরা ভিতরে-বাইরে এখনও একেকজন “পাকিস্তানী-হানাদার”। এরা এখনও “জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের” অংশীদার। আর নয়তো এখনও তারা পাকিস্তানের দালাল-পার্টি: নেজামে ইসলাম, মুসলিম-লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ইত্যাদির সদস্য।

২. দ্বিতীয়শ্রেণীর রাজাকার: এরা ১৯৭১ সালের অবসরপ্রাপ্ত রাজাকারদের পুত্র-কন্যা-স্ত্রীসহ সকলপ্রকার আত্মীয়স্বজন ও বংশধর। এরা এদের পিতা, ভ্রাতা, পিতামহ, মাতামহ, চাচা, মামা, খালু, ফুপা, দুলাভাই, শ্বশুর ও অন্যান্য জ্ঞাতিবর্গের নিকট থেকে পাকিস্তানী“অমৃত-বচন” শ্রবণ করে-করে আজ একজন “সেমি-পাকিস্তানী”। তবে এদের কেউ-কেউ এখন ভিতরে-ভিতরে একেবারে পুরা-পাকিস্তানী। আর এদের “পাকিস্তানী-ঈমান-আকিদাহ” এতোই মজবুত যে, এরা দেশের ইতিহাস চোখের সামনে জাজ্বল্যমান অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও সীমাহীন অন্ধ-আনুগত্যে “পাকিস্তানকে” ভালোবেসে যাচ্ছে। এরা “বঙ্গবন্ধু” ও “আওয়ামীলীগকে” একদম সহ্য করতে পারে না। আর দেশের ভিতরে একটা-কিছু হলেই এরা “আওয়ামীলীগ” ও “বঙ্গবন্ধুকে” আক্রমণ করে কথা বলতে ভালোবাসে। এরা কখনও বীর-বাঙালি-জাতির মুক্তিযুদ্ধকে ভালোবাসে না। এবং শ্রদ্ধাও করে না। কিন্তু তারা সবসময় লোকদেখানোভাবে বাংলাদেশের জন্য কতো দরদ দেখায়! আর এরা এখন দেশের জন্য “মায়াকান্না” দেখাতে খুব ব্যস্ত। কারণ, এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে “রাজনৈতিক ফায়দা-লুটতে” চায়।

৩. তৃতীয়শ্রেণীর রাজাকার: এরাও ১৯৭১ সালের “পাকিস্তানী-হানাদারবাহিনীর” সক্রিয়-সদস্যদের ভাবাদর্শ দ্বারা এমনভাবে আলোড়িত ও তাড়িত হয়েছে যে, এদের এখন “পাকিস্তান” ছাড়া আর কিছু ভালো লাগে না। এদের কারও-কারও জন্ম মুক্তিযুদ্ধের আগে বা পরে। কিন্তু এরা পাকিস্তানকে এখনও “ইসলামী-রাষ্ট্র” ভেবে তাকেই জীবনের সর্বক্ষেত্রে ঠাঁই দিয়েছে। এরা বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টাও করছে। আর এদের আদর্শের প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে: “পাকিস্তানী-বীজের” ফসল “বিএনপি” ও তার অধীনস্ত দলসমূহ। যেমন—আজকের কথিত “বিশদলীয়-আঠারোদলীয়-জোট, বিগত চারদলীয়-জোট ইত্যাদি”। এরা সবসময় এই রাজাকারদলীয়-জোট ও রাজাকারবৃত্তের মধ্যে বসবাসের চেষ্টা করে থাকে। এরা শয়নে-স্বপ্নে-ধ্যানে-জ্ঞানে দিনরাত শুধু পাকিস্তানকে দেখতে থাকে। আর এদের একমাত্র আশা-ভরসা ও নেশা: পাকিস্তান। এরা পাকিস্তানকে এতো ভালোবাসে। আর তাই, এদের কাছে পাকিস্তানের “মদও” হালাল বলে মনে হয়।

৪. চতুর্থশ্রেণীর রাজাকার: এরা স্বাধীনতাপরবর্তী-প্রজন্মের একাংশ। কারণ, দেশের নতুন-প্রজন্মের বেশির ভাগই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে। কিন্তু এই “একাংশ” দেশের ভিতরে “পাকিস্তানী-বীজ-রোপণ” করার জন্য সবসময় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরা “জীন”গতভাবে পাকিস্তানীদের উত্তরসূরী। এদের বেশির ভাগই দেশের রাজাকারদের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন “প্রাইভেট-বিশ্ববিদ্যালয়ে” অধ্যয়নরত। এরা বাংলাদেশের জন্য আগাছা-পরগাছা ছাড়া আর কিছু নয়। আর বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় অভিশাপ হলো এইসব “প্রাইভেট-বিশ্ববিদ্যালয়”।

৫. পঞ্চমস্তরের রাজাকার: এরাও “জীন”গতভাবে পাকিস্তানের ধারক-বাহক হওয়ার চেষ্টা করছে। আর সেই মোতাবেক জীবনযাপন করে যাচ্ছে। এরা বাইরে “বাংলাদেশ-রাষ্ট্রকে” ভালোবাসার ভান করে থাকে। আসলে, এরা প্রত্যেকে ভিতরে-ভিতরে এক-এক-জন খাঁটি-পাকিস্তানী। এরা সবসময় আওয়ামীলীগের বিরুদ্ধে বলবে, বঙ্গবন্ধুকে গালি দিবে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদানকারী ভারত ও রাশিয়াকে আক্রমণ করবে। আর এরা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলতে-বলতে নিজেদের মুখে একেবারে ফেনা তুলে ফেলবে। ভারতের সমালোচনা করা কখনওই দোষের নয়। আর গঠনমূলক-সমালোচনা আমরা কিছু-স্পর্শকাতর বিষয় ব্যতীত সবকিছুরই করতে পারি। তবে এক্ষেত্রে তারা ১৯৭১ সালের কথা মনে করে আক্রোশবশতঃ ভারতের সমালোচনা করে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান এদের পিতৃভূমি। তাই, পাকিস্তানকে “বাপ” ডাকতে এদের কোনো লজ্জাশরম নাই। এরা একেবারে বিশ্ববেহায়া।

৬. ষষ্ঠস্তরের রাজাকার: এরা বলছে “আমরাও বাংলাদেশের উন্নয়ন চাই। তবে তা দুর্নীতিমুক্তভাবে।” এরা আসলে, এসব কথা বলে আওয়ামীলীগকেই ঘায়েল করে দেশের ভিতরে আবার রাজাকারি-শাসন কায়েম করতে চায়। এরা কথায়-কথায় আওয়ামীলীগ, ভারত, রাশিয়া, বঙ্গবন্ধু, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদি নিয়ে মারাত্মক অশালীনভাষায় ও কুরুচিপূর্ণভাবে বক্তব্যপ্রকাশ করে থাকে। এদের মধ্যে অনেক সার্টিফিকেটধারী-পশুও রয়েছে। যেমন, এরা বাংলাদেশে টিকে থাকার স্বার্থে এখন তাদের নামের আগে ব্যারিস্টার, অ্যাডভোকেট, অধ্যাপক, ইঞ্জিনিয়ার, সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর, ডাক্তার, সাংবাদিক, আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, মিডিয়া-ব্যক্তিত্ব, পরিবেশবিদ, কলামনিস্ট, ড. অমুক-তমুক, বিশিষ্ট-শিল্পপতি ইত্যাদি সম্মানজনক খেতাব ও পদবী ব্যবহার করছে। এরা আসলে বর্ণচোরা এবং এই দেশের একনাম্বার শত্রু। আর এইজাতীয় কিছুসংখ্যক রাজাকার “বর্তমান আওয়ামীলীগের” মধ্যেও ঘাপটি-মেরে আছে। এরা খুব শয়তান! এরা পানির মতো। আর তাই, এরা সবজায়গায় যখন-তখন মিশে যেতে পারে।

৭. সপ্তমস্তরের রাজাকার: এরা পাকিস্তানের ধুতুরা-ফুল। এদের দেখতে বাঙালি কিংবা বাংলাদেশীর মতো মনে হলেও আসলে এরা একেকজন সম্পূর্ণ পাকিস্তানী। এরা ভিতরে-ভিতরে পাকিস্তানী। কিন্তু তা সহজে মানুষকে বুঝতে দিতে চায় না। এরা একটু সুযোগ পেলে দেশের মুক্তিযুদ্ধ, আওয়ামীলীগ, বঙ্গবন্ধু, ভারত, রাশিয়া, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদিকে সবসময় আক্রমণ করে থাকে। এছাড়া এদের আর-কোনো বিদ্যাশিক্ষা নাই। এরা জন্মের পর থেকে “বঙ্গবন্ধু, ভারত ও আওয়ামীলীগকে” গালি দিতে শিখেছে। এইস্তরের রাজাকাররা খুবই ঘৃণিত ও ভয়াবহ। এরা ভদ্রবেশীশয়তান। দেশের বহু “ব্যারিস্টার-নামধারী” জানোয়ারও সরাসরি এই শ্রেণীভুক্ত। আর এখন বাংলাদেশ থেকে “এক-ব্রিফকেস” টাকা নিয়ে “পাপের শহর” লন্ডনে একবার যেতে পারলে অল্প-কিছুদিনের মধ্যেই তার নামের আগে ঝুলবে একটা “ব্যারিস্টার”-ডিগ্রী! আর সে তখন সমাজের একজন রেডিমেট বুদ্ধিজীবী হয়ে মাঝে-মাঝে বিভিন্ন “FTV”-তে টকশো-ফকশো করতে পারবে!

৮. অষ্টমস্তরের রাজাকার: এরা এখন নব্য-রাজাকার। এরা পতিত-বামপন্থী, পতিত-চীনপন্থী, পতিত-জাসদ, পতিত-বাসদ, পতিত-ন্যাপ(ভাসানী)পতিত-যেকোনো সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্য, পতিত-আওয়ামীলীগার, বহিষ্কৃত-আওয়ামীলীগার, আর নষ্ট-পচা-গলা “কমিউনিস্ট” ইত্যাদি। এরা সরাসরি বঙ্গবন্ধুকে গালি না দিলেও তাকে নিয়ে ইনিয়েবিনিয়ে নানারকম শয়তানীকথাবার্তা বলতে ভালোবাসে। আর এদের প্রায় সবাই “পাকিস্তানী-রাজাকারদের” মতো সবসময় “আওয়ামীলীগ, ভারত, রাশিয়া, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ” ইত্যাদির সমালোচনা করতে একপায়ে খাড়া। আর এরাও দেশের জন্য আজ ভয়ানক আপদবিপদ।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এই দেশটা ৩০লক্ষ জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা-লাভ করেছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আমরা, মানে, বাঙালিরা জয়লাভের পর আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিলাম। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই আমাদের টনক নড়তে থাকে। আমরা বুঝে যাই আমাদের হাতে “পাকিস্তানীনরপশু-সামরিকজান্তারা” রাষ্ট্রক্ষমতা-অর্পণ করবে না। তারা নানারকম কূটচালের আশ্রয়গ্রহণ করছে। আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু তখনকার রাজনৈতিক সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। আর তিনি ছিলেন, রাজনীতিবিদ। তাই, তিনি ছিলেন সহজ-সরল ভালোমানুষ। আর সেদিনের “পশ্চিমপাকিস্তানী” নামক ধূর্তশয়তানরা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস-প্রাণী। তবুও আমাদের নেতা পাকিস্তানীদের কূটচালের সঙ্গে টিকে থাকার সবরকম ব্যবস্থাই করছিলেন। সেইজন্য আজ আমরা স্বাধীন হতে পেরেছি। আমাদের এই স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-চেতনা সবসময় ধরে রাখতে হবে। আর এজন্য মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী-রাজনৈতিক দল: আওয়ামীলীগকে সবার আগে বিশুদ্ধ হতে হবে। আর এই দলের ভিতরে যতো আগাছা-আবর্জনা আছে আগেভাগে তা একেবারে আন্তরিকভাবে পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন করতে হবে। তাহলে, দেশে আর নতুনভাবে রাজাকারবৃদ্ধি পাবে না। আর বাংলাদেশ তখনই হবে সম্পূর্ণ রাজাকারমুক্ত।
জয়-বাংলা।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *